সোহেল হত্যার ঘটনা দেশব্যাপী নিউজ মিডিয়া আর
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুরোদমে প্রচার হতে লাগল, এই নিউজটা এতো বেশি ভাইরাল
হয়েছে যে পরিচিতজনদের জনে জনে বলতে হচ্ছে আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টিতে
মারামারি হয়নি, হয়েছে বিজনেস ফ্যাকাল্টিতে...দুটা বিল্ডিং দুই জাগায়। নিঃসন্দেহে
এই ঘটনা আমাদের পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর কালিমা লেপন করেছে, আর একজন ছাত্র হিসেবে
আমি নিজেও খুব লজ্জিত। সিসিটিভি ফুটেজ
ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে যাতে দেখা যাচ্ছে ক্লাসের বারান্দায় ভীড়ের মধ্যে একজন
ছাত্র আরেকজনকে নৃশংসভাবে কোপাচ্ছে। এইসব ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসীরা বই-খাতা-কলমের
স্থলে কিভাবে যে ছুরি-চাকু নিয়ে ক্যাম্পাসে আসে ভাবতেই গা শিওরে উঠে। আম্মু টিভিতে
নিউজ দেখেই বকাঝকা শুরু করলেন…
- তোরে কইলাম আই, এডে ভর্তি ন অইবের লাই। আ-হা-হা-হা কন মা’র বুক খালি গরি দিল অমাইনষের পোয়া-অক্কল।
- আম্মু এইটা ওয়াসা ক্যাম্পাসে, আমাদেরটায় কোন রাজনীতি হয় না।
বিভিন্ন সময় বারে বারে আমাদের প্রকৌশল অনুষদেও
ছাত্ররাজনীতি শুরু করার প্রচেষ্টা চলেছিল, কিন্তু আমাদের অনুষদের প্রক্টর ও সিনিয়র
ফ্যাকাল্টিদের দৃঢ় মনোভাবের কারণে কখনোই এই অনুষদে ছাত্ররাজনীতি ঢুকতে
পারেনি,এমনকি অনুষদের বিভিন্ন ক্লাবগুলোকেও কড়া নজরদারির মধ্যে রাখা হয়। প্রক্টর
স্যারের ভাষায়…
- পলিটিক্স যা করবা ক্যাম্পাসের বাইরে গিয়ে কর, পার্সোনালি কর। এই ক্যাম্পাসে কোন সক্রিয় রাজনীতি চলবে না এবং এর অনুমোদনও আমরা দেবো না।
পরদিন বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্যে বন্ধ
ঘোষণা করা হয়েছে, টিভি নিউজে জানতে পারলাম হত্যাকারী ও তার সহযোগীরা সবাই পলাতক,
বিদায় অনুষ্ঠান আয়োজন কে কেন্দ্র করে একই ছাত্রসংগঠনের দুটি গ্রুপের অন্তর্কোন্দল
বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাতে বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করে জানতে পারলাম, দুপুরের পরপরই
প্রশাসনিক ভবনের সামনে সোহেল এর বন্ধুরা গণ্ডগোল করেছে আর ভাঙচুর চালিয়েছে, আর এই
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিকেল পর্যন্ত প্রশাসনিক ভবনের গেইট বন্ধ করে রাখা হয় যাতে
অনেক ছাত্রছাত্রীই ভেতরে আটকা পড়ে যায়। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যে
ছাত্ররাজনীতি যে কতটা ভয়ংকর তা আগে পত্রিকা আর টিভিতে দেখে আসলেও আজকে একরকম সামনে
থেকেই উপলব্ধি করলাম। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের মধ্যেও যে এত এত গ্রুপিং থাকতে
পারে আর এরাই নিজেদের মধ্যে আবার মারামারি করে এই বিষয়ে চবির এক রাজনীতি করা
বন্ধুকে প্রশ্নই করে বসেছিলাম
- আচ্ছা, এই যে তোরা বগি নিয়ে রাজনীতি করিস, আবার নিজের দলের লোকেদের মধ্যেই অমুক সমর্থক গ্রুপ তমুক সমর্থক গ্রুপ… এরকম কেন?
- আরে বন্ধু, বুঝবি না। এভাবে নিজেদের মধ্যে গ্রুপিং করলে কাজ দ্রুত হয়, আবার নির্বাচন কিংবা বড় কোন উপলক্ষ্যে আবার সবাই এক হয়ে যাই।
- আচ্ছা বুঝলাম, সামান্য একটা রেলগাড়িই তো এইটার বগি নিয়ে মারামারি করার কি আছে?
- বগি রাজনীতি চবিতে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে, জীবনেও বন্ধ হবেনা।
- আচ্ছা বগির কথা বাদ দে, দুই গ্রুপের মধ্যে প্রতিযোগীতাও মেনে নিলাম, একজন আরেকজনরে খুন করছ কেমনে? কুখ্যাত সেই শিবির ফিল্ডে নাই বলে কি তাদের মত আচরণ শুরু করবি?
- আরে আমি করছি নাকি খুন খারাবি?
- তুই না করলেও তোর দলের বড় ভাই তো করছে, নাকি?
- স্পেড-কে স্পেড বলার স্বভাবটা তোর আর গেল না।
অন্য কোন নেতা হলে এতক্ষণে আমি শেষ, আর বন্ধু আমার মুচকি হাসছে আর চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল। আজকের এই ঘটনায় আমার সেই বন্ধুর কথা খুব মনে পড়ে গেল। অনির্দিষ্টকালীন ছুটি কাটানোর কোন অভিজ্ঞতা ছিলনা আগে, পরিস্থিতি বিবেচনায় বাইরে কোথায় গেলেই সবার প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছিলাম- “এই, তোমার ক্যাম্পাসে না মার্ডার হইছে?”
কোচিং, টিউশন আর বাসা এই তিনটি নিয়ে ব্যাস্ত
আপাতত, বিশ্ববিদ্যালয় খোলার কোন নামগন্ধ নেই… পরিস্থিতি স্বাভাবিক কবে হবে কোন ঠিক
নেই। সন্ধ্যের দিকে জিহাদ ভাইয়ের মেসেজ, আমাদের একটা শর্টফিল্ম “We art Water” টপ টেন এর মধ্যে আছে। ভোটের জন্য বেশি বেশি শেয়ার
করতে হবে। সাথে সাথেই রেজিস্ট্রেশন করে লগিন করে ভোট দিয়ে দিলাম। “সিনে তারুণ্য”
নামের একখানা গ্রুপ আছে জিহাদ ভাইয়ের, যারা নিয়মিত শর্টফিল্ম থেকে শুরু করে বিভিন্ন ডকুমেন্টারী তৈরী করেন। ক্যামেরার পেছনের
মানুষগুলো কিভাবে কাজ করে তা জানার আগ্রহ থেকেই জিহাদ ভাইদের সিনেতারুণ্য টিমের
সাথে যুক্ত হওয়া। কয়েক মাস আগে পরিচালক জিহাদ ভাই বললেন চট্রগ্রামের বিভিন্ন নদী ও
খাল দূষণ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে। চাক্তাই খাল নিয়ে কিছু ডকুমেন্টারি ও গবেষণাপত্র
সংগ্রহ করে সারসংক্ষেপ করে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, এরপর কখনই যে স্ক্রিপ্ট লিখলেন, কখন
ভিডিও শ্যুট করলেন আর কখনই বা এই ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এ পাঠিয়ে দিলেন কিছুই জানা ছিল
না। যাই হোক, Pollution Cycle নামের তিন মিনিটের এই শর্টফিল্ম এ খুব সুন্দরভাবে
ফুটিয়ে তোলা হয়েছে শহুরে জীবনে পানি দূষণের এক চক্র। আমাদের নিজেদের খামখেয়ালিপনায়
খালে-বিলে ফেলে দেয়া বর্জ্য নদীর পানি দূষণ করে, আবার সেই পানি বিভিন্ন মাধ্যম হয়ে
খাবারের সাথে অসুস্থতা নিয়ে আসে আমাদের ঘরেই যার দায় আমরা মোটেই এড়াতে পারিনা।
শর্টফিল্ম এর শেষদিকে জন-ত্রিশেক গুনী মানুষের ভীড়ে কৃতজ্ঞতায় আমার নামখানা দেখতে
পেয়ে ভালোই লাগছিল।
এদিকে অনির্দিষ্টকালীন ছুটি শেষ হবার কোন নামগন্ধ
নেই, একদিন টিভি নিউজে দেখলাম অভিযুক্ত বেশ কয়েকজন গ্রেফতার হলেও অন্যতম আসামী
সোহান গা-ঢাকা দিয়েছে। প্রায় সপ্তাহ খানেক বাদে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে
বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেয়া হয়। বেশ ক’দিন ভার্সিটি বন্ধ থাকার ফলাফলস্বরূপ এবারে
ক্লাস আর ল্যাবের প্রেশার বেড়ে যাবে, আর কোর্স টিচাররা ছুটির দিনেও ক্লাস নিয়ে
সিলেবাস শেষ করবে। অনির্দিষ্টকালীন ছুটির কারণে মিড এক্সাম পিছিয়েছে, আর মাত্রই
ক্যাম্পাস খুলতে না খুলতেই মিড এক্সামের নতুন রুটিন দেয়া হয়েছে...কোর্স টিচাররাও
তাই আপাতত পড়িমরি করে মিডের সিলেবাস শেষ করছেন। এদিকে আবার আগামীকাল বাংলা নববর্ষ। গত বছর জিইসি ক্যাম্পাসে বেশ ঘটা
করে নববর্ষ উৎযাপন করা হয়েছিল, এবার তেমন কিছু আয়োজিত হচ্ছে না...থমথমে পরিস্থিতি
বিরাজ করছে প্রতিটা অনুষদে। আমি, নাইম আর সাব্বির আড্ডা দিচ্ছিলাম ক্লাসের
ফাঁকে...এর মধ্যেই প্রসেনজিতের আগমন …
- দোস্ত, চল পহেলা বৈশাখে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যাই।
- চবি ক্যাম্পাসে যাবি নাকি এখানের চারুকলা ইন্সটিউট যাবি?
- ক্যাম্পাসেই যাবো, সকাল সকাল বটতলী স্টেশন চলে আসিস।
“কি পড়ে আসবি সবাই?”... আমরা পাঁচজন চবি
ক্যাম্পাসে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর সাব্বির পোশাকের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলল।
- কি আর পড়বি? পাঞ্জাবি পিনধিবি দি রি, লগে জিন্স প্যান্ট না হয় পাজামা। - পরিকল্পনাকারী প্রসেনজিত এর সহজ সরল উত্তর।
- আচ্ছা, ঠিক আছে। তাহলে সকাল আটটার ট্রেনে দেখা হবে কাল।

