শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ২০


বিকেলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ঢুকেই দেখি ম্যাছাকার কাণ্ড ঘটে গেছে। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে গড়া গ্রুপ থেকে জানতে পারলাম, ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাট বিরোধী প্রতিবাদ মিছিলে নাকি পুলিশ ফাঁকা গুলি চালিয়েছে আর বেশ ক’জন ছাত্রছাত্রী আহত হয়েছে। এই ঘটনার সাথে সাথে পুরো দেশ জুড়ে চলমান ছাত্র-আন্দোলন এক নতুন রূপ নেয়। রাতে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা হয় কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে, ত্বরিত গতিতে আগামীকাল ১০ই সেপ্টেম্বর দেশের সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। যথারীতি রাতেই আমাদের কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়, আগামীকাল জিইসি মোড় অবরোধ করা হবে।

ছাত্রদের উপর পুলিশের গুলির খবর টিভিতে দেখতে পাবার পর থেকেই আম্মু সমানে আমাকে বকে যাচ্ছেন।

-কি দরকার এ? হুদাহুদি রাস্তাত নামি এনে মিছিল গরিবার? আর কথা ত হুনতু ন? বয়স তো এখন মিছিল গরিবার?

-জ্বি আম্মু । কবি হেলাল হাফিজের কবিতা ……

“এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়,

এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়”

(কবি হেলাল হাফিজের “নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়” শিরোনামের কবিতার এ দু-লাইন জনপ্রিয়তা পায় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে)

-“অ, যা গই মিছিলত। যেড়ে যর এডে খাইচ, এডে পরিছ…ঘরোত ন আইছ আর।”

-“মিছিলের সব হাত, কণ্ঠ, পা এক নয়

সেখানে সংসারী থাকে, সংসার বিরাগী থাকে

কেউ আসে রাজপথে সাজাতে সংসার

কেউ আসে জ্বালিয়ে বা জ্বালাতে সংসার”।

এতো বকাবকির মাঝেও আমার এমন কবিতা পাঠে আম্মু না হেসে পারলেন না। সকালের নাস্তা করতে করতে মা-ছেলের মাঝে একটুকু খুনসুটি হয়ে গেল আর বকুনি শেষে আম্মু বললেন…

-সাবধানে থাকিছ, বেশি আগে আগে ন দুরিবি। - মিছিলের আগে আগে দৌড়াতে নিষেধ করলেন আম্মু।

-আচ্ছা, ঠিক আছে।

ক্যাম্পাসে পৌঁছেই সরাসরি ক্যান্টিনে গেলাম, আজ সকাল থেকেই ক্যান্টিন ছাত্রছাত্রীদের পদচারণায় মুখর। একটু পরই পরিকল্পনা মাফিক বাইরে একসাথে সমবেত হয়ে মিছিল নিয়ে জিইসি মোড় অবরোধ করা হবে। সিনিয়র ভাইদের ডাক পড়তেই ছাত্রছাত্রীরা একে একে ক্যাম্পাসে সামনে জড়ো হতে শুরু করে, আগের মতোই ব্যানার, ফেস্টুন-প্ল্যাকার্ড সহকারে। কিন্তু আজ কেমন যেন সবার মধ্যে একটু বেশি আগ্রাসী মনোভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, হয়তোবা আগের দিনের ঘটনার কারণে। সিনিয়র ভাইদের নেতৃত্বে মিছিল শুরু হলো, বিবিএ ক্যাম্পাস থেকে শিমুল ভাইয়ের নেতৃত্বে আরেকটি মিছিল জিইসি মোড়ে যোগ দেবে আমাদের সাথে। আর পাশাপাশি আশেপাশের অন্যান্য ভার্সিটি থেকেও ছোট ছোট মিছিলও যোগ দিচ্ছে আমাদের সাথে। আমাদের মিছিলটি প্রাথমিক বাঁধার সম্মুখীন হয় গোলপাহাড় মোড়ে, অবস্থানরত ট্রাফিক সার্জেন্ট দীর্ঘ বাকবিতণ্ডা শেষে এই বিশাল জনস্রোতের কাছে হার মানলেন। হয়তোবা তারও মনে পড়ে গেল ফেলে আসা ছাত্রজীবনের দিনগুলির কথা, মুচকি হেসে সরে দাঁড়ালেন মিছিলের সামনে থেকে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা নগরীর ব্যাস্ততম পয়েন্ট “জিইসি মোড়” এসে পৌঁছলাম। এ এক বিশাল জনসমুদ্র, বিভিন্ন ভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের স্লোগানে স্লোগানে গমগম করছে এই জিইসি মোড়…এ দৃশ্য আগে কখনো দেখিনি।

“ভ্যাট দিব না, গুলি কর” , “NO VAT” , “জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও…মাল-মুহিতের আস্তানা” – স্লোগানের ধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলছিল আশে পাশের ভবনগুলোতে।

প্রথম দিকে বিক্ষিপ্তভাবে এ আন্দোলন চলতে থাকায় পুলিশ এসে আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। কিন্তু আমরা আমাদের প্রতিবাদে ছিলাম অটল, হয়তো পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা ভেবেছিলো…দৌঁড়ে এসে হুমকি-ধমকি দিলেই আমরা কেটে পড়ব। কিন্তু এসব হুমকি-ধমকি কে আমরা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছিলাম, কেননা আমরা জানতাম আর যাই হোক গতকালের মতো পুলিশ দ্বিতীয়বার আর ভুল করবে না। মুক্তা দিদি ও শিমুল ভাই পুলিশ অফিসারের সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে সিদ্ধান্তে এলেন, মোড়ের মাঝামাঝি আমরা ঘন্টা-দুয়েকের জন্যে অবস্থান নেব। মাইকে মুক্তা দিদির ঘোষণা আসতেই আমরা সবাই একে একে রাস্তার মোড়ের ট্রাফিক পুলিশ পয়েন্ট ঘিরে গোল করে বসে গেলাম। আজও আমি “No VAT” লেখা সেই গোলাপী টিশার্ট গায়ে চড়িয়েছি। প্রচুর সাংবাদিক ও টিভি রিপোর্টার ভিড় করেছেন মাঝের সেই ট্রাফিক পুলিশ পয়েন্টে। আমরা আমাদের অবস্থানে অটল, “No VAT” “No VAT” স্লোগানে সবাই তাদের প্রতিবাদ জানাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল কবি সুকান্তের “দুর্মর” কবিতার দুটি লাইন-

“হয় ধান নয় প্রাণ, এই শব্দে সারা দেশ দিশেহারা

একবার মরে ভুলে গেছে আজ মৃত্যুর ভয় তারা।”

ঘন্টা দুয়েক ধরে জিইসি মোড় অবরোধ শেষে ধীরে ধীরে পুলিশ আমাদের অবস্থান ছাড়তে বাধ্য করছিল। ইতোমধ্যেই ছাত্রছাত্রীদের পরিমাণও অনেক কমে এসেছে, অনেকেই ছেড়ে চলে গেছে রাজপথ। আর তাই শিমুল ভাইয়ের ঘোষণা মতো আমরাও রাজপথে অবস্থান ছেড়ে দিয়ে মিছিল নিয়ে চললাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্বারকলিপি পেশ করার উদ্দেশ্যে।

>>>>>>>>>

শুক্রবার, সাপ্তাহিক ছুটির দিন। গত দিনের মিছিল আর সড়ক অবরোধের ক্লান্তি নিয়ে প্রচুর ঘুমিয়েছি বাসায় এসে। জুমার নামাজ শেষে খেয়েদেয়ে গেলুম কোচিং এ ক্লাস নিতে। একটা ক্লাস শেষ করে শিক্ষক রুমে গিয়ে বসতেই পত্রিকা হাতে ইংরেজি শিক্ষক রাকিব স্যারের প্রবেশ।

-সানি স্যার, আজকে তো আপনি ট্রিট দিচ্ছেন?

-কিসের ট্রিট ঠিক বুঝলাম না।

-আরেহ আপনি ত ফেমাস হয়ে গেছেন। ট্রিট দিতেই হবে।

-কাশছেন যখন আরেকটু নাহয় ঝেড়েই কাশুন স্যার। বলতে না বলতে পরিচালক হালিম স্যারও যোগ দিলেন আমাকে মুরগি করার ফন্দিতে।

-পত্রিকা দেখেন আজকের। আপনার ছবি !

-আরেহ, এটা তো আমিই। আমার সেই “No VAT” লেখা গোলাপী টিশার্ট, জিইসি মোড়ে আন্দোলনরত আমি ও সকলে, আর ছবির নিচে ক্যাপশন “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে জিইসি মোড় এলাকায় সড়ক অবরোধ করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে শিক্ষার্থীরা-আজাদী”। খাইছে, আমিতো শেষ। এখন সবাই গণহারে ট্রিট চাইলে তো আমি শেষ।

-মজা করলাম স্যার। আপনাকে নিয়ে সত্যিই আমরা গর্বিত। আপনি আপাতত রাজপথে থাকুন, আপনার ক্লাসগুলো আমরা নিয়ে নেব।

-আরেহ না না, আমার ক্লাস আমি সময় করে নিতে পারব। আর হ্যাঁ, ট্রিট দিব…আন্দোলনটার একটা গতি হোক।


>>>>>>>>>>

সরকার এখনো ছাত্রদের দাবি মেনে নেয়নি আর তাই শনিবার থেকেই পুরোদমে সকাল বিকাল ক্লাস বর্জন ও সড়ক অবরোধের সিদ্ধান্ত আসে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে। আমরাও আমাদের পরিকল্পনামতো আবারো মিছিল নিয়ে বেরোই ক্যাম্পাস থেকে, এবারের পরিকল্পনা ওয়াসা মোড় অবরোধ। এই অবরোধটা গতদিনের চেয়ে কিছুটা জমে উঠেছিল বটে। আমরা এবার মোড়ের কেন্দ্রে অবস্থান না নিয়ে হাতে হাতে ধরে বিশাল বর্গাকার মানববন্ধন সৃষ্টি করলাম। এই মানবব্যুহের

শান্তিপূর্ণভাবেই ঘন্টার পর ঘন্টা সড়ক অবরোধ চলছিল, পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও নিরুপায় হয়ে হাল ছেড়ে দিলেন। এভাবে প্রতিদিনকার চলতে ফিরতে যে সড়ক ব্যবহার করি সেই সড়কে এভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকব তা কখনো কল্পনাও করিনি। তীব্র গরমে এই পিচঢালা রাস্তার মধ্যে বসে থাকতে যদিও কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু এসব কষ্টকে ভুলে থাকতে ছেলেপিলেরা সড়কের পিচঢালা রাস্থায় তাদের প্রতিবাদগুলো লিখলে শুরু করল। খাবার ও পানির ব্যবস্থা করা হচ্ছিল স্বেচ্ছায় উদ্যমী কিছু তরুণদের পক্ষ থেকে। আমি শাওন, প্রসেনজিত, ওয়ারিফ, রিয়াদ, সাব্বির অবস্থান নিয়েছিলাম আটকে থাকা কিছু গাড়ির সামনেই। স্লোগানের পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে হাসি-আড্ডা-মজা চালিয়ে যাচ্ছিলাম নিজেদের চাঙ্গা রাখতে। পেছনে থাকা গাড়ির ড্রাইভাররা বেরিয়ে কতোই না কাকুতি মিনতি করছিল…কিন্তু এসবের কিছুই যে আমাদের হাতে নেই। অবশ্য দু-একজন প্রবীণ ভদ্রলোক আমাদের আন্দোলেন পক্ষেই কিছু কথা বলছিলেন।

-“মেলা দিন পর ছাত্রসমাজ ক্ষেপছে। এই রকম আরো বেশি বেশি অন্দোলনের দরকার আছে। পাইছে টা কি? মগের মুল্লুক ? যখন যা খুশি চাপাই দিবো !”

আজও বেশ কিছু মিডিয়ার লোকজন এসেছে, এদের দেখেই আমি একপাশে চলে এলাম। গতদিন পত্রিকায় ছেপেছিল বলে আম্মুর হাতে পড়েনি, টিভিতে আমার কীর্তিকলাপ দেখলে পরে আম্মু আর ভাত দেবে না। হঠাৎ লক্ষ করলাম পরিচিত কেউ একজন, কাছে যেতেই দেখি স্কুলের বন্ধু সৈকত। আমাকে দেখে বেচারা একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে, সাথে গার্লফ্রেন্ড ছিল বলে কথা।

-কি খবর দোস্ত? তোরে মিছিলে দেখে ভালই লাগল।

-আরে সানি। পরিচয় করিয়ে দিই, এটা হচ্ছে…… আর ও হচ্ছে সানি আমার স্কুলফ্রেন্ড।

-হেলো। তরুণীর দিকে সরাসরি না তাকিয়ে অপ্রস্তুতভাবে সম্বোধন করলাম।

-আচ্ছা, তুমি এদিকটায় থাকো। সানির সাথে আমি ওদিকে যাচ্ছি।

গার্লফ্রেন্ড নিয়ে হাতে হাত ধরে কেউ আন্দোলনে আসবে এটাও আমার নতুন অভিজ্ঞতা। সে যাই হোক চলমান আন্দোলন ও আমাদের করণীয় নিয়ে দু-চারটে উপদেশমূলক কথা শুনিয়ে সৈকত বেচারা আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার ললনার হাত ধরল। বিড়বিড় করলাম হেলাল হাফিজের কবিতার আরো দুটি লাইন…

“শাশ্বত শান্তির যারা তারাও যুদ্ধে আসে,

অবশ্য আসতে হয় মাঝে মধ্যে”।

<<<<<আগের পর্ব 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...