রবিবার, ২৮ জুন, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ৭


-“ভাই, গতকাল সেই ম্যাচ হইছে… যদি আসতি রে ভাই”

-“ওফফ, মিস করে ফেললাম তাহলে”

-“হ, আমগো ডিজে মামা তো যেই মাইর রে ভাই, বলে বলে ছক্কা”

-“ডিজে মামা টা আবার কে?”

-“আরে শাওন আরকি, ডিজে শাওন… CR শাওন না আবার”

-“ও আচ্ছা”

খুব প্রফুল্লভাবে কথাগুলি আমাকে বলছিল সাব্বির। ছেলেটা খুবই হেল্পফুল, একটা কলম চাইতেই ওর হাতের কলমটা আমাকে দিয়ে দিল আর ব্যাগ থেকে অন্য কলম বের করে নিল নিজের জন্যে। গতকাল শুক্রবার ছিল, এ সেকশান এর সাথে আমাদের বি সেকশানের একটা প্রীতি ম্যাচ আয়োজন করা হয়েছিল কিন্তু দিনশেষে যে এই প্রীতিম্যাচ অপ্রীতিকর অবস্থায় রূপ নেবে তা কে জানত !!! গতকাল কোচিং এর অতিরিক্ত ক্লাস নিতে গিয়ে মেডিকেল ফিল্ডের এই প্রীতি ম্যাচটাতে আসতে পারিনি, আর তাতেই নাকি ঘটে গেছে লঙ্কাকান্ড। প্রচুর কথা কাটাকাটি, স্লেজিং একসময় গিয়ে মারামারিতে রুপ নেয় আর তাতে আরো ঘি ঢেলে দেয় ডিজে শাওনের অপরাজিত ৭০ রান।

-“নোবেল অনিক যেখানে আছে সেখানে এরকম মারামারি স্বাভাবিক ব্যাপার” সাব্বিরকে লক্ষ্য করে বললাম আমি।

-“আরেহ ডিজে মামার মাইর দেখে ওরা ভয় পাইছে, শেষমেষ তো বলই হারাই দিল…এজন্যে ক্ষেপে গেছে ওরা”

-“ও আচ্ছা, কাহিনী তাহলে এখানে”

আজকাল ক্লাসে কারো মন নাই, প্রথম দু-একদিন একটু সিরিয়াস ছিল সবাই…এরপর থেকে থোরাই কেয়ার ভাব। তার উপর এই ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। প্রথম ক্লাস শেষ হতে না হতেই সব খেলোয়াড় একসাথে জড়ো হলো, জার্সি দেয়া হবে এখন। ছাই রঙা বিশ পিছ টিশার্ট আমি, নোবেল আর জন কয়েক হকার্স এ গিয়ে আগেই কিনে স্কিন প্রিন্টের জন্যে দিয়ে এসেছিলাম। দেখতে বেশ ভালোই হয়েছে, বুকের দিকে ইংরেজিতে কোণাকুনিভাবে “Circuit Breakers” লিখা। নামের সাথে টিমের পারফর্মেন্স এখন খাপে খাপে মিলেছে। ডিজে শাওন আর সাইদুল এর ব্যাটিং দেখে আমাদের আশার পালে হাওয়া লেগেছে। গতকালের ম্যাচে মীর আর পার্থ ভালোই বোলিং করেছে। আর তাই টিশার্ট পেতে না পেতেই গ্রুপ সেলফি তোলা শুরু হয়ে গেল। আগামীকাল সপ্তম সেমিস্টার এর সাথে আমাদের প্রথম ম্যাচ, আর সবাইকে দেখিয়ে দিতে হবে “আমরাও পারি”।

-“রাশেদ, আমার একটা ছোটখাটো IPS বানাইতে হবে, তুই জানিস কোথায় জিনিসপত্র পাবো”? ক্লাস শেষে বন্ধু রাশেদকে প্রশ্ন করলাম। 

-“IPS মানাবি যে? আমিও তো মানাব, মার্কেট যাইতে হবে”।

-“চল আজকে যাই”

-“আইচ্ছা চল, আমার কিছু ডিসি বাল্বও কিনতে হবে”

গোলপাহাড় থেকে আমরা দুজন নিউ মার্কেটের বাসে উঠলাম। কোন বাসই খালি নাই, গাদাগাদি করে বাসে চড়া আমার প্রতিদিনকার অভ্যেস… আর তাই কোন রকমে দুজন একটা বাসে ঝুলে পড়লাম। তিন পুলের মাথা পার হয়ে বাস শাহ আমানত মার্কেটের সামনে আসতেই আমরা নেমে পড়লাম। পুরো শাহ আমানত মার্কেট চক্কর দিয়েও ব্যাটা রাশেদ কোন ব্যাটারি কিনল না, ভেবেছিলাম বাবা বিদেশ থাকে… হাত খুলে খরচ করবে হয়ত। এ তো দেখছি আমার চেয়ে বেশি কিপটে…একেবারে হাঁড়কিপটে যাকে বলে। কিছু না কিনেই ব্যাটা শাহ আমানত মার্কেট থেকে বেরিয়ে তামাকুন্ডি লেনের পাশেই আন্ডারগ্রাউন্ড মোবাইল মার্কেটে ঢুকল।

-“একানে অনেক কম দামে পেয়ে যাব, দেখিস”।

-“তো অই মার্কেটে গেছিলি কেন” ?

-“একটা আইডিয়া গরার জন্য, আগে কিনি নাই তো”

-“আইচ্ছা, এই ছিল তোর মনে”

অনেক অলিগলি ঘোরা শেষে এক দোকান থেকে বার ভোল্টের লেড এসিড ব্যাটারি আর ডিসি বাল্ব কিনে আমরা রওনা দিলাম আইচ ফ্যাক্টরি রোডের ইলেকট্রনিক্স মার্কেটের দিকে। এই ব্যাটারিকে চার্জ করার জন্যে চার্জিং সার্কিট কিনতে হবে। বাগদাদ ইলেকট্রনিক্স মার্কেটে ঢুকে সোজা গিয়ে “ফেমাস” নামে একটা দোকান চোখে পড়ল, এই মার্কেটে আজই প্রথম এলাম আমি।

-“লেড এসিড ব্যাটারি চার্জিং সার্কিট আছে ভাই?” রাশেদ দোকানের ছেলেটিকে প্রশ্ন করল।

-“এটার সার্কিট তো পাবেন না, নিজেদের বানাই নিতে হবে”

-“মানাইতে কি কি লাগবে একটু বললে ভাল হয়”

-“এইতো একটা ১২ ভোল্টের ট্রান্সফরমার আর দুইটা ৩ এম্পিয়ার এর ডায়োড। ডায়োড ১ এম্পিয়ার এর নিলে চারটা লাগবে। দুইটা ডায়োড দিলে হাফ ব্রিজ, চারটা দিলে ফুল ব্রিজ”

-“ও আচ্ছা, দেন না” দোকানের ছেলেটি কি বলল কিছুই বুঝলাম না, কেবল ট্রান্সফরমার আর ডায়োড শব্দ দুটি আমাদের পরিচিত।

শেষমেষ ট্রান্সফরমার-ডায়োড কিনে কিভাবে কানেকশন দিবো তা বুঝে নিলাম। দোকানী ছেলেটির নাম সাজু, কথা বলতে বলতে বেশ আন্তরিকতা হয়ে গেল তার সাথে। আমার হাত খালি থাকায় সেদিন কেবল দেখেই গেলাম, কিছু কিনতে পারলাম না। ঠিক অই মুহূর্তে আমি রাশেদকে আমার গুরু মানছিলাম, গুরু যদি সফল হয় আমিও ব্যাটারি দিয়ে এরকম একটা চার্জিং লাইট সার্কিট মানাব… থুক্কু বানাব, গুরুর সাথে থাকতে থাকতে গুরুর মতেই হয়ে যাচ্ছি।  

বাসায় এসেই খেয়েদেয়ে ছুট লাগালাম কোচিং এর দিকে, আজ ক্লাস নেই আমার, কিন্তু কি যেন এক গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে বলল পরিচালক। মিটিং শেষে সন্ধ্যায় আবার কোচিং এর টিম নিয়ে ডেইলপাড়া ম্যাচ খেলতে যেতে হবে। একেবারে ভার্সিটির সার্কিট ব্রেকার টিশার্ট গায়েই বেরিয়ে পড়েছি, যাতে করে একেবারে খেলা শেষ করে ফেরা যায়। কোচিং এ পৌঁছাতেই দেখি আলাদা একটা রুমে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে, বেশ কিছু অপরিচিত মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম…পরিচিতদের মধ্যে পরিচালক হালিম স্যার ছাড়া ছিল দুজন কোচিং এর শিক্ষক। আমি গিয়ে বসতেই আরো জনা পাঁচেক লোক আসন গ্রহণ করলেন, এরপরই শুরু হলো হালিম স্যারের বক্তব্য…

-“আজ আপনাদের সকলকে এখানে ডেকেছি একটা বিশেষ কারণে, আপনারা প্রায় সবাই এই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা এবং এই এলাকার প্রতি আমাদের সকলের কমবেশি দায়িত্ব-কর্তব্য আছে।”

-“এটা কি কোন রাজনৈতিক মিটিং ভাই?” পাশে বসে থাকা চশমা পরিহিত ভাইটিকে ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করলাম, খচখচ করে ডাইরীতে কি যেন লিখছেন উনি। উপরে ডান পাশে তারিখ দিয়ে মাঝামাঝি লিখেছেন “Youth Renaissance, সাধারন সভা - এক”। অল্প কিছুক্ষণ হালিম স্যারের বক্তব্য শুনেই বুঝতে পারলাম এলাকার বেশ কিছু উদ্যমী তরুণদের নিয়ে একটি অরাজনৈতিক সমাজসেবামূলক সংগঠন গঠিত হতে যাচ্ছে যাদের লক্ষ্য থাকবে এলাকার অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর আর্ত-সামাজিক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কর্মসংস্থানমূলক বহুমুখী উন্নয়ন। একে একে সবাই যার যার পরিচয় দিল এবং প্রত্যেককে সংগঠনের একটি করে ফর্ম বিলি করা হলো। সংগঠনের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ মনোনয়নের পর সমন্বয়ক পদের জন্যে আমাকে মনোনয়ন দেয়া হলো আর একটি সুষ্ঠু গঠনতন্ত্র প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হলো।

-“এই পাঁজি হালিম স্যারটা আমাকে বার বার কেন এমন ঝামেলায় ফেলে দেন বুঝি না, কখনো কোন সংগঠন করলাম না, আর আজকে সংগঠনের গঠনতন্ত্র বানাতে হবে, তার উপর সমন্বয়কের দায়িত্ব। একেবারে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা অবস্থা”। মনে মনে হালিম স্যারের গুষ্ঠি উদ্ধার করছিলাম আমি। অবশ্য তখন যদি জানতাম এই সংগঠনের সাথে থেকেই বেশ কিছু সফল আয়োজনের অংশীদার হবো কিংবা আমারই প্রণীত সেই গঠনতন্ত্র দেখে পরবর্তীতে বিভিন্ন সংগঠন তাদের গঠনতন্ত্র প্রণোয়নের জন্যে পরামর্শ চাইবে তবে তখনই হাত ভরে দুআ করতাম এই মানুষটার জন্যে যিনি কিনা আমার অনেক সুপ্ত প্রতিভাকে একরকম নিংড়ে নিংড়ে  বের করেছেন। 

মিটিং শেষ করেই হালকা নাস্তা করে খেলোয়াড়দের নিয়ে ছুটলাম ডেইলপাড়ার উদ্দেশে, আজ আমাদের প্রতিপক্ষ “ফুটন্ত পথিক একাদশ” – “কি অদ্ভুত নাম রে বাবা, একেবারে ফুটিয়ে ফেলবে আমাদের বোধ হয়”- মনে মনে কিছুটা ভয় পাচ্ছিলাম, কেননা দিনে বহু ম্যাচ খেললেও রাতে ফ্লাড লাইটের আলোতে কোন ম্যাচ খেলা হয়নি। মাঠে পৌঁছতেই দেখি বিপক্ষ দল আমাদের জন্যে ফুটানোর অপেক্ষা করছে। কোচ হিসেবে নয় জন খেলোয়াড় থেকে সাত জনের নাম ঘোষণা করলাম আর অধিনায়ক হিসেবে গেলুম টস করতে। টসে হেরে পেলাম ব্যাটিং , রাত বাড়লে কুয়াশা বাড়বে, আর বল করা কঠিন হয়ে পড়বে … সহজ সমীকরণ।

ভাগ্যের লিখন যায় না খন্ডন, নিয়তিকে মেনে নিয়েই ব্যটসম্যান আরিফ আর কামরুলকে নামালাম। আরিফ দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী, খুব ভাল ব্যাট চালায় ছেলেটা। নেমেই পরপর তিনটে চার মেরে চতুর্থ বলেই বোল্ড হয়ে গেল বেচারা, এরপর নামল সাকিব। সাকিব আর কামরুল মিলে বেশ কিছুক্ষণ উইকেট ধরে খেলায় স্কোরবোর্ডে জমা হয় পাঁচ ওভারে পঁচিশ রান। আর মাত্র পাঁচ ওভার বাকি।  সত্তর-আশি করতে না পারলে রান আটকে রাখা যাবে না।

-সাকিব, মেরে খেল এবার। সাকিবকে উজ্জিবিত করে বললাম

-জী ভাই, খেলছি।

মেরে খেলো বলতে না বলতেই ওই ওভারে কালবৈশাখী ঝড়ের আমের মতো টপাটপ তিনটে উইকেট পড়ে যায়, আর দল পড়ে যায় চরম বিপর্যয়ে।

দলের বেহাল দশায় ব্যাট হাতে ক্রিজে নামতে নামতে ভাবছিলাম- “পারব তো, মান সম্মান কিছু রাখতে?” ক্রিজে তো দেখি পার্টনার হিসেবে আছে সেই বাচাল তনয়।

-“তনয়, কিছু একটা করতে হবে। মাঠের বাইরে এতো কথা বলো , মাঠে নেমে চুপ কেন”?

-“জ্বি ভাই, খেলতে আছি তো তাই। টেনশনে কথা বার হচ্ছে না”।

-“বেশি বেশি কথা বলো, যা খুশি তাই বলো। আর বোলারকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করো”।

-“আচ্ছা ঠিক আছে ভাই”।

 টোটকা দিতে না দিতেই তনয় কাজে লাগানো শুরু করল যার ফলশ্রুতিতে ভুরি ভুরি অতিরিক্ত রান আসা শুরু হলো। ব্যাপারটাতে ভীষণ মজা পেয়ে তনয় বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে যেমন অনেকটা সামনে এগিয়ে গিয়ে, ডানহাতি থেকে বাঁহাতি তে শাফল করে, শুয়ে বসে পড়ে রানের চাকা সচল রাখল। আমিও সিঙ্গেলস নিয়ে নিয়ে ওরেই স্টাইকে রাখার চেষ্টা করলাম। ইতোমধ্যেই দেখি হালিম স্যার দুজন স্যারকে নিয়ে মাঠে চলে এসেছেন।

-“ওয়াওওও, আমাদের নিউটন স্যার ক্রিজে। বাউন্ডারি হবে স্যার বাউন্ডারি”- হালিম স্যার আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই বাদবাকি খেলোয়াড়েরা “নিউটন স্যার” , “নিউটন স্যার” বলে চিয়ার্স করতে লাগল।

-“এই সমস্যাটাকে এখনই আসতে হলো, এখন তো বোল্ড হয়ে গেলেও লজ্জায় পড়ে যাব” মনে মনে বললাম।

শেষ ওভারে স্ট্রাইকিং প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমি, দলীয় স্কোর নয় ওভারে ৬০/৫। তনয় ইতোমধ্যেই আউট হয়ে বিদায় নিয়েছে, শেষ উইকেটে যা করার করতে হবে। বলের গতি খানিকটা বুঝেই সজোরে অফ স্ট্যাম্পের দিকে ব্যাট চালালাম… সর্বনাশ, ক্যাচ উঠে গেছে…তাও সীমানাপ্রান্ত ঘেষে। বুকের ধুকপুকুনিটা বেড়েই গেল…এত ছেলেপেলে পদার্থবিজ্ঞানের কিছুই না বুঝে একের পর এক বাউন্ডারি মেরে গেল আর আমি শিক্ষক হয়ে একটাও বাউন্ডারি মারতে পারলাম না “ছি…কি লজ্জা”।

মাথা নিচু করে ক্রিজ ছাড়তেই শুনি “বাউন্ডারি”… “নিউটন স্যার”

কি ব্যাপার !!! কি হলো …? আচ্ছা, ফিল্ডারের হাত ফসকে বল সীমানার ওপারে। যাক বাবা, আল্লাহ এ যাত্রার রক্ষা করেছে। আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল খুব, পরের চার বলে স্ট্রেইট ড্রাইভ, কাভার ড্রাইভ, সুইপ , স্ট্রেইট ড্রাইভ…… গুণে গুণে চারটি চার। দলীয় স্কোর ৮০/৫। শেষ বলেও হাঁকালাম …ওভার বাউন্ডারি, কিন্তু শর্ট পিচের নিয়ম অনুযায়ী ওভার বাউন্ডারি মারলেই আউট।তাই আর কোন রান যোগ করতে পারলাম না, অবশ্য এই রানও কম না, জমিয়ে লড়াই করা যাবে।   

<<<<আগের পর্ব      পরের পর্ব>>>


শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ৬



গতদিনের ঘটনায় ক্লাসে ফাটাফাটি অবশ্য তেমন কিছুই হয়নি, কিছু উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় ছাড়া। জহির ছেলেটা এতটাই সহজ সরল যে নিমিষেই তার ভুল স্বীকার করে নিল, আর সাজ্জাদ ভাইও ব্যাপারটা সমঝোতা করে দিলো। কিন্তু শারমিন ম্যাম আমাদের উপর ব্যাপক চটেছেন, এর শোধ তিনি সুদে আসলে নেবেন।

ক্লাসের ফাঁকে আমরা ক’জন আজ দল বেঁধে ঘুরতে গেলাম সপ্তম তলার স্থাপত্য অনুষদের বিশাল ডিজাইন ল্যাবে। ল্যাবের দরজা খোলা পেয়ে আমরা বেড়ালের মতো চুপি চুপি ঢুকে পড়লাম। যতই দেখছি ততই বিষ্মিত হচ্ছি, সৃষ্টিশীলতার চরম শিখরে গেলে মানুষ কিই না বানাতে পারে তা এই স্থাপত্য অনুষদে এসেই প্রথম টের পেলাম। শয়ে শয়ে পেরেক দিয়ে নির্মিত বিশাল মনুষ্য প্রতিকৃতি  থেকে শুরু করে দারুণ দারুণ সব নির্মাণশৈলীর মডেল, কাগজ, কাঠ, কাঁচ, রঙ, ইট-বালি-রড-সিমেন্ট দিয়ে মডেল কি নেই এতে। সবাই মিলে ছবি তুলতে তুলতে ভুলেই গিয়েছিলাম ঠিক পরের ক্লাসটি দেবাশীষ স্যারের। হঠাৎ টের পেয়ে সাত তলা থেকে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে দোতলায় এসে দেখি ক্লাসের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।

টানা দু-ঘন্টার ক্লাস বাইরে বাইরে ঘুরতে হবে, ব্যাগও ক্লাসের ভেতর। নিয়তিকে মেনে নিয়ে আমরা ক’জন গেলাম মজনু মামার টঙ এ আড্ডা দিতে। টঙ এ যেতেই দেখি শেষ বর্ষের সিনিয়র ভাইরা আড্ডা দিচ্ছেন। আমরা ভয়ে ভয়ে যেতেই উনারা আমাদের আপন করে নিলেন, চা নাস্তা করালেন। বিশেষ করে আকিব ভাই, মোশারফ ভাই, জামান ভাই।
-“তো নোবেল, তোরা এবার ভার্সিটির ক্রিকেট টুর্নামেন্ট এ টিম দিচ্ছিস না”? কাল-লম্বা করে ক্যাপ পরিহিত CSE এর আকিব ভাই আমাদের নোবেলকে প্রশ্ন করলেন।
-“হ্যাঁ, ভাই দিব তো । আমি আজকেই ক্লাসে গিয়ে বলব”।
নোবেলের কথাবার্তা দেখে মনে হচ্ছিল এরা তার অনেক দিনের চেনা। তৈলমর্দন করে কথা বলা আর কথায় কথায় চটে যাওয়াতে এই নোবেল অনিকের জুড়ি মেলা ভার। যা বুঝতে পারলাম, প্রকৌশল অনুষদের বিভিন্ন সেমিস্টার থেকে ক্রিকেট টিম দেয়া হয় প্রতি বছর, এবং এই টুর্নামেন্ট টাই বছরে অনুষদের একটিমাত্র মর্যাদার লড়াই। এই টুর্নামেন্ট এর চমক দেখানো খেলোয়াড়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল দলে খেলার সুযোগ পায়। সাইদুল ছেলেটাকে দেখলাম একের পর এক বিড়ি ধরিয়ে যাচ্ছে, এই ছেলেটা যে হারে বিড়ি টানে সেভাবে তো পানিও পান করেনা মনে হয়। বিড়ি টানতে টানতে সে বলল…
-তো বন্ধু, টিম যে দিবি – নাম কি দিবি টিমের ?
আমাদের আলোচনায় অমুক একাদশ, তমুক একাদশ বেশ কিছু নাম উঠল।  
-“সার্কিট ব্রেকার” ??? মুখ ফসকে বেরিগে গেল আমার ।
-“ভাল নাম, আমরা রাতে গ্রুপে এটা নিয়ে আলোচনা করব”। মীর সায় দিল আমার কথায়।
-“তার আগে চল আমরা এন্ট্রি ফর্ম নিয়ে আসি”। - নোবেল মীরের কথার সাথে যোগ করল।

অবশেষে আমরা ফর্ম নিয়ে ক্লাসে গিয়ে ঘোষণা করলাম টুর্নামেন্ট এর ব্যাপারে এবং আগ্রহীদের পরদিন মেডিক্যাল ফিল্ডে সিলেকশান এর জন্যে আসতে বলা হলো। টিমের জন্যে টি-শার্ট কেনা, প্রিন্টিং ও টুর্নামেন্ট এর ফি হিসেব নিকেশ করে জনপ্রতি ৩০০ টাকা বরাদ্ধ করা হলো।  
ক্লাস শেষ করে একরকম দৌঁড়ের মধ্যে বাসায় পৌঁছলাম কেননা দুপুর ৩ টার মধ্যেই কোচিং-এ পৌঁছাতে হবে, এরপর ছাত্রদের নিয়ে যেতে হবে নেভালের দিকে একটা ক্রিকেট গ্রাউন্ডে। এলাকার একটা জনপ্রিয় শর্টপিচ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট-এ কোচিং থেকে নাম এন্ট্রি করা হয়েছে। আমাকে অধিনায়ক কাম কোচ এর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে আমাকে দেখলে যে-কেউ ধরে নেবে আমি ওদের মতোই এখনো স্কুল-কলেজের স্টুডেন্ট, আর তাই ওদেরই শিক্ষক হয়ে ওদেরই সাথে খেলাতে একটু অস্বস্তিকর হলেও গত ছুটির দিনে মুসলিমাবাদ বীচ এ দু-একটা প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে ওদের খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছি।
-“ভাইয়া, আমরা টসে জিতলে আগে ব্যাটিং নিব কিন্তু। মাঠটাতে প্রথম দিকে ভাল রান আসে, পরে গিয়ে স্লো হয়ে যায়” – পাকা খেলোয়াড়ের মতো আমাকে সমানে টোটকা দিয়ে যাচ্ছিল উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির তনয়।
-“আগে বাকি খেলোয়াড়দের প্রস্তুত কর, একটু পরেই আমরা রওনা দেব”। - একটু গম্ভীরভাবে বলার চেষ্টা করলাম।

ইতোমধ্যেই সোহেল, সুজন , আরিফ , বাবলু, মোস্তাক এসে পড়েছে। সুজন আমার সহকারী অধিনায়ক, ওকে পেয়েই একটা ছোট্ট মিটিং সেরে নিলাম দুজনে…
-তনয় বলছিল, আগে ব্যাটিং নিলে নাকি জেতা সহজ ?
-আরে না ভাই। টার্গেট নিয়ে ব্যাটিং করতে মজা। শর্ট পিচে ব্যাট হাতে তো খেলা হাতে।
-“আচ্ছা, বুঝলাম”। তাহলে কি তনয় ছেলেটা এতক্ষণ আমাকে পরীক্ষা করছিল নাকি এভাবে বকবক করাটা ওর স্বভাব, মনে মনে ভাবলাম।
হাজারো জল্পনা কল্পনা মাথায় নিয়ে একঝাঁক খেলোয়াড় নিয়ে বাইরে বেরুলাম, কর্তৃপক্ষ থেকে বুঝে নিলাম যাতায়াত ও নাস্তা খরচ। আমার মাথায় রাজ্যের দুশ্চিন্তা, শিক্ষক থেকে বনে গেলুম খেলোয়াড় কাম কোচ… পারব তো নিজের মান সম্মান রক্ষা করতে ? আচ্ছা, যদি শূন্য রানে আউট হয়ে যাই !!! কিংবা খেলার মাঠে যদি ক্যাচ বা ফিল্ডিং মিস করি তবে !!! এই পুঁচকে পাঁচকাদের সামনে তো নাক কাটা যাবে। নাহ, হালিম স্যার বড্ড নির্দয় মানুষ, শিক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে জুনিয়র বলে আমার উপরই চাপিয়ে দিলেন এই ঝামেলা। 

আমাদের গাড়ি সীবিচ রোড ধরে দ্রুতই পৌঁছে গেল খেলার মাঠে। ব্যাট, বল আর নাস্তা-পানির বোতল নামাতে নামাতে তনয় বলছিল…
-ভাই মনে রাইখেন ব্যাটিং ই নিবেন কিন্তু । ভুলেও বোলিং নিবেন না।
-আরেহ, আগে মাঠে ত যাই। ক্যাপ্টেন তুমি না আমি ।
তনয় কি আমার ব্রেইন ওয়াশ করার চেষ্টা করছে? অবশ্য উচ্চ মাধ্যমিক এর পর মেরিনে ভর্তির জন্যে “ব্রেইন ওয়াশ” নামের এক কোচিং ভর্তি হয়েছিলাম । সেই কোচিং-ই তো যা ওয়াশ করার করে দিয়েছে। এই বাচাল তনয় আবার কিই বা করবে?

এসব ভাবতে ভাবতে আমি একটু পিছিয়ে পড়েছিলাম আর তখনই ঘটল সেদিনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা। উঁচুনিচু মাটিতে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলুম আমি, দ্রুত উঠে দাঁড়াতেই আবিষ্কার করলাম – আমার ট্রাউজার দুই পায়ের মাঝে ছিঁড়ে গিয়েছে। ভেতরে অন্তর্বাস ছিল বলে রক্ষে, নয়ত কি বিতিকিচ্ছিরি কান্ডটাই না ঘটতে যাচ্ছিল আমার সাথে। আমি আমার সহ-অধিনায়ক কে ডেকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললাম, আর ওকে টস করতে যেতে অনুরোধ করলাম।

আমরা এসেছি প্রায় ত্রিশ মিনিট হয়ে গেছে। সেই কবে থেকে আমি সৈনিক-দের মতো সাবধান হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, একটু এদিক সেদিক হলেই লজ্জায় পড়ে যাব। বিপক্ষ দল এখনো মাঠে এসে পৌঁছায়নি, বাইলজে আছে নির্ধারিত সময়ের কুড়ি মিনিটের মধ্যে কোন দল মাঠে উপস্থিত হতে না পারলে বিপক্ষ দল ওয়াক-ওভার পাবে। যদিও আমরা চল্লিশ মিনিট অপেক্ষা করে ওয়াক-ওভার পেইয়ে গেলাম। আয়োজক কমিটির সাথে আমার টিমের খেলোয়াড়রা একটা ছোট্ট প্রীতি ম্যাচ খেলে, কিন্তু আমি তাতে শরীক না হয়ে কর্তব্যপরায়ণ কোচের দায়িত্ব পালন করছিলাম, অথচ ব্যাট-বল দেখলে আমাকে কেউ দমিয়ে রাখতে পারে না।  
যাক বাবা অনেক বড় বাঁচা বেঁচে গিয়েছি আজ, এই ছেঁড়া ট্রাউজার নিয়ে খেলতে গেলে ছাত্রদের সামনে মান-সম্মান যেটুকু আছে তাও হারাতাম। সন্ধ্যেয় বাসায় এসে হাত মুখ ধুয়ে পড়ার টেবিলে বসলাম…ভার্সিটির খাতাটা নিয়ে একটু ওলট-পালট করে আম্মাকে বুঝাই যে আমি অনেক সিরিয়াস। কিন্তু বসতে না বসতেই বিদ্যুৎ গেল চলে, আঁধারে হাতড়ে মোমবাতি জ্বালালাম আর একটা IPS এর প্রয়জনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করলাম। কথায় আছে, প্রয়োজনীয়তাই উদ্ভাবনের জনক। IPS অবশ্য বহু আগেই আবিষ্কৃত হয়েছে, এখন আমাকে নিজের জন্যে একটা মিনি IPS বানাতে হবে।

ফেসবুক গ্রুপে ঢুকে দেখলাম ক্রিকেট টুর্নামেন্ট নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে, আমার দেয়া “সার্কিট ব্রেকার” নামটি সকলের পছন্দ হলো, আর যথারীতি গ্রুপেই স্বিদ্ধান্ত নেয়া হলো আগামীকাল ল্যাব ক্লাস শেষেই সবাই চকবাজার প্যারেড গ্রাউন্ডে চলে যাবে, ওখানেই টিম সিলেকশান হবে।
এখন আমি তো পড়ে গেলাম আরেক চিন্তায়, ট্রাউজার যা ছিল একটা ওটাও ছিঁড়ে গেছে। কাল সেলাই করে নিয়ে গেলাম নাহয়, যদি আবার ছিঁড়ে ? তখন বন্ধুদের সামনে কানকাটা যাবে। এইসব ভাবতে ভাবতে ট্রাউজার সেলাই করে ঘুমিয়ে পড়লাম।
>>>>>>>>>>>>>>>> 
সকাল সকাল উঠেই গোগ্রাসে নাস্তা করে ব্যাট-স্ট্যাম্প নিয়েই বেরোতে যাচ্ছিলাম আর আম্মা সাথে সাথেই
-লাঠি ডান্ডা লই এনে কডে যদ্দে? মারামারি গরিবিনি কনু ?
-না না , ক্রিকেট ম্যাচ আছে ভার্সিটি তে।

কোন রকমে বাসা থেকে বের হয়েই প্রাণপণ ছুটে চলা। ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারলেই যেন বাঁচি। ক্যাম্পাসে গিয়ে ক্যান্টিনে ফটোকপির দোকানে ব্যাট-স্ট্যাম্প রাখতে গিয়েই দেখি পোলাপান সব দল বেঁধে সাদা কাগজে কিসব লিখছে।
-কিরে প্রসেনজিত, কি করস ?
-ল্যাব রিপোর্ট লিখি।
না বাংলা সিনেমার প্রসেনজিত না , আর তাই ওর নাম দিয়েছি আমরা “প্রসেন”। বেচারা চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বছর দুয়েক এপ্লাইড ফিজিক্স এ পড়ে এখানে চলে আসছে, রক্তের লিউকোমিয়া রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে তারও পড়ালেখায় ছেদ পড়ে। প্রসেন কে এবার প্রশ্ন করলাম-
-ভাই, ল্যাব রিপোর্ট কি?
-আরে গত ক্লাসে না বলছে ম্যাম, কম্পিউটার ল্যাবে।
-অইটা তো প্রোগ্রামিং শিখাইছে কম্পিউটার এ।
-হ্যাঁ , ওটা এখন রিপোর্ট আকারে জমা দিতে হবে ।
-ও আচ্ছা বুঝছি এখন। কিন্তু আমার তো প্রোগ্রাম টা মনে নাই , কি লিখব?
-তুই কথা বলিস না , ধর আমার থেকে পেজ নে… দেখে দেখে লেখ।
-“বাহ, এত সোজা !!! দেখে দেখে লিখলেই হয়ে যাবে”। মনে মনে ভাবলাম আমি। অল্প কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই পেজের পর পেজ লিখতে লিখতে হাত ব্যাথা করছিল…কি দরকার ছিল এসবের , ফটোকপি করে দিতে বললেই হয়ে যেত।
প্রথম দিন রিপোর্ট লিখে জমা দিয়েই আবিষ্কার করলাম যতটা সহজ ভেবেছিলাম ততটা না এই রিপোর্ট লেখা। কপি করার দায়ে অনেকের রিপোর্ট ম্যাম সাইন করে নাই। কি আর করা ল্যাব ক্লাস শেষে সিলেকশান এর জন্যে প্যারেড গ্রাউন্ড এর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম আমরা।

প্রবর্তক থেকে চকবাজার হেঁটেই যাওয়া যায়, আমরা দল বেঁধে সব গল্প করতে করতে পৌঁছে গেলাম প্যারেড ফিল্ডে। চট্রগ্রাম কলেজের পাশেই এই বিশাল খেলার মাঠ, এর আগেও অনেকবার আসা হয়েছিল তবে কোনবারই খেলার জন্যে নয়। অল্প সময়ে কমবেশি সবার পারফর্মেন্স দেখার জন্যে একটি ম্যাচ খেলার বিকল্প নাই আর তাই আমি ও নোবেল খুব দ্রুত উপস্থিত সবাইকে দুটো দলে ভাগ করলাম। পুরো খেলাজুড়ে ছিল চরম বিশৃঙ্খলা আর নোবেল অনিকের একচ্ছত্র আধিপত্য। এমনিতেই আমাদের মধ্যে বোঝাপড়াটা এখনো ঠিক জমে উঠেনি, তার উপর নোবেল অনিকের মতো একজন যখন জোর করে নেতৃত্ব খাটাতে যায়, তখন আর কিছু বলার থাকে না। ওর চরম বাড়াবাড়িতে নেতৃত্বটা ওর হাতেই ছেড়ে দিতে হয় আমাকে, সহকারী অধিনায়ক হিসেবে মাঠে থেকে আমার দায়িত্বটুকু পালন করছিলাম কেবল। দিনশেষে আমাদের মধ্যে কথোপকথন…
-কি অবস্থা, কেমন দেখলি?
-বেশির ভাগই গড়পড়তা মানের, রেসের ঘোড়া নাই একটাও।
-উইকেট কিপার হিসেবে শাওন থাকুক আপাতত, সাইদুল আর আলী আজম তো ভালোই বল করে।
-রিয়াদ ও , আর দীপ্ত? ইতা তো পুরাই ব্রাভো স্টাইল।
-হা হা হা, দারুন বলছিস ব্রাভো। ব্যাটসম্যান নাই টিমে ভাল, জেনুইন ব্যাটসম্যান লাগবে।
-আমি আছি না, কুল ম্যান। অনেকেই আসতে পারে নাই আজকে, কাল ক্লাসে বলব দেখি।

খুব বাজে একটা দিন গেল সবার, এই কাকফাটা রোদের মধ্যে খেলেও কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারা, বারকয়েক ওয়ারিফ ও নোবেলের মধ্যে কথা কাটাকাটি ইত্যাদি ইত্যাদি।
-“নোবেইল্লা বেশি ঘাড়ত্যাড়া, কেপটেন্সি তুমি নাও ভাই”- যাবার প্রাক্কালে ওয়ারিফ আমাকে বলছিল।
-“থাক, ও আয়োজক কমিটির কাছের মানুষ। আমি ভাইস ক্যাপ্টেনই থাকি।”
-“এগুলা ভাই মেনে নেয়া যায় না, এই শুক্রবার আবার একটা ম্যাচ আয়োজন কর”- জিগর যোগ করল।
-“আচ্ছা দেখতেছি।”- মৃদ্যু সম্মতি দিলাও ওদের কথায়। কিন্তু আমার মাথায় চলছিল কোন এক লিজেন্ড ক্রিকেটারের সেই বিখ্যাত উক্তি…
“Cricket is a team game, if you want fame for yourself, go play an individual game”.

মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ৫


এইটা হইছে যে ডিচি চার্কিট, আমরা একন এই চার্কিট টা সোজা করি মানাব। এইটাকে সোজা করি আকলে এই রকম হয়। আব্বার আমরা জানি যে V=IR”- সকাল সকাল ক্লাসে এসেই এই রকম বিদঘুটে লেকচারে মাথা ঝিম ঝিম করছে...ওমা এখনো তো টিচারই আসেনি, তাহলে এই লেকচার দিচ্ছিল কে?

ঘুম ভাঙতেই খেয়াল করলাম সাত-আট জনের মতো ছেলেপেলে গোল করে একজনের লেকচার শুনছে...ওদের মধ্যমনি খুব ফর্সা করে একটা ছেলে রাশেদ।

আজ খুব তাড়াতাড়ি ক্লাসে এসে পড়েছি, তাই একটু ঘুম পেয়ে গিয়েছিল, কিন্তু রাশেদ হতচ্ছাড়া টা আর ঘুমোতে দিল কই।  যাই হোক, আগা মাথা কিছু বুঝতে না পেরে জটলা থেকে একজন একজন করে কেটে পড়ছিল।  জহিরকে হতাশ ভঙ্গিতে ফিরে আসতে দেখেই প্রশ্ন করলাম-

-ছেলেটা কে ভাই, সিনিয়র নাকি?

-আরে না না, আমাদের সাথেই। IIUC তে ইইই তে ছিল ১ বছর, এরপর এখানে চলে আসছে।

-ও আচ্ছা, এজন্যেই এখানে এসেই আমাদের মাস্টারবাবু হয়ে গেছে... ধুর।

রাশেদ ছেলেটার সাথে কদিন পরই আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়, এককথায় বলতে পারি আমার বন্ধু রাশেদ। এখনো পর্যন্ত আর কেউ আমার খোজ খবর রাখে না রাখুক, এই রাশেদ ঠিকই রাখে। এই রাশেদের সাথেই আমার আজকের সানি হয়ে উঠা, দুজনে মিলে বড় ভাইদের প্রজেক্টগুলো দেখতাম আর বুঝে নিতাম, ক্লাসের গ্যাপগুলোতে সিনিয়রের বেশ ধরে CSE ডিপার্টমেন্ট এরও টুকটাক ল্যাব করে আসতাম। মজার ব্যাপার হচ্ছে মাত্র দ্বিতীয় সেমিস্টারেই আমরা একটা রোবোটিক্স ওয়ার্কশপ এর আয়োজন করে বসি, সেই থেকে সবাই রাশেদকে ওয়ার্কশপ ম্যানেজার” বলে ডাকে। সব সময় ছেলেটা বলত – যেটা দেখবি বা শিখবি সাথে সাথে অইটা মানাই ফেলতে হবে, আর ওজ্ঞে টিউটোরিয়াল মানাই রাখিবি যাতে পরদি ভুলি গেলে চাই এনে শিখি লইত তারছ”। কিন্তু কেন জানিনা এই অনুপ্রেরণা যোগানো বন্ধুটি পরবর্তীতে এসে একটু খেই হারিয়ে ফেলে।

দীর্ঘক্ষণ ধরে শিক্ষক ক্লাসে না আসায় ছাত্রছাত্রীরা ধরেই নিয়েছে আজ স্যার আসবেন না। মাঝের সারিতে আনিস তার ভাঙ্গা গলায় গান ধরেছে। পাশে থাকা সিফাত আর নুহাশও তাতে কোরাস দিয়ে যাচ্ছে, আর ঠিক পেছনে বসেই ঘুম ঘুম চোখের ছেলেটা সমানে চেয়ারের হাতল চাপড়িয়ে যাচ্ছে। নেহাত ওটা হাতল ছিল বলে, তবলা হলে এতক্ষণে ঠিকই ফেটে যেত। আমিও কিছুটা আগ্রহী হয়ে ঘুম ঘুম চোখের ছেলেটার পাশে গিয়ে বসলাম।  

-কি অবস্থা বন্ধু? অবস্থা শব্দটিকে কেমন দাঁত থেকে ফস করে বাতাস ছেঁড়ে দিয়ে প্রশ্ন করল ইফতেখার, ডাক নাম তার “ব্রাভো”,আমাদেরই দেয়া নাম।

-এইতো ভালো, রাতে ঘুমাস নাই?

-ঘুমাইছি তো, চেহারা এমনি এরকম যে।

-ও আচ্ছা, চল গান ধরি।

আমিও তাদের সঙ্গে কোরাস ধরলাম, যদিও এই কোরাসের কোন তাল-লয় নেই, যে যেভাবে পারছে সেভাবেই গলা ফাটিয়ে গাইছে…

“চল সবাই …… জীবনের আহ্বানে , সামনে এগিয়ে যাই”

একসাথে সবার চিন্তাবিহীন আর প্রফুল্ল মন নিয়ে গান করার মধ্যে যে কি মজা তা কজনই বা জানে? হঠাৎ আমাদের মাঝে কিছুটা গম্ভীর চেহারা নিয়ে হাজির হলো সবুজ পাগড়ি পরিহিত সফেদ পোশাকের শ্মশ্রুবহুল এক যুবক…

-“ভাই, আমরা চাইলে এভাবে নাত-এ-রাসুল কিংবা ইসলামী সংগীত গাইতে পারি। কি বলেন সবাই?”

-“তুই আগদি শুরু গর, ভালা লাইলে আরা তর ল ধইজ্জুম”- আনিস ছেলেটা সফেদ পোশাকধারী মনির-কে উদ্দেশ্য করে বলল।

-হু হু ঠিক। ইফতেখার আনিসের কথায় সায় দিল।

ফিক করে হেসে দিয়ে সফেদ পোশাকধারী মনির নামের ছেলেটা শুরু করল…

দে দে পাল তুলে দে, মাঝি হেলা করিস না, ছেড়ে দে নৌকা আমি যাবো মদিনায়

দুনিয়ার নবী এলো মা আমেনার ঘরে, হাসিলে হাজার মানিক কাঁদিলে মুক্তা ঝরে…”

অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেলেগুলো সব যেন বদলে গেল… একেকজন আধ্যাত্মিকতার চরম শিখরে পৌঁছে গেল।

হই-হুল্লোরের মাঝে দেখলাম পেছনে দুটো ছেলে প্রচুর তর্কাতর্কি করছে। এদের মধ্যে একজন কে ভাল করেই চিনি, আমাদের দুজন শ্রেণি প্রতিনিধিদের মধ্যে একজন … সাজিদ। আরেক জন কে সবসময়ই দেখি একে ওকে হুমকি ধমকি দিচ্ছে, মেরে ফেলব কেটে ফেলব , চেয়ার তুলে মারব, আমি সিটি কলেজে পড়ে আসছি। তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে হঠাৎ হুমকি দিতে থাকা ছেলেটা চেয়ার তুলে নিয়ে সাজিদকে তাড়া করল। তাড়া করার এক পর্যায়ে চেয়ারের কিছু অংশ আমার মাথায় লাগাতে কিছুক্ষণ ঘোরের মধ্যে ছিলাম, ঘোর কাটতেই দেখি ছেলেটা চেয়ার রাখতে আসছে। আমার মেজাজ গেল চটে, আমি উঠে ছেলেটার গালে বসিয়ে দিলাম এক চড়। আর রেগেমেগে বললাম…

-“শো ডাউন করবি মারামারির আর আমার মাথায় আঘাত লাগবে কেন?”  

ঘটনাকে আর বাড়তে না দিয়ে কোরাস গাইতে থাকা বন্ধুরা নোবেলকে সামলে নিল। আমাকেও দুজন এসে সরিয়ে নিল।

-“কাজটা তুই ভাল করলি না, তোরে আমি দেখে নিব” -তর্জেগর্জে বললে লাগল নোবেল।  

এরকম কিম্ভুতকিমাকার আকৃতির ছেলে আমি আগে কখনো দেখিনি। সামনে ভুঁড়ি আর পেছনে পশ্চাতদেশ, দুটোই দুই দিকে বেড়ে গিয়ে যা তা অবস্থা। তার উপর গালখানা গোলআলু টাইপের, যেন কেউ একপাশ থেকে বাড়ি মেরে এমন দশা করেছে। খুব জানতে ইচ্ছে করছিল ব্যাটা নোবেল নামটা পাবার মতো কি কাজটা করেছে? আচ্ছা, মারামারি করে কিংবা এরকম পশ্চাতদেশ দুলিয়ে পায়নি তো কোন?

থার্মোডাইনামিক্স এর লেকচারটা আজ কেমন যেন ভাল লাগছে না, কেননা লেকচার দেয়ার চেয়ে প্রফেসর বোর্ডে লিখান বেশি উনার সেই স্নাতক-পিএইচডির নোট খাতা দেখে দেখে। আশির দশকের নোট খাতা ধুলোয় মলিন হয়েছে, কিছু কিছু পাতা ঘুণে ধরেছে … বিজ্ঞান তার আপন গতিতে এগিয়ে গেলেও প্রফেসর রয়ে গেছেন সেকেলে। ক্লাস শেষ করেই স্যার বললেন -“আজকের লেকচার এর উপর এখন হবে ইন্সট্যান্ট সিটি”।

একথা শুনেই সবার মাথায় যেন বাজ পড়ল। হাজার অনুনয় বিনয় করেও স্যারকে মানানো গেল না। এই প্রফেসর নাকি দশমিক দুই পাঁচ এর জন্যেও অনেক ছাত্রকে ফেলের কোটায় আটকে রাখেন কিংবা আধা-দুয়েক নাম্বার এর জন্যে এ প্লাস আটকে দেন- এমন কুখ্যাতি আছে উনার নামে। আর তাই আমরা আর কথা না বাড়িয়ে পরীক্ষায় বসলাম।

কার্নো চক্র নিয়ে প্রশ্ন এসেছিল, উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির পদার্থবিজ্ঞান পড়াতে গিয়ে “র‍্যাসনিক হ্যালিডে”-র বই থেকে টুকটাক যতটুকু জ্ঞানার্জন হয়েছে তাই ইংরেজি-তে বানিয়ে বানিয়ে লিখে দিলাম।

দুপুরের ঠিক আগেই খবর পেলাম সরকারদলীয় একটি নেতৃস্থানীয় ছাত্রসংগঠনের আয়োজনে মুসলিম ইন্সটিউট হলে বিশ্ববিদ্যালয় এর ছাত্রছাত্রীদের নবীনবরণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দুপুরের একবেলা খাবারের লোভে ক্লাসের সবাই দলবেঁধে সিদ্ধান্ত নিলাম আজকের শারমিন ম্যামের সার্কিট ক্লাস বাংক করব, যেহেতু মিডিয়ার সামনে আগের দিন এক অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে গেছে। যেই কথা সেই কাজ, দুপুর একটার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম সবাই ঐতিহ্যবাহী মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে।

দুপুরে খাঁ খাঁ রোদে প্রবর্তক থেকে নিউ মার্কেট এসে সবাই ক্লান্ত পরিশ্রান্ত। হলে ঢুকতেই দেখি স্লোগানে স্লোগানে হল গমগম করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব-কটি অনুষদের ছাত্রছাত্রীরা ইতোমধ্যেই এসে পড়েছে। আমরা আমাদের অনুষদের জন্যে নির্ধারিত আসনগুলোতে গিয়ে বসলাম। সামনে থেকে কোন এক ছাত্রনেতার কণ্ঠে ভেসে আসছে স্লোগান “জয় বাংলা”… নবীন ছাত্রছাত্রীরা সমোস্বরে বলছে “জয় বঙ্গবন্ধু…” । শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাবসায় শিক্ষা অনুষদ আর আঈন অনুষদে ব্যাপকভাবে রাজনীতি চর্চা হয়, যেখানে আমাদের বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদে রাজনীতি চর্চা বলতে গেলে শূন্যের কোঠায়। আর তাই স্বাভাবিকভাবেই ব্যাবসায় শিক্ষা ও আঈন অনুষদের ছাত্রছাত্রীরা পুরো অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব করছিল, আর আমরা কাঁচুমাচু হয়ে এক কোণে বসে বসে নেতাদের বক্তৃতা শুনছিলাম।

-“এই মাম্মা, মাইয়া টা তো চরম… দেখ না দেখ না।“-আমার পাশে বসে থাকা নোবেল সাজিদকে বলছিল। কে বলবে মাত্র সকালেই এই দুজন মারামারি করছিল, পরে গিয়ে আমিও যোগ দেই। কিন্তু এখন আবার ক্যাম্পাসের বাইরে এসে সবাই এককাট্টা।

-“এইটা কোন মেয়ে হইল রে, অই দেখ আমাদের CSE ডিপার্টমেন্ট এর গুলা কি সুন্দর সুন্দর” -পাশে বসে থাকা সাজিদ নোবেলকে উদ্দেশ্য করে বলল।

নারীসৌন্দর্য বরাবরের মতোই সৃষ্টিকর্তার অপূর্ব সৃষ্টি, কিন্তু কেন জানিনা আধুনিকতার নামে আজকালকার নারীরা যেভাবে নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়ায় তা আমাকে টানে না… তবে বন্ধুদের প্ররোচনায় পড়ে সৃষ্টিকর্তার সৌন্দর্য এক পলকের জন্যে হলেও উপভোগ করা আরকি। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারলাম অধিকাংশ বন্ধুদের এই অনুষ্ঠানে আসার উদ্দেশ্য “নারী দেখা, বিরানি খাওয়া”- কিন্তু আমার শুধু বিরানি পেলেই চলবে, আর তাই আমি মোবাইল গেমস এ মনোনিবেশ করলাম।

দুপুরের খাবারের প্যাকেট নিয়ে এসে আমরা আবার আমাদের আসনে এসে বসলাম।

-“এই আমাদের মধ্য থেকে বক্তৃতা কে দেবে?”-হন্তদন্ত ভঙ্গিতে এসে প্রশ্ন করল ওয়ারিফ।

-“আমি যাব”-শ্রেণি প্রতিনিধি শাওন উত্তর দিল।

সেদিন শাওনের মঞ্চ বক্তৃতা শুনেই আমরা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করে নিলাম, এই ছেলেই হচ্ছে আসল নেতা। হঠাৎ খোঁজ খবর নিয়ে কে যেন আবিষ্কার করল আমাদের সাথে একজন আসে নাই , “জহির”- যে কিনা শারমিন ম্যামের সার্কিট ক্লাস করেছে। ম্যাম খুব রেগে গেছে আমাদের উপর, অনেক কিছু পড়াই ফেলছে, পরের ক্লাসে ফাটাবে। আমরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা আগে জহিরকে ফাটাব, যা হয় দেখা যাবে। 

<<<<আগের পর্ব                   পরের পর্ব>>>>



শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ৪


উচ্চ মাধ্যমিক পদার্থবিজ্ঞান -শাহজাহান তপন এর বই হাতে কোচিং সেন্টারের দিকে ছুটছি। কাটগড় মুসলিমাবাদ রোড ধরে সামান্য গেলেই পতেঙ্গা গ্রামার স্কুল, এরই দোতলায় “স্টাডি জোন” নামক কোচিং সেন্টার। উঁচু উঁচু সিঁড়ি বেয়ে শিক্ষক রুমে মার্কার আর ডাস্টার নিতে নিতেই হালিম স্যারের চোখাচোখি হলো। গণিতের হালিম স্যার অত্র কোচিং এর পরিচালক, আমার রোজ রোজ এই ১৫-২০ মিনিট দেরি করে ক্লাসে আসাতে উনি বেশ বিরক্ত। দু-বছর ধরে এই কোচিং এর সাথে আছি- অনেকটা মায়া পড়ে গেছে। প্রথম দিকে অস্থায়ী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও এখন এখানে স্থায়ী… সপ্তাহে ৩ দিন ক্লাস। মাসশেষে পাঁচ হাজার টাকা মাইনে। পদার্থবিজ্ঞানের বিশেষায়িত লেকচারার… হা হা হা , দুধের স্বাধ ঘোলে মেটানো যাকে বলে আরকি।  

ক্লাসে ঢুকতেই ফিসফিস করতে থাকা ছাত্রছাত্রীরা একদম চুপ হয়ে গেল।

-“আজ আমরা কোন টপিক টা পড়ব?”-পকেট থেকে একটা লাটিম বের করতে করতে বললাম।

-“বলবিদ্যা স্যার, নিউটনিয়ান বলবিদ্যা ” – উচ্চঃস্বরে বলে উঠল রেহানা। ইতু, মিতু, তানিয়া, ফারজানা একসাথে হেসে উঠল।

-“কি আজব? একসাথে হাসার কি আছে? মেকানিক্স কি হাসির টপিক্স?”-একটু গম্ভীর হয়ে বলার চেষ্টা করলাম।

-“স্যার, এইটা ওদের ব্যারাম, আপনি কি এখনো লাড্ডুম খেলেন স্যার”- পেছন থেকে এক ছাত্র বলে উঠল।

-“বলছি, আগে চুপ সব, এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। আজ তাহলে আমরা টর্ক, কৌণিক গতি, কেন্দ্রমুখী ত্বরণ এসব নিয়ে আলোচনা করব। তার আগে সবার জন্যে একটা প্রশ্ন- কে কে লাটিম ঘুরাতে পারো?”

-“স্যার আমি আমি”- হুমায়ুন ছেলেটা হাত তুলল।

মজায় মজায় পদার্থবিজ্ঞান শিখতে গেলে আশেপাশের বাস্তব উদাহরণ থেকে শেখার বিকল্প নেই, আমিও এমনটি করার চেষ্টা করি। ক্লাসের টপিক অনুযায়ী একেক দিন একেক জিনিস নিয়ে আসি, আজ যেমন আনলাম লাটিম আর সুতা।হুমায়ুন সামনে এসে লাটিম ঘুরিয়ে দেখাল, আর আমি লাটিম কিভাবে ঘুরে কেন ঘুরে এসব ব্যাখ্যা করলাম।নবম-দশম শ্রেণীর আরেকটি পদার্থবিজ্ঞান এর ক্লাস শেষ করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

বাসায় পৌঁছেই মোবাইল খুলে দেখি বেশ কিছু নটিফিকেশন, ভার্সিটির গ্রুপে Engineer Akash নামের একজনের পোস্ট নিয়ে ব্যাপক হাসাহাসি চলছে। পোস্টটি ঠিক এমন -  

 “Hala vondu ra, kaman aso? Grop ar all vondu k janai spike boy akash ar pako thake subocca. Amar movile er hadpone ta harai gaca. Keo jada paya takesh tahole amar sathe gogagong cor. Hadpone ar calar sada. Band samsam.”  

ইঞ্জিনিয়ার আকাশ নামের আইডি হতে ছেলেটি নাকি এভাবেই লিখে, এভাবেই মেসেজ করে। এরপর  থেকে গ্রুপে বাকি সবাই মজা করে ইঞ্জিনিয়ার আকাশের মতো করে লেখালেখি শুরু করল এবং এই রেশ দু-তিনদিন পর্যন্ত চলল।

আজ নাকি সপ্তাহের শেষ ক্লাস, আগামী দুদিন ছুটি। একাকি হেঁটে হেঁটে ক্যাম্পাসের কাছাকাছি আসতেই চোখে পড়ল সানগ্লাস পড়া হোমরা চোমরা চেহারার এক যুবক রিকসা থেকে নামছে। “আরে, একে তো আমি চিনি। কলেজের বন্ধু প্রিয়ম না?” – মনে মনে বললাম। কথা বলব নাকি পাশ কেটে চলে যাব, ২ বছর পরে এসে আমি এখনো ফার্স্ট সেমিস্টার… প্রিয়ম নিশ্চয়ই সিনিয়র হবে – হাজারো জল্পনা কল্পনা চলতে লাগল মনের মধ্যে। আমাকে দেখতে পেয়েই সদা হাসোজ্জ্বল আর প্রাণখোলা অভ্যার্থনায় সামনে এগিয়ে এলো প্রিয়ম...

-“আরে বন্ধু ? তুই এইখানে কি করস? তুই না CU তে ছিলি? ”

-না মানে ছেড়ে দিছি, এখন এখানে ইইই তে আছি।

-আমিও তো ইইই তে, কোন সেমিস্টারে তুই ?

-না মানে … এইতো ফার্স্ট ইয়ার, তুই?

-পরে বলব, দেখা হবে তাহলে, আসি।

ফিক করে একটা গাল ভেটকানো হাসি দিল সে, এটা তার ট্রেডমার্ক হাসি- কলেজ লাইফ থেকে দেখে আসছি। ক্লাসের দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে প্রিয়ম দ্বিতীয় একাডেমিক ভবনের সদর দরজার দিকে চলে গেল, আমার ল্যাব ক্লাস থাকায় আমি লিফট এ উঠলাম, গন্তব্য ৭ম তলা- মেকানিক্যাল ড্রয়িং ল্যাব।

ক্লাস রুটিনে লিখা MED-MAW-703, অর্থাৎ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং , শিক্ষক MAW-উচ্চারণ করলে দাঁড়ায় ম্যাঁও-কি মজার। ল্যাব ক্লাসে ঢুকার পর থেকেই সমানে ম্যাঁও ম্যাঁও করে যাচ্ছি, এই ম্যাঁও স্যারই যে সামনে ক্লাস নিচ্ছেন তাতে কোন ভ্রুক্ষেপই নেই আমার। AutoCAD নামক একটা সফটওয়্যার এ কিসব বাচ্চাদের আঁকিবুঁকি শেখাচ্ছেন স্যার। ফ্রন্ট ভিউ, ব্যাক সাইড ভিউ, আইসোমেট্রিক ভিউ আরো কত কি…

-“এই এই “অটোকাঠ” কেমনে খুলব একটু দেখায়া দে না রে ?”- পাশেই বসা মধ্যবয়সী এক ভদ্রলোক আমার পিঠে হাত রেখে বলল সফটওয়্যার টা কিভাবে ওপেন করতে হবে।

-“আঙ্কেল, আপনাকে তো আগে ক্লাসে দেখি নাই?”

-“আমি জাহিদ, ফাস সেমিস্টার”

-“ও আচ্ছা, সরি। আমি ভাবছিলাম আপনি কোন স্টুডেন্ট এর গার্ডিয়ান হবেন হয়তো”

মাথায় টাক আর আংকেল আংকেল চেহারা এই বেচারার পরবর্তীতে ডাকনামই হয়ে যায় “আঙ্কেল”, কেউবা ডাকতো “চাচা”, “জাহিদ চাচা”। পরে গিয়ে শুনেছি বেচারার বউ আছে, সংসার করছে ৩ বছর ধরে। ইপিজেড-এ ভাল মাইনের সুপারভাইজার পদের চাকুরি ছেড়ে দিয়ে দীর্ঘদিনের পুষে রাখা স্বপ্ন পূরণ করতে এই ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট এ। 

দ্বিতীয় তলায় পরের ক্লাস ধরতে গিয়ে দেখি রুম এখনো খালি হয়নি, ভেতরে অনিল স্যার ক্লাস নিচ্ছেন। প্রফেসর অনিল স্যার নাকি ডিপার্টমেন্ট এর ডিন, সার্কিট খুব ভাল পড়ান… যদিও এই সেমিস্টারে আমরা তাঁর ক্লাস পাইনি। অনিল স্যার যেতে যেতে আমরা সবাই যে যার জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম আর মনে পড়ে গেল রবীন্দ্রনাথের "দুরন্ত আশা" কবিতার সেই বিখ্যাত দুটি লাইন-

“ভদ্র মোরা শান্ত বড়ো, পোষ মানা এ প্রাণ… বোতাম আঁটা জামার নিচে শান্তিতে শয়তান” –ইচ্ছে করেই শয়ান কে আমি শয়তান বলি।স্যার যেতে না যেতেই সবাই যে যার মতো হই-হুল্লোর শুরু করল, অনেক্ষণ ধরে একটা ছেলেকে দেখছি ঠায় বসে মোবাইল টিপছে… অনিল স্যার চলে গেল তাতেও তাঁর কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।

-“আর কত ডাউনলোড করবি রে, ভার্সিটির ওয়াইফাই তো ডাউন করে দিছস”-পাশ থেকেই বলে উঠল লিকলিকে কালো এক ছেলে। 

-“আরেহ সাব্বির, বুঝছ নাই। যেই টাকা দিচ্ছি সেগুলা উসুল করতে হবে না?”-প্রত্যুত্তরে বলে উঠল মোবাইল টিপতে থাকা ছেলেটি।

সাব্বির আর মোবাইল পাগলা ছেলেটির কথোপকথন এর মধ্যে ঢুকে বুঝতে পারলাম এই ছেলেটার রুটিন ওয়ার্ক হচ্ছে ওয়াইফাই এর পর্যাপ্ত ব্যাবহার করা। সুযোগ পেলেই আমরা যেখানে গল্প-আড্ডায় মেতে উঠি, এই ছেলেটা সেখানে ডিপার্টমেন্ট অফিসের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে কিংবা বসে গান,মুডি,ড্রামা ইত্যাদি ডাউনলোড করতে ব্যাস্ত থাকে, সিগনাল নাকি ভাল পাওয়া যায়। আর তাই মোজাম্মেল নামের সেই ছেলেটার নাম দিয়েছি আমরা ওয়াইফাই মাল।

AKK স্যারের ম্যাথ ক্লাস চলছে। পুরো ক্লাস যে যার মতো হই-হুল্লোর এ ব্যাস্ত, স্যার পেছনে ফিরলেই সবাই চুপ। হঠাৎ কে যেন চিৎকার করে উঠল “স্যার, আমার কলম নিয়ে গেছে”… পুরো ক্লাসে হাসির রোল পড়ে গেল। দেখলাম শহীদ নামের একটা ছেলের সাথে আশেপাশের সবাই মজা করছে। কেউ কলম নিয়ে যাচ্ছে, কেউবা খাতা। এই ছেলেটা একদমই হাবাগোবা টাইপের, মাঝে মধ্যে তার কথাবার্তা শুনলে মনে হবে সে অনেক জ্ঞানী শ্রেণীর লোক…কিন্তু জ্ঞানের বেলুন ফুটো করে দিয়ে নিজেই নিজের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে বসে যখন তখন। অবশ্য জ্ঞানী আরেকজন আছে ক্লাসে, নাম তার মিনহাজ। আমরা তাকে ডাকি প্রফেসর মিনহাজ। কলেজের বাংলা বইতে “কমলাকান্তের জবানবন্দী” নামক গদ্যের কমলাকান্ত যেন বাস্তবে আমাদের প্রফেসর মিনহাজ। যে কোন সত্য কিংবা যুক্তিযুক্ত কথা উপযুক্ত স্থানে বলায় প্রফেসর মিনহাজের জুড়ি ছিল মেলা ভার, সে কাউকে পরোয়া করত না।

আজ দুপুরের বিরতিতে আমি, জাহিদ আর শহীদ গেলাম গোলপাহাড় মোড়ের আগের কিছু টংঘরে। ফুটপাতের পাশেই বিশাল সীমানা প্রাচীর, প্রাচীরের ওপাশে এসব উঁচু উঁচু টংঘর… অনেকটা উপজাতীদের ঘরের মতো করে বানানো। কাস্টমারদের জন্যে উপর থেকে সিঁড়ি মেলে দেয়া, সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছি আর ভাবছি এই বুঝি পড়ে গেলুম।

-“কি খাইবেন মামা? খিচুড়ি আছে, মাংস আছে, চনা-পিয়াজু”

-“খিচুড়ির দাম কত?”

-“ত্রিশ টাকা মামা”

-“আর চনা মুড়ি ?”

-“দশ টাকা”  - বাহ বেশ সস্তা তো… মনে মনে বললাম আমি।

আমি মোবাইল বের করে রুটিন দেখে নিলাম। দুপুরে একটা ক্লাস পরেই ছুটি, এখন খিচুড়ি খাওয়ার কোন মানে হয়না। তাই সবাই মিলে চনা-মুড়ি দিয়ে জম্পেশ খেয়ে ক্যাম্পাসে ফিরলাম।

দুপুরের শেষ ক্লাস ছিল শারমিন ম্যামের সার্কিট। ক্লাস শুরু হতে না হতেই নাদুশ-নুদুস একটা স্যার আসলেন একজন টিভি রিপোর্টার আর ক্যামেরাম্যান নিয়ে। শুনেছি কাছেই একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল এর অফিস, ডিপার্টমেন্ট নিয়ে তারা কোন নিউজ করবে হয়তো। আমাদের সবাইকে বুঝিয়ে দেয়া হলো ম্যামের ক্লাস খুব মনযোগ দিয়ে শোনার জন্যে, আর কিছু প্রশ্ন করার জন্যে। যথারীতি শারমিন ম্যাম তাঁর বুলেট ট্রেন চালু করে দিলেন আর প্রায় সাথে সাথে আমাদের মিনহাজ দাঁড়িয়ে...

-“ম্যাম একটা প্রশ্ন আছে”

-“হ্যাঁ, বলো?”

-“ম্যাম আপনার কি তাড়া আছে? আপনি কি কোথাও যাবেন?”

-“নাহ, কেন?”

-“এই যে আপনি বুলেটগতিতে ক্লাস নিচ্ছেন আমরা তো কিছুই বুঝতেছি না”

-“কি বুঝতেছ না ওইটা বলো ?”

-“কি বুঝতেছি না ওইটাই তো বুঝতেছিনা, আগের ক্লাস গুলাও আপনি এমন করছেন। কিছুক্ষণ এই টপিক, কিছুক্ষণ ওই টপিক”

এভাবে টিভি ক্যামেরার সামনে বন্ধু মিনহাজ কে যুক্তিযুক্ত কথা বলতে দেখে আমরা সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়লেও আমাদের কমলাকান্ত দারুণভাবে প্রতিবাদ করছে ভেবে মনে মনে প্রশান্তি পাচ্ছিলাম। আবার আজকের এই রেকর্ডিং হয়তোবা টিভিতে দেখানো হবে না, তারই ফলশ্রুতিতে আমাদের কি অবস্থা হবে এই ভাবতে ভাবতে আমার নিজেরই গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল।  

<<<<<আগের পর্ব                        পরের পর্ব>>>>>>


সোমবার, ১৫ জুন, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ৩


গত দুদিন ওয়ারিফ আর জিগর ধরে ধরে সব পোলাপান কে গ্রুপে এড করছে, ভার্চুয়াল জগতে আমাদের ভার্চুয়াল আড্ডাখানা।

গ্রুপখানা আমার নিজেরই গঠন করা, সকাল সকালই গ্রুপে ঢুকে শ্রেণি প্রতিনিধিদের দেয়া পোস্ট দেখে জানতে পারলাম সকালে শারমিন ম্যামের ক্লাস , বিষয় সার্কিট-১। ব্যাপারটা বেশ ভালোই, সব রকম খোজ খবর হাতের কাছেই পাওয়া যায়। আম্মুর হাতে বানানো পরোটা আর চা খেয়েই আদ্র আর উষ্কখুষ্ক চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বাসা থেকে বের হচ্ছিলাম।

“তুই আর মানুষ হইলি না, ভার্সিটি তে পরছ আর চলাফেরা ডোম-চামার এর মতো।”-রান্নাঘর থেকে আম্মার কর্কশধ্বনি।

প্রতিনিয়ত এসব শুনতে শুনতে আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি, স্কুলে তো আয়েশা ম্যাম সরাসরি বস্তির ছেলে বলেই ডাকতো। অনেক সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে চিরুনি নিয়ে চুলে হালকা আঁচড় কাটলাম…… ধুর, ডানহাতে অল্প পানি নিয়ে আমার হালকা ঝাড়ি দেয়া চুলের স্টাইলই ঢের ভালো।    

“এই ফ্রিপোট, কাস্টম, বিশ্বরোড, আগ্রাবাদ, ডেনহাট, জিইসি-ওয়াসা, ২ নম্বর, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, টার্মিনাল, রাস্তার মাথা – রাস্তার মাথা ”- কাটগড় বাসস্ট্যান্ড মোড়ে এভাবে হাঁকাতে থাকা এক রাইডারে দৌঁড়ে উঠলাম। বড় বাসে জিইসি পৌঁছতে দেড় ঘন্টার উপর লেগে যাবে, এই ছোট গাড়িগুলা একটু দ্রুত যায় বলে ১ ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছানো যায়।

-“আরে দোস্ত, তুই? তোর বাসা কি এদিকে নাকি?”- ফ্রিপোর্ট থেকে উঠা গাট্টাগোট্টা চেহারার স্বাস্থ্যবান এক ছেলে আমাকে দেখেই প্রশ্ন ছুড়ে দিল। ক্লাসের সব বন্ধুদের সাথে এখনো ঠিকঠাক পরিচিতি হয়ে উঠেনি। মুখ দেখা চেনায় বলে উঠলাম-

-“হ্যাঁ, আমা বাসা তো কাটগড়। তোর? ”

- এইতো , নেভী কলোনী তেই।

-“আচ্ছা নাম কি যেন তোর? ”

-নিলয় , শাহরুল নিলয়।

-“ও আচ্ছা হ্যাঁ হ্যাঁ। ফেসবুক আইডি শ্যামবালক নিলয়?”

– “হ্যাঁ”

“শ্যাম মানে কালো, এই নাম তো আমার হওয়া উচিত ছিল, বরংচ "গাট্টাগোট্টা নিলয়" বা "হোঁৎকা নিলয়" দিলে মন্দ হতো না” – মনে মনে বললাম আমি। সল্টগোলা ক্রসিং থেকে কাস্টমস ব্রিজ এর দিকে রাস্তা খালি পেইয়ে রাইডার সাঁই সাঁই করে ছুটছে, একদম পেছনে বসা দু-এক জন যাত্রী ভয়ে চেঁচামেচি শুরু করে দিল- “এ ভাই আস্তে চালান, এ ভাই মরি যাইয়ুম তো” 

আমি বেশ ভালোই মজা পাচ্ছি, নগদে রোলার কোস্টার এর ফিল নিচ্ছিলাম। শ্যামবালকের সাথে গল্প করতে করতে কবে যে জিইসি এসে পড়লাম খেয়াল নাই, তাড়াহুড়ো করে রাইডার থেকে নেমে দুজনে হাঁটা শুরু করলাম প্রবর্তক এর উদ্দেশ্যে।

আজও দেরি হয়ে গেল রুটিন ধরে রুম নম্বর খুজতে খুজতে। এই রুম নম্বর ধরে রুমে রুমে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতেই স্নাতকের দিনগুলি গেছে। এই রুমে প্রজেক্টার সমস্যা, অই রুমে চল… অই রুমে আবার এসির সমস্যা কিংবা কোন স্যার সিটি নিচ্ছেন, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকো… ইত্যাদি ইত্যাদি।

অনুমতি নিয়ে ক্লাসে ঢুকেই একদম পেছনে গিয়ে বসলাম, পেছনের দিকে এসিগুলো থাকে আর এসির হাওয়ার ঘুমানোর মজাই আলাদা। ইতোমধ্যেই পুরো বোর্ড আঁকিবুঁকি করে ভরিয়ে ফেললেন শারমিন ম্যাম। ডিসি সার্কিট, সিরিজ-প্যারালাল, কার্শফ রুল, ভোল্টেজ ডিভাইডার রুল হাবিজাবি সার্কিটে সার্কিটে পুরো ক্লাসের পরিবেশ থমথমে। ক্লাসেই কেউই আসলে কিছুই বুঝতেছিল না, না পারছিল বলতেও কারণ ম্যাম যে গতিতে পড়াচ্ছিলেন। আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল ম্যাম গলাধঃকরণ করে জ্ঞান হড়হড় করে বমি করছেন শ্রেণিকক্ষে, থামলেই গলায় আটকে যাবে জ্ঞান।

খাতা-কলম নিয়ে একসাথে লিখা আর ঘুমানো খুব স্কিলফুল একটা কাজ, যে সে এটা পারেনা। বরাবরের মতো আমিও ব্যর্থ, লিখতে লিখতে কয়েকবার ঘুমিয়ে কয়েকবার উঠেছি। ক্লাস শেষে সবাই "এই নদী ","এই নদী" করে হাঁকছিল। আমিও নদীর খাতার ছবি তুলে নিয়ে আবার আমার চেয়ারে গিয়ে বসলাম, এই যা… কোন নদী সেটা তো জানা হলো না। পরে অবশ্য জেনেছিলাম- "নাদিয়া নদী"।

একঘন্টার একটা ক্লাস বিরতির পরেই ICS ল্যাব। আনিস-মীরদের সাথে আজ গেলুম মজনুর টং এ নাস্তা করতে।

“এ মামা চা লন, মামা কি কফি চা খাবেন ? এই নেন মামা গোল্ডলিফ” – একাহাতে সমান তালে সার্ভ করছে, টাকা নিচ্ছে আবার ভার্সিটির ছেলেদের সাথে একান্তই আপনজনের মতো কথোপকথন চালিয়ে যাচ্ছে। চট্রগ্রাম মেডিকেলের এই উত্তর দিকের গেটটা প্রায়ই বন্ধ থাকে, মাঝে মধ্যে খোলা হয়। আর গেটের পাশ ঘেঁষেই মজনু মামার টং, প্রশস্ত হিজলার খালের উপর ছোট্ট কালভার্টের উপর জমে ভার্সিটির ছেলেমেয়েদের আড্ডার আসর। কফি চা টা খেতে মন্দ না, কিন্তু আজ লাঞ্চ করা যায় কোথায়? ভার্সিটির ক্যাফেটেরিয়া তে খাবারের দামের কারণে আজ বাইরে বের হওয়া, প্রবর্তক মোড়ে বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট। গলাকাটা দাম নেয়ার ভয়ে ওদিকে আর গেলুম না, বন-কলা দিয়েই লাঞ্চ সেরে নিলাম।

কম্পিউটার ল্যাবটা অনেক সাজানো গোছানো, শুনেছি সব মিলিয়ে ৬-৭ টার মতই কম্পিউটার ল্যাব আছে। ল্যাবে ঢুকেই একটা ডেস্কটপের সামনে বসে পড়লাম। যে কোন কম্পিউটার পেলেই কি কি সফটওয়্যার ইন্সটল আছে এটা চেক করা আমার পুরোনো স্বভাব। এদিকে বাকি সবাই যে যার মতো আড্ডায় ব্যাস্ত। হঠাৎ করেই সুন্দরী একজন ম্যাম ক্লাসে ঢুকলেন।

“আমি সাবরিনা তারান্নুম, তোমাদের CSE ডিপার্টমেন্ট এর লেকচারার। তোমাদের Theory ক্লাস আর ল্যাব দুটোই আমি নেব। এই যে দেখ বালাগুরুস্বামীর সি প্রোগ্রামিং এর এই বইটা তোমরা কিনে নিবা”- এসেই পরিচয়পর্ব শেষে সরাসরি টপিকে চলে গেলেন ম্যাম। প্রোগ্রামিং বলতে গেলে কিছুই বুঝিনা তখন, কি থেকে যে কি হয়ে যাচ্ছে আগা মাথা কিছুই ঠুকছিল না মাথায়। বেশ কিছুক্ষণ থিওরেটিক্যাল কথাবার্তা শেষে “Turbo-C” নামের একটি সফটওয়্যার খুলে বোর্ডে লিখে দেয়া প্রোগ্রাম টাইপ করতে বললেন ম্যাম। চোখে শুধু নীল আর নীল দেখছিলাম তখন, টাইপ করতে করতে ত্রাহিদশা।

সময় গড়িয়ে চলে, বেশ কজনই প্রোগ্রাম কমপাইল করে রান করে ফেলেছে। আমি এখনো টাইপিং শেষ করে উঠতে পারিনি। যেইনা টাইপ শেষ করে কমপাইল দিয়েছি, ওমা একি এতো এরর কেন?

“সি প্রোগ্রাম হলো কেস সেনসিটিভ, এইযে এখানে stdio.H  এর H ছোট হাতের , মেইন এর ভেতর প্রত্যেকটা লাইন শেষে সেমিকোলন হবে”- মিষ্টি গলায় বুঝিয়ে দিলেন ম্যাম।

এই কেস, এত ক্যারেক্টার যে মেইনটেইন করে কোড লিখতে হয় এইটা তো ক্লিয়ার করল না, নাকি ক্লাসে ঘুমাই ছিলাম কে জানে… এসব ভাবতে ভাবতেই দেখি কোড রান হয়েছে। উপস্থিত অনেকেই দেখলাম নিজ নিজ মোবাইল এর ক্যামেরা দিয়ে মনিটর স্ক্রীনের ছবি তুলছে। জীবনে প্রথম প্রগ্রামিং এর প্রথম কোড এর সাথে ছবি না তুললেই নয় এই ভেবে আমি মুখখানা কম্পিউটার এর মনিটর এর সামনে নিয়ে গিয়ে একটা সেলফি তুললাম। পরে ক্লাস শেষে জানতে পারলাম, সবাই বাসায় গিয়ে প্রোগ্রামিং অনুশীলন করার জন্যে কোডের ছবি নিচ্ছি। এখন আমার কি হবে ? আমার সেলফি তে তো থোবড়াটার কারণে কোডই বোঝা যাচ্ছে না।

<<<<<<আগের পর্ব                                            পরের পর্ব>>>>>>                                       

শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ২


“আমার ক্লাসে দশ মিনিট লেট পর্যন্ত ঢুকতে দেই, এরপর দরজা বন্ধ। তোমাদের সিনিয়রদের থেকে ব্যাপারটা ভালমতো জেনে নিও”

-স্যার,আসি ? জিইসি মোড় থেকে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে এসে জুতো স্লিপ করতে করতে দরজার হাতল ধরে কোনরকমে বেঁচে যাওয়া আমি চাপা গলায় শিক্ষককে প্রশ্ন করলাম। সবাই সমোস্বরে হেসে উঠল… মনে মনে ভাবলাম কি আজব ? এটা কি ফার্স্ট সেমিস্টার এর কেমিস্ট্রি ক্লাস না তবে?

-“ইতোমধ্যেই ২০ মিনিট লেট, আজকের মতো সবাইকে আসতে দিচ্ছি। পরবর্তী ক্লাস থেকে ১০ মিনিট পরেই দরজা লক”

এ কেমন শিক্ষক রে বাপু !!! মাথা নিচু করে শ্রেণীকক্ষে ঢুকতে ঢুকতে ভাবছিলাম।
-দেবাশীষ স্যার, বহুত ডেয়ারিং পাবলিক মামা। বড় ভাইদের থেকে শুনছি পাশ করতে দেয় না নাকি সহজে।
-আইত্তেরি… এরকম পাবলিক এখানেও ?
-হুম বন্ধু , পাবলিকের টিচার তো, তাই।
প্রথম ক্লাসেই রসায়ন শিক্ষক যথারীতি গন্ডাদুয়েক পড়িয়ে বইয়ের নাম লিখে দিয়ে বিকালের ল্যাব ক্লাসের আমন্ত্রণ জানিয়ে বিদায় নিলেন। স্কুল-কলেজে বাংলায় পড়ে আসা পদার্থের ভৌত অবস্থা, রাসায়নিক নাম-সংকেত-সমীকরণ আর পরমাণু মডেল-কে ইংরেজি তে লেকচার দিয়ে যেন ওহী বানিয়ে ফেললেন- সহপাঠীদের মুখের চেহারা দেখে তেমনটাই বোধ হয়েছিল।
তাকিয়ে দেখি লম্বা মেয়েটার খাতা নিয়ে সবাই টানাটানি করছে ছবি তুলবে বলে। কি এক প্রযুক্তি মানুষকে অলস বানিয়ে দিল, পুরো ক্লাস নোট না লিখে ক্লাস শেষে অন্যের খাতার ফটোসেশন। প্রতিটা ক্লাস শেষে সামান্যতম এই বিরতিতে শ্রেণীকক্ষ যেন মাছের বাজারে পরিণত হয়। আর আমি কোন এক কোণে গিয়ে চুপচাপ ঘুমাই, প্রচন্ড হই-হুল্লোর এর মাঝেও ঘুমানোর স্বভাবটা আমার বহুদিনের।

হই-হুল্লোর গুলো হতো ছোট ছোট কিছু গ্রুপে গ্রুপে, এই যেমন নাদিয়া (লম্বা মেয়েটা) আর শ্যামা নামের আরেকটা মেয়েকে কেন্দ্র করে আনিস, মীর, সিফাত, নোবেল, দীপ্ত, ইফতেখার – দের একটা ছোট গ্রুপ। পরবর্তীতে অবশ্য অনেক গ্রুপ গড়ে আবার অনেক গ্রুপ ভাঙ্গে। স্বভাবসুলভ ভাবেই আমি কোন নির্দিষ্ট গ্রুপের সাথে থাকতাম না, আমি থাকতাম আমার মতো। কিছুক্ষণ এদিক কিছুক্ষণ ওদিক আর ভাল না লাগলে যেখানে আছি ওখানেই ঘুম।

ঠিক কিছুক্ষণ আগেই সবার মাঝে হঠাৎ “ভাই” হয়ে যাওয়া আমি মাত্রই আমার ফ্লোর হারিয়েও মনে মনে খুব উৎফুল্ল বোধ করছিলাম। দারিদ্রতার দুষ্টচক্র তখন আমার উদারতার লাগাম টেনে ধরেছে, কেননা উপস্থিত অধিকাংশেরই ষাণ্মাসিক কোর্স ফি হয়ত পরিবার থেকেই আসবে, কিন্তু আমার সবকিছুই তো আমাকেই জোগাড় করতে হবে- নয়তো ছেড়ে দিতে হবে এটাও।
– গম্ভীর গলায় তার লেকচার শুরু করলেন দেবাশীষ পালিত স্যার।

স্যার আরো যোগ করলেন- “আমার ভাল করেই জানা আছে তোমরা যেসব স্কুল-কলেজ থেকে এসেছ হাতে গোনা গুটিকয়েক কলেজ ছাড়া আর কোথাও ল্যাব প্র্যাক্টিকাল গুলো ভালভাবে করানো হয় না,ল্যাব ই তো নাই- শেখাবে কি? আর এজন্যেই একরকম ভীতি তৈরী হয় ছাত্রছাত্রীদের মাঝে”
ল্যাব প্র্যাকটিকাল খাতায় আগে থেকে অই দিনের এক্সপেরিমেন্ট বিস্তারিত লিখে আনতে হবে, এক্সপেরিমেন্ট মিলানো শেষে সব পূরণ করে যেদিনের রিপোর্ট সেদিনেই সাইন করে নিতে হয়ে… নয়তো আর সাইন হবেনা।
-“স্যার আসি?”- ক্লাসের প্রায় আধ ঘন্টা পেরিয়ে যাবার পর একটা খাতা হাতে হেলেদুলে ল্যাবে প্রবেশ করছে ট্রাউজার আর স্যান্ডেল পরে আসা এক ছেলে।
- তুমি কি ভার্সিটির পিওন না স্টুডেন্ট ?
- জ্বি স্যার, স্টুডেন্ট। ইইই ফাস্ট সেমিস্টার।
- এটা কি নিজের বাসা মনে কর তোমরা? যা ইচ্ছা তাই পড়েই চলে আসবে? ভদ্রতার কোন বালাই নেই? আইডি বল তোমার?
- জানিনা স্যার।
- তো ল্যাব করতে আসছ কি জন্যে? নাম বল…
- জ্বি স্যার… সাইদুল। ও, ইসলাম …… না না স্যার , সাইদুল ইসলাম।
- নামও দেখছি ভুলে গেছ , এরপর থেকে আর এভাবে আসবে না।
-দোস্ত, তোদের কারো কাছে ১টা কলম হবে?
“নাহ”- সবাই মনযোগ দিয়ে স্যারের লেকচার শুনছে।
-পিন্সিল হবে পিন্সিল? একটা পিন্সিল হইলেও দে ভাই। আচ্ছা কেউ একটা পৃষ্ঠা ছিড়া দে না, আমি ভুলে লেখাভর্তি খাতা নিয়ে আসছি।
কিছুক্ষণ ধরেই সাইদুলের এসবে প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে স্যার নিজে থেকেই কলমের ব্যাবস্থা করে দিলেন, আমি আমি দিলাম একটা পৃষ্ঠা ছিড়ে। প্রায় আড়াই ঘন্টা ক্লাস হয়ে যাবার পরও শিক্ষক আমাদের ছাড়লেন না। বললেন ৩ ঘন্টার ল্যাব ক্লাস কাঁটায় কাঁটায় ৩ ঘন্টাই অতিবাহিত করতে হবে।

দুপুর আড়াই টা থেকে একটানা দাঁড়িয়ে ল্যাব ক্লাস করতে করতে অবশেষে সাড়ে পাঁচটায় গিয়ে আমাদের মুক্তি মেলে। দলবেঁধে হই-হুল্লোর করে লিফট ধরার জন্যে যাই। নিচে নেমে সহপাঠীরা ছোটখাটো জটলা করে আড্ডা শুরু করে, কিন্তু আমার যে আবার ৬ টা থেকেই দেবপাহাড় একটা টিউশন-এ যেতে হবে। চবির এক বড় ভাই এর মিডিয়ার মাধ্যমে নেয়া এই টিউশন- এখনো প্রথম মাসের টাকা উসুল করা বাকি। আমার আগেই বড় ভাই বলে দিয়েছেন আমি চুয়েটে পড়ি, আর এদিকে আমার হাতে প্রিমিয়ার এর ব্যাগ। এখন কি করি করি ভাবতে ভাবতে টিউশন এ পৌঁছে বাড়ির নিচতলায় আমার ব্যাগখানা লুকিয়ে রাখলাম আর ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীর নিয়ে ছাত্রীকে পড়াতে বসলাম।
খাস্তগীর স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী, আংকেল এর ভাষ্য অনুযায়ী- “উ একটু অংকে দুর্বল, পদার্থবিজ্ঞান ও নাকি তেমন একটা বুঝে না।”
-জ্বি আচ্ছা আঙ্কেল, চিন্তা কইরেন না।
ছাত্রীর সাথে পরিচিতিপর্ব শেষেই পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে কিছুক্ষণ জমিয়ে আড্ডা দিলাম। দৈনন্দিন জীবনে ফিজিক্স যে আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে আর খুব মজার ছলেই ফিজিক্স শেষা যায় তা ছাত্রীকে বুঝানোর চেষ্টা করলাম। এরপর উচ্চতর গণিতের দু-এক টা ম্যাথ করিয়ে দিয়ে ছাত্রীকে নিজে নিজে ম্যাথ করতে দিলাম।
-“স্যার,স্যার। উঠেন । ধরেন চা খেয়ে নেন।”
হঠাৎ ডাকাডাকি তে আবিষ্কার করলাম আমি ঘুমিয়ে পড়েছি ।
-“আসলে বুঝলে, সারাদিন ক্লাস করছি তো আমিও তাই খুব ক্লান্ত। আংকেল কে আবার বলতে যেও না”
-“আব্বু দেখছে আপনি ঘুমাচ্ছেন, আব্বু তো দরজার ওপাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।”

পেছনে গিয়ে গতদিনের চা-খাওয়ানো বন্ধু নুহাশের পাশে গিয়ে বসলাম আর প্রশ্ন করলাম- “এই স্যার এর পরিচয় কি-রে?”

পরবর্তী ক্লাসও ছিল একজন গেস্ট টিচারের – শুকলা ম্যাম। ইংরেজির একজন প্রবীণ শিক্ষিকা যে ছাত্রছাত্রীদের সাথে কতটা স্মার্ট, প্রাণোবন্ত আর মিশুক হতে পারেন তা শুকলা ম্যামের ক্লাস না করলে অজানা থেকে যেত। উনার ক্লাস উপভোগ করেনি এমন ছাত্রছাত্রী খুব কমই পাওয়া যাবে। প্রথম দিনেই শিক্ষিকার সাথে পুরো ক্লাস দল বেঁধে সেলফি তুলল – এ আমার আজীবন মনে থাকবে।

“অই আমার খাতা দাও। ” – উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে উঠল একটি নারীকণ্ঠ। আরেকটু হলেই কান্না করে দেবে বেচারী।

“ক্লাসের CR কে কে হতে চাও দেখি দাঁড়াও?”- শুনেই চেয়ারের হাতলের উপর থেকে মাথা তুলে চোখ কচলাতে কচলাতে দেখি একজন শিক্ষক শ্রেণী প্রতিনিধি নির্বাচন করছেন। অল্প কিছুক্ষণের জন্যে পুরো কক্ষে নিঃস্তব্ধতা নেমে আসলো, CR মানে যে শ্রেণী প্রতিনিধি তখন কেউ ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। অতঃপর শিক্ষক আশ্বস্ত করার পর ৪-৫ জন উঠে দাঁড়াল। ওয়ারিফ আর জিগর জোর করে আমাকেও দাঁড় করিয়ে দেয়। শেষমেষ সকলের মতামত নিয়ে সাজিদ ও শাওন কে দুই-CR নির্বাচিত করা হয়। ভাগ্যিস অইদিন নির্বাচিত হইনি, নয়ত পুরো চারটে বছর ফ্যাকাল্টি আর বন্ধুদের ফায়ফরমেশ খাটতে খাটতে মারা যেতাম।

ক্লাস শেষে নিচতলার সেই বিশাল ক্যান্টিন এ গিয়ে দেখি রমরমা বাজার। একটা ছোটখাটো বলরুম বললেও বোধ হয় চলবে। ছাত্রছাত্রীদের বসার সুবিধার্তে দুপাশের দেয়ালের সাথে কোমর সমান উচ্চতার শেড করা, আর মাঝে উন্মুক্ত পরিসর। এক কোণে ফুড কর্ণার ও ফটোকপি মেশিন এর দোকান। শেডে গ্রুপ করে বসে ছাত্রছাত্রীরা আড্ডা দিচ্ছে, জোড়ায় জোড়ায় কপোত-কপোতীরা তো আছে, কোন কোন আড্ডার মধ্যমণি গিটার হাতে এক যুবক, কেউবা আবার দল বেঁধে দেখাদেখি করে সাদা A4 কাগজে কিসব ছাইপাঁশ লিখেই যাচ্ছে-দুদিন পরেই জেনেছি এসব ল্যাব রিপোর্ট আর এসাইনমেন্ট।

ফুড কর্ণার এর সামনে আসতেই ওয়ারিফ খাওয়ানোর আবদার করে। পাবলিকের মতো ১০ টাকায় চা-সিঙ্গারা-চপ অন্তত না হোক, ১০০ টাকায় তো ৪-৫ জনের নাস্তার বিল হয়ে যাবে, এই ভেবে হ্যাঁ করে দিলাম। মাত্র সিঙ্গারা শেষ করে চায়ের কাপ মুখে তুলে নিয়েছি আর একঝাঁক পঙ্গপাল হাজির। ক্লাসের প্রায় সব বন্ধুরা এসে হাজির, ওয়ারিফ আর জিগর বড়মুখ করে বলে দেয়- “সানি ভাই খাওয়াচ্ছে”। ঠিক অই মুহুর্তেই গলা দিয়ে আর চা নামছিল না, কারণ পকেটে একটা মাত্র ১০০ টাকার নোট আর গুটিকয়েক ভাঙতি পয়সা।

ত্রাণকর্তা হয়ে আসলেন সাজ্জাদ ভাই সাথে জহিরকে নিয়ে। জহিরের ভাষায়-“আমাদের মধ্যে বিবাহিত বড় ভাই। ফ্রিল্যান্সার ভাই – সাজ্জাদ ভাই” “সাজ্জাদ ভাই,সাজ্জাদ ভাই”-আমি মনে মনে কয়েক লাইন স্লোগান দিয়ে দিলাম। এসেই সাজ্জাদ ভাই বললেনঃ “আপনারা যা খুশি খান। পিৎজা,কেক,বার্গার, কোক, চা-নাস্তা …… বিল আমি দিব।”

সাজ্জাদ ভাই-এর ট্রিট এ জম্পেস খেয়েদেয়ে আমরা কেমিস্ট্রি ল্যাব ক্লাসের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। হন্তদন্ত করে ঢুকেই শিক্ষক খুব দ্রুত পরিচিতিপর্ব শেষ করলেন।

“কেমিস্ট্রি থিওরি কোর্স বরাবরের মতো ৩ ক্রেডিট আর এই ল্যাব কোর্সটা ০.৭৫ ক্রেডিটের, বরাবরের মতোই আমার কেমিস্ট্রি ল্যাব কোর্সে পাশ করতে গেলে হাতে হাতে কাজ করতে হবে । Without proper performance I wouldn’t accept anybody for passing this course. And here are some basic instructions for you.”

বলে কি এই ব্যাটা !! আমার তো মাথা গরম হয়ে যাচ্ছিল। দশম শ্রেণীতে থাকতেই শুধুমাত্র পাঠ্যবইয়ের টপিক টা বুঝাইতে গিয়ে তসলিমা ম্যাম নারিকেল তেল আর সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড এর বিক্রিয়ায় সাবান তৈরী হাতে কলমে শেখালেন আর কলেজের টাইট্রেশন, লবন টেস্ট নাহয় বাদই দিলাম।

যাই হোক, জ্ঞানীর ভাব নেয়া আমার তখন সাজেনা তাই বাকি সবার মতো আনকোরার ভঙ ধরে লেকচার শুনতে লাগলাম।

স্যারের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে পড়িমরি করে ব্যাটা সাইদুল আমাদের টেবিলের দিকেই আসল। প্রত্যেকটা টেবিলে স্যার ৫ জন করে নির্দিষ্ট করে দেয়ায় এই বিজোড় পাবলিক-কে কোন গ্রুপ নিতে চাচ্ছিল না। এসেই

মেয়ের ছেলেমানুষি তে ধরা পড়ে গিয়ে আঙ্কেল দরজার ওপার থেকে বেরিয়ে এলেন আর আমি পুলিশের কাছে পাকড়াও হওয়া কোন অপরাধীর মতো জবুথবু হয়ে রইলাম। সেদিন বাসায় ফিরতে প্রায় ন-টা বেজে গিয়েছিল। ঘুমিয়ে পরার অনুশোচনা বাবদ পাক্কা দু-ঘন্টা পড়াই, আর রাস্তায়-ও প্রচন্ড জ্যাম ছিল বৈকি।

<<<<<আগের পর্ব                                       পরের পর্ব>>>>>>>>>

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ১


"The relationship between philosophy, science, engineering and technology. "

- ঠিক এই টপিক টার উপর সকাল ৮.৩০ থেকে শুরু করে টানা ১ ঘন্টা লেকচার দেয়ার পর স্যার বললেন "Now its time for a 5 minutes short break" - বলেই হনহন করে AKK স্যার শ্রেণীকক্ষ ত্যাগ করলেন।
তার এই ভাষ্যে মুগ্ধ হয়ে তাকেই আমি গুরু ভাবা শুরু করলাম- কেননা যে সময়টা নষ্ট করেছি তা সুদে-আসলে আমাকে উদ্ধার করতেই হবে, আর এজন্যে কারিগরী শিক্ষার কোন বিকল্প নাই। পরবর্তীতে অবশ্য সকাল-বিকাল ভার্সিটির টানা ক্লাস-ল্যাব আর কোচিং-টিউশন শেষ করে তার সেই বড় ভাই এর দোকানে যাওয়া হয়ে উঠেনি।
“আমগোর উপর দিয়া ৪ ঘন্টা বুল্ডোজার চালাইয়া বুইড়া এখন কয় কি ?”- পেছন থেকে এক ছাত্রের মৃদ্যুস্বরে প্রতিবাদ।
চায়ের ব্যাপারে আমার জুড়ি মেলা ভার, হোক কনকনে ঠান্ডা, বৃষ্টিস্নাত দিন কিংবা তপ্ত প্রখর রৌদ্রজ্জ্বল দুপুর। মাথা নিচু করে ঢুকলাম টঙঘরে। ছেলেটা বড্ড মিশুক, হাত মেলালাম।
-সুন্দর নাম। আমি সানি, দেখা হয়ে ভাল লাগল।
-সিগারেট কোনটা খাবি? গোল্ড লিফ, বেনসন না নেভী ?
-দুঃখিত, আমি আসলে সিগারেট খাই না। আমার চা-তেই চলবে।
-বুঝলি, ভার্সিটি তে আমার মামা আছে। এখানের ইইই-র ১ম ব্যাচ। এখান থেকে পড়ে এখানেরই লেকচারার হইছেন।
... ............খাইছে, এইখানেও মামা-চাচা- মনে মনে বললাম আমি।
পরে চা শেষ করে নুহাশের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জিইসি মোড় থেকে কাঠগড়ের বাস ধরলাম।

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসে প্রথম দিনেই এমন কুপোকাত হবো ভাবতে পারিনি। আনুষ্ঠানিক পরিচিতিপর্ব শেষেই এই প্রফেসরের দর্শন, বিজ্ঞান, প্রকৌশলবিদ্যা, প্রযুক্তি সব মিলেমিশে একাকার.....দুচোখে কেবলই সরষে ফুল দেখছিলাম। দাঁতভাঙ্গা ইংরেজি শব্দ শুনতে আর লিখতে লিখতে সবার প্রাণ ওষ্ঠাগত।

দিনটা প্রায় বছর পাঁচেক আগের জানুয়ারির একটি সুন্দর সকাল। অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে শহরের একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে আসা। জানি এতে অনেকেরই দ্বিমত থাকবে, কারণ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে সাধারণত কাঠখড় পুড়াতে হয় না। সত্য বলতে কি খুব ভাল ফলাফল করে উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পরও প্রায় বছর-দুয়েক ধরে কই মাছের মতো এদিক ওদিক খাবি খাচ্ছিলাম। পরপর দুবার মেরিন একাডেমি – তে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পরও ভাইবা তে অনুত্তীর্ণ হওয়ার ব্যার্থতায় চুলোয় গিয়েছিল আমার উচ্চশিক্ষা। অবশ্য স্বনামধন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে ভর্তি থাকায় গোটাকয়েক টিউশন জোগাতে বেগ পেতে হতো না, পাশাপাশি শহরে বেশ কিছু কোচিং সেন্টার এ পূর্ণকালীন ও খন্ডকালীন খ্যাপ মেরে আমার চলে যেত বিন্দাস।

সে যাই হোক, কোন এক কোচিং এ ক্লাস নিতে গিয়ে কলেজের পুরোনো বন্ধুর সাথে দেখা। তার সাথে দেখা না হলে হয়তোবা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াটাও হয়ে উঠতো না, কেননা প্রাইভেট ভার্সিটি মানেই মনে করতাম বিলাসিতা। সিটি কর্পোরেশন এর আওতাধীন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে এতো সুলভে পড়া সম্ভম তার কাছেই আশ্বস্ত হয়েছিলাম।

ইতোমধ্যেই এসব ভাবতে ভাবতে স্যার রোবটের মতো শ্রেণীকক্ষে ঢুকলেন। এসেই ঘোষণা দিলেন -“আমি তোমাদের গণিত-১ এর ক্লাসটি এডজাস্ট করে আগে নিয়ে এসেছি, ফিজিক্স-১ শেষেই শুরু হবে গণিত-১।”

খাইছে… আজকে তো শহীদ- সজোরে বলে উঠলাম আমি। মাত্রই পরিচিত হওয়া কিছু সহপাঠীরাও এককাট্টা হয়ে গেল, হবেনা স্যার হবেনা, ৪ ঘন্টা টানা ক্লাস করা সম্ভব না, আজকে প্রথম দিন… ১ ঘন্টা অন্তত মাফ করেন।

আমাদের স্বান্তনা দিয়ে স্যারও বোর্ডে লিখতে শুরু করে দিলেন। “ত্রি ইডিয়টস” এর ভাইরাসের কথা মনে পড়ে গেল আমার। মোটামুটি শ্রেণীকক্ষে সবাই কিছুটা ফ্রি হয়ে এসেছে আর স্যার বোর্ডের দিকে ফিরে লিখা আরম্ভ করা মাত্রই আমাদের পাশাপাশি কথোপকথন এর গুণগুণ শব্দ। ওয়ারিফ আমি আর জহিরের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ক্লাসে মাত্র ৩ টা মেয়ে কেন ?

ওয়ারিফ ছেলেটার সাথে আমার পরিচয় হয় ভর্তি পরীক্ষার আরো আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তার নাম আরিফ না ওয়ারিফ এইটা বুঝতে আমার আরো এক সপ্তাহ লেগেছিল। প্রথম থেকেই সে আমাকে ভরশা দিয়ে আসছিল। তার ভাষায়ঃ

- “প্রাইবিট ভার্চিটি বলি চিন্তা গরার কিছু নাই, সিডিএ মার্কেটে আমার বড় ভাই এর দোআন আছে… বেক ডইল্লে মোটর, পুশ, রিলে, সুইচ আছে অখানে। আমরা ক্লাস শেষ গরি অখানে গিয়ে কাজ শিখতে পারব। ”

ক্লাস নিতে নিতে স্যার প্রায় পৌনে চার ঘন্টা পার করে আমাদের মুক্তি দিলেন। যাবার আগে বলে গেলেন-“ফার্স্ট সেমিস্টার এ সব ব্যাচেই এরকম ক্লাস ভর্তি ছাত্রছাত্রী দেখি, ৭ম-৮ম সেমিস্টারে গিয়ে দেখা যায় হাতে গোনা জনা-বিশেক। নিজেরাই ঠিক করে নেন কোন দলে থাকবেন আপনারা?”

শিক্ষক যেতে না যেতেই পুরো ক্লাস আবার গমগম করে উঠলো, যেন একঝাঁক ভেড়ার পালের অবিরাম ডাকাডাকি। এরই মধ্যে ছোট ছোট পরিচিতিপর্ব হয়ে গেছে। যে যার সাথে পারছে পরিচিত হচ্ছে… আমি নির্লিপ্তভাবে চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে আরাম করছি আর যারা আসছে আমার হয়ে ওয়ারিফ আর জহির আমাকে তাদের মাঝে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।

লক্ষ্য করলাম… খুব লম্বা করে একটি মেয়ে, আর দুটি মেয়ে একটু বেটে করে প্রমান সাইজের। তাদের সাথে বন্ধুত্ব করার জন্যে তোড়জোড় চলছে সবার। খুব ফর্সা করে গুল্লু টাইপের একটু ওভার স্মার্ট দীপ্ত নামের একটি ছেলে দেখছিলাম তাদের সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করছে খুব, সাথে আছে মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা মীর নামের একটি ছেলে। শ্রেণীকক্ষখানা বিশাল হওয়ায় পেছনে বসে সবকিছু দেখছিলাম আর মুখ টিপে টিপে হাসছিলাম। সময়ক্ষেপণের জন্যে মোবাইল তো পকেটে ছিলই। সবাই প্রচুর সেলফি তুলছিল… এভাবে ওভাবে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্টাটাস দেবে হয়ত। আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা- এই বয়সটা আমি আরো দু-বছর আগে ফেলে এসেছি, এখন আমার এসব করা সাজেনা। পরে অবশ্য জানতে পেরেছি আমার চেয়ে সিনিয়র পাবলিক আরো আছে জনা-তিনেক এই ১৬তম ব্যাচে, যদিওবা দু-এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই আমি নিজেকে সবার মধ্যেই একজন হিসেবে আবিষ্কার করেছি।

প্রথম দিনেই কোন শ্রেণী প্রতিনিধি (CR) না থাকায় জহির দায়িত্ব নিয়ে ক্যামিস্ট্রি ল্যাব সেকশন এর গ্রুপ বিভাজন জানিয়ে দিল। জহির ছেলেটা খুবই ভদ্র, ধার্মিক আর দায়িত্বপরায়ণ। সেই প্রথম দিন থেকেই আমাকে ভাই বলেই ডাকছে …… আজও দেখা হলে ডাকে “সানি ভাই”।

সার্কিট-১ ক্লাসটিতে ম্যাম উপস্থিত না থাকায় সকলেই যে যার মতো বেরিয়ে পড়তে লাগল। কতিপয় সহপাঠী দল বেঁধে আড্ডা শুরু করল নিচতলার বিশাল ক্যান্টিনে। আমি তখনো সবার সাথে ভালভাবে মিশতে পারছিলাম না ওয়ারিফ , জহির আর জিগর ছাড়া । জিগর ছেলেটা ওয়ারিফের স্কুলের বন্ধু, খুবই ভদ্র, মিশুক আর দিলখোলা মানুষ। ওরে প্রশ্ন করলাম জিগর মানে কি-রে? প্রত্যুত্তরে বলল- “এইটা বোঝেন না ভাই, কলিজা কলিজা। কি করতে হবে জাস্ট বলেন। এই জিগর আপনার পাশে আছে।” – যাক, ছেলেটার নামের সাথে কাজের মিল আছে।

প্রথম দিনের ক্লাস আর হালকা কথোপকথন শেষে বাড়ি ফেরার রাস্তা ধরলাম, কোচিং সেন্টার গুলোতে যেতে হবে। রুটিন এডজাস্ট করতে হবে পরিচালকের সাথে বসে। যেতে যেতে হঠাৎ একটা চায়ের টং থেকে ডাক পড়লঃ

-“এই মাম্মা, কি খবর? এদিকে আয়, বয় । চা খাবি ? ”

-আমি নুহাশ, আজকে ক্লাসে দেখছিলাম তোকে।

                                                                                      পরের পর্ব>>>>>          

#বিঃদ্রঃ 

আমার স্নাতকের সময়কার স্মৃতিগুলো পর্ব আকারে লিখার চেষ্টায় আছি। প্রতি সপ্তাহে একটি-দুটি বা তিনটি করে পর্ব প্রকাশের চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। সবগুলি পর্ব ব্লগ আকারে থাকবে আমার সাইটে, নিচে প্রথম মন্তব্যে প্রথম পর্বের ব্লগ Link টি দেয়া হলো। যার যার প্রকৃত নামই ব্যাবহার করেছি, আর তাই কাউকেই ট্যাগ দিলাম না। যদি আল্লাহ সুস্থ রাখে আশা করছি সুন্দর একটি সিরিজ উপহার দিতে পারব ইনশাআল্লাহ ।

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...