শুক্রবার, ২৭ আগস্ট, ২০২১

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

 


মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না, আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেমাস থেকে একটা আর্ডিনো কিনে নিলাম, আর সাথে নিলাম একটা সার্ভো মোটর, কিছু এলইডি লাইট, ভেরোবোর্ড, জাম্পার ওয়্যার আর কিছু L293D মোটর ড্রাইভার আইসি। টিউশন এর জমানো টাকার বেশ খানিকটাই খরচ করে ফেলেছি এই শখের ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর পেছনে। রাতে বাসায় ফিরে এই আর্ডিনো নিয়ে বসলাম, নীল রঙের একখানা বোর্ড...দুপাশে জাম্পার তার কানেক্ট করার জন্য রেইল আর মাঝখানে লম্বা একটা আইসি। খুব কাছ থেকে ওই আইসির গাইয়ে লিখা আছে ATmega328, আইসির নাম হবে হয়তো। এর আগে রোবোটিক্স ক্লাবের ওয়ার্কশপে ও সিনিয়র ভাইদের ফাইনার প্রজেক্টে এই আর্ডিনো ব্যাবহার করতে দেখেছি। আর এই হচ্ছে আমার নিজের প্রথম আর্ডিনো বোর্ড। অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করে ক্যাবল লাগিয়ে কম্পিউটার এর সাথে সংযুক্ত করলাম এই আর্ডিনোকে, কিন্তু বারবার আননোন ড্রাইভার দেখাচ্ছিল। এই ড্রাইভার সেটাপের নিশ্চয়ই কোন কারিকুরি আছে, এর আগে ওয়ার্কশপে এই ড্রাইভারটার কথাই বলেছিল হয়তোবা। মোবাইলের ইন্টারনেটের উপর ভরসা নেই, এমন এলাকায় থাকি যে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কানেকশনও সহজলভ্য হয়র উঠেনি। যাগ গে, কাল ক্যাম্পাসে গিয়ে ফ্রি ওয়াইফাই দিয়ে ডাউনলোড করে নিব এই ড্রাইভার ফাইল আর কিছু টিউটোরিয়াল কিংবা পিডিএফ। 


এর মধ্যেই ফাইনাল পরীক্ষার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল, আর আমিও ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি সব গুছিয়ে বইপত্র নিয়ে বসলাম। এই সপ্তাহটাই ফাইনালের আগে শেষ সপ্তাহ, স্যার-ম্যামরা সবাই দেদারছে ইন্সট্রাকশন দিচ্ছে, সিলেবাস রিভিউ করছে… আর আমাদের মতো ফাঁকিবাজ স্টুডেন্টদের সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। জুলিয়ানা ম্যাম সিগনাল এন্ড সিস্টেম ক্লাসে ইলেকট্রিকাল টু মেকানিকাল সিস্টেম এনালজিস নিয়ে পড়াচ্ছিলেন, আর আমি চোখে ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে কোন রকমে ক্লাস করছিলাম। হঠাৎ মেকানিকালের গন্ধ পেয়েই আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো আর মনযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলাম ইলেকট্রিকাল সিস্টেম কে কিভাবে মেকানিকালে নেয়? অতি উৎসাহী হয়ে প্রশ্নও করে বসলাম -ম্যাম, এই কনভার্শন টা রিয়েল লাইফে কি কাজে লাগবে?” ম্যামের উত্তর-কেন?ইন্ডাস্ট্রিতে লাগবে, যেখানে মেকানিকাল আর ইলেকট্রিকাল সিস্টেম একসাথে আছে ওখানেম্যামের উত্তর শুনে যা বুঝলাম এই কনভার্শনের বাস্তবে অস্তিত্ত্ব নাই, শুধুমাত্র খাতায়-কলমে হিসাব-নিকাশ করে রাখার জন্যেই এই এনালজি। অথচ আমি কতোটাই না বোকা ! এতক্ষণ ভাবছিলাম এ আবার কেমন জিনিস, মেকানিকাল রে ইলেকট্রিক্যাল করে ফেলল...আবার ইলেকট্রিকাল রে মেকানিকাল !!!  ক্লাস শেষে বন্ধু রাশেদের ডাক…  

-      বন্ধু, পরীক্ষার প্রিপারেশন কেমন নিচ্ছস?

-      আর বলিস না, ইলেকট্রনিক্স ২ আর সিগনাল সিস্টেম নিয়ে বেশি টেনশনে আছি। 

-      এই মেডামগুলা এতো দ্রুত সিলেবাস শেষ করে দেয়, কি পড়ায় না পড়াই কিছুই বুঝিনা।

-      সাজেশনও তো দেয় নাই কোন। কিছু সিলেক্টিভ টপিক ঠিক করে দিলে ভাল হইতো। 

-      চল নাদিয়া আর ইশিতার খাতার ছবি তুলে নিয়ে নেই, ইতারা সব ক্লাস করছে।  

-      এডমিট কার্ড কালেক্ট করছস ?

-      নাহ, আমার এখনো সেমিস্টার ফি দেয়া বাকি। ফাইন কতো আসছে কেজানে?

-      আমিও দেই নাই ফি এখনো। চল আগামীকাল গিয়ে লেনদেন ক্লিয়ার করে আসি। 

 

ফাইনাল পরীক্ষার একটা মাস যেন কাটতেই চাচ্ছিল না, পুরো সেমিস্টারের পড়া এই একমাসের জন্যে জমিয়ে রাখলে যা হয় আরকি। কুল নাই কিনার নাই নাইকো দরিয়ার পানি - এখান থেকে কিছু, ওখান থেকে কিছু এভাবে ভাঙ্গাচোরা প্রিপারেশন নিয়ে মোটামুটি এবারের মতোও পার পাওয়া গেল। আগের বারের মতো এবারও দৃঢ় সংকল্প- এই সেমিস্টারটা যাক, পরের সেমিস্টারে একেবারে ফাটিয়ে দেবো। পরীক্ষা শেষ করে টানা কদিন ঘুমিয়েছি, এরপর এক ফাঁকে আবার বসলাম আর্ডিনো নিয়ে। টানা কয়েক ঘণ্টা লেগে থেকে মোটামুটি ড্রাইভার আর সফটওয়্যার সেটাপ করে ফেললাম। আমি তো তখন মহাখুশি, প্রোগ্রাম করে দিচ্ছি আর সে অনুযায়ী এলিডি লাইট ব্লিংকিং করছে। পরদিন ঠিক করলাম, এই আর্ডিনো দিয়ে ছোটখাটো কোন একটা প্রজেক্ট বানিয়ে ফেললে মন্দ হয়না। গ্রামীণফোন এর দুই জিবি নেট কিনে শুরু করে দিলাম রিসার্চ, ইন্টারনেটের এখানে ওখানে খুজতে লাগলাম এই আর্ডিনো দিয়ে কে কি বানালো...আর কিভাবেই বা বানালো। যেখানে আমার উচিত ছিলো এই ডিভাইসটা নিয়ে পড়াশোনা করা, এর বিভিন্ন কম্পোনেন্ট নিয়ে জানা...তা না করে সরাসরি লেগে পড়লাম হার্ডওয়্যার নিয়ে। অনেক খুঁজতে খুঁজতে একটা প্রজেক্ট বেশ ভালো লাগলো-সিএনসি প্লটারনষ্ট ডিভিডি রাইটার থেকে বানানো এই ড্রইং করার মেশিন কি সুন্দর কম্পিউটার এর থেকে দেয়া ছবি এঁকে দিচ্ছে, বাহ। এইটা বানাতে হবেই আমাকে, কিন্তু এই ডিভিডি রাইটার জোগাড় করতে হবে, এলুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেল জোগাড় করতে হবে ফ্রেম বানানোর জন্যে, সার্ভো আর মোটর ড্রাইভার আইসি তো আছে। 


একদিন বিকেলে হালিম ভাইয়ের ফোন। সিটিজি ব্লাড ব্যাংক এর নাকি একটা বড়সড় আয়োজন আছে শিশু একাডেমীতে। অনেকগুলো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মধ্যে আমাদের সংগঠনইয়ুথ রেনেসাঁ”- কেও আমন্ত্রিত করা হয়েছে। সন্ধ্যার আগে করে রাকিব ভাই, আরমান ভাই, সাখাজিল ভাই হালিম ভাই এর সাথে চললাম শিশু একাডেমী। বেশ বড়সড় আয়োজন করা হয়ে শিশু একাডেমী প্রাঙ্গনে, আমাদের ক্যাম্পাস থেকে কাছেই। ভেতরে প্রবেশ করতেই সূর্য ভাই এর সাথে দেখা হয়ে গেলো, আমাদের ক্যাম্পাসের সিনিয়র ভাই যিনি এই সিটিজি ব্লাড ব্যাংক এর প্রতিষ্টাতা। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত পর্যন্ত চললো অনুষ্ঠান, আমাদের সংগঠনের নাম ডাকার পর আমরা তিন-চারজন মঞ্চে গিয়ে সম্মাননা ক্রেস্ট গ্রহণ করলাম। সংগঠনের পক্ষ থেকে আরমান ভাই সিটিজি ব্লাড ব্যাংক-কে ধন্যবাদ জানিয়ে শুভেচ্ছা বক্তব্য দিলেন। এরপর খাওয়া দাওয়া শেষে যখন বাড়ির পথ ধরছিলাম তখন ঝুম বৃষ্টি...সবাই মিলে একসাথে কাটগড় পর্যন্ত এলেও ছাতা না থাকার দরুণ রাত বিরাতের এই বৃষ্টিতে ভিজেচুপসে বাসায় ফিরতে হলো আমায়।   

..................................................................................................................................................................... 

-      হ্যালো, বন্ধু তানভীর। কি অবস্থা? দিনকাল কেমন যায়?

-      এইতো ভালো, তোর কি অবস্থা? 

-      চলতেছে, আচ্ছা শোন। তোর কাছে কি পুরাতন কম্পিউটার এর ডিভিডি রাইটার আছে?

-      আছে মনে হয়, কিন্তু এগুলা তো নষ্ট- চলবে না লাগাইলে।

-      আরেহ, আমার নষ্টই লাগবে রে। খুলব, খুলে ভেতরের স্টেপার মোটর একটা কাজে লাগাবো।

-      আচ্ছা, কি বানাবি? 

-      আরেহ এমনি, দেখিনা কি বানানো যায়।

-      আমার বাসার দিকে চলে আয় তাহলে আগামীকাল।

ভার্সিটির বন্ধু তানভীর কম্পিউটার এর বিজনেস করে, অধিকাংশ ক্লাসেই তানভীরকে দেখা যায় এর নাহয় ওর ল্যাপটপ সেটআপ দিচ্ছে, টুকিটাকি প্রব্লেম ক্লাসে বসেই ঠিক করে দিচ্ছে...একরকম কম্পিউটারের পোকা বলা চলে। যাক, ডিভিডি রাইটার জোগাড় হয়ে যাবে কাল, এখন এলুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেলটাও খুঁজে দেখতে হবে মার্কেটের দিকে গিয়ে।   

কিছু টিউটোরিয়াল দেখে আর ডায়াগ্রাম দেখে কানেকশন দিয়ে L293D ড্রাইভার আইসি দিয়ে স্টেপার মোটর ভালোভাবেই রান করালাম, এরপর বসলাম ফ্রেমের কাজ নিয়ে। দিনরাত পরিশ্রম করে কাটাকুটি, নাট-বোল্ট-স্কু হাবিজাবি করে ফ্রেমখানাও দাঁড়িয়ে গেলো। দুদিনের মধ্যেই হার্ডওয়্যার রেডি, নাওয়া নাই খাওয়া নাই, মাথায় শুধু একটাই চিন্তা...যে করেই হোক, এই হার্ডওয়্যারকে এখন সফটওয়্যার দিয়ে ঠিকভাবে চালাতে হবে !!! 

<<<আগের পর্ব  

বিদ্রঃ লেভেল ২, টার্ম ২ (দ্বিতীয় বর্ষ) সম্পন্ন। ২০১৬ ইং 

শুক্রবার, ২০ আগস্ট, ২০২১

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪১


উচ্চ আপেক্ষিক রোধের নাইক্রোম এর তার বৈদ্যুতিক কেটলিতে ব্যবহার করা হয় কেন  ?”

-“কারণ নাইক্রোম তার খুব শক্তিশালী। এটিতে অনেক ভোল্টেজ দিলেও তারের কোন ক্ষতি হয় না। এটি সাধারণত স্টেপ ডাউন আপ ট্রান্সফরমার এ ব্যাবহার করা হয়, কারণ ট্রান্সফরমার এ উচ্চ আপেক্ষিক রোধের ছোট তার ব্যবহার করলে তা গলে পড়ে যায়। তাই উচ্চ আপেক্ষিক রোধের নাইক্রোম তার ব্যবহার করা হয়।”

কোচিং এ দশম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার খাতা কাটতে গিয়ে মাথা গেলো বিগড়ে। মানে পরীক্ষার খাতাকে এরা যে কি মনে করে, যাচ্ছেতাই লিখে দিলুম,ব্যাস !!! অবশ্য আমরাও বা কম যাই কিসে। ক্লাসে গিয়ে সেই ছাত্রকে কিছুক্ষণ বোঝালাম নাইক্রোম তার কেন ব্যাবহার করা হয়। এরপর একটা উদাহরণ দেয়ার চেষ্টা করলাম... 

-ধরো, তোমার কিছু টাকা দরকার … এখন তুমি ঠিক করতে পারছ না কিভাবে আব্বুকে বলবে, গিয়ে বললে তোমার আম্মুকে কারণ আম্মু খুব নরম মনের মানুষ। আর তোমার কথায় তোমার আম্মু গলে যায়, তোমার আব্বু গলে তমার আম্মুর কথায়। এখন তোমার আম্মু আব্বুকে গিয়ে বললে খুব সহজেই টাকা ম্যানেজ হয়ে যাবে।আপেক্ষিক রোধ বেশি হওয়ায় নাইক্রোমও অন্যান্য ধাতুর চেয়ে অল্প ইলেক্ট্রিক এনার্জিতেই গরম হয়ে যায়। বুঝলেতো এবার?

-ও আচ্ছা স্যার, বুঝসি। কিন্তু আপনি তো গলানোর কথা বললেন, কেটলি তো হয় গরম?

-আরেহ এমনি উদাহরণ দিছি বুঝাবার জন্যে কোনটা সহজ। লোহা বা তামার তার সারাদিন কারেন্ট দিয়ে ফেলে রাখলে কতটুকুই বা গরম হবে? তোদের মাথায় ফিজিক্স ঢুকবে না !!!!

 

এদিকে বাংলাদেশ আর ইংল্যান্ডের টেস্ট সিরিজ চলছে চট্রগ্রামে, কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যেতে পারছিনা। একের পর এক ল্যাব ফাইনাল আর ভাইবার সিডিউল। পুরো সেমিস্টার জুড়ে যা যা ল্যাব করেছি সবগুলো রিভিউ করা, ল্যাব রিপোর্ট বাকি থাকলে সেগুলো কমপ্লিট করা, ভাইবার জন্যে প্রস্তুতি নেয়া এটা সেটা আরও কতো কি!! তার মধ্যে প্রতিদিন একটা-দুটা এসাইনমেন্ট লেগেই থাকে।

আজ মেশিন-২ ল্যাব ভাইবা, রুম নম্বর-২০১, টিচার্স কমন রুম! “খাইছে”, সব শিক্ষক মিলে ভাইবাতে ইনসাল্ট করবেনাকি! দুজন দুজন করে ভাইবা শুরু হলো, এক গ্রুপ ঢুকার পরপরই শুরু হয়ে যায় টিচার্স রুমে ঝুঁকি নিয়ে উঁকি দেয়া। প্রায় মিনিট দশেক পর দুজন বের হতে না হতেই সবাই পড়িমড়ি করে তাদের উপর হামলে পড়ছিল... “এই কি জিজ্ঞেস করছে?”, “দোস্ত তোর শিটটা দে?”, “এই, বেল্ট টা দিস তো একটু?”, “অডা, তুর পাম শো গিন দিছ তো” । এভাবে এটা সেটা চেয়ে সবাই হামলে পড়ছিল মাত্রই ভাইবা দিয়ে বেরিয়ে আসা বন্ধুদের উপর। ভাইবা রুম থেকে একটু দূরে ২০৩ নাম্বার রুমখানা আমাদের জন্যে একটা ড্রেসিং রুম হয়ে গেছে বলা চলে। মাঠে ক্রিকেটাররা আউট হয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরে বোলারের উপর যেভাবে ক্ষোভ ঝাড়ে, ব্যাট-প্যাড ছুড়ে মারে… ঠিক তেমনই হচ্ছিল এখানে। অবশ্য ব্যাতিক্রম বলতে ব্যাট-প্যাড ছুড়ে মারতে হচ্ছিল না, ড্রেসিং রুমে ঢুকার সাথে সাথেই বন্ধুরা এসে জুতো, জামা, বেল্ট, কলম, ঘড়ি নিয়ে টানাটানি শুরু করে দেয়। কেউবা আবার প্রিয় বন্ধুর কাছে ফরমাল প্যান্টখানাও আবদার করে বসে।

তখন প্রায় দুপুর তিনটে, আমি আর মোজাম্মেল ঢুকলাম ভাইবা দিতে। ঢুকতেই দেখি আকরাম স্যার আর হেলাল স্যার চা খাচ্ছেন আর বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড ম্যাচ উপভোগ করছেন। “আচ্ছা, ভেতরেও তাহলে খেলা চলছে”- মনে মনে বললাম। ঢুকে সালাম দেবার পর স্যাররা বসতে বললেন।

- “বল, কি জিজ্ঞেস করবো তোমাদের? আপনি জিজ্ঞাস করেন হেলাল ভাই।”- আকরাম স্যার পাশে বসে থাকা হেলাল স্যারকে ওপেনিং বোলিং করতে বল হাতে তুলে দিলেন।

- এই তুমি বল দেখি, স্প্লিপ কি? ওহহহ, শিট … দেখছেন আকরাম ভাই। একটা স্লিপ থাকলে এইটা ক্যাচ ছিল ।

- স্যার, স্লিপ মানে … স্লিপ মানে …  মোজাম্মেল আমতা আমতা করছিল।

- পড়ালেখা তো করনা, পারবা কেমনে? আচ্ছা বল, ডেম্পার ওয়ান্ডিং কি?

এদিকে আকরাম স্যার আমাকে লক্ষ্য করে বললেন -

-আচ্ছা, তুমি বলো Synchronous Motor এ সাপ্লাই দিলে ঘুরেনা কেন? ঘুরাইতে হলে কি মেথড এপ্লাই করতে হয়?

- স্যার, সিঙ্ক্রোনাস মোটরের স্টার্টিং টর্ক শূন্য থাকে, এজন্যে মোটরকে স্টার্ট করতে হলে রোটরকে স্টেটরের ম্যাগনেটিক ফিল্ডের গতির কাছাকাছি আনতে হয়। আলাদা ডিসি ফিল্ড দিয়ে একসাইটেশন দিলে এই কাজটা হয় আর মোটর ঘুরে।

ইয়েস ! ইয়েস ! উইকেট পড়ছে পড়ছে… পাশ থেকে হেলাল স্যারের উৎযাপন দেখে আকরাম স্যারও যোগ দিলেন। এদিকে আমি আর মোজাম্মেলও উঁকি দিয়ে দেখতে যাচ্ছিলাম… হঠাত মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল স্যার, স্কোর কত?”

-এই, তোমরা এখন যাও। আর কয়জন আছে? পাঠাই দাও পরের গ্রুপ।

কোন রকমে ভাইবা শেষ করে ড্রেসিং রুমে ফিরতেই বন্ধু জাহিদ ঝাপিয়ে পড়লো…

-অই দোস্ত, তুর শার্টটা দেনা একটু। আমি তো জানতামই না আজকে ভাইবা, গেঞ্জি পরেই চলে আসছি।

-শার্ট কেমনে দেই তোকে? গেঞ্জি ইন করে চলে যা ভাইবা দিতে।

-দিলি না তো? মনে থাকবে দেখিস।


ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে এসে আনমনে হাঁটছিলাম, আর তখনই ফোনটা বেজে উঠল…মেজ খালা নাকি নতুন এলইডি টিভি কিনেছেন, কেনার দু-সপ্তাহের মধ্যেই টিভিতে সমস্যা, একরকম পানির দামেই ওয়ারেন্টি ছাড়াই কেনা হয়েছে… আর তাই সস্তার তিন অবস্থা। এতো করে বললাম, আমি টিভির কিছুই বুঝিনা টিভির মিস্ত্রির কাছে নিয়ে যেতে- নাহ, আমাকেই নাকি যেতে হবে। এরপর একরকম বাধ্য হয়েই চলে গেলুম সরাসরি খালার বাসায়। বাইরে থেকে দেখে যা বুঝলাম সেটিংস এ কোন সমস্যা হবে হয়তো, পাউয়ার অন হয় আর পুরো ডিসপ্লে নীল হয়ে থাকে। ব্যাপারটা যা বুঝলাম,পিসির এলইডি মনিটর এর সাথে টিভিকার্ড সেট করে এলইডি টিভি বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে ! রিমোট নিয়ে সেটিংস অনেক চেষ্টা করেও কিছু না হওয়ায় ব্যাগ থেকে স্কু-ড্রাইভার নিয়ে এদিক ওদিক খোলার চেষ্টা করলাম...কিন্তু কি মনে করে আর খুললাম না। পাউয়ার অফ করে আবার পাউয়ার দিতেই দেখি অবস্থা আরো খারাপ, ডিসপ্লে পুরো ব্লাকআউট। এই যাহ, দোষ পড়লো আমারই ঘাড়ে...আমি টিভি নষ্ট করছি। আগে তাও নাকি নীল আলো আসতো...এখন তাও আসেনা। অনেক কথা শুনে প্রচন্ড মন খারাপ করে বাসায় ফিরে এলাম, মনে মনে ভাবছি- এই ইলেকট্রিক্যাল রিপেয়ারিং এর কাজ ছেড়ে দিতে হবে...ইলেকট্রনিক্সের পাশাপাশি মাইক্রোকন্ট্রোলার আর প্রোগ্রামিং শিখতে হবে।  

<<<আগের পর্ব             পরের পর্ব>>>

শুক্রবার, ১৩ আগস্ট, ২০২১

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ৪০


“ভাইনে কি কারন ওর কাম গর দে নে?” অপ্রত্যাশিত এই প্রশ্নে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেলাম। সকালে গিয়েছিলাম মেজো খালার বাসায়, উপস্থিত থাকাকালীন সকেটবোর্ড এর সমস্যা দেখা দেয়ায় নিজেই লেগে পড়েছিলাম ঠিক করতে। কিছু প্রয়োজনীর মালামাল আনতে হার্ডওয়্যার দোকানে যেতেই মামা আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে, আর অতি চালাক দোকানী ইলেকট্রিক মিস্ত্রী ভেবে বসেন। বাসার ওয়্যারিং করতে করতে বিষয়খানা আন্টিকে বলছিলাম আর আন্টি কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিলেন- “ঠিক তো, তোর চালচলন মিস্ত্রির ডুইল্লে। তোরে মিস্ত্রি ন কই আর কি কইবু?” মনে মনে ভাবছিলাম এই শেষ ইলেকট্রিক এর কাজ, এরপর থেকে আর না। কিন্তু বিকেলের দিকে বাসায় ফিরে সবভুলে আবার লেগে পড়লাম আইপিএস এর কাজ নিয়ে। 

সামনেই কুরবানীর ঈদ, আর গরুর বাজার দু-তিনটা ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত আমি আর ছোট ভাই। কাটগড় বাজারে আব্বু আর হুজুর অপেক্ষা করছিলেন, আমি আর ছোট ভাই গিয়ে দেখলাম তারা একটা গরু দরদাম করছেন... 

-     ও-বা দাম কত ইবের? ঠাস করে সজোরে গরুর পশ্চাদদেশে এক চপেটাঘাত করে গরু বিক্রেতাকে প্রশ্ন করলেন আব্বু।

-       বদ্দা আশি। 

-       ইয়া দিলি নি গলাত ফাঁসি !!

-       দাম তো কইয়ো ঠাসি !!!

আব্বু এরকম কথার সাথে কথা মিলিয়ে বলতে পছন্দ করেন, পেছন থেকে হুজুরও আব্বুর সাথে তালে তাল মেলালেন। এভাবে আরো কিছুক্ষণ দরদাম করে বাজেটের মধ্যে একখানা গরু মেলানো গেলো। হাসিল পরিশোধ করেই গরুর রশি ধরে আমি আর ছত ভাই চললাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে বেশ কয়েকবার গরু এদিও-ওদিক ছুটে পালানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু আমার মাথায় ঘুরছিল গরুর সাথে গরু হয়ে যেতে হয়। আর তাই গরুর গলার একদম কাছ থেকেই রশি ধরে গরুকে নিয়ন্ত্রণ করছিলাম। মাঝে দুয়েকবার বিরক্ত হয়ে বেচায়া হাঁটা বন্ধ করে দেয়, আর আমার ছোটভাই এর লেজ ধরে টান দেয়ার বিশেষ টেকনিকে আবার হাঁটা শুরু করে। 

বরাবরের মতো একদিনের কসাই আর একদিনের ডেলিভারীম্যান হিসেবে কাটলো কুরবানীর ঈদ। ঈদের পরপরই মিড টার্ম পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। মেশিন ২ পরীক্ষার জন্যে পড়তে পড়তে একরকম যা-তা অবস্থা, ইন্ডাকশন মোটরের স্ট্যাটর ফ্লাক্সের স্পীড আর রোটর ফ্লাক্সের স্পীডের পার্থক্যকেই বলে নাকি  স্লিপ। এই স্লিপ বুঝতে বুঝতে আর স্লিপের ম্যাথ করতে করতে করতে আমার এমনিতেই চোখে চোখ লেগে আসছিল, পরবর্তীতে স্বাভাবিকভাবেই যা স্লীপে রূপ নিল। পরদিন কোন রকমে পরীক্ষাটা দিয়ে দিলাম, ম্যাথ দুইটা কোন রকমে সলভ করেছি আর থিওরি বানিয়ে বানিয়ে কি লিখেছি নিজেও জানি না। দুপুরের দিকে জাহিদকে ধরে নিয়ে গেলাম পেটুকে, “আজলে তো আমি হেল্প না করলে তুই গেছিলি, তাই ট্রিট মাস্ট।” পেটুকে ঢুকে দেখি ওয়ারিফ আর কামরুল গোগ্রাসে গিলছে, এদের কেসটাই সেইম মনে হচ্ছে। পরীক্ষার হলে সহযোগিতার প্রতিদান বলুন আর বন্ধুত্বের নিদর্শন বলুন, ট্রিট ট্রিটই। খাওয়া দাওয়া সেরে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতেই সিফাতের সাথে দেখা, নাকেমুখে বিড়ি ফুঁকছে ...

-       কিরে বন্ধু, কি অবস্থা? বিড়ি খাবি?

-       এই না না, বিড়ি খাই না। চা খাওয়া ।

-       এই পিচ্চি, চা লাগা তো দুই কাপ।

-       তারপর বল, এক্সাম কেমন দিলি?

-       কেমন দিছি সেইটা তো নিজেও জানিনা। খাতা কি লিখছি নিজেও জানিনা, উপর ওয়ালা পার কারেগা !!!

-       হা হা হা ...

ক্যাম্পাস থেকে ফিরে এসে গেলাম কোচিং সেন্টারে, পদার্থবিজ্ঞানের দুটো ক্লাস শেষ করে যখন বের হচ্ছিলাম তখন সাখাজিল ভাই এর সাথে দেখা…

-       কি অবস্থা ভাই? কেমন যায় দিনকাল?

-       এইতো ভাই ভালো, আপনার কি অবস্থা?

-       এই চলে আরকি কোন রকম। একটা সেমিনার আছে আমগো ভার্সিটি তে। ক্লাউড কম্পিউটিং এর উপর। ডি-ইঞ্জিনিয়ার ক্লাব আয়োজন কইরছে...। 

-       ক্লাউড মানে তো মেঘ , মেঘ কম্পিউটারে কি করবে?

-       আরে ওই ক্লাউড না, ক্লাউড ক্লাউড…

-       জানি তো ভাই, স্টোরেজ। কিডিং, চলেন তাহলে যাই, হালিম ভাইকেও বলেন, তিনজনে গিয়ে দেখে আসি। 

পরদিন বিকেলের দিকে তিনজন কাটগড় থেকে রওনা দিলাম, গন্তব্য সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি। কাছাকাছি ক্যাম্পাস হলেও এই দিকটায় তেমন একটা আসা হয়না। অবশ্য সকাল বিকাল ক্লাস আর ল্যাব করে যে সময়টুকু পাওয়া যায় তা টঙে আর কেন্টিনে আড্ডা দিতে দিতেই কেটে যায়। সাউদার্নের অডিটোরিয়ামে এসে ঢুকলাম আমরা, কোন এর প্রফেসর না আসবেন ঢাকা থেকে এই সেমিনারের স্পেশাল গেস্ট। সাখাজিল ভাই কিছুক্ষণ পর পর মাঞ্জা মারছিলেন আর প্রশ্ন করছিলেন “আমারে কি খারাপ দেখাচ্ছে? ছবি তুলি দেন চাই একখান”। বেশ খানিকক্ষণ পর অনুষ্ঠান শুরু হলো, ভেবেছিলাম হাতে কলমে কিছু শেখানো হবে। ডি-ইঞ্জিনিয়ার ক্লাব চিটাগং তাদের পরিচয় দিতে দিতেই অর্ধেকটা সময় পার করে দিলো। অবশেষে যখন স্লাইড-শো আর প্রেজেন্টেশন শুরু হলো, তখন এই ক্লাউডের মাথা-মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমাদের কথা নাহয় বাদ দিলাম, গণিতের হালিম ভাই না বুঝেও বুঝার ভান ঠিকই করে যাচ্ছিলেন আর মাঝে মধ্যে দুয়েকটা প্রশ্নও করছিলেন।

-       কিরে হালিম? পিছদির মাইয়া গুনরে পটাইবার নি চেষ্টা গরর?

-       ধুর...। কি যা তা বলছ। ইন্টারেস্টিং লাগছে ত প্রেজেন্টেশন। 

-       হ, কালে কালে আর কত কিই যে লাইগবো। 

সেমিনার শেষে সন্ধ্যার দিয়ে হালকা নাস্তা করে তিনজনই চলে গেলাম শিল্পকলা। মুক্তমঞ্চের একপাশে বসে আড্ডায় আড্ডায় শুরু হয়ে গেল ছোটখাটো এক বিতর্ক। সমসাময়িক রাজনীতি, পররাষ্ট নীতি, মানব সভ্যতা থেকে শুরু করে জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, দার্শনিকতা বাদ গেলনা গেলনা কিছুই। যুক্তি-তর্কের মুক্ত চর্চার এক ফাঁকে খেয়াল করলাম রাত বাড়ছে , বাড়ির পথ ধরা উচিত আমাদের । 

<<<আগের পর্ব             পরের পর্ব>>>


শুক্রবার, ৬ আগস্ট, ২০২১

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ৩৯

  


সন্ধ্যার পর থেকেই বাতাসের ঝাঁঝালো গন্ধে নিঃশ্বাস নেয়াটাই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। ক্যামিস্ট্রি ল্যাবের সেই অ্যামোনিয়ার গন্ধ বাতাসে, আরো স্পেসিফিকলি বলতে গেলে কলেজের সেই টয়লেটের গন্ধ আকাশে বাতাসে। কিন্তু, এরকমটাতো কখনো হয়নি…...গণশৌচাগার এর বাজে গন্ধের চেয়ে এই গন্ধ যে আরো বেশি তীব্র !!! আজব ব্যাপার তো, হলোটা কি? ইতোমধ্যেই আম্মুর বকাঝকা শুরু হয়ে গেছে...আমরা সঠিকভাবে টয়লেট ব্যাবহার করিনা, ইত্যাদি ইত্যাদি। পরে জানতে পারলাম আনোয়ারায় সিইউএফএল সংলগ্ন ডিএপি সার কারখানায় নাকি এমোনিয়ার ট্যাংক বিস্ফোরিত হয়েছে। 


নদীর ওপারে কারখানায় বিস্ফোরণ, আর নদীর এপারে পতেঙ্গায় ব্যাপন প্রক্রিয়ায় গ্যাসের অণু-পরমাণুগুলোর ছুটে চলে আসা। আরো অবাক হলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢুকে, পুরো শহরেই নাকি এই এমোনিয়া মিশ্রিত বাতাস ছড়িয়ে পড়েছে। কি বাজে এক অবস্থা, কোন রকমে মানিয়ে নিয়ে জমে থাকা কাজগুলো করছিলাম। সামনেই ক্যাম্পাসে নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠান আছে, আর অনুষ্ঠানে ব্যাচের সবার পরিকল্পনামতো একখানা টিশার্ট ডিজাইন করা। শখের বশে গ্রাফিক্সের কাজ করলে যা হয় আরকি, কিন্তু মাথায় চলছিল কিছু ব্যাতিক্রম ডিজাইন করা যাক। বলতে না বলতেই নোবেল অনিকের ফোন, এই নোবেল ছেলেটার একটু বেশি এগ্রেসিভ ব্যাবহারে আমার অস্বস্তি লাগে। 

- হ্যালো, বন্ধু ডিজাইন কদ্দুর? 

- এইতো প্রায় শেষের দিকে রে, সামনের দিকে ইংরেজিতে ইঞ্জিনিয়ার লিখা একটা ডিজাইন আর্ট,আর পেছনের দিকে ষোল তম ব্যাচ লিখা। চলবে তো?

- আরেহ একটা হইলেই হলো। তুই মেইল করে দে ডিজাইন।

- একটা হইলে কেমনে হইলো ? এরকম হলে ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে নিতিস। 

- আরেহ কুল ম্যান কুল। আচ্ছা বল এক্সেপশনাল কি করলি?

-  Engineer লেখাটাকেই প্লাগ, আর্থিং দিয়ে একটা সার্কিটের মতো করে ডিজাইন করছি। 

- বাহ, তাইলে ত সেই হচ্ছে। ওকে, বাই...কাল দেখা হবে। 


পরদিন ক্যাম্পাসে এসে শুনি সকালের ইলেকট্রনিক্স ল্যাব ক্যান্সেল। সবাই লাইব্রেরিতে বসে বসে আড্ডা দিচ্ছে, কেউবা আবার পড়াশোনা করছে। আমি আর জাহিদ এক কোণের একটা টেবিলে পেন-ফাইট শুরু করে দিলুম, সেই যখন স্কুলে ছিলাম তখন প্রতিদিনকার খেলার মধ্যে ছিল এই পেন ফাইট। খেলতে খেলতে হঠাৎ দেখি লাইব্রেরিয়ান ম্যাম পিছনে এসে দাঁড়িয়ে আছেন, এরপর কি হলো তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। বিকেলের দিকে নোবেল, শাওন, নুহাসসহ আমরা ক’জন গেলাম জহুর হকার্স মার্কেট। প্রায় চল্লিশ পিসের মতো টিশার্ট নিতে হবে, টিশার্টের জন্যে ইতোমধ্যে সবার কাছ থেকে দুশ টাকা করে সংগ্রহ করা হয়েছে। ঘুরতে ঘুরতে এক দোকান থেকে কাল রঙের ডিজাইনলেস টিশার্ট  কেনা হলো। এরপর টিশার্টে লগো আর ডিজাইন প্রিন্টিং এর জন্যে দেয়া হলো আরেক দোকানে। 


বৃহস্পতিবার, ক্যাম্পাসের সাপ্তাহিক দুটো ছুটির দিনের মধ্যে একটি। এই ছুটির দিনেও ক্যাম্পাসে এসেছি একটাই কারণ - নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠান। চট্রগ্রাম মেডিকেলের অডিটোরিয়ামে আয়োজন করা হয়েছে এই প্রোগ্রাম। এই বিশাল আয়োজনের পেছনে ১২ ব্যাচের সিনিয়র ভাইরা প্রচুর পরিশ্রম করছেন। অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ “শিরোনামহীন” ব্যান্ড এর তুহিন ভাই আসছেন, পাশাপাশি জনপ্রিয় দুই ব্যন্ড “নাটাই” আর “তীরন্দাজ”-ও পারফর্ম করবে একই মঞ্চে। সকাল থেকেই তাই অডিটোরিয়াম প্রাঙ্গন ধীরে ধীরে লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠছিল। আমরা ষোল ব্যাচের সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম আমাদের টিশার্টের জন্যে, কিন্তু টিশার্ট আসতে আসতে দুপুর গড়িয়ে গেল। নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানের সকালের সেশন প্রায় শেষের দিকে, নবীনদের ফুল দিয়ে বরণ করা হলো আর প্রবীণদের ক্রেস্ট সার্টিফিকেট দিয়ে বিদায় দেয়া হলো। 


মধ্যাহ্নভোজনের বিরতিতে আমরা সবাই টিশার্ট হাতে পেলাম, আমার নিজের ডিজাইন করা টিশার্ট সবার পরনে দেখে ভালোই লাগছিল। এর সাথে সাথেই শুরু হয়ে গেল ফটোসেশন, গ্রুপ ছবি আর সেলফির সমারোহ। খাওয়া-দাওয়া শেষে দলবেঁধে সবাই অডিটোরিয়ামে ঢুকলাম। ভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা মাতিয়ে রাখছিল পুরো অডিটোরিয়াম। আমরা সবাই আমাদের মতো করে আনন্দ করছিলাম। দ্বিতীয় সেশন শেষে বিকেলের দিকে সবার অধীর অপেক্ষা… তুহিন ভাই আসবে কবে? 

- এই তোরা সবাই এদিকে আয়, একসাথে দাঁড়াই আমরা। 

- এই সাব্বির, রিয়াদ, নাইম জাহিদ উঠে চলে আয় এদিক। 

প্রসেনজিত এর ডাকে আমরা কয়েকজন নিজ নিজ আসন থেকে উঠে অডিটোরিয়ামের মাঝামাঝি একটা প্রশস্ত ফাঁকা প্লাটফর্মে দাঁড়ালাম। তীরন্দাজ এর ব্যান্ড দল খানিক আগেই মঞ্চ কাপিয়েছে, এখন নাটাই ব্যান্ডের তুষি আপু মঞ্চে গান ধরেছেন…

“খাজার নামে পাগল হইয়া,

ঘুরি আমি আজমীর গিয়া…

পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না...”

এই গান ধরার সাথে সাথে সবাই একরকম পাগল হয়ে গেল বলা চলে। আমরা যে ক’জন এক সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম সমাই সমানে কাঁধে কাঁধ রেখে লাফাচ্ছিলাম। পাগল শেষ হতে না হতেই তুষি আপু ধরলেন জলের গান… 

“এমন যদি হতো, আমি পাখির মতো

উড়ে উড়ে বেরাই সারাক্ষণ...”

মুহূর্তের মধ্যেই আমরা সবাই পাখি হয়ে গেলাম, দুদিকে দুহাত তুলে যে যার যার জায়গা থেকে উড়ে বেড়াতে শুরু করলাম। এভাবে আরো ঘন্টাখানেক কেটে গেলো, সবার অধীর অপেক্ষা তুহিন ভাই কবে মঞ্চে আসবে। সাড়ে সাতটার দিকে শোনা গেল তুহিন ভাই এসে পৌঁছেছেন, একটু পরেই মঞ্চে আসবেন। 


“আবার হাসিমুখ” দিয়ে শুরু করলেন শিরোনামহীনের তুহিন ভাই। পুরো অডিটোরিয়াম তার সুরের মূর্ছনায় মন্ত্রমুগ্ধ। “তুমি চেয়ে আছো, তাই আমি পথে হেঁটে যাই...হেঁটে হেঁটে বহুদূর” - সবাই একসাথে লাফাতে লাফাতে পা ব্যাথা হয়ে গেছে। একই দিনে শিক্ষক, সিনিয়র জুনিয়র ছাত্রছাত্রীরা সবাই যেন এক হয়ে গেল। রাত বাড়তে থাকলে অনুষ্ঠানের পর্দা নামতে শুরু করে, উপস্থিত সকল ছাত্রছাত্রীদের অনুরোধে চেয়ারম্যান স্যার পুরোনো দিনের একটা গান ধরেন-

“ময়ূরকণ্ঠী রাতের নীলে , আকাশে তারাদের ওই মিছিলে

তুমি আমি আজ চল চলে যাই, শুধু দুজনে মিলে…”

পুরো একটি দিন আবার চাইলেই হয়তোবা হারিয়ে যাওয়া হবেনা, একসাথে চাইলেই বন্ধুরা পাখির মতো উড়ে বেড়াতে পারবোনা, কিংবা পারবোনা সবাই একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাগলের মতো লাফালাফি করতে। বিদায়ী শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের আবেগঘন বক্তব্যে অনুষ্ঠানের শেষদিকে পরিবেশ কিছুটা থমথমে হয়ে উঠে, আমিও মনে মনে আঁচ করতে পারছিলাম… আমাদেরও একদিন এভাবে বিদায় নিতে হবে, ছাত্রজীবনের এই সোনালী সময়গুলো হয়তোবা আর কখনোই ফিরে পাওয়া যাবেনা। 

 

<<<আগের পর্ব             পরের পর্ব>>>

 




শুক্রবার, ৩০ জুলাই, ২০২১

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ৩৮

 

সিগনাল এন্ড সিস্টেম, ইলেকট্রনিক্স-২, মেশিন-২, ম্যাথ-৪ আর সিএমইপি এই পাঁচটা থিওরি কোর্স এবারের সেমিস্টারে, আর সাথে এই কোর্সগুলার ল্যাব। সকাল দশটায় থেকে ক্যাম্পাসে এসে বসে আছি নতুন সেমিস্টারের কোর্স এনরোলমেন্ট করব বলে। সাড়ে এগারোটার দিকে সফটওয়্যার এ ঢুকে রেজিস্ট্রেশন করলাম, অনেওদিন পর সবার সাথে দেখা হয়ে ভালোই লাগছিল। কয়েকজন বন্ধুর অনুরোধে ক’দিন আগেই কেনা সাইকেল নিয়ে এসেছি ক্যাম্পাসে। বন্ধুরা দুয়েকজন নিয়ে কিছুক্ষণ চালানোর পর টঙের আড্ডায় সাইকেল নিয়ে এলো, এরপর সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। 

চালাতে চালাতে মনে পড়ল কিছু ইলেকট্রনিক্স জিনিসপত্র কেনা দরকার, আবার একটা স্পিডোমিটারও কিনতে হবে সাইকেলের জন্যে... আর তাই সিটি কলেজের দিকে রওনা দিলাম। স্পিডোমিটার কিনে সাইকেলে লাগিয়ে গেলাম বিখ্যাত বাগদাদ ইলেকট্রনিক্স মার্কেট, মার্কেটের সামনে সাইকেল লক করে রেখে ভেতরে গেলাম। একখানা আইপিএস বানানোর জন্যে আইসি, মসফেট, লেড এসিড ব্যাটারি, ট্রান্সফরমারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নিলাম। শখের বশেই এই কম ওয়াটেজের আইপিএস বানানোর পরিকল্পনা করেছিলাম, তখনো সবেমাত্র ইলেক্ট্রনিক্স এর গভীরে প্রবেশ করতে শুরু করেছি। বেলা প্রায় আড়াইটা বাজে ঘড়িতে, জিনিসপত্রগুলো নিয়ে বসলাম মাত্রই বেরিয়েছি সাইকেল নিয়ে। স্পিডোমিটারে গতি বাড়ছেই, মুহূর্তের মধ্যেই ৩০-৩৫-৪০ এমপিএইচ। এবার অনেকটা ভালো লাগছে, মনে হচ্ছিল যেন মোটর সাইকেল চালাচ্ছিলাম। বারিক বিল্ডং মোড়ের কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ করে পি...ইইই...কক 

-আআআউউচ...। দেখেশুনে সাইকেল চালাতে পারেন না? আরেকটু হলেই তো গায়ের উপর উঠাই দিচ্ছিলেন। 

-দেখেশুনেই তো চালাচ্ছিলাম আপু, আপনিই তো দৌড় দিয়ে বাসে উঠছিলেন !!

হঠাৎ সাইকেলের হার্ড ব্রেকের প্রচন্ড শব্দে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বিস্ফোরিত চোখে কটমট করে আমার দিকে তাকালেন এক তরুণী। যদিও সাইকেল উনার গায়ে লাগেনি, যথেষ্ঠ দক্ষতায় পাশ কাটিয়ে ব্রেক করে নিয়েছি। আমি আর কথা বাড়ালাম না, সরি বলে তাড়াতাড়ি প্যাডেলে চাপ দিয়ে গতি বাড়ালাম। এক্সিডেন্ড হয়ে গেলেই বোধ হয় ভালো হতো ওই তরুণীর সাথে...নেহাত ভালমানুষি করে ব্রেক করলাম, আজকাল ভালোমানুষের কোন দাম নেই।  

বাড়ি ফিরে এসে কিছুক্ষণ আইপিএস এর সার্কিট নিয়ে ঘাটাঘাটি করলাম, CD4047 আইসিখানা নিয়ে অনেক্ষণ গবেষণা করলাম। ইন্টারনেট ঘেটেঘুটে বের করলাম এর বিভিন্ন পিন কনফিগারেশন। কাজ করতে করতেই স্টুডেন্ট এর ফোন…

-হ্যালো ভাইয়া, আজকে আসবেন না?

-আজকে কিবার?

-বুধবার ভাইয়া। 

-ও আচ্ছা, তাই নাকি ? আসতেছি আমি, তুমি বসে বসে ম্যাথ করতে থাক।

কখন কবে টিউশন থাকে তাও ঠিকঠাক মনে থাকেনা, কাজে ব্যাস্ত থাকলে সব ভুলে যাই। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও সন্ধ্যের দিকে আবার সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেলাম টিউশনে। স্টুডেন্টকে কয়েকটা বীজগনিতের সমস্যার সমাধান করে দিয়েই বললাম- 

-এইগুলা তুমি করে ফেল দেখি এইবার, একটা নতুন এপস আসছে...প্রিজমা নাম। এটার কি কাজ একটু দেখি।

-ভাই, আমাকে দেন ভাই। আমি এডিট করছি ছবি এই এপস দিয়ে।  

কথোপকথনের মাঝেই স্টুডেন্ট এর আব্বা এসে হাজির, হাতে একখানা সাদা খাম দেখা যাচ্ছে। যাক বাবা, অনেকদিন ধরে বলতে বলতে দুমাসের বেতন একসাথে দিচ্ছে। ঈদের মাসের টাকা না দিয়েই স্টুডেন্ট বাড়ি চলে গিয়েছিল, যাই হোক এই টাকা দিকে কি কি ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি কেনা যাবে তার একটা ছক আঁকছিলাম মনে মনে। প্যাকেটটা হাতে পাওয়ার পর অনেকটা ভালোই লাগছে, সাধারণ খামের চেয়ে অনেকটা মোটা...দুমাসের টাকা একসাথে আছে বলেই হয়তোবা। এরপরই যে আমার জন্য কি অপেক্ষা করছিল তা কল্পনায়ও আনিনি। পড়ালেখার উন্নতি নিয়ে কথা শেষ হবার পরপরই হঠাৎ স্টুডেন্ট এর আব্বা বলে উঠলেন

- অনিক আগামীকাল থেকে আর পড়বে না, ওকে একটা কোচিং এ দিচ্ছি। আগামীকাল থেকে আর না আসলেও চলবে।  

আমার মনটা কিছুক্ষণের জন্য খারাপ হয়ে গেল, যাই হোক সবকিছু ভুলে গিয়ে স্টুডেন্ট কে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে আসলাম। বাইরে এসে খাম খুলে দেখলাম অনেকগুলো একশত টাকার নোট। যাক বাবা, এতো ভাংতি টাকা দিল কিজন্যে !! গুনে দেখি মোটেই একমাসের বেতন, আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল। মনের মধ্যে আঁকা ছকগুলো নিমিষেই মিলিয়ে গেল অজানার পানে। 

দুদিনের ছুটিতে আইপিএস মোটামুটি বানিয়ে ফেলেছি বলা চলে। তিন-চার খানা এসি বাল্ব সহজেই জ্বালানো যায়। কলেজের প্রথম বর্ষে যখন ছিলাম তখন এসি থেকে ডিসি রুপান্তর করে ব্যাটারি চার্জ করেছিলাম হাতে-কলমে, আর এখন ডিসি থেকে এসিতে রুপান্তরের বেসিকটা হাতেকলমে শেখা হয়ে গেলো। শনিবার ক্যাম্পাসে পৌঁছেই শুনি আজকের কোন ক্লাস হবেনা, তার পরিবর্তে হবে বিক্ষোভ মিছিল। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এর সম্মানিত ভিসি মহোদয় কে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে তথাকথিত উগ্রগোষ্ঠী। আর আমরাও তাই চুপ করে বসে থাকিনি, বিশ্ববিদ্যালয় এর সকল অনুষদ থেকে মিছিল নিয়ে সমবেত হলাম প্রেসক্লাব চত্বরে। 

সময় গড়ানোর সাথে সাথে সকল ব্যাবসায় অনুষদ, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদ এবং কলা অনুষদ সকল শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রীরা একত্রিত হলো জামালখান প্রেসক্লাব চত্বরে। রাস্তার দুপাশে হাতে হাত রেখে তৈরী করা হলো মানববন্ধন। সবার হাতে হাতে প্রতিবাদী পোস্টার, ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন। আমাদের শ্রেণি প্রতিনিধি শাওন তার প্লাকার্ডে লিখেছে- 

-“হুমকি দেয়া কাপুরুষের কাজ, আদর্শের কখনো হয়না বিনাশ” 

ঘন্টাখানেকের মানববন্ধন ও প্রতিবাদী কর্মসূচি শেষে বন্ধুরা সবাই মিলে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে বাড়ির পথ ধরলাম। আদৌ জানা নেই হুমকিদাতা কে বা কারা, জানা নাই এই মানববন্ধনের কার্যকারিতার মাপকাঠি। তবে মনে মনে ভাবছিলাম...

“প্রতিবাদের ভাষা আমি জানি শুধু একটাই,

সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমি স্লোগান দিতে চাই।” 

<<<আগের পর্ব                    পরের পর্ব>>>  



 

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...