শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ২০


বিকেলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ঢুকেই দেখি ম্যাছাকার কাণ্ড ঘটে গেছে। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে গড়া গ্রুপ থেকে জানতে পারলাম, ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাট বিরোধী প্রতিবাদ মিছিলে নাকি পুলিশ ফাঁকা গুলি চালিয়েছে আর বেশ ক’জন ছাত্রছাত্রী আহত হয়েছে। এই ঘটনার সাথে সাথে পুরো দেশ জুড়ে চলমান ছাত্র-আন্দোলন এক নতুন রূপ নেয়। রাতে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা হয় কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে, ত্বরিত গতিতে আগামীকাল ১০ই সেপ্টেম্বর দেশের সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। যথারীতি রাতেই আমাদের কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়, আগামীকাল জিইসি মোড় অবরোধ করা হবে।

ছাত্রদের উপর পুলিশের গুলির খবর টিভিতে দেখতে পাবার পর থেকেই আম্মু সমানে আমাকে বকে যাচ্ছেন।

-কি দরকার এ? হুদাহুদি রাস্তাত নামি এনে মিছিল গরিবার? আর কথা ত হুনতু ন? বয়স তো এখন মিছিল গরিবার?

-জ্বি আম্মু । কবি হেলাল হাফিজের কবিতা ……

“এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়,

এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়”

(কবি হেলাল হাফিজের “নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়” শিরোনামের কবিতার এ দু-লাইন জনপ্রিয়তা পায় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে)

-“অ, যা গই মিছিলত। যেড়ে যর এডে খাইচ, এডে পরিছ…ঘরোত ন আইছ আর।”

-“মিছিলের সব হাত, কণ্ঠ, পা এক নয়

সেখানে সংসারী থাকে, সংসার বিরাগী থাকে

কেউ আসে রাজপথে সাজাতে সংসার

কেউ আসে জ্বালিয়ে বা জ্বালাতে সংসার”।

এতো বকাবকির মাঝেও আমার এমন কবিতা পাঠে আম্মু না হেসে পারলেন না। সকালের নাস্তা করতে করতে মা-ছেলের মাঝে একটুকু খুনসুটি হয়ে গেল আর বকুনি শেষে আম্মু বললেন…

-সাবধানে থাকিছ, বেশি আগে আগে ন দুরিবি। - মিছিলের আগে আগে দৌড়াতে নিষেধ করলেন আম্মু।

-আচ্ছা, ঠিক আছে।

ক্যাম্পাসে পৌঁছেই সরাসরি ক্যান্টিনে গেলাম, আজ সকাল থেকেই ক্যান্টিন ছাত্রছাত্রীদের পদচারণায় মুখর। একটু পরই পরিকল্পনা মাফিক বাইরে একসাথে সমবেত হয়ে মিছিল নিয়ে জিইসি মোড় অবরোধ করা হবে। সিনিয়র ভাইদের ডাক পড়তেই ছাত্রছাত্রীরা একে একে ক্যাম্পাসে সামনে জড়ো হতে শুরু করে, আগের মতোই ব্যানার, ফেস্টুন-প্ল্যাকার্ড সহকারে। কিন্তু আজ কেমন যেন সবার মধ্যে একটু বেশি আগ্রাসী মনোভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, হয়তোবা আগের দিনের ঘটনার কারণে। সিনিয়র ভাইদের নেতৃত্বে মিছিল শুরু হলো, বিবিএ ক্যাম্পাস থেকে শিমুল ভাইয়ের নেতৃত্বে আরেকটি মিছিল জিইসি মোড়ে যোগ দেবে আমাদের সাথে। আর পাশাপাশি আশেপাশের অন্যান্য ভার্সিটি থেকেও ছোট ছোট মিছিলও যোগ দিচ্ছে আমাদের সাথে। আমাদের মিছিলটি প্রাথমিক বাঁধার সম্মুখীন হয় গোলপাহাড় মোড়ে, অবস্থানরত ট্রাফিক সার্জেন্ট দীর্ঘ বাকবিতণ্ডা শেষে এই বিশাল জনস্রোতের কাছে হার মানলেন। হয়তোবা তারও মনে পড়ে গেল ফেলে আসা ছাত্রজীবনের দিনগুলির কথা, মুচকি হেসে সরে দাঁড়ালেন মিছিলের সামনে থেকে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা নগরীর ব্যাস্ততম পয়েন্ট “জিইসি মোড়” এসে পৌঁছলাম। এ এক বিশাল জনসমুদ্র, বিভিন্ন ভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের স্লোগানে স্লোগানে গমগম করছে এই জিইসি মোড়…এ দৃশ্য আগে কখনো দেখিনি।

“ভ্যাট দিব না, গুলি কর” , “NO VAT” , “জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও…মাল-মুহিতের আস্তানা” – স্লোগানের ধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলছিল আশে পাশের ভবনগুলোতে।

প্রথম দিকে বিক্ষিপ্তভাবে এ আন্দোলন চলতে থাকায় পুলিশ এসে আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। কিন্তু আমরা আমাদের প্রতিবাদে ছিলাম অটল, হয়তো পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা ভেবেছিলো…দৌঁড়ে এসে হুমকি-ধমকি দিলেই আমরা কেটে পড়ব। কিন্তু এসব হুমকি-ধমকি কে আমরা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছিলাম, কেননা আমরা জানতাম আর যাই হোক গতকালের মতো পুলিশ দ্বিতীয়বার আর ভুল করবে না। মুক্তা দিদি ও শিমুল ভাই পুলিশ অফিসারের সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে সিদ্ধান্তে এলেন, মোড়ের মাঝামাঝি আমরা ঘন্টা-দুয়েকের জন্যে অবস্থান নেব। মাইকে মুক্তা দিদির ঘোষণা আসতেই আমরা সবাই একে একে রাস্তার মোড়ের ট্রাফিক পুলিশ পয়েন্ট ঘিরে গোল করে বসে গেলাম। আজও আমি “No VAT” লেখা সেই গোলাপী টিশার্ট গায়ে চড়িয়েছি। প্রচুর সাংবাদিক ও টিভি রিপোর্টার ভিড় করেছেন মাঝের সেই ট্রাফিক পুলিশ পয়েন্টে। আমরা আমাদের অবস্থানে অটল, “No VAT” “No VAT” স্লোগানে সবাই তাদের প্রতিবাদ জানাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল কবি সুকান্তের “দুর্মর” কবিতার দুটি লাইন-

“হয় ধান নয় প্রাণ, এই শব্দে সারা দেশ দিশেহারা

একবার মরে ভুলে গেছে আজ মৃত্যুর ভয় তারা।”

ঘন্টা দুয়েক ধরে জিইসি মোড় অবরোধ শেষে ধীরে ধীরে পুলিশ আমাদের অবস্থান ছাড়তে বাধ্য করছিল। ইতোমধ্যেই ছাত্রছাত্রীদের পরিমাণও অনেক কমে এসেছে, অনেকেই ছেড়ে চলে গেছে রাজপথ। আর তাই শিমুল ভাইয়ের ঘোষণা মতো আমরাও রাজপথে অবস্থান ছেড়ে দিয়ে মিছিল নিয়ে চললাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্বারকলিপি পেশ করার উদ্দেশ্যে।

>>>>>>>>>

শুক্রবার, সাপ্তাহিক ছুটির দিন। গত দিনের মিছিল আর সড়ক অবরোধের ক্লান্তি নিয়ে প্রচুর ঘুমিয়েছি বাসায় এসে। জুমার নামাজ শেষে খেয়েদেয়ে গেলুম কোচিং এ ক্লাস নিতে। একটা ক্লাস শেষ করে শিক্ষক রুমে গিয়ে বসতেই পত্রিকা হাতে ইংরেজি শিক্ষক রাকিব স্যারের প্রবেশ।

-সানি স্যার, আজকে তো আপনি ট্রিট দিচ্ছেন?

-কিসের ট্রিট ঠিক বুঝলাম না।

-আরেহ আপনি ত ফেমাস হয়ে গেছেন। ট্রিট দিতেই হবে।

-কাশছেন যখন আরেকটু নাহয় ঝেড়েই কাশুন স্যার। বলতে না বলতে পরিচালক হালিম স্যারও যোগ দিলেন আমাকে মুরগি করার ফন্দিতে।

-পত্রিকা দেখেন আজকের। আপনার ছবি !

-আরেহ, এটা তো আমিই। আমার সেই “No VAT” লেখা গোলাপী টিশার্ট, জিইসি মোড়ে আন্দোলনরত আমি ও সকলে, আর ছবির নিচে ক্যাপশন “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে জিইসি মোড় এলাকায় সড়ক অবরোধ করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে শিক্ষার্থীরা-আজাদী”। খাইছে, আমিতো শেষ। এখন সবাই গণহারে ট্রিট চাইলে তো আমি শেষ।

-মজা করলাম স্যার। আপনাকে নিয়ে সত্যিই আমরা গর্বিত। আপনি আপাতত রাজপথে থাকুন, আপনার ক্লাসগুলো আমরা নিয়ে নেব।

-আরেহ না না, আমার ক্লাস আমি সময় করে নিতে পারব। আর হ্যাঁ, ট্রিট দিব…আন্দোলনটার একটা গতি হোক।


>>>>>>>>>>

সরকার এখনো ছাত্রদের দাবি মেনে নেয়নি আর তাই শনিবার থেকেই পুরোদমে সকাল বিকাল ক্লাস বর্জন ও সড়ক অবরোধের সিদ্ধান্ত আসে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে। আমরাও আমাদের পরিকল্পনামতো আবারো মিছিল নিয়ে বেরোই ক্যাম্পাস থেকে, এবারের পরিকল্পনা ওয়াসা মোড় অবরোধ। এই অবরোধটা গতদিনের চেয়ে কিছুটা জমে উঠেছিল বটে। আমরা এবার মোড়ের কেন্দ্রে অবস্থান না নিয়ে হাতে হাতে ধরে বিশাল বর্গাকার মানববন্ধন সৃষ্টি করলাম। এই মানবব্যুহের

শান্তিপূর্ণভাবেই ঘন্টার পর ঘন্টা সড়ক অবরোধ চলছিল, পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও নিরুপায় হয়ে হাল ছেড়ে দিলেন। এভাবে প্রতিদিনকার চলতে ফিরতে যে সড়ক ব্যবহার করি সেই সড়কে এভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকব তা কখনো কল্পনাও করিনি। তীব্র গরমে এই পিচঢালা রাস্তার মধ্যে বসে থাকতে যদিও কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু এসব কষ্টকে ভুলে থাকতে ছেলেপিলেরা সড়কের পিচঢালা রাস্থায় তাদের প্রতিবাদগুলো লিখলে শুরু করল। খাবার ও পানির ব্যবস্থা করা হচ্ছিল স্বেচ্ছায় উদ্যমী কিছু তরুণদের পক্ষ থেকে। আমি শাওন, প্রসেনজিত, ওয়ারিফ, রিয়াদ, সাব্বির অবস্থান নিয়েছিলাম আটকে থাকা কিছু গাড়ির সামনেই। স্লোগানের পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে হাসি-আড্ডা-মজা চালিয়ে যাচ্ছিলাম নিজেদের চাঙ্গা রাখতে। পেছনে থাকা গাড়ির ড্রাইভাররা বেরিয়ে কতোই না কাকুতি মিনতি করছিল…কিন্তু এসবের কিছুই যে আমাদের হাতে নেই। অবশ্য দু-একজন প্রবীণ ভদ্রলোক আমাদের আন্দোলেন পক্ষেই কিছু কথা বলছিলেন।

-“মেলা দিন পর ছাত্রসমাজ ক্ষেপছে। এই রকম আরো বেশি বেশি অন্দোলনের দরকার আছে। পাইছে টা কি? মগের মুল্লুক ? যখন যা খুশি চাপাই দিবো !”

আজও বেশ কিছু মিডিয়ার লোকজন এসেছে, এদের দেখেই আমি একপাশে চলে এলাম। গতদিন পত্রিকায় ছেপেছিল বলে আম্মুর হাতে পড়েনি, টিভিতে আমার কীর্তিকলাপ দেখলে পরে আম্মু আর ভাত দেবে না। হঠাৎ লক্ষ করলাম পরিচিত কেউ একজন, কাছে যেতেই দেখি স্কুলের বন্ধু সৈকত। আমাকে দেখে বেচারা একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে, সাথে গার্লফ্রেন্ড ছিল বলে কথা।

-কি খবর দোস্ত? তোরে মিছিলে দেখে ভালই লাগল।

-আরে সানি। পরিচয় করিয়ে দিই, এটা হচ্ছে…… আর ও হচ্ছে সানি আমার স্কুলফ্রেন্ড।

-হেলো। তরুণীর দিকে সরাসরি না তাকিয়ে অপ্রস্তুতভাবে সম্বোধন করলাম।

-আচ্ছা, তুমি এদিকটায় থাকো। সানির সাথে আমি ওদিকে যাচ্ছি।

গার্লফ্রেন্ড নিয়ে হাতে হাত ধরে কেউ আন্দোলনে আসবে এটাও আমার নতুন অভিজ্ঞতা। সে যাই হোক চলমান আন্দোলন ও আমাদের করণীয় নিয়ে দু-চারটে উপদেশমূলক কথা শুনিয়ে সৈকত বেচারা আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার ললনার হাত ধরল। বিড়বিড় করলাম হেলাল হাফিজের কবিতার আরো দুটি লাইন…

“শাশ্বত শান্তির যারা তারাও যুদ্ধে আসে,

অবশ্য আসতে হয় মাঝে মধ্যে”।

<<<<<আগের পর্ব 


মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ১৯



আকমল আলী রোড ধরে অলি গলি পেরিয়ে রিকসা এসে থামলো বেড়িবাঁধ এর কাছাকাছি, একটু পরেই খেজুরতলা বীচ। সাগরের কোল ঘেঁষে বাঁধের এপারে গড়ে উঠা জেলেদের ছোট ছোট ঘর আর বেশ কিছু ভাসমান মানুষের আবাসস্থল। ভাসমান লোক গণনা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মেজো খালার সাথে আজ এদিকটায় এসেছি। যখনই কোন না কোন সমস্যায় পড়েছি মা-বাবার পরে এই জুলেখা খালার কাছেই সাহায্য কিংবা পরামর্শ পেয়েছি। আমার এখনো মনে পড়ে, সেই ছোট্টবেলায় বয়স তখন সাত কি আট, জন্মদিন পালন করতো না আব্বু-আম্মু কখনো। অইদিন কিছুই না জানিয়ে নানু আর মামাদের নিয়ে কেক, গিফট সহ বাসায় এসে আমাকে চমকে দেয় এই জুলেখা খালা। বয়স যতো বেড়েছে জন্মদিনের উপর আগ্রহটা ততোটাই কমেছে, মেজো খালাও তার পরিবার সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন আর বিশেষ কারো কোন তাগিদেও কখনো কেক কাটা হয়ে উঠেনি। ও হ্যাঁ, স্নাতকের তৃতীয় বর্ষে গিয়ে সম্মিলিত কেক কাটা হয়েছিল বটে…নোবেল, কামরুল আর আমি – তিনজনেরই জন্মদিন ছিল ওদিন। সে যাই হোক, হাঁটতে হাঁটতে একখানা লম্বা বেড়ার টিনশেড ঘরের সামনে এলুম। দরজার বাইরে একটা এনজিও-র গণশিক্ষা কার্যক্রমের সাইনবোর্ড।
-আন্টি, এখন আমাদের কি করতে হবে ?
-কিচ্ছু করতে হবেনা আজকে। আজকে হবে ট্রেনিং…কিভাবে ঘরে ঘরে গিয়ে গণনা করতে হবে তার বেসিক ট্রেনিং।
-ও আচ্ছা, তাহলে তো ভালই হবে। নতুন কিছু শিখব।

ভেতরে ঢুকতেই দেখি স্কুলঘরের মতো টুল-টেবিল বসানো, পুরো কক্ষ বিভিন্ন বয়সী মানুষে গিজগিজ করছে। মাঝামাঝি গিয়ে বসলাম। মধ্যবয়স্ক একজন অফিসার আর আমার মেঝো খালা সামনে থেকে সবার ক্লাস নিচ্ছিলেন। উপস্থিত সব গণনাকারীদের কয়েকটা গ্রুপে ভাগ করা হলো আর একজন করে সুপারভাইজার নির্বাচন করা হলো প্রতিটি গ্রুপে। আন্টি আমাকে তার গ্রুপেই রাখলেন। দীর্ঘ দু-ঘন্টার ক্লাস শেষে সবাইকে খাতা-কলম, পরিচয়পত্র আর ইন্সট্রাকশন ম্যানুয়েল বুঝিয়ে দেয়া হলো। ক্লাস শেষে বুঝতে পারলাম ভাসমান মানুষ মানেই শুধু বস্তি এলাকা না, আশেপাশে টিনশেড কলোনীগুলোতে যেসব দিনমজুর, গার্মেন্টসকর্মী কিংবা বিভিন্ন শ্রেণীপেশার অস্থায়ী মানুষ বসবাস করেন তাদেরও গণনায় নিতে হবে। আমি আর আন্টি বাইরে বেরিয়ে এলাম…

-চল আজকেই গিয়ে কিছু গণনা শেষ করে ফেলি। আমি এবং গ্রুপের বাকি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন আন্টি।
-কিন্তু আন্টি, এত বিশাল এলাকা। কোত্থেকে শুরু করব, সবাইকে একটা করে ম্যাপ দিলে ভাল হতো না?
-আরেহ, এই এলাকার অলি-গলি সব আমার মুখস্থ। তোরে কোন কোন ঘরগুলা গুণতে হবে দেখাই দিব চল।
আমার মাথায় কেবল ঘুরছিল, এভাবে প্রত্যেকটা ঘরে ঘরে গিয়ে গিয়ে কিভাবে প্রশ্ন করব- কোন পূর্ব-অভিজ্ঞতা নেই এই কাজে। গ্রুপের বাকিদের তাদের গণনা এলাকা বুঝিয়ে দিয়ে আন্টি আমাকে নিয়ে চললেন। খুব ঘিঞ্জিবস্তি এলাকা…আবর্জনার স্তূপ, নোংরা কলঘর আর অলি গলি পেরিয়ে আন্টির সাথে কয়েকটা ঘরে গেলাম। আন্টি কিভাবে প্রশ্ন করছিলেন আর সম্পূর্ণ একটা নতুন পরিবেশের সাথে কি-করে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছিলেন তা বোঝার এবং শেখার চেষ্টা করছিলাম। এরপর একটা বিশাল টিনশেড কলোনীর দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন আমাকে, প্রায় ৪০-৫০ খানা ঘর হবে এখানে। প্রতি গণনাকারীদের ১৫০ ঘর/খানার একটা টার্গেট সেট করে দেয়া হয়েছে। (বিবিএস এ খানা বলতে বোঝায় যারা এক ঘরে থাকেন এবং এক হাঁড়ির খাবার খান ) আন্টি চলে গেছেন, একবুক নিঃশ্বাস নিয়ে মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে বললাম- “আমি পারব, আমাকে পারতেই হবে”।
-আসসালামু-আলাইকুম, আমি একটা পরিসংখ্যান এর একটা জরিপের কাজে এসেছি। যারা এই এলাকায় অস্থায়ী তাদের গণনা কার্যক্রম।
-হ্যাঁ, আসুন।
-আপনিই কি খানাপ্রধান মানে পরিবারের কর্তা?
-হ্যাঁ।
-আচ্ছা, আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট টি নিয়ে আসুন। আমার এখানে ১৫-২০ টির মতো প্রশ্ন আছে। এতে করে আপনার এবং আমার দুজনেরই সুবিধে হবে।

যতদূর মনে পড়ে প্রথম ঘরের ওই ব্যাক্তি পেশায় ছিলেন একজন ভ্যানগাড়ি চালক, আর তার স্ত্রী গার্মেন্টসকর্মী। নদীভাঙ্গনের কবলে ভিটে-মাটি হারিয়ে চলে এসেছেন চট্রগ্রাম। এভাবে দু-তিনটে ঘর গণনা করতে করতে মোটামুটি আয়ত্ত্বে এসে যায় সবকিছু। প্রশ্নগুলোও মাথার মধ্যে সেট হয়ে যায়। বইখানার প্রশ্নগুলো এমনভাবে তৈরী করা হয়েছিল যাতে করে একটা পরিবারের আর্ত-সামাজিক অবস্থার চিত্র ঠিকঠাক তুলে ধরা যায়। কিছু কিছু ঘরে তো সরকারি পরিচয়পত্র দেখানোর পরও তথ্য দিতেই চাইছিল না, এই গণনার উপর আসন্ন যে কোন দুর্যোগে সরকার থেকে পর্যাপ্ত সাহায্য পাবে- এমন ছাইপাস বুঝিয়ে তথ্য নিতে হচ্ছিল। অথচ মধ্যসত্ত্বভোগীদের কল্যাণে এইসব সাহায্যের যে সুষম বন্টন হয়না তা আপনি আমি সবাই জানি।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নেমেছে, মাত্র ২০টি ঘর গণনা করতে পেরেছি আজ। প্রচুর গরম পড়েছে সারাদিন, কাকফাটা রোদ সকাল থেকেই। একফোঁটা পানিও পড়েনি গলায় গত কয়েক ঘন্টায়, শেষের ঘরে পানি চেয়ে নিয়ে পিপাসা মেটালাম। অনেক হয়েছে, আজ আর না। অধিকাংশ ঘরেই আবার তালা দেয়া, যা বুঝলাম গার্মেন্টস ছুটির পর মানে সন্ধ্যের পর থেকেই গণনায় আসতে হবে। দিনশেষে এটুকুই প্রাপ্তি, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে কথোপকথন যা আগে কখনো হয়ে উঠেনি। এরমধ্যে পেশাজীবী-শ্রমজীবী মানুষ যেমন ছিল, তেমন ছিল আমার মতো ভার্সিটির ছাত্ররাও…ঘরভাড়া কম হওয়াতে এদিকটায় এসে উঠেছে।
>>>>>>>>>>>>
আজ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পূর্বঘোষিত সেই সংহতি সমাবেশ। ঢাকার রাজপথ ভ্যাট আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীদের পদচারণায় মুখর, দেশব্যপী এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। সকালের একটা ক্লাস শেষ করেই আমরা সবাই সমবেত হলাম ক্যান্টিনে। ব্যানার-ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড রেডি করা হয়ে গেছে…ক্যাম্পাসের সামনে সবাই সমবেত হতে শুরু করল। পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্যাম্পাসের সামনে থেকে মিছিল করতে করতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পৌঁছাবো আমরা। রাস্তার একপাশ পুরোপুরি ব্লকড, আশেপাশের লোকজন সব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে… এ আবার কিসের মিছিল? প্রথম কয়েকটি সারিতে হাতে হাত ধরে দৃঢ় মানবব্যুহ তৈরী করা হয়েছে…এরপর থেকে সারি সারি করে ছাত্রছাত্রীরা যুক্ত হচ্ছে। ছাত্রীদের সামনের দিকে দাঁড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন মুক্তা দিদি- এও হয়তো আন্দোলনের কোন কৌশল। আমি, ওয়ারিফ, শাওন, সাজিদ, নোবেলসহ যে যেভাবে পারছিলাম একটা সুশৃঙ্খল র‍্যালির লক্ষ্যে ছাত্রছাত্রীদের সমবেত করছিলাম।

-এই ওয়ারিফ, এদিকে আয়। আমি তুইসহ কয়েকজন একসাথে থাকব…ছাত্রছাত্রীদের মাঝের এই সারিতে, যাতে করে কিছু হইলেই আমরা সামনে থাকা আপুদের প্রটেকশান দিতে পারি।
-আচ্ছা ঠিক আছে। আমি মীর, সিফাত আর তাহমিদ কেউ ডাকতেছি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মাইকে ঘোষণা আসল- “আমরা এখন আমাদের যাত্রা শুরু করব কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের উদ্দেশ্যে”। তৎক্ষণাৎ সামনে থেকে স্লোগান উঠল “নো ভ্যাট” কিংবা “ভ্যাট দিব না, গুলি কর” ইত্যাদি। এই “No VAT on Education” এখন আমাদের সকলের প্রাণের দাবী হয়ে উঠেছে। কিছুক্ষণ পর পর ওয়ারিফ এতোটাই উত্তেজিত হয়ে পড়ছিল যে, মিছিলের সামনে গিয়ে দু-একটা স্লোগান দিয়ে আসছিল। আবার গলা ভেঙ্গে গেলে পরে পেছনে চলে আসছিল। একজন হাঁপিয়ে গেলে আরেকজন, এভাবেই চলছিল- এক পর্যায়ে আমিও গেলাম সামনে। স্লোগান দিতে দিতে একটা মিছিলকে লীড করতে যে কি প্রাণশক্তি তা সেদিন অনুভব করেছিলাম…… স্লোগানের ধ্বনি মিছিলের শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে আর তারই প্রত্যুত্তরে মিছিলে থাকা সবাই একসাথে কণ্ঠ মেলাচ্ছে।

আমাদের বিশাল মিছিল নিউ মার্কেট এর পাশ ঘেঁষে চট্রগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে থামল। অন্যান্য ভার্সিটি থেকেও ছেলেপিলেরা যোগ দিয়েছে আমাদের এই মিছিলে। শিমুল ভাই এর কণ্ঠ মাইকে ভেসে এলো-“সবাই আমরা রাস্তার একপাশ করে বসে পড়ি, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ হবে।” শহীদ মিনারের সামনে একটা স্ট্যান্ড মাইকের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। আর তারই সামনে রাস্তার উপর লাইন করে বসে পড়লাম আমরা সবাই। একে একে অর্পন দাদা, মুক্তা দিদি, শিমুল ভাই সহ আরো অনেকেই বক্তৃতা দিতে থাকল। আমাদের ছাত্রসমাজের বিভিন্ন বিপ্লবী আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে উপস্থিত সবাইকে উজ্জীবিত করছিলেন বক্তারা। যতটুকু বুঝলাম সামনে আরো কঠোর আন্দোলনে নামতে হবে, স্বারকলিপি পেশ, ক্লাস বর্জন ও রাজপথ অবরোধ এর মতো কর্মসূচির ঘোষণা আসল নেত্রী মুত্তা দিদির ঝাঁঝালো বক্তব্যে। হঠাৎ সামনে থেকে এসে আমার নাম ধরে ডাকল সাজিদ…
-এই,বক্তৃতা দিবি নাকি ?
-হ্যাঁ, দেয়া যায়। আর কে কে দিচ্ছে?
-আমি আর শাওন দিচ্ছি। তুই চাইলে দিতে পারিস।
-সমস্যা নাই , বলতে পারব।
-তোর পুরা নামটা বল তো, লিখে নিই।
স্কুল-কলেজে উপস্থিত বক্তৃতার অভিজ্ঞতা আছে, এছাড়া কোচিং এর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কমবেশি কথা বলতেই হয় মঞ্চে গিয়ে। কিন্তু এই পরিস্থিতিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন, একগাদা ছেলেপিলে রাস্তার উপর বসে। এদের অনেককেই আমি চিনি না, মাথার উপর কাঁকফাটা রোদ। একটা ছোট কাগজে বলার জন্যে কিছু টপিক্স টুকে নিলাম আর মনে মনে একটা ছোটখাটো রিহার্সাল করে নিলাম। মাইকে ভেসে এলো মুক্তা দির কণ্ঠ-
-“উচ্চশিক্ষার উপর এই অযৌক্তিক ৭.৫% ভ্যাট এর প্রতিবাদে আজকের এই সমাবেশে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে থেকে বলতে আসছে ইঞ্জিনিয়ারিং প্রথম বর্ষের ছাত্র, এহসান সানি”

মাইকের সামনে এগিয়ে গেলাম, বলতে শুরু করলাম নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেই-এই টিউশন ফি জোগাড় করতে কি পরিমাণ পরিশ্রম করতে হয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মাঝেও মেধার কমতি নেই, বিসিএস-সহ বিভিন্ন প্রতিযোগীতামূলক পরীক্ষায় পাবলিকের পাশাপাশি মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছে এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্রছাত্রীরা, তারপরও কেন এতো অবজ্ঞা, কেন এতো লাঞ্ছনা?...ইত্যাদি ইত্যাদি। বক্তব্য শেষ করে যদিও হাততালি পেলাম, কিন্তু এই হাততাতিলে বিন্দুমাত্র আনন্দ উপলব্ধি নেই বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত।


শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা -পর্ব ১৮



ভোর পাঁচটা… ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বাস জিইসি মোড় নামিয়ে দিল। আমি আর সুব্রত নেমে প্রবর্তক এর দিকে হাঁটা শুরু করলাম, রাশেদ চলে গেল দুই-নাম্বার গেটের দিকে। জিইসি মোড়ে একটাও গাড়ি চোখে পড়ছিল না যে বাসায় ফিরে যাব, তাই সময় অতিবাহিত করতে একটু এদিক ওদিক হাঁটাহাঁটি। সুব্রত ছেলেটা খুব সিরিয়াস, সারারাত জার্নি করে এসেও সকাল সাড়ে আটটার ক্লাস নাকি মিস দেয়া যাবে না…কি না কি পরীক্ষা আছে, আর তাই এখন প্রবর্তক গিয়ে মন্দিরে উঠবে…বিশ্রাম নিয়ে পরে সকালের ক্লাসে আসবে। আমারও ক্লাস ছিল বটে, আমার কাছে এসব থোরাই কেয়ার…দু-একদিন ক্লাস না করলে কিই বা হবে আর ! সুব্রতকে একটু এগিয়ে দিয়ে মিনিট বিশেক অতিবাহিত করতেই কাটগড়ের গাড়ি পেয়ে যাই আর উঠে পড়ি। বাসায় ফিরে পুরো দিনটাই ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম এক রকম।

পরদিন… ক্লাস শুরুর আগে আমি আর রাশেদ বাকিদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম পেছনের দিকে বসে। হঠাৎ নুহাশ এসে আমাদের নাম ধরে ডাকল…
-IUT তে প্রতিযোগিতায় যারা যারা গেছে তাদেরকে মুন্না স্যার ডাকছে। সানি, রাশেদ, সুব্রত…এদেরকে ডাকছে স্যার।
-খাইছে, কেইস খেয়ে গেলাম নাকি ?
-জানিনা, আমাকে বলছে শুধু তোদেরকে পাঠাই দিতে। আর কিছু বলে নাই।
ভার্সিটির কোন স্যারকে না জানিয়েই আমরা নিজেরাই একরকম এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলাম, এই খবর হয়তো স্যারদের কানে গেছে। আর এজন্যেই ডাক পড়েছে টিচার্স রুমে… আমার মুখ থেকে আর কথা বার হচ্ছিল না। নিজেদের দোষ স্বীকার করে নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই, নিজেদের এই বুঝ দিয়ে তিনজনই ভয়ে ভয়ে টিচার্স রুমে গেলাম।
-স্যার, আসব?
-হ্যাঁ, আস…আস। স্যার এদের কথা বলছিলাম। এরা IUT তে গেছে…Mecceleration কন্টেস্ট এ।
মুন্না স্যার কথাগুলো বলছিলেন রুমে থাকা টোটন স্যার-কে লক্ষ্য করে। রুমে থাকা অন্যান্য স্যার-ম্যাডামদের সবার চোখ আমাদের তিনজনের দিকে। অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম আমরা…মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছিল না। সময় টাও কেন যেন থমকে গেছে, “কোনক্রমে এই যাত্রায় রক্ষা পেলেই বাঁচি”-মনে মনে এই প্রার্থনা করছিলাম। সহসা সহকারী অধ্যাপক টোটন চন্দ্র মল্লিক স্যার আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন…
-কোন সেমিস্টার?
-স্যার, সেকেন্ড সেমিস্টার।
-বাহ, তোমাদের আগ্রহ দেখে ভালো লাগল। এই আগ্রহ যাতে শেষ পর্যন্ত থাকে। এই মুন্না, আমি গেলাম…ক্লাস আছে।
ঠিক বুঝলামনা ব্যাপারখানা কোনদিকে মোড় নিচ্ছে। আসন্ন বিপদের সম্ভাবনা এখনো জিইয়ে রেখেছি মনে মনে। ঠিক তখনই থমথমে পরিবেশ ঠান্ডা করলেন মুন্না স্যার।
-হ্যাঁ, তারপর বলো ওইখানে কি কি শিখছ? কারা কারা আসছে?
-অনেক কিছুই তো দেখলাম স্যার। ঢাকার অনেক নামকরা ভার্সিটি থেকে ছেলেপিলেরা আসছে। চট্রগ্রাম থেকে শুধু আমরা গেছিলাম।
-কি কি প্রজেক্ট আনছে মনে আছে?
-আর্ডিনো আর রাসবেরি পাই নিয়ে বেশির ভাগ প্রজেক্ট। আমরা জাস্ট একটা মডেল নিয়ে গেছিলাম।
-যাই হোক, প্রথমবার গেছ শিখছ তো। এভাবে বিভিন্ন কন্টেস্ট এ যাবা, নতুন নতুন প্রযুক্তি শিখে নিজেরা অইটা নিয়ে কাজ করবা, আরো ডেভেলপ করে বেটার কিছু বানাবা। আর কোন হেল্প লাগলে আমিতো আছিই।
-ঠিক আছে স্যার।

আমাদের সবার কলিজায় পানি আসল, যা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। মুন্না স্যার আমাদের ইইই ডিপার্টমেন্ট এর প্রথম ব্যাচের স্টুডেন্ট ছিলেন। স্নাতক শেষ করে নিজের ভার্সিটি-তেই ফ্যাকাল্টি হিসেবে যোগ দেন। গত সেমিস্টার থেকেই এর-ওর কাছে উনার ব্যাপারে শুনে যাচ্ছি, স্টুডেন্টদের কোন সমস্যার সমাধান হচ্ছে না…মুন্না স্যার আসলেন তো প্রব্লেম সলভ। একজন ভার্সিটির শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের সাথে এতোটা আন্তরিক হতে পারে তা আমার জানা ছিল না। এককথায় প্রতিনিয়ত ডিপার্টমেন্ট এর শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের মাঝে এক মধুর মেলবন্ধন সৃষ্টি করে যাচ্ছেন সবার প্রিয় এই মুন্না স্যার। শুনেছি রোবোটিক্স ক্লাবটাও নাকি উনারই সুন্দর চিন্তার ফসল। টিচার্স রুম থেকে বেরুতে গিয়ে আবার কি মনে করে ঢুকলাম…
-স্যার, আর্ডিনো কিভাবে শিখব ?
-তুমি এক কাজ কর, আগে সার্কিট ডিজাইন শিখ, মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে জান। “প্রোটিয়াস” আর “মিক্রো-সি” সফটওয়্যার দুইটা আমার কাছ থেকে নিয়ে যাবা ।
-আচ্ছা ঠিকাছে, আসি স্যার। আসসালামু-আলাইকুম।
টিচার্স রুম থেকে বেরিয়ে সোজা ক্লাসে ঢুকে গেলাম। অনিল স্যারের ক্লাস, স্যার আজ রেজোনেন্স নিয়ে পড়াচ্ছিলেন।
-একটা ফ্রিকোয়েন্সি আরেকটা ন্যাচারাল ফ্রিকোয়েন্সির সমান বা কাছাকাছি হইলে তাঁকে রেজোনেন্স বলে। এসি সার্কিটে যখন দুইটা রিএকটেন্স একটা আরেকটা কে ক্যান্সেল করে দেয়, মানে XL = XC  হয় তখন যে ফ্রিকোয়েন্সি পাই অইটাকে রেজোনেন্স ফ্রিকোয়েন্সি বলে।
-স্যার বুঝতেছিনা । মিশন স্যারকে লক্ষ্য করে বলল।
-আচ্ছা, তাহলে একটা ঘটনা বলি। জাপানে প্রচুর ভূমিকম্প হয়, আমার ছেলে জাপানে পিএইচডি করছে ওর থেকে শুনা ঘটনা টা। একদিন ভূমিকম্প হচ্ছিল, আমার ছেলেসহ ফ্লাটের সবাই নিচে নেমে আসে। পুরা বিল্ডিং এমনে এমনে দুলছিল (হাত নাড়িয়ে স্যার বুঝানোর চেষ্টা করছিলেন, বিল্ডিং ঠিক কিভাবে দুলছিল)…কিন্তু বিল্ডিং এর কিছুই হচ্ছিল না।
-নিচে মনে হয় রাবারের পাইলিং করছে স্যার। কেউ একজন আগ্রহ নিয়ে স্যারকে জানাল।
-হতে পারে। এইখানে মেইন পয়েন্টটা হচ্ছে রেজোনেন্স। ভূমিকম্পের ফ্রিকোয়েন্সি বিল্ডিং এর নিজস্ব ফ্রিকোয়েন্সি কাছাকাছি হয়ে গেছিল , তাই একটা আরেকটা কে ক্যান্সেল করে দিচ্ছিল বলে বিল্ডিং ভেঙ্গে পড়ে নাই।

যাহ বাবা, ওদিন সত্যি বলতে কি এসি সার্কিট এর মাথা-মুণ্ডু কিছুই বুঝি নাই। কেবল এই বিল্ডিং এর রেজোনেন্স জিনিসটা মাথায় ঢুকে গেছিল যা এখনো পর্যন্ত আর বের হয় নাই। ক্লাস শেষে নিচে ক্যান্টিনে গিয়ে দেখি একটা বড়সড় মিটিং হচ্ছে। মিটিং এর বিষয় “ভ্যাট আন্দোলন”।
-“যে, করেই হোক আমাদের এই আন্দোলন কে ত্বরান্বিত করতে হবে। এভাবে বসে বসে ক্লাস করলে চলবে না। ক্লাস বর্জন করতে হবে এখন থেকে।”
কথাগুলো বলছিলেন একটু বেটে করে গৌরবর্ণের একজন দিদি। দেখেই মনে হচ্ছিল উনি আমাদের ক্যাম্পাসের নন, পরে অবশ্য জানতে পেরেছি চবির বামফ্রন্ট এর একজন নারী নেত্রী উনি। ছাত্রদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করতে করতে চেহারার এই বেহাল দশা। আমাদের এমনই কাউকেই হয়তো প্রয়োজন ছিল, শান্তিপূর্ণ ছাত্র-আন্দোলন সংগঠিত করা থেকে শুরু করে সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মতো বিচক্ষণ দিক নির্দেশনা উনার মাথা থেকেই আসছিল।
-দিদি, তাহলে কি কাল থেকে আমরা ক্লাস করব না ? বন্ধু সাজিদ দিদিকে কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করল।
-ক্লাসে ঠিকই আসবে, পরশু আমরা একটা সংহতি সমাবেশ এর পরিকল্পনা করেছি। প্রতিবাদ জানাতে দুপুর ১২ টা থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান নেব আমরা। অন্যান্য ভার্সিটিতেও জানানো হয়েছে এই কর্মসূচি।
-আমাদের ভার্সিটি থেকে কারা কারা আছেন ?
-তোমরা তো আছই প্রত্যেক সেকশন এর শ্রেণি প্রতিনিধি রা ছেলেপিলেদের সংগঠিত করবে, আর তোমাদের বিবিএ ডিপার্টমেন্ট এর সিনিয়র ভাই শিমুল এই সমাবেশ এর নেতৃত্ব দেবে।
-আপনি থাকেন না দিদি।
-নাহ, আমি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সক্রিয় আছি। আমার নেতৃত্ব দেয়া মানায় না, তবে সবসময় পাশে আছি তোমাদের।

হালকা চা-নাস্তা শেষে সমাবেশ শেষ হলো। এরপর যে যার মতো চলে এলো। এদিকে সকাল থেকে সমানে ফোন করে যাচ্ছে ছোটবোন তামান্না।
-ভাইয়া, কই তুই? আজ না আমাদের প্রতিযোগিতা !
-ও হ্যাঁ হ্যাঁ। তোরা কোথায়?
-আমরা জামালখান…এখানে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। আমাদের প্রজেক্ট টা প্রব্লেম করতেছে। তাড়াতাড়ি আয়…
-আচ্ছা, ২০ মিনিট…আমি আসতেছি।
এরই মধ্যে বিজ্ঞান জয়োৎসব এর জন্যে আমার নির্দেশনা মতো প্রকল্প তৈরী করে ফেলেছে ছোট বোন ও তার সঙ্গীরা। সমুদ্রের উপরের আর নিচের স্তরের তাপমাত্রার পার্থক্য-কে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প। এক্সপেরিমেন্ট এর সেটআপ হিসেবে দুটো বীকারে থাকা ঠান্ডা-আর গরম পানির মধ্যে কপার আর জিঙ্কের পার ডুবিয়ে একটা এমিটার দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহ পাওয়া যাচ্ছিল। প্রতিযোগিতাস্থলে পৌঁছে দেখি এমিটার টা কোন কারণে মান দিচ্ছে না, এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ প্রবাহ দেখানো টাও খুব জরুরি । নয়তো এই প্রকল্প মাঠে মারা যাবে। বিশাল এক কনভেনশন সেন্টারে হচ্ছে এই প্রতিযোগিতা, আশে পাশে শয়ে শয়ে প্রতিযোগী তাদের উদ্ভাবনী প্রকল্প প্রদর্শন করছে। এরকম একটা সিরিয়াস কন্ডিশনে প্রকল্প কাজ না করলে কি পরিমাণ টেনশন হয় তা আমার নিজেরো অভিজ্ঞতা আছে। বিসিএসআইআর ল্যাব আয়োজিত বিজ্ঞান মেলায় স্কুল-কলেজ থেকে যখন প্রতিবার অংশ নিতাম তখনও এরকম হরহামেশা ঘটত। কিন্তু এদের জন্যে এই অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ নতুন, যত দ্রুত সম্ভব একটা সমাধান করতে হবে।
-ভাইয়া, কি হবে এখন? একটু পরই বিচারক আসবে।
-টেনশন করিছ না। ভাইয়া আছি না। সব আমার উপর ছেড়ে দে।
ব্যাগ থেকে আমার নিজের ডিজিটাল মাল্টিমিটার বের করে সংযুক্ত করলাম…তাও কোন মান পাচ্ছিলাম না, এরপর জিঙ্ক আর দস্তার পাত দুটো পানি থেকে বের করে হালকা ঘষে পরিষ্কার করে নিলাম। আগের পানিগুলো ফেলে ছোট বোনের ফ্রেন্ড তাসনিয়া কে বললাম…
-এবার পানি ঢাল তো দেখি …ঠান্ডা, গরম।
-ইয়েহহহহ…

মাল্টিমিটারে রিডিং দিচ্ছে… মেয়েরা খুব খুশি এখন। এতটাই নার্ভাস হয়ে পড়েছিল যে তিনজন … বিচারক এলে হয়তো কান্নাই করে দিত। ওদিকে বেশ কটা দিন কোচিং এ ক্লাস কামাই করা হয়েছে, তাই আমাকে কোচিং এ ক্লাস নিতে যেতে হবে। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সারাটা দিন ওদের সাথে থাকতে পারলাম না। ফিরে আসার পথে ওদের অভয় দিলাম। “আমার দায়িত্ব শেষ, যা বলার এবং করার তোমাদেরই করতে হবে এখন”।
>>>>>> 
সন্ধ্যায় কোচিং এ ক্লাস নিয়ে বের হচ্ছিলাম…হঠাৎ বেজে উঠল ফোন…অপরিচিত নাম্বার।
-ভাইয়া, আমরা কলেজ সেকশন থেকে “চ্যাম্পিয়ন” হয়েছি। অনেক অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া।
-ধুর পাগলি, কিসের ধন্যবাদ? এ আমার কর্তব্য ছিল, উপস্থাপন তো তোরাই করেছিস।
আনন্দের আতিশয্যে আমার দু-চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। ফোনের ওপাশেও হয়ত ওরা খুব কান্নাকাটি করছিল। তাদের অনেক পরিশ্রমের ফসল এই জয়। আমি কেবল পেছনে থেকে প্রযোজকের ভূমিকা পালন করে গেছি। দুদিন আগে ঢাকার IUT থেকে খালি হাতে ফিরে আসার আফসোস কেটে গেছে ওদের বিজয়ে। সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনা বোঝা সত্যিই কঠিন, দুচোখ মুছে আবারো দুহাত তুলে মন থেকে বললাম…আলহামদুলিল্লাহ।

শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ১৭



ল্যাব ক্লাস শেষ করে বের হতে না হতেই সুব্রত-র সাথে দেখা। আজকে বিকেলের মধ্যেই প্রকল্পের সব কাজ শেষ করে বিকেলের ট্রেনে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে, কাজ যা করার এই চার-পাঁচ ঘন্টার মধ্যে শেষ করতে হবে। টিকেটের বন্দোবস্ত রাশেদ করে রেখেছে। বাসা থেকে ব্যাগপত্তর একেবারে গুছিয়েই বেরিয়েছি আর জিনিসপত্র যা ছিল সব নিয়ে লাইব্রেরিতে রেখেছি, এখন হাতে হাত লাগিয়ে বাকি কাজ শেষ করা বাকি। প্রকল্পের কাজ শেষ করার জন্যে আমরা আজকের বাকি ক্লাসগুলো করবনা বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। প্রিন্ট করা রঙিন ম্যাপখানা একটা মোটা পেপার বোর্ডের উপর রেখে এন্টি-কাটার চালিয়ে গেলাম, ম্যাপখানা সুন্দরভাবে কেটে বোর্ডের উপর বসানো হয়ে গেল। এরপর খালের পানি বোঝাতে প্লাস্টিকের নীল ওয়াটার শীট কেটে লাগালাম। ছোট ছোট বিভিন্ন স্থাপনা কেটে বসাতে লাগলাম আমরা ম্যাপের উপর… আর ম্যাপখানাকে ত্রিমাত্রিক চিত্র দেয়ার চেষ্টায় মগ্ন ছিলাম। এর মধ্যেই বন্ধু রাশেদ আমাকে উদ্দেশ্য করে বল-
-দোস্ত, তুই অটোমেটিক খালের ময়লা তোলার যন্ত্রটার মডেল মানাই ফেল, আমি আর সুব্রত ম্যাপ মানাচ্ছি।
-আচ্ছা ঠিকাছে, দুপুরের কিছু খাবারের তো বন্দোবস্ত করতে হবে। আমি নিচে গিয়ে দেখি কিছু পাই কিনা।
কাজ করতে করতে কবে যে দুপুর দুটো বেজে গেছে তা আমাদের খেয়ালই নেই, হাতেও আর বেশি সময় নাই – বিকাল পাঁচটার ট্রেন ধরতে হবে। আমি নিচে গিয়ে বন-কলা আর পানি কিনে উপরে এলাম। দেখলাম লাইব্রেরি নোংরা হয়ে যাচ্ছিল বলে ওদের উপর তলায় এক্সাম কন্ট্রোলার এর রুমের সামনে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। সুব্রত আর রাশেদ বিশাল ফ্লোরে আসন পেতে কাজ করে যাচ্ছে নির্বিঘ্নে।
-এই নে, বন-কলা দিয়েই দুপুরের খাবারটুকু সেরে নে। কোথাও ভাত-বিরিয়ানি পেলুম না…সব শেষ।
-হ, বিরিয়ানি ও খাবর তুই আরা রে। রাশেদ আমাকে মুখ ভেংচিয়ে বলল, বিরিয়ানি খাওয়ানোর সামর্থ্য আমার নেই।
-আচ্ছা ঠিক আছে, ঢাকা যাই। জমিয়ে ভাল-মন্দ খাওয়া যাবে।
প্রায় চারটের মধ্যে কাজ মোটামুটি গুছিয়ে এলো আমাদের, আমাদের পরিকল্পনাগুলোকে একটা সুন্দর ত্রিমাত্রিক মডেলে রূপ দিতে পেরে আমরা খুশি, এদিকে স্যারদের রুম থেকে সুব্রত গিয়ে পানির লেভেল ডিটেক্ট করার একটা ছোট প্রজেক্ট নিয়ে এলো। মোটামুটি জোড়াতালি দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল আমাদের প্রকল্প “চাক্তাই স্বয়ংক্রিয় বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা”।
বটতলী স্টেশন… প্লাটফর্মে থাকা মাইকে ভেসে আসছে নারী কণ্ঠ -“চার নম্বর প্লাটফর্মে থাকা আন্তঃনগর ট্রেন মহানগর গোধূলী ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে সময় বিকাল পাঁচ ঘটিকায়”। পাঁচটা বাজতে আর মিনিট পাঁচেক বাকি, ক্যাম্পাস থেকে সব কিছু গুছিয়ে আসতে আসতে দেরি হয়ে গেছে। টিকিট মিলিয়ে বগি ধরতে ধরতে ৩৯ খানা বাংলা ব্যাঞ্জনবর্ণের অর্ধেক প্রায় পড়া হয়ে গেল বহুদিন পর। বগিতে উঠে সিট ধরতেই রাজ্যের প্রশান্তি নেমে এলো আমাদের চোখেমুখে। লম্বা হুইসেল বাজিয়ে ঝিক ঝিক শব্দে ট্রেন ছেড়ে দিলো বটতলী স্টেশন। বগিতে আমি আর রাশেদ পাশাপাশি বসলাম, সুব্রত একটু দূরে। লক্ষ্য করলাম বগির মাঝামাঝি এক তরুণী সমানে ঝগড়া করে যাচ্ছে জানালার পাশে বসা এক যুবকের সাথে, উঠে কাছে গিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলাম ব্যাপারখানা। যতদূর বুঝলাম- দুজনই দুজনের পূর্বপরিচিত, দুজনেরই সিট পড়েছে জানালার পাশে কিন্তু মুখোমুখি… অথচ এতো লম্বা সময় ধরে দুজনের কেউই কারো মুখ দেখতে চান না। প্রেমঘটিত ব্যাপারস্যাপার হবে হয়তো, শেষমেশ অবশ্য আর না পেরে ছেলেটি পাশের আরেকজন ভদ্রলোকের সাথে সিট পরিবর্তন করল। আমি আমার সিটে ফিরে এলাম আর মনে পড়ে গেল রবীন্দ্রনাথের সেই “হঠাৎ দেখা” কবিতাটি…
“রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা, ভাবিনি সম্ভব হবে কোনদিন…”

আজ কবিগুরু এই কামরায় থাকলে এই দৃশ্য দেখে নির্ঘাত নিজের মাথার চুল নিজে ছিড়তেন। এর আগেও বহুবার ট্রেনে চড়েছি, ঢাকায় এসেছি। একটা বিষয় ভাল করে খেয়াল করেছি কুমিল্লা অতিক্রম করার পর থেকেই চট্রগ্রামের অধিকাংশ স্থানীয় লোকেরা তাদের মুখের বুলি বদলে ফেলে, এর আগে জম্পেস চাঁটগাইয়া ভাষায় কথোপকথন চালিয়ে যায়। আমাদের সামনে বসা ভদ্রলোক আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন…
-বাবারা, তোমরা কি ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্ট ?
-জি, হ্যাঁ আঙ্কেল। ঢাকায় একটা প্রতিযোগিতায় যাচ্ছি।
-ও আচ্ছা, আমার ছেলেও ঢাকার একটা নামকরা প্রাইভেট ভার্সিটি তে পড়ে। তোমরা কি চুয়েটের ?
-জ্বি না আংকেল, আমরা চট্রগ্রাম শহরের ছোটখাটো এক প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছাত্র।
ভদ্রলোকের সাথে আলাপচারিতার এক পর্যায়ে বগিতে পুলিশ আসলো মালামাল চেক করতে, আমার ব্যাগ খুলে পেল মাল্টিমিটার, সোল্ডারিং আয়রন ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি।
-এইসব কি এঁ? দেখি তো সব বাইর করে নিচে ফেলেন।
-আঙ্কেল আমরা ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্ট, ঢাকায় একটা প্রতিযোগিতায় যাচ্ছি।
-স্টুডেন্ট তো বুঝলাম, ব্যাগে আর কি কি আছে বলেন।
-প্রকুশলী, প্রকুশলী…
-ও আচ্ছা, ঠিক আছে। আইডি কার্ড দেখান। 
পাশে থাকা টিটি প্রকৌশলী কে কি বিদঘুটেভাবে “প্রকুশলী” বললেন তা শুনে আমার হাসিতে পেট ফেটে যাচ্ছিল, অনেক কষ্টে হাসি চেপে রেখে আইডি কার্ড দেখিয়ে নিস্তার পেলাম তাদের কাছ থেকে। ঢাকা নেমে কোথায় উঠব তা নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা চলছিল আমাদের তিনজনের মধ্যে, এর আগে আমি যতবারই ঢাকা এসেছি প্রত্যেক বারই কোন না কোন পরীক্ষা দেবার উদ্দেশ্যে। ঢাকায় আমার কোন আত্মীয় নেই বললেই চলে, তাই প্রথমবার উঠেছিলাম স্কুলের এক বন্ধুর বাসায়। বন্ধুর বাসায় দুদিন যেতে না যেতেই এ-কথা ও-কথা বলে বের করে দেয় বন্ধুর মা। এরপর রাত কাটিয়ে দেই পথে-প্রান্তরে কিংবা ইজতেমার ময়দানে। আবার তীব্র শীত সইতে না পেরে গিয়ে উঠি আরেক বন্ধুর বাসায়। সেই অতীত মনে পড়লে আমার আর ঢাকায় আসতেই ইচ্ছে করে না। পরবর্তীতে অবশ্য বিমান বাহিনীতে কর্মরত প্রতিবেশী এক আঙ্কেল ঢাকায় পোস্টিং হয়ে এলে বেশ কবার উঠেছি উনার বাসায়, এবারও উনার উপর ভরসা।  
রাত বাজে সাড়ে এগারোটা। বিমান বন্দর স্টেশন আসতেই ব্যাগ আর প্রজেক্টের জিনিসপত্র নিয়ে আমরা নেমে সেই আঙ্কেলকে ফোন দিলাম, এতো রাতেও বিরক্ত না হয়ে আঙ্কেল চলে আসতে বললেন বাসায়। কিন্তু সমস্যা হলো, আমি আংকেল এর বাসায় রাস্তা ভুলে গেছি…বালুঘাট না কি যেন এলাকার নাম। ভুল গাড়িতে উঠে এদিক ওদিক ঘুরে আংকেল কে ফোন দিতে দিতে শেষমেশ রাত সাড়ে বারোটায় গিয়ে পৌঁছলাম উনার বাসায়।
-বুঝলা সানি, তোমার আন্টি বাপের বাড়ি গেছে বাচ্চাদের নিয়ে। আমি তাও যতদূর পারছি রান্না করছি, আশা করি সবার হয়ে যাবে।
-এতো রাতে রান্না করতে গেলেন কেন আঙ্কেল? আমরা তো ট্রেনেই খেয়ে নিয়েছি।
-কি যে বলো? তোমার আম্মার আতিথেয়তার কথা ভুলতে পারি না। সে তুলনায় এসব কিছুই না।
-জ্বি আঙ্কেল, আম্মু আপনাদের কথা সব-সময় বলে। আন্টি কেমন আছে? বাচ্চারা?
-হ্যাঁ, আছে সবাই ভালো। নানুবাড়ি গেছে।
হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসেছি, এই রাত বিরাতে আঙ্কেল কিভাবে গরুর মাংস রান্না করলেন জানা নাই। সেদ্ধ হয়েছে কিনা জিজ্ঞাস করলেন, সেদিকে আমাদের ভ্রুক্ষেপ নেই। ক্ষিদেয় পেট চো চো করছে তিনজনেরই, কাঁচা দিলে কাঁচাও খেয়ে ফেলতে পারব এই অবস্থায়। আঙ্কেলের উষ্ণ আতিথেয়তায় আমাদের ক্লান্তি কিছুটা কমল, ঘুমোলেই পুরোপুরি কেটে যাবে।
সকাল সকাল উঠেই আঙ্কেল কে বিদায় জানিয়ে তিনজন একসাথে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম জসিমউদ্দির উদ্দেশ্যে, আর আঙ্কেল চলে গেলেন তার কর্মক্ষেত্রে। পথে হালকা নাস্তা করে অটোরিক্সায় করে পৌঁছলাম জসিমউদ্দি। এই স্টপেজ দিয়ে IUT এর বাস যাবে, আর আমরা উঠে পরব। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে করতে আরো ৪-৫ জন এসে হাজির হল স্টপেজে, বাস আসতেই আমরা সবাই উঠে পড়লাম… গন্তব্য বোর্ডবাজার-গাজীপুর IUT ক্যাম্পাস। ফাঁকা রাস্তায় সাঁই সাঁই করে বাস ছুটছিল, আর আশেপাশের ছেলেপিলেদের মাঝে আমরা নিজেদের বোকা-গেঁয়ো হিসেবে আবিষ্কার করছিলাম। ঢাকা শহরের স্কুল-কলেজের ছেলেপিলেরাও আমাদের চেয়ে অনেক স্মার্ট যেমন কথাবার্তায়, তেমন চালচলনে।

প্রায় মিনিট-চল্লিশেক পর বাস এসে থামল একটা বিশাল ফটকে…ভেতরে ঢুকে গেল বাস। আরিব্বাস…কি বিশাল রেড ক্যাম্পাস। এই তাহলে IUT। বাস গিয়ে থামল এক বিশাল গাড়ি পার্কিং এ। নেমেই নিজেকে আবিষ্কার করি লাল ইটের গাথুনিতে গড়া এক মনোরম ক্যাম্পাসের মাঝে। সুবিশাল মসজিদ, মসজিদের সামনেই মনোরম লেক, একটু দূরে বাস্কেটবল গ্রাউন্ড, লন টেনিস গ্রাউন্ড, ফুটবল গ্রাউন্ড, একাডেমিক ভবন, ক্যাফেটারিয়া, নর্থ হল, সাউথ হল… চারদিকে কেবল লাল ইটের সুবিশাল স্থাপনা, এককথায় Red Campus বলা চলে। সেন্টাল লাইব্রেরির নিচে আমাদের প্রকল্প প্রদর্শনীর জন্যে স্টল করা হয়েছে। ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সব ভুলে গিয়েছিলাম, হুশ ফিরে পেতেই আমরা আমাদের টি-শার্ট আর গিফট সামগ্রী সংগ্রহ করে এটেনডেন্স শিট এ সাইন করে স্টল সাজাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ি। বেশ কিছুক্ষণ ধরে রাশেদকে দেখছি না…আমি আর সুব্রত ওর নাম নিতে না নিতেই স্টলের সামনে ওকে আবিষ্কার করলাম…
-দোস্ত, অনেক গুলা কম্পিটিশন হচ্ছে। অডিটোরিয়াম এ হচ্ছে লাইন ফলোয়ার আর মাল্টিকপ্টার রেসিং কন্টেস্ট, প্রতিযোগিতার মূল আকর্ষণ এই দুইটা।
-তাই নাকি? আচ্ছা এদিকটা গুছিয়ে ঘুরে আসব।

আমরা আমাদের স্টল গুছাতে না গুছাতেই প্রচুর দেশি-বিদেশী শিক্ষার্থীদের আনাগোনা শুরু হয়ে গেল। বিদেশী শিক্ষার্থীরাই সংখ্যায় ছিল বেশি এক রকম। বিশ্ববিদ্যালয় OIC কর্তৃক পরিচালিত হয় বলে সদস্য দেশগুলো থেকে বৃত্তি নিয়ে পড়তে আসে প্রচুর ছাত্রছাত্রী। ইংরেজি তে একটানা বকতে বকতে মুখ ব্যাথা করছিল, ভাঙ্গাচোরা ইংরেজি যাকে বলে আরকি…যখন যেটা মুখে আসছিল ওটাই কাজে লাগিয়ে দেয়া। আমি একটু বিশ্রাম নিতেই সুব্রত-র “হোয়েন…এ…হোয়েন…এ…হোয়েন” টান নিয়ে আটকে যাওয়াতে আমি আর রাশেদ মুখ টিপে হাসতে লাগলাম, এরপর হাবিজাবি বকে বিদায় করলাম সুদানিজ কিছু দর্শনার্থীদের। দুপুরের বিরতিতে আয়োজকদের দেয়া বিরানি খেয়েদেয়ে আশেপাশের কিছু স্টল ঘুরে দেখছিলাম, প্রচুর ছবি তুললামও বটে।  
-“খাইউস নে এবার বিরানি?” – রাশেদকে উদ্দেশ্য করে বললাম।
-“ইন তো প্রোগ্রাম কমিটির বিরানি, তুই কত্তে খাবাবি ইয়েন হ।”
-“চিটাং যাই লই থিয়ে, তোরে জন্মের খাবান খাবাইউম।”
আশেপাশের অন্যান্য প্রকল্পগুলি আমাদের চেয়ে অনেক উৎকৃষ্টমানের। এই প্রজেক্ট প্রদর্শনীতে আমরাই একমাত্র চট্রগ্রাম থেকে এসেছি। ঢাকা শহরের নামকরা সব ইঞ্জিনিয়ারিং ভার্সিটির ছেলেপিলেরা প্রকল্প নিয়ে এসেছে, অধিকাংশ প্রকল্পই আর্ডিনো আর রাসবেরি পাই নামে বোর্ড দিয়ে বানানো। আরেকটি প্রকল্পে দেখলাম খুব সুন্দর করে একটা মেশিন ডিজাইন করে এনিমেশন করেছে ওরা, একটা Can Crushing Machine। এই আর্ডিনো আর ডিজাইন এনিমেশন যে করেই হোক আমাকে শিখতেই হবে- তখনই মনে মনে পণ করে নিলাম আমি। বিকেলের দিকে কোন এক নিউজ চ্যানেল এসে আমাদের দিকে ক্যামেরা তাক করে ইন্টারভিউ নিল। শেষ বিকেলে সবকিছু গুছিয়ে অডিটোরিয়ামে গেলাম ফলাফল জানতে, লাইন ফলোয়ার প্রতিযোগিতার ফাইনালটাও উপভোগ করলাম এ সুযোগে। লাইন ফলোয়ার ইভেন্টে আমাদের ভার্সিটির এক সিনিয়র ভাই এর সাথে দেখা হয়ে গেল, কিছুটা সময় কাটলো তাদের সাথে। নাহ, আমরা কোন স্থান অর্জন করতে পারিনি। মন খারাপ করে লেকের পাড়ে বাসের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম সবাই। সন্ধ্যা নেমে এসেছে রেড ক্যাম্পাসে, কি মনোরম পরিবেশ। ইশ, এই ক্যাম্পাসে যদি কটা দিন কাটাতে পারতাম ! ক্লাস করতে পারতাম! সৃষ্টিকর্তা ওদিন হয়তো আমার কথা শুনেছিলেন, পরবর্তীতে প্রফেশনাল হিসেবে এক সপ্তাহের একটা শর্ট কোর্সে নিমন্ত্রণ পাই এই রেড ক্যাম্পাসে।
 

লেকের পাড়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে লক্ষ্য করেছিলাম এক যুগল প্রচুর কথা বলছিল, ওমা এরা দেখছি বাসেও আমার সামনের সিটেই বসেছে। কপালটাই মন্দ, না পারতেও তাদের কথাবার্তা শুনতে হচ্ছিল। সুন্দরী তরুণী বার-কয়েক পেছনে ফিরে তাকিয়েছিল বটে, আমাকে দেখে হয়তো স্কুল-কলেজের কোন বাচ্চা ভেবে তাদের কথোপকথন চালিয়ে গেছে। “এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হবে তুমি বলতো?” কিংবা “আর কটা সাবজেক্ট আছে? কবে শেষ হবে বলতো?” তাদের এই স্নাতকজীবন কিংবা এরপর তারা তাদের ক্যারিয়ার আর সংসার কি-করে সাজাবে এইসব হাবিজাবি টপিক্স নিয়ে কথা শুনতে শুনতেই পুরো রাস্তা ফুরিয়ে গেল আমার। আমি রাশেদ আর সুব্রত নেমে পড়লাম বাস থেকে, গন্তব্য সায়েদাবাদ…চট্রগ্রামের বাস ধরতে হবে। আবার সেই ঘরে ফিরে যাওয়া…পেছনে ফেলে যাওয়া এই জাদুর শহর ঢাকা। 

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ১৬



রাশেদ কে নিয়ে কোর্ট বিল্ডিং এলাম ম্যাপ প্রিন্ট করাব বলে। বেশ কিছু দোকান ঘুরে কোথাও ম্যাপ প্রিন্ট এর দোকান মিলল না, এখানকার সবাই ম্যাপ ফটোকপি করে। এরপর এক দোকানীর কাছে জানতে পারলুম কোতোয়ালী মোড়ে একটা ম্যাপ প্রিন্ট এর দোকান আছে। গেলাম প্রিন্টের দোকানে, গিয়ে দেখি এ দোকান না … পুরাই একখানা ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম। বিভিন্ন সিভিল আর আর্কিটেকচারাল ম্যাপ ডিজাইন ও প্রিন্ট করে থাকে এরা। বুঝতেই পারলাম, গলাকাটা দাম নেবে। কিন্তু কিছুই করার নেই আমাদের, এতদূর এগিয়ে এসেছি আর পেছানো যাবেনা। আমার থেকে সফট কপি নিয়ে বিশাল এক ডিজিটাল প্রিন্টারে দোকানী আমাদের চাক্তাই কমার্শিয়াল এলাকার ম্যাপখানা প্রিন্ট দিলেন, এতো বড় প্রিন্টার আগে কখনো দেখিনি। এই বিশাল প্রিন্টারের জন্যেই আলাদা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ। প্রিন্ট শেষে গুণে গুণে দিলুম ৫০০ টাকা, ব্যাটা ৮০০ টাকা চাচ্ছিল এই সামান্য ম্যাপ প্রিন্ট এর জন্যে। কি আর করার, অভিজ্ঞতা নাই আক্কেল সেলামি তো দিতেই হবে।

তাড়াহুড়ো করে কোচিং ক্লাস নিতে এসেই দেখি ছাত্রছাত্রীরা সব আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। এই একটা বিশেষ সময়ে আমার জগতের সব ভালো লাগা কাজ করে – জ্ঞান দান ও আহরণের জন্যে সবার তীব্র প্রতীক্ষা। আমি নিতান্তই নগণ্য একজন শিক্ষক, উপর ওয়ালার কৃপায় দু-চার কলম লেখাপড়া করেছি বলেই এই নগণ্য জ্ঞান ফেরী করে বেড়াই। তবে মাঝে মাঝে তাজ্জব বনে যাই আমার ছাত্রছাত্রীদের কাজকর্ম দেখে, মন থেকে একটা ভালো লাগা কাজ করে…ওদের থেকেও নিত্য নতুন কিছু শিখতে পারি।
ক্লাসে ঢুকেই দেখি অর্পনের আনা প্লাস্টিকের এক জারভর্তি পানি নিয়ে বাকি সবার রাজ্যের কৌতুহল। মুচকি হেসে কৌতুহল নিয়ে অর্পনকে জিজ্ঞাস করলাম-
-কিরে? কি জিনিস বানাইলি এটা?
-ভাইয়া, আপনি গত ক্লাসে তড়িৎ বিশ্লেষণ পড়াইছিলেন না? ওটা বাসায় চেষ্টা করছিলাম, একটু দেখেন তো।
-বাহ, দারুণ তো। এদিকে নিয়ে আয় তো দেখি।

জারভর্তি পানি আর কাগজে মুড়ানো খাবার লবণ নিয়ে সামনে এলো অর্পন, সাথে দুটো ছোট স্টিলের স্কেল, পেপার ক্লিপ আর ব্যাটারি। বেচারা বাসায় সংযোগ দিয়েই বুদবুদ উঠতে দেখে ঘাবড়ে যায়, তাই আজ ক্লাসেই সবকিছু নিয়ে এসেছে। যাই হোক, জানার আগ্রহ তৈরী করা গেছে এদের মাঝে তাতেই আমি খুশি। পানিতে খাবার লবন ঢেলে স্কেল দিয়ে ভালভাবে নেড়ে স্কেলদুটো জারের ভেতর রাখলাম আর ক্লিপ দিয়ে আটকে দিলাম। স্কেলের সাথে তার সংযুক্ত করে ব্যাটারি সংযুক্ত করতেই তড়িৎ বিশ্লেষণ চালু হয়ে গেল আর জারে ক্লোরিং গ্যাসের বুদবুদ উঠতে শুরু করল। ছাত্রীদের মধ্যে নিতু মেয়েটা বলে উঠল
-ভাইয়া, আমরা কি একটু দেখতে পারি?
-হ্যাঁ, অবশ্যই। এই অর্পন, এটা ওদের বুঝিয়ে দে।
-না, ভাইয়া আপনি বুঝাই দেন।
-আচ্ছা, ঠিক আছে কথা বলে নেই একটু…একটা জরুরি ফোন আসছে
এই মেয়েদের নিয়ে একটা সমস্যা, বকাও দেয়া যায় না রাগ করে কথাও বলা যায় না। আকাশের মেঘ কালো হতে হতে এমন এক অবস্থায় চলে যাবে যেন যে কোন সময়ই হতে পারে ভারী বর্ষণ। একবার আমার বন্ধু ইমরান বকা দিয়েছিল খুব করে, পরদিন মেয়ে তার বাবাকে নিয়ে হাজির। আর তাই এই বিষয়গুলো খুব সতর্কতার সাথে সামলাতে হয় যাতে সাপও মরে লাঠিও না ভাঙ্গে। 
-হ্যালো, ভাইয়া। কোথায় তুই?
-আমি কোচিং এ, ক্লাস নেই।
-শোন না, “প্রথম আলো বিজ্ঞান জয়োৎসব” এর জন্যে একটা প্রজেক্ট বানাই দিতে হবে। আমার মাথায় কিছু আসছে না।
-লাস্ট ডেট কবে? ফরম নিছিস?
-আরো দুদিন সময় আছে। ফরমে বিস্তারিত লিখে জমা দিতে হবে কাল-পরশু।
-আচ্ছা, সমুদ্রের পানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে একটা আইডিয়া আছে। রাতে বাসায় গিয়ে বিস্তারিত বলব।
-আচ্ছা, তুই ক্লাস নে। রাতে ফোন দিব।
ফোনের ওপাশে আমার ছোট খালার মেয়ে…তামান্না। নিজের কোন আপন বোন নাই, তাই তামান্নাকে আমি নিজের ছোট বোনের চেয়ে বেশি বলে মনে করি। তাড়াতাড়ি ক্লাস শেষ করে বাসায় ফিরে সমুদ্রের পানি থেকে বিদুৎ উৎপাদন নিয়ে লিখতে বসলাম। উচ্চ মাধ্যমিকের বইতে পড়েছিলাম, সীবেক ক্রিয়া। দুটি বস্তুর মধ্যে তাপমাত্রার পার্থক্য থাকলে এবং বস্তু দুটিকে একটি পরিবাহী তার দিয়ে যুক্ত করলে তারের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। যেহেতু সমুদ্রের পানির উপরের স্তর উষ্ণ এবং নিচের স্তর ঠান্ডা তাই এই তাপমাত্রার পার্থক্য কে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। আর এর একটা এক্সপেরিমেন্ট আগেই করে দেখছিলাম দুটি পাত্রে ঠান্ডা আর গরম পানি নিয়ে। যতদূর পারলাম লিখে শেষ করে চিত্রসহ বিশ্লেষণ করে পৌঁছে দিলাম ছোট খালার বাসায়।
>>>>> 

সকাল সকাল ক্লাস থাকলেই রাজ্যের যতো আলসেমি ভর করে আমার উপর। একেবারেই উঠতে ইচ্ছে করে না এই সাত সকালে আর তার ফলস্বরূপ ক্লাসগুলোতে ২০-৩০ মিনিট করে লেট। আজও দেরি করেই ল্যাবে এসেছি, প্রশাসনিক ভবনের তিনতলায় সার্কিট-২ ল্যাব। আমাদের এই ল্যাব কোর্সের শিক্ষক আকরাম স্যার খুব সাদাসিদে মনের মানুষ, অনেক দূর থেকে আসি এই বলতেই স্যারের মন গলে গেল…তেমন একটা ঝামেলা করলেন না।  
এই সার্কিট ল্যাবে গত সেমিস্টারেও কাজ করেছি, ল্যাবের ইন্সট্রুমেন্ট গুলো এমন যে ভালই পাঠ দিতে দিতে হঠাৎ করে এদের মাথা বিগড়ে যাবে। আর তাই প্রত্যেক গ্রুপের কিছু নির্দিষ্ট করা টেবিল থাকে, আর তারা ভাবে এই টেবিলের সেট করা ইন্সট্রুমেন্ট গুলাই তাদের জন্যে পয়া। আমার গ্রুপের টেবিল একদম শেষে চার নম্বর টেবিলটা। আমার অবশ্য কোন টেবিল নির্দিষ্ট করা নাই, আমি সব টেবিলেই কমবেশি ঘুরঘুর করি। টেবিলে এসেই প্রথম কাজ হচ্ছে অসিলোস্কোপ কেলিব্রেশন করা, এই এনালগ অসিলোস্কোপ গুলো কেলিব্রেট করা যে কত ঝামেলার তা এখন যারা ডিজিটাল অসিলোস্কোপ ব্যাবহার করছে তারা বুঝবে না।

-কিরে জাহিদ, আমাদের ফাংশান জেনারেটর ডিস্টার্ব দিচ্ছে কেন রে আজ?
-আমার মনে হচ্ছে পাশের টেবিলের প্রসেনজিত এটা ওদেরটার সাথে চেঞ্জ করে ফেলছে।
-কেমনে বুঝলি ? প্রমান আছে?
-গত ল্যাবে আমরা আগে আগে মিলিয়ে চলে গেলাম না, এরপর করছে শয়তানটা এই কাজ।
-যাই হোক, না দেখে কিছু বলা ঠিক না,
-আমাদের ইন্সট্রুমেন্ট এর পেছনে আমি J লিখে দিছিলাম, এইটার পিছে নাই।
-দাঁড়া, আমি দেখছি ব্যাপারটা।
ঘুরঘুর করতে করতে পাশের টেবিলে গেলাম, এরা আজ খুব হাসিখুশি। গতদিন আমরা আগে মিলিয়ে ফেলছি দেখে আমাদের সাথে আজ কথাই বলছে না, অন্যান্যদিন আমাদের টেবিলে এসে খোঁজ খবর নেয়। একটু ভাব জমানোর চেষ্টা করলাম প্রসেনজিত এর সাথে…
-বাহ, আজকে তো তোরা সবার আগে মিলাই ফেলবি দেখছি।
-হ্যাঁ দোস্ত, দেখ তো সার্কিট কানেকশন ঠিক আছে কিনা?
-ঠিকই তো আছে দেখছি।
-আজকে তাড়াতাড়ি মিলাই তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যাব।
-“হ, মিলাচ্ছি তোমাদের”। মনে মনে বললাম আমি।

এদের ফাংশান জেনারেটর এর পেছনে লক্ষ্য করলাম বড় করে J লিখা, আমার মনে আর কোন সন্দেহ রইল না। এদের কিভাবে জব্দ করা যায় তা ঘুরপাক খাচ্ছিল মাথায়। এই ইন্সট্রুমেন্ট তো এখন চাইলে আর দেবে না এরা। আমার চোখ পড়ল পাশেই থাকা ভ্যারিয়াক এর দিকে,নব ঘুরিয়ে ভ্যারিয়েবল এসি সাপ্লাই দেবার একটা যন্ত্র…অনেকটা কাঁধে ঝুলানো সেকেলে টিফিন বক্সগুলির মতো। কথা বলতে বলতেই ভ্যারিয়াক এর প্লাগ খুলে দুই তার শর্ট করে দিলাম। আজ দেখব “কত ধানে কত চাল”। কাজ সেরেই আমি আমার টেবিলে চলে এলাম।
-স্যার হয়ে গেছে আমাদের। প্রসেনজিত এর গ্রুপ থেকে সাব্বির স্যারকে ডাকল।
-কই দেখি। হ্যাঁ, ঠিক আছে এবার ভ্যারিয়াক থেকে এসি সাপ্লাই দাও।

প্রসেনজিত ভ্যারিয়াক এর প্লাগ সকেটে লাগাতেই বুম…মম, সাথে সাথে ওই টেবিলের ব্রেকার পড়ে গেল। স্যার এগিয়ে গিয়ে দেখলেন শর্ট সার্কিট…ভ্যারিয়াকের প্লাগ পুড়ে গেছে। আমি আর জাহিদ তো মনে মনে এত্তো খুশি…না পারছি গলা ছেড়ে গান গাই-“আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে…”
পরিদর্শকের ভাব নিয়ে পাশের টেবিলে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করে জানালাম…
-স্যার, ভ্যারিয়াক ঠিক আছে…ফিউজ আর প্লাগটা চেঞ্জ করে দিলে আবার চলবে।
-যাই হোক, অই টেবিলে আর কাজ কইরো না প্রসেনজিত। তোমরা পাশের গ্রুপের সাথে কাজ করো আজকে।

<<<<আগের পর্ব   পরের পর্ব>>>>

রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ১৫


মুসলিমাবাদ রোডে এসেই ভাবলাম আজ বেড়িবাঁধ এর দিকে যাওয়া যাক, ভালো কিংবা খারাপ সময়ে আমার পছন্দের স্থানগুলির মধ্যে এই মুসলিমাবাদ বেড়িবাঁধ অন্যতম। বন্ধু সৈকতকে একটা কল দিলাম…

-হ্যালো, দোস্ত কই তুই? আমি মুসলিমাবাদ বেড়িবাঁধ এর দিকে যাচ্ছি, সাইকেল নিয়ে পারলে আইসা পড়।

-ওকে মাম্মা। স্লুইস গেটের কাছাকাছি থাকিস।

-আচ্ছা।

আমাদের উত্তর পতেঙ্গার এই মুসলিমাবাদ এলাকার বিশাল অংশ জুড়ে জেলে সম্প্রদায় এর বসবাস। জীবিকা অন্বেষণের তাগিদে জেলেরা সাগর পাড়েই গড়ে তুলেছে তাদের আবাসস্থল। সাগর পাড়ের বাঁধের পরেই উঁচু মাটির ঢিপিতে গড়ে তোলা তাদের ছোট্ট ছোট্ট কুটির। এই এলাকারই সন্তান প্রখ্যাত লেখক হরিশংকর জলদাস তার বিভিন্ন উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলেছেন এই জেলেপল্লীর জীবনচিত্র।

সন্ধ্যা নামতে আরো কিছু সময় বাকি আছে, এই সময়টা সাগরপাড়ে কাটাতে আমার খুব ভাল লাগে। সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি শেষে জেলেরা তাদের বিশাল বিশাল জাল নিয়ে ঘরে ফেরে, সাথে থাকে হরেক রকমের সামুদ্রিক মাছের সমাহার। তবে ইলিশ আর লইট্টা ইচা মাছের জন্যে এই স্থানটি বিখ্যাত। আশে-পাশের বিভিন্ন বাজার থেকে ব্যাবসায়ীয়া আসে মাছ কিনতে। জেলেরা একে একে সাগর থেকে মাছ নিয়ে ফেরে আর শুরু হয় নিলাম ডাকাডাকি। নিলামে কম-বেশি দাম হেঁকে ছোট-বড় ব্যাবসায়ীরা নিয়ে যায় সামুদ্রিক মাছ আর চওড়া দামে বিক্রি করে স্থানীয় বাজারে।

আশেপাশে আছে বেশ কিছু চিংড়ির ঘের, সাগরের নোনা জল নিয়ন্ত্রণ করার তাগিদে তৈরী করা হয়েছে বড় বড় দুটি স্লুইস গেইট। এই স্লুইস গেইট এর পাশেই আমার জগতের চির প্রশান্তি, শোঁ শোঁ করে বইতে থাকা প্রাণবন্ত বাতাস আর নিচে বন্ধ স্লুইস গেটে ঝাপটে এসে পড়া স্রোত। পেছনের চিংড়ির ঘেরগুলিতে নিয়ম করে স্লুইস গেট খুলে পানি নেওয়া হয়। কিছুক্ষণ বসতেই পেছন থেকে ডেকে উঠে একটি পরিচিত কণ্ঠ…

-কি অবস্থা দোস্ত? দিনকাল কেমন যায় ?

-এইতো চলছে ভালোই। তোর ?

-আর কইস না ভাই, মাইয়া মাইনষের ঝামেলা বহুত বড় ঝামেলা।

-হা হা হা, এজন্যে কথায় আছে “সিঙ্গেলই মঙ্গল”।

-হুম ঠিক। তা তোর কাজ কামের কি খবর? নতুন কিছু বানাইলি ?

-কই আর, অই একটা মিনি আইপিএস বানাইছি আরকি।

-ও আচ্ছা। ভালো।

এভাবে গল্প-আড্ডায় সূর্যাস্ত উপভোগ করছিলাম দুজন, আর রোমন্থন করছিলাম আমাদের ফেলে আসা স্কুলজীবনের স্মৃতিগুলো। কিছু সময় গড়াতে না গড়াতেই আকাশ ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেল, শুরু হলো বজ্রপাত। এবার বোধ হয় বাড়ির পথ ধরতে হবে, যেকোন সময় বৃষ্টি নামতে পারে।

বাড়ি ফিরেই কাজে লেগে গেলাম… টি-শার্ট এ প্রতিবাদী কিছু একটা লিখতে হবে। গোলাপী রঙটা আমার একেবারেই পছন্দ না, ছোট খালার এই ঈদে দেয়া একটা গোলাপী টি-শার্ট কেই তাই বলির পাঁঠা করলাম। গেঞ্জিটার মাঝামাঝি প্রথমে পেন্সিল দিয়ে VAT লিখলাম। এরপর একটা বড় গোলাকার বাটি নিয়ে গোল্লা এঁকে দিলাম এর চারপাশে, গোল্লার উপর দিক করে আঁকলাম একখানা আশ্চর্যবোধক চিহ্ন। ডানদিকে বুকের উপরে কিছু বই-পুস্তক আঁকলাম। সবশেষে বড় গোল্লাটাকে একপাশ থেকে কেটে দিলাম…আর পেন্সিলের আঁকাআঁকি গুলো কালো মার্কার পেন দিয়ে বোল্ড করে দিলাম। গায়ে দিয়েই আয়নার সামনে দাঁড়ালাম আর মনে মনে বলছিলাম- নাহ, আমরা উচ্চশিক্ষায় কোন ভ্যাট দিব না। হঠাৎ বেজে উঠল ফোন…

-বন্ধু, বাসায় আছিস?

-হ্যাঁ, লিমন …আছি। তুই চিটাগং আসলি কখন?

-এইতো, আজকেই এলাম। ন্যাশনাল আইডি কার্ড তোলা লাগবে, নির্বাচন কমিশন অফিস যাওয়া লাগবে কাল।

-আচ্ছা, আমার ক্যাম্পাস এর কাছেই অফিস। আমার সাথে যাস সকালে।

লিমন আমার স্কুলের বন্ধু, ঢাকায় বেশ নামকরা এক প্রাইভেট ভার্সিটি তে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। সকালে ওকে নিয়ে ক্যাম্পাসে আসার পথে আলোচনায় যা বুঝলাম এই ভ্যাট নিয়ে ওর তেমন কোন মাথা ব্যাথা নাই। ওর ভাষ্য মতে ৩০-৪০ হাজার টাকা সেমিস্টার ফি দিতে পারলে এই অতিরিক্ত পাঁচ-ছয় হাজার টাকা কিছুই না। অথচ আমাদের কাছে এই পাঁচ-ছয় হাজার টাকাই অনেক কিছু তা ওকে কি-করে বোঝাই?

ক্যাম্পাসে পৌঁছেই দেখি নিচতলার ক্যান্টিনে সব সেমিস্টার এর শ্রেণী-প্রতিনিধিরা মিলে একসাথে আলোচনা করছে, আজকের মানববন্ধন কিভাবে সফল করা যায় এই নিয়ে। ইতোমধ্যেই উচ্চশিক্ষায় ভ্যাট ১৫% থেকে নামিয়ে ৭.৫% করার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু আমাদের দাবী একটাই- আমরা এক পয়সাও ভ্যাট দিব না।

ক্লাসের শুরুতেই আমি আর রাশেদ সবার সামনে গিয়ে কিছু বক্তব্য রাখলাম। আমরা Mecceleration নামের একটা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছি, রেজিস্টেশন আর যাওয়া আসা নিয়ে প্রায় তিন-চার হাজার টাকা যাবে। তাই ক্লাসের বাকিদের থেকে ভেবেছিলাম অন্তত এক হাজার টাকা হলেও সাহায্য পাবো। কিন্তু আমাদের কে হতাশ করে দিয়ে কেউ কেউ দু-চার-পাঁচ-দশ টাকা করে দিল, আর অধিকাংশই দিল না। গুণে দেখি ৭৫ টাকা মাত্র, ১০০ টাকাও দিতে পারল না এই ৪০-৫০ জন মিলে। রাগে ক্ষোভে যার যার টাকা তাকে ফিরিয়ে দিলাম, দু-এক সপ্তাহের হাত খরচার টাকা বাঁচিয়ে নিজেদের টাকা দিয়েই যাবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। সকালের ক্লাসগুলো শেষে আমি আর রাশেদ গিয়ে সেন্ট্রাল লাইব্রেরি তে বসলাম, মানববন্ধন শুরু হতে আরো ঘন্টাখানেক সময় আছে। আলোচনার এক পর্যায়ে রাশেদ জানালো, চট্রগ্রামে জলাবদ্ধতা সমস্যা একটা চিরাচরিত সমস্যা। এইটা নিয়ে কিছু করতে পারলে ভাল হবে। কিন্তু মাত্র প্রথম বর্ষের ছাত্র হয়ে কি করব মাথায় ঢুকছিল না…তাই ভাবলাম চাক্তাই খাল নিয়ে কিছু একটা করা যায়। চাক্তাই খাল চট্রগ্রামের ব্যাবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র, প্রতিদিনকার ময়লা আবর্জনায় ভর্তি হয়ে এই খাল এখন মৃতপ্রায়। এই খালের বিভিন্ন পয়েন্টে আবর্জনা পরিষ্কারের কোন সয়ঙ্ক্রিয় ব্যাবস্থা রাখার প্রস্তাবনা দিয়ে কিছু একটা করা যায়। যেই ভাবা সেই কাজ আমি আর রাশেদ দুজনে মিলে লাইব্রেরির কম্পিউটারে বিভিন্ন বই-পুস্তক ও পিডিএফ ডকুমেন্ট ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করলাম।

চাক্তাই খাল নিয়ে একখানা গবেষণাপত্র পড়ে দীর্ঘ আলোচনার পর আমরা দুজনে স্বিদ্ধান্তে আসলাম, চাক্তাই খালের ম্যাপটা আমরা ত্রিমাত্রিকভাবে উপস্থাপন করব…আর্কিটেকচার এর ছাত্রছাত্রীরা যেমনটা করে আরকি। কিছু পয়েন্ট সিলেক্ট করে আমার ডিজাইন করা একটা সয়ঙ্ক্রিয় যন্ত্রের মডেল বসিয়ে দেব। রাশেদের ভাষায় – “একটা প্রজেক্টে সব রকম ফ্লেভার থাকবে, আর্কিটেকচার, সিভিল-এনভাইরনমেন্ট, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল ডিজাইন এই আরকি”। তখন যে কি রকম বোকা ছিলাম আর কিসব বিদঘুটে কাজ করছিলাম তা ভাবলেই এখনো হাসি পায়।

-দোস্ত, এই পিডিএফ থেকে ম্যাপটাকে বড় করে প্রিন্ট করতে হবে। রাশেদকে উদ্দেশ্য করে বললাম আমি।

-অ আইচ্ছে। ওমর ফারুক আছে, ইতা গ্রাফিক্স এর কাজ পারে। ওকে বলে দেখি চল।  

বিশাল লাইব্রেরির একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতেই দেখলাম মুখে ঘন শ্মশ্রুমন্ডিত এক যুবককে কেন্দ্র করে বেশ কিছু ছেলেপিলে কম্পিউটার এর বেসিক পাঠ নিচ্ছে। পরিচয় হতে না হতেই তাকে আমাদের সমস্যার কথা জানালাম। বাকি সব কাজ ফেলে খুব হাসিখুশিভাবে ছেলেটা আমাদের সাহায্য করতে শুরু করল।

-পিডিএফ উর তুন ম্যাপ ইবে বাইর গরি এনে আরেউজ্ঞে সিংগেল ম্যাপ পিডিএফ বানাই দিলে অইবু নে?

-অ, অইবু। যাতে ডাইরেক্ট ম্যাপ প্রিন্ট গরন যা।

-অ, যাইবু যাইবু। দুই মিনিট উর কাম।

রাশেদের কলেজের বন্ধু এই ওমর ফারুক, আমাদের সাথেই দ্বিতীয় সেমিস্টার। তবে এ সেকশানে, আর আমরা বি সেকশানে। ওইদিন ফারুকের সাথে সাথে সুব্রত নামের আরেকটা ছেলের সাথেও খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেল। সুব্রত আমাদের সাথে Mecceleration প্রতিযোগিতায় যাবার জন্যে একপায়ে খাড়া, প্রয়োজনে অর্ধেক টাকা সে দেবে। একদিকে টাকাপয়সার সংকট আরেকদিকে তিনজন হলে রেজিস্ট্রেশন টাও করে ফেলা যেত…এই ভেবে সুব্রত কে দলে নিয়ে রাশেদ কে রেজিস্টেশন করে ফেলার দায়িত্ব দিলাম।

দুপুরের কড়া রোদ, এর মাঝেও প্রবর্তক মোড়ে ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির সব ছাত্রছাত্রীরা একে একে জমায়েত হতে শুরু করেছে। শাওন এর কাছে শুনলাম, বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম-কে নাকি আগে থেকেই জানানো হয়েছে আর থানা থেকেও অনুমতি নেয়া হয়েছে এই শান্তিপূর্ন মানববন্ধনের। আমিও আর দেরি না করে ব্যাগ থেকে টি-শার্ট খানা বের করে পরে নিলাম…ওয়ারিফ ও পরে নিল তার টি-শার্ট। নোবেল, সিফাত, ওয়ারিফ, রাশেদ, সাব্বির, রিয়াদ, তানভীর সহ আমরা বেশ কজন মিলে গ্রুপ ছবি তুলে নিলাম ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাইকে ঘোষণা আসল- “এই, তোমরা সবাই লাইন করে ফেল, প্রবর্তক মোড় থেকে শুরু হবে এই হিউম্যান চেইন…হাতে হাত ধরে দুই নাম্বার একাডেমিক ভবন পর্যন্ত”। কম্পিউটার প্রকৌশল অনুষদের রাহুল ভাই হ্যন্ডমাইকে কথাগুলো বলছিলেন।

“সি-আর রা সবাই যার যার সেকশনের ছেলেপিলেদের লাইনে নিয়ে আস”

আমরা আর কালবিলম্ব না করে লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। ওয়ারিফ আর নাদিয়া দেখলাম বেশ কিছু রঙিন কাগজে স্লোগান লিখে লিখে প্রত্যেকের হাতে হাতে দিচ্ছে, আমিও লাইন থেকে বের হয়ে ওদের সাথে হাতে হাত লাগালাম। এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল না তাই। সময় যত গড়াচ্ছিল সূর্যের দাবদাহ ততোই বাড়ছিল, ইতোমধ্যে আমরা সমাই ঘেমেনেয়ে একাকার। উপর থেকেও কোন ঘোষণা আসছিল না, ঠিক কতক্ষণ ধরে চলতে পারে এই মানববন্ধন। রাস্তার এপাশে-ওপাশে ছাত্রছাত্রীরা লাইন করে দাঁড়িয়ে গেছে। আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে আশে পাশের দু-একটি প্রাইভেট ভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা। সবার মুখে একটাই স্লোগান “NO VAT, NO VAT”। এই নো-ভ্যাট, নো-ভ্যাট করতে করতে বার কয়েক আমার হাসি চলে আসছিল…কিভাবে সম্ভব !

টিভি ক্যামেরা আর সাংবাদিকদের দেখেই ছাত্রছাত্রীরা সবাই সিরিয়াস হয়ে উঠেছে। আগের চেয়ে গর্জনের ধ্বনি খানিকটা বেড়েছে বলা চলে। সবার সমস্বরে মিলিত ধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলছিল আশে পাশের দেয়ালে। এ এক চরম অভিজ্ঞতা, যা আগে কখনো হয়নি। সিনিয়র ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বেশ ক’জন মিডিয়ার সামনে তাদের বক্তব্য রাখলো আর এই প্রতিবাদ সমাবেশ নিয়মিত হবে বলে ইঙ্গিত দিয়ে গেল। দিনশেষে সবাই ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত, সুশৃঙ্খলভাবে এমন একটা মানববন্ধন করা গেছে সেই অনেক। সামনের দিনগুলি অনিশ্চয়তায় ভরা, কি হবে না হবে এই আন্দোলনের ফলাফলই বা কি হতে পারে এই ভাবতে ভাবতে বাড়ির পথ ধরা।


<<<<আগের পর্ব     পরের পর্ব>>>> 

শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ১৪



খুব সহজে ভেঙ্গে পড়ার মতো মানুষ আমি নই, পরিস্থিতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে নিতেই মানুষ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে বিশ্ব সংসারে। অবশ্য তার পাশাপাশি প্রয়োজন সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ ও মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। লোহাকে যেমন পেটালে দৃঢ় হয়, আমার অবস্থাটাও ঠিক তেমন। আর তাই এসব ঘাত-প্রতিঘাত কে আমি জীবনের অংশ বলেই মনে করি। হাতে কোন টিউশন নাই, সেমিস্টার ফি দিতে হবে সামনেই… এমন অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে করতেই আরো একজন সংগ্রামী মানুষের সাথে পরিচয় হয়ে যায় রাস্তায়…
-আরে জাহিদ না? কি অবস্থা বন্ধু? এতো রাতে কই যাস?
-এইতো আছি ভালো, নাইট শিফট এ কাজ আছে ইপিজেড এ।
-কি কাজ ? আমিও করব। আমারও টিউশন সব চলে গেছে।
-পারবি না-রে তুই অই কাজ। এই বলে খিক খিক করে বিদঘুটে হাসি দিল জাহিদ।
-বলেই দেখ না কি কাজ করিস। পারি না পারি পরে আসছে।
-শোন তাহলে, কাটন উঠাই আর নামাই। লেবার এর কাজ আরকি। তবে ভালই টাকা পাই… এই রাত ১০ টা থেকে শুরু করে ভোর পর্যন্ত কাটন টানলে ৮০০-১০০০ টাকা পাওয়া যায়।
-কিসের কাটন? আর তোরা কি পার্মানেন্ট ? আমি গেলে কি নেবে ?
-কাপড়ের রোলভর্তি কাটন, সুতা, জুতার রাবার… এক এক ফেক্টরিতে এক এক রকম। আমরা ফ্যাক্টরির বাইরে গিয়ে দাঁড়াই, এরপর কতজন লোক লাগবে এসে ডাকে আর নিয়ে যায়।
-আচ্ছা, তাহলে আমি কাল থেকে তোর সাথে যাব।
ভার্সিটির বন্ধু জাহিদ ছেলেটা এতোটা পরিশ্রম করে জানতাম না। শুনেছি বিবাহিত, তাই বলে সংসার আর লেখাপড়ার খরচ চালাতে রাত বিরাতে এভাবে লেবার এর কাজ করছে…জীবন বড়ই কঠিন। ভাবতেই আবারো চোখ দুটো ছলছল করে উঠে, হয়তোবা আমাদের অজান্তেই এরকম হাজারো জাহিদ রাতের অন্ধকারে পরিশ্রম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে একটুকু স্বাচ্ছন্দে বেঁচে থাকার আশায়।
বাসায় ফিরে খেয়েদেয়েই ইলেকট্রনিক্স জিনিসপত্র নিয়ে বসলাম, চরম হতাশার মধ্যেও এই যন্ত্রপাতিগুলো আমাকে আশা জাগায়, নতুন উদ্দীপনা যোগায় মনে। ১০ ওয়াটের দু-তিনটে ডিসি বাল্ব ১২ ভোল্ট সাড়ে সাত এম্প এর ব্যাটারি দিয়ে প্রায় দু-আড়াই ঘন্টার মতো জ্বলে। হিসাব নিকাশ অনুযায়ী ভালোই পারফর্মেন্স দিচ্ছিল এই সেটআপ, কিন্তু সমস্যা হলো বিদ্যুৎ চলে গেলেই অন্ধকার হাতড়ে এই সিস্টেমের সুইচ অন করতে হয়। চিন্তা করতে লাগলাম ব্যাপারটা কিভাবে স্বয়ংক্রিয় করা যায় ! ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে গেল বন্ধু সৈকতের কথা, আরেহ…ওইদিন যে LDR দিয়ে লাইট সুইচিং সার্কিট এর পিসিবি বানালাম আমরা ওখানেই তো রিলে নামের একটা কিছু ব্যাবহার করা হয়েছিল। সাথে সাথেই আমার ইলেকট্রনিক্স জঞ্জালের স্তূপ থেকে হাতড়ে রিলে আছে এরকম পুরোনো সার্কিট বের করে নিলাম, সোল্ডারিং আয়রন দিয়ে রিলে উপড়ে নিলাম ডিসি বাল্ব সুইচিং এ কাজে লাগাবো বলে। এখন সমস্যা হলো বিদ্যুৎ আসছে যাচ্ছে এটা রিলে বুঝবে কিভাবে, রিলের ইনপুট তো ডিসি ???
শেষমেষ একটা এসি টুঁ ডিসি এডাপটার কাজে লাগিয়ে জম্পেশ কানেকশন দিয়ে দিলাম। বাসার মেইন সুইচ অফ করার সাথে সাথেই দেখি রিলে কাট করে শব্দ করে ডিসি বাল্বগুলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে…আবার মেইন সুইচ অন করার সাথে সাথে কাট করে শব্দ করে ডিসি বাল্বগুলো নিভিয়ে দিচ্ছে। এক্সপেরিমেন্ট এ সফল হয়ে প্রবল উদ্দীপনার আবারো একটা শক খেয়ে বসি, আর আম্মুর সেই বকাবকি-“এদ্দুর লাতিয়ে আবার জারগই শুরু গইজ্জুস নে? ঘুম ন যাইলে বাইর হই যা গই।”এই ইন্সট্যান্ট ডিসি বাল্ব লাইটিং সিস্টেম এর নাম দিলাম আমি “টেসলা মিনি আইপিএস”। মাত্র ১৫০০ টাকার মধ্যে ৩ বাল্বের মিনি আইপিএস…খারাপ না।
>>>>>>>>>>>>> 
আজ সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে কেমন যেন গমগমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, এখানে ওখানে ছাত্রছাত্রীদের জটলা…কমবেশি সবাই দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আমাদের করণীয় নিয়ে আলোচনা করছে। সকালের প্রথম ক্লাসটি শেষ হতে না হতেই আমাদের দুজন শ্রেণি প্রতিনিধি সামনে দাঁড়িয়ে গেল কিছু ঘোষণা দেয়ার জন্যে।
-“বন্ধুরা সবাই, আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি যে, বাজেটে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি-র উপর অতিরিক্ত ১৫% ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে যা কখনোই মেনে নেয়া যায় না। ইতোমধ্যেই ঢাকায় বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এর প্রতিবাদে  বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করে যাচ্ছে। আমাদের চট্রগ্রামে এখনো পর্যন্ত কোন প্রতিবাদ গড়ে উঠেনি, আর তাই আগামীকাল দুপুরে ক্লাস শেষে আমরা ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাটির সবাই প্রবর্তক মোড়ে মানববন্ধন করব”।
বক্তৃতা শেষ হতে না হতেই সবাই সমোস্বরে চিৎকার চেঁচামেচি করে আর চেয়ারের হাতল চাপড়ে সম্মতি জানাল। আমার মনে পড়ে গেল নূর হোসেনের কথা, ১৯৮৭ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এর কথা। ওয়ারিফ,রাশেদ জিগর, জহির, জাহিদ, মোজাম্মেল সহ আরো অনেককে উজ্জীবিত করলাম সাতাশির সেই আন্দোলনের কাহিনী শুনিয়ে। নূর হোসেন সেদিন বুকে-পিঠে লিখে এসেছিলেন “স্বৈরাচার নীপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক”, আর আন্দোলনের কোন এক সময়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়ে মুক্তি দিয়েছিলেন গণতন্ত্র কে। আমি আর ওয়ারিফ এমন কিছু করার পরিকল্পনা করলাম, টিশার্টে মার্কার দিয়ে নিজেদের প্রতিবাদ, স্লোগান গুলি লিখে আনব…নিজেই হয়ে যাবো প্রতিবাদী পোস্টার, প্ল্যাকার্ড। ক্লাসের কোন এক বিরতিতে রাশেদের সাথে চলছিল আমার গুরুগম্ভীর আলোচনা…
-“দেখ বন্ধু, আমরা চাইলে ইইই ক্লাবটাকে এই সময়ে দাঁড় করাতে পারি”। বন্ধু রাশেদ আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল।
-কিন্তু আমরা তো গ্রুপ করেছিলাম একটা, উপর থেকে না করে দিলো। অনুমোদন ছাড়া কোন গ্রুপ বা সংগঠন চলবে না ক্যাম্পাসে। ক্যাম্পাসে একটাই সংগঠন এর অনুমোদন আছে যেটা হচ্ছে “রোবোটিক্স ক্লাব”।
-রোবোটিক্স ক্লাবের কোন কার্যক্রম নাই। নামের উপর একটা ক্লাব পড়ে আছে । কোন ওয়ার্কশপ হয়না, সেমিনার হয়না, কোন প্রতিযোগিতা আয়োজন হয়না।
-তো আমাদের কি করার আছে, আমরা মাত্র সেকেন্ড সেমিস্টার।
-করার অনেক কিছু আছে। আমরা চাইলে এই ভ্যাট আন্দোলন টাকে কাজে লাগাতে পারি। সবাই কে একত্রিত করে ইইই ক্লাব এর নেতৃত্বে আন্দোলন চালিয়ে যেতে পারি।
-বুঝলি না ব্যাপারটা টা, দুইটার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। তার উপর রাজনীতি তো ক্যাম্পাসে পুরোপুরি নিষিদ্ধ। তার পরও এই নিয়ে আমি আমাদের সেকশানের গ্রুপে একটা পোস্ট করব। বাকি সবাই কি বলে দেখি।
বন্ধু রাশেদের মাথায় ছিল কেবল… ইইই ক্লাব করেই বিভিন্ন ওয়ার্কশপ,সেমিনার ও প্রতিযোগিতা আয়োজন করা সম্ভব। কিন্তু আমার মন তাতে সায় দিচ্ছিল না, নতুন করে আরেকটা ক্লাব গঠনের চেয়ে পুরোনো রোবোটিক্স ক্লাবকেই একটা সুন্দর প্লাটফর্ম হিসেবে দাঁড় করানো উচিত বলে আমি মনে করছিলাম। এরই মধ্যেই চোখে পড়ল একটা প্রতিযোগিতা, ঢাকার IUT তে। “Mecceleration-2015” নামে এই প্রতিযোগিতায় বেশ কিছু ইভেন্ট ছিল। প্রজেক্ট প্রেজেন্টেশান, পোস্টার প্রেজেন্টেশান, মাল্টিকপ্টার রেস, বিজনেস আইডিয়া, ইঞ্জিনিয়ারিং কুইজ ইত্যাদি। রাশেদের সাথে ক্লাস শেষে আবার এই বিষয়টা নিয়ে বসলাম।
- দেখ বন্ধু, Mecceleration 2015, যাবি নাকি?
-টিয়া কত্তুন পাবি? পল অইয়ুস নে ? রেজিস্টেশন ফি চা গই হত।
আসলেই তো, প্রতিটা ইভেন্টের রেজিস্টেশন ফি ১৫০০ টাকা। এক টিমে তিনজন। তার উপর ঢাকায় আসা-যাওয়া খরচ তো আছেই। আমি রাশেদকে অনুপ্রাণিত করতে বললাম…
-আরে সমস্যা নাই, আমরা কিছু দিলাম। আর কিছু ক্লাসের সবাই কে বললে হেল্প করবে।
-হ্যাঁ, ইবে গরিত তারস। ক্লাসে বলি দেখ, কিন্তু কি মানাই নিয়ে যাবি?
-অইটা আমি আজকে গিয়ে ভেবে দেখব কি বানানো যায়। এমন কিছু করতে হবে যেটা আমাদের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে কাজে আসবে।
-হ্যাঁ, ঠিক হইউস।
ক্লাস শেষে বাসায় এসেই খেয়েদেয়ে কোচিং এ ছুটলাম , এই কোচিং টা অন্তত টিকিয়ে রাখতে হবে। নয়ত পকেট খরচ চালানোটাই দায় হয়ে যাবে। বাসায় অবশ্য কিছুই বলিনি, আমার যে দু-দুটো টিউশন চলে গেছে। ঘুরচি ফিরছি, ক্যাম্পাসে আসছি, কোচিং এ যাচ্ছি আর বিকল্প কোন উৎসের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছি। আর একেবারে কিছু না পেলে দিনশেষে না-হয় জাহিদের সাথেই যাবো কাটন টানতে। কোচিং এ টানা তিনটে ক্লাস নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীর নিয়ে নামছি আর ফোন বেজে উঠল… মেঝো খালার ফোন, আমার প্রিয় জুলেখা খালা।
-হ্যালো, সানি কই তুই?
-এইতো আন্টি, কোচিং থেকে ক্লাস নিয়ে বের হচ্ছি।
-শুক্রবার বন্দরটিলা ওয়ার্ড অফিসে আসতে পারবি ?
-কি কাজে আন্টি?
-পরিসংখ্যান এর কিছু কাজ আছে সামনে। বস্তিশুমারী ও ভাসমান লোক গণনা।
-আচ্ছা ঠিকাছে, আসলাম।
-ছবি আর ন্যাশনাল আইডি কার্ড নিয়ে আসিস। ১ সপ্তাহের কাজ… পাঁচ-ছয় হাজারের মতো পাবি।
-ওয়াও, ১ সপ্তাহেই পাঁচ হাজার। আমি অবশ্যই আসব।
জুলেখা খালা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো তে কাজ করেন। কাজের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় মাঠকর্মীর প্রয়োজন হয় আর তাই আমাকে জানালেল। এ যে আমার জন্যে মেঘ না চাইতেই জল, জাহিদের সাথে কাটন টানার কাজ করলে হয়ত এক সপ্তাহে আরেকটু বেশিই জুটত, তবে কম হলেও মাঠকর্মী হিসেবে কাজ করাটাই ঢের ভাল। আর তাই জাহিদকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম-“আসছি না আজ”। উপর ওয়ালার মহিমা সত্যি অদ্ভুত, আমি মন থেকেই চাইছিলাম বিকল্প কিছুর সন্ধান হোক। কাটন টানার কাজটা প্রচুর পরিশ্রমের। দিনশেষে তাই দুহাত তুলে বলি, যা পেয়েছি তাই যথেষ্ঠ- “আলহামদুলিল্লাহ”।

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...