শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ১৪



খুব সহজে ভেঙ্গে পড়ার মতো মানুষ আমি নই, পরিস্থিতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে নিতেই মানুষ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে বিশ্ব সংসারে। অবশ্য তার পাশাপাশি প্রয়োজন সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ ও মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। লোহাকে যেমন পেটালে দৃঢ় হয়, আমার অবস্থাটাও ঠিক তেমন। আর তাই এসব ঘাত-প্রতিঘাত কে আমি জীবনের অংশ বলেই মনে করি। হাতে কোন টিউশন নাই, সেমিস্টার ফি দিতে হবে সামনেই… এমন অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে করতেই আরো একজন সংগ্রামী মানুষের সাথে পরিচয় হয়ে যায় রাস্তায়…
-আরে জাহিদ না? কি অবস্থা বন্ধু? এতো রাতে কই যাস?
-এইতো আছি ভালো, নাইট শিফট এ কাজ আছে ইপিজেড এ।
-কি কাজ ? আমিও করব। আমারও টিউশন সব চলে গেছে।
-পারবি না-রে তুই অই কাজ। এই বলে খিক খিক করে বিদঘুটে হাসি দিল জাহিদ।
-বলেই দেখ না কি কাজ করিস। পারি না পারি পরে আসছে।
-শোন তাহলে, কাটন উঠাই আর নামাই। লেবার এর কাজ আরকি। তবে ভালই টাকা পাই… এই রাত ১০ টা থেকে শুরু করে ভোর পর্যন্ত কাটন টানলে ৮০০-১০০০ টাকা পাওয়া যায়।
-কিসের কাটন? আর তোরা কি পার্মানেন্ট ? আমি গেলে কি নেবে ?
-কাপড়ের রোলভর্তি কাটন, সুতা, জুতার রাবার… এক এক ফেক্টরিতে এক এক রকম। আমরা ফ্যাক্টরির বাইরে গিয়ে দাঁড়াই, এরপর কতজন লোক লাগবে এসে ডাকে আর নিয়ে যায়।
-আচ্ছা, তাহলে আমি কাল থেকে তোর সাথে যাব।
ভার্সিটির বন্ধু জাহিদ ছেলেটা এতোটা পরিশ্রম করে জানতাম না। শুনেছি বিবাহিত, তাই বলে সংসার আর লেখাপড়ার খরচ চালাতে রাত বিরাতে এভাবে লেবার এর কাজ করছে…জীবন বড়ই কঠিন। ভাবতেই আবারো চোখ দুটো ছলছল করে উঠে, হয়তোবা আমাদের অজান্তেই এরকম হাজারো জাহিদ রাতের অন্ধকারে পরিশ্রম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে একটুকু স্বাচ্ছন্দে বেঁচে থাকার আশায়।
বাসায় ফিরে খেয়েদেয়েই ইলেকট্রনিক্স জিনিসপত্র নিয়ে বসলাম, চরম হতাশার মধ্যেও এই যন্ত্রপাতিগুলো আমাকে আশা জাগায়, নতুন উদ্দীপনা যোগায় মনে। ১০ ওয়াটের দু-তিনটে ডিসি বাল্ব ১২ ভোল্ট সাড়ে সাত এম্প এর ব্যাটারি দিয়ে প্রায় দু-আড়াই ঘন্টার মতো জ্বলে। হিসাব নিকাশ অনুযায়ী ভালোই পারফর্মেন্স দিচ্ছিল এই সেটআপ, কিন্তু সমস্যা হলো বিদ্যুৎ চলে গেলেই অন্ধকার হাতড়ে এই সিস্টেমের সুইচ অন করতে হয়। চিন্তা করতে লাগলাম ব্যাপারটা কিভাবে স্বয়ংক্রিয় করা যায় ! ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে গেল বন্ধু সৈকতের কথা, আরেহ…ওইদিন যে LDR দিয়ে লাইট সুইচিং সার্কিট এর পিসিবি বানালাম আমরা ওখানেই তো রিলে নামের একটা কিছু ব্যাবহার করা হয়েছিল। সাথে সাথেই আমার ইলেকট্রনিক্স জঞ্জালের স্তূপ থেকে হাতড়ে রিলে আছে এরকম পুরোনো সার্কিট বের করে নিলাম, সোল্ডারিং আয়রন দিয়ে রিলে উপড়ে নিলাম ডিসি বাল্ব সুইচিং এ কাজে লাগাবো বলে। এখন সমস্যা হলো বিদ্যুৎ আসছে যাচ্ছে এটা রিলে বুঝবে কিভাবে, রিলের ইনপুট তো ডিসি ???
শেষমেষ একটা এসি টুঁ ডিসি এডাপটার কাজে লাগিয়ে জম্পেশ কানেকশন দিয়ে দিলাম। বাসার মেইন সুইচ অফ করার সাথে সাথেই দেখি রিলে কাট করে শব্দ করে ডিসি বাল্বগুলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে…আবার মেইন সুইচ অন করার সাথে সাথে কাট করে শব্দ করে ডিসি বাল্বগুলো নিভিয়ে দিচ্ছে। এক্সপেরিমেন্ট এ সফল হয়ে প্রবল উদ্দীপনার আবারো একটা শক খেয়ে বসি, আর আম্মুর সেই বকাবকি-“এদ্দুর লাতিয়ে আবার জারগই শুরু গইজ্জুস নে? ঘুম ন যাইলে বাইর হই যা গই।”এই ইন্সট্যান্ট ডিসি বাল্ব লাইটিং সিস্টেম এর নাম দিলাম আমি “টেসলা মিনি আইপিএস”। মাত্র ১৫০০ টাকার মধ্যে ৩ বাল্বের মিনি আইপিএস…খারাপ না।
>>>>>>>>>>>>> 
আজ সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে কেমন যেন গমগমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, এখানে ওখানে ছাত্রছাত্রীদের জটলা…কমবেশি সবাই দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আমাদের করণীয় নিয়ে আলোচনা করছে। সকালের প্রথম ক্লাসটি শেষ হতে না হতেই আমাদের দুজন শ্রেণি প্রতিনিধি সামনে দাঁড়িয়ে গেল কিছু ঘোষণা দেয়ার জন্যে।
-“বন্ধুরা সবাই, আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি যে, বাজেটে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি-র উপর অতিরিক্ত ১৫% ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে যা কখনোই মেনে নেয়া যায় না। ইতোমধ্যেই ঢাকায় বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এর প্রতিবাদে  বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করে যাচ্ছে। আমাদের চট্রগ্রামে এখনো পর্যন্ত কোন প্রতিবাদ গড়ে উঠেনি, আর তাই আগামীকাল দুপুরে ক্লাস শেষে আমরা ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাটির সবাই প্রবর্তক মোড়ে মানববন্ধন করব”।
বক্তৃতা শেষ হতে না হতেই সবাই সমোস্বরে চিৎকার চেঁচামেচি করে আর চেয়ারের হাতল চাপড়ে সম্মতি জানাল। আমার মনে পড়ে গেল নূর হোসেনের কথা, ১৯৮৭ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এর কথা। ওয়ারিফ,রাশেদ জিগর, জহির, জাহিদ, মোজাম্মেল সহ আরো অনেককে উজ্জীবিত করলাম সাতাশির সেই আন্দোলনের কাহিনী শুনিয়ে। নূর হোসেন সেদিন বুকে-পিঠে লিখে এসেছিলেন “স্বৈরাচার নীপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক”, আর আন্দোলনের কোন এক সময়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়ে মুক্তি দিয়েছিলেন গণতন্ত্র কে। আমি আর ওয়ারিফ এমন কিছু করার পরিকল্পনা করলাম, টিশার্টে মার্কার দিয়ে নিজেদের প্রতিবাদ, স্লোগান গুলি লিখে আনব…নিজেই হয়ে যাবো প্রতিবাদী পোস্টার, প্ল্যাকার্ড। ক্লাসের কোন এক বিরতিতে রাশেদের সাথে চলছিল আমার গুরুগম্ভীর আলোচনা…
-“দেখ বন্ধু, আমরা চাইলে ইইই ক্লাবটাকে এই সময়ে দাঁড় করাতে পারি”। বন্ধু রাশেদ আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল।
-কিন্তু আমরা তো গ্রুপ করেছিলাম একটা, উপর থেকে না করে দিলো। অনুমোদন ছাড়া কোন গ্রুপ বা সংগঠন চলবে না ক্যাম্পাসে। ক্যাম্পাসে একটাই সংগঠন এর অনুমোদন আছে যেটা হচ্ছে “রোবোটিক্স ক্লাব”।
-রোবোটিক্স ক্লাবের কোন কার্যক্রম নাই। নামের উপর একটা ক্লাব পড়ে আছে । কোন ওয়ার্কশপ হয়না, সেমিনার হয়না, কোন প্রতিযোগিতা আয়োজন হয়না।
-তো আমাদের কি করার আছে, আমরা মাত্র সেকেন্ড সেমিস্টার।
-করার অনেক কিছু আছে। আমরা চাইলে এই ভ্যাট আন্দোলন টাকে কাজে লাগাতে পারি। সবাই কে একত্রিত করে ইইই ক্লাব এর নেতৃত্বে আন্দোলন চালিয়ে যেতে পারি।
-বুঝলি না ব্যাপারটা টা, দুইটার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। তার উপর রাজনীতি তো ক্যাম্পাসে পুরোপুরি নিষিদ্ধ। তার পরও এই নিয়ে আমি আমাদের সেকশানের গ্রুপে একটা পোস্ট করব। বাকি সবাই কি বলে দেখি।
বন্ধু রাশেদের মাথায় ছিল কেবল… ইইই ক্লাব করেই বিভিন্ন ওয়ার্কশপ,সেমিনার ও প্রতিযোগিতা আয়োজন করা সম্ভব। কিন্তু আমার মন তাতে সায় দিচ্ছিল না, নতুন করে আরেকটা ক্লাব গঠনের চেয়ে পুরোনো রোবোটিক্স ক্লাবকেই একটা সুন্দর প্লাটফর্ম হিসেবে দাঁড় করানো উচিত বলে আমি মনে করছিলাম। এরই মধ্যেই চোখে পড়ল একটা প্রতিযোগিতা, ঢাকার IUT তে। “Mecceleration-2015” নামে এই প্রতিযোগিতায় বেশ কিছু ইভেন্ট ছিল। প্রজেক্ট প্রেজেন্টেশান, পোস্টার প্রেজেন্টেশান, মাল্টিকপ্টার রেস, বিজনেস আইডিয়া, ইঞ্জিনিয়ারিং কুইজ ইত্যাদি। রাশেদের সাথে ক্লাস শেষে আবার এই বিষয়টা নিয়ে বসলাম।
- দেখ বন্ধু, Mecceleration 2015, যাবি নাকি?
-টিয়া কত্তুন পাবি? পল অইয়ুস নে ? রেজিস্টেশন ফি চা গই হত।
আসলেই তো, প্রতিটা ইভেন্টের রেজিস্টেশন ফি ১৫০০ টাকা। এক টিমে তিনজন। তার উপর ঢাকায় আসা-যাওয়া খরচ তো আছেই। আমি রাশেদকে অনুপ্রাণিত করতে বললাম…
-আরে সমস্যা নাই, আমরা কিছু দিলাম। আর কিছু ক্লাসের সবাই কে বললে হেল্প করবে।
-হ্যাঁ, ইবে গরিত তারস। ক্লাসে বলি দেখ, কিন্তু কি মানাই নিয়ে যাবি?
-অইটা আমি আজকে গিয়ে ভেবে দেখব কি বানানো যায়। এমন কিছু করতে হবে যেটা আমাদের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে কাজে আসবে।
-হ্যাঁ, ঠিক হইউস।
ক্লাস শেষে বাসায় এসেই খেয়েদেয়ে কোচিং এ ছুটলাম , এই কোচিং টা অন্তত টিকিয়ে রাখতে হবে। নয়ত পকেট খরচ চালানোটাই দায় হয়ে যাবে। বাসায় অবশ্য কিছুই বলিনি, আমার যে দু-দুটো টিউশন চলে গেছে। ঘুরচি ফিরছি, ক্যাম্পাসে আসছি, কোচিং এ যাচ্ছি আর বিকল্প কোন উৎসের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছি। আর একেবারে কিছু না পেলে দিনশেষে না-হয় জাহিদের সাথেই যাবো কাটন টানতে। কোচিং এ টানা তিনটে ক্লাস নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীর নিয়ে নামছি আর ফোন বেজে উঠল… মেঝো খালার ফোন, আমার প্রিয় জুলেখা খালা।
-হ্যালো, সানি কই তুই?
-এইতো আন্টি, কোচিং থেকে ক্লাস নিয়ে বের হচ্ছি।
-শুক্রবার বন্দরটিলা ওয়ার্ড অফিসে আসতে পারবি ?
-কি কাজে আন্টি?
-পরিসংখ্যান এর কিছু কাজ আছে সামনে। বস্তিশুমারী ও ভাসমান লোক গণনা।
-আচ্ছা ঠিকাছে, আসলাম।
-ছবি আর ন্যাশনাল আইডি কার্ড নিয়ে আসিস। ১ সপ্তাহের কাজ… পাঁচ-ছয় হাজারের মতো পাবি।
-ওয়াও, ১ সপ্তাহেই পাঁচ হাজার। আমি অবশ্যই আসব।
জুলেখা খালা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো তে কাজ করেন। কাজের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় মাঠকর্মীর প্রয়োজন হয় আর তাই আমাকে জানালেল। এ যে আমার জন্যে মেঘ না চাইতেই জল, জাহিদের সাথে কাটন টানার কাজ করলে হয়ত এক সপ্তাহে আরেকটু বেশিই জুটত, তবে কম হলেও মাঠকর্মী হিসেবে কাজ করাটাই ঢের ভাল। আর তাই জাহিদকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম-“আসছি না আজ”। উপর ওয়ালার মহিমা সত্যি অদ্ভুত, আমি মন থেকেই চাইছিলাম বিকল্প কিছুর সন্ধান হোক। কাটন টানার কাজটা প্রচুর পরিশ্রমের। দিনশেষে তাই দুহাত তুলে বলি, যা পেয়েছি তাই যথেষ্ঠ- “আলহামদুলিল্লাহ”।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...