শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা -পর্ব ১৮



ভোর পাঁচটা… ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বাস জিইসি মোড় নামিয়ে দিল। আমি আর সুব্রত নেমে প্রবর্তক এর দিকে হাঁটা শুরু করলাম, রাশেদ চলে গেল দুই-নাম্বার গেটের দিকে। জিইসি মোড়ে একটাও গাড়ি চোখে পড়ছিল না যে বাসায় ফিরে যাব, তাই সময় অতিবাহিত করতে একটু এদিক ওদিক হাঁটাহাঁটি। সুব্রত ছেলেটা খুব সিরিয়াস, সারারাত জার্নি করে এসেও সকাল সাড়ে আটটার ক্লাস নাকি মিস দেয়া যাবে না…কি না কি পরীক্ষা আছে, আর তাই এখন প্রবর্তক গিয়ে মন্দিরে উঠবে…বিশ্রাম নিয়ে পরে সকালের ক্লাসে আসবে। আমারও ক্লাস ছিল বটে, আমার কাছে এসব থোরাই কেয়ার…দু-একদিন ক্লাস না করলে কিই বা হবে আর ! সুব্রতকে একটু এগিয়ে দিয়ে মিনিট বিশেক অতিবাহিত করতেই কাটগড়ের গাড়ি পেয়ে যাই আর উঠে পড়ি। বাসায় ফিরে পুরো দিনটাই ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম এক রকম।

পরদিন… ক্লাস শুরুর আগে আমি আর রাশেদ বাকিদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম পেছনের দিকে বসে। হঠাৎ নুহাশ এসে আমাদের নাম ধরে ডাকল…
-IUT তে প্রতিযোগিতায় যারা যারা গেছে তাদেরকে মুন্না স্যার ডাকছে। সানি, রাশেদ, সুব্রত…এদেরকে ডাকছে স্যার।
-খাইছে, কেইস খেয়ে গেলাম নাকি ?
-জানিনা, আমাকে বলছে শুধু তোদেরকে পাঠাই দিতে। আর কিছু বলে নাই।
ভার্সিটির কোন স্যারকে না জানিয়েই আমরা নিজেরাই একরকম এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলাম, এই খবর হয়তো স্যারদের কানে গেছে। আর এজন্যেই ডাক পড়েছে টিচার্স রুমে… আমার মুখ থেকে আর কথা বার হচ্ছিল না। নিজেদের দোষ স্বীকার করে নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই, নিজেদের এই বুঝ দিয়ে তিনজনই ভয়ে ভয়ে টিচার্স রুমে গেলাম।
-স্যার, আসব?
-হ্যাঁ, আস…আস। স্যার এদের কথা বলছিলাম। এরা IUT তে গেছে…Mecceleration কন্টেস্ট এ।
মুন্না স্যার কথাগুলো বলছিলেন রুমে থাকা টোটন স্যার-কে লক্ষ্য করে। রুমে থাকা অন্যান্য স্যার-ম্যাডামদের সবার চোখ আমাদের তিনজনের দিকে। অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম আমরা…মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছিল না। সময় টাও কেন যেন থমকে গেছে, “কোনক্রমে এই যাত্রায় রক্ষা পেলেই বাঁচি”-মনে মনে এই প্রার্থনা করছিলাম। সহসা সহকারী অধ্যাপক টোটন চন্দ্র মল্লিক স্যার আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন…
-কোন সেমিস্টার?
-স্যার, সেকেন্ড সেমিস্টার।
-বাহ, তোমাদের আগ্রহ দেখে ভালো লাগল। এই আগ্রহ যাতে শেষ পর্যন্ত থাকে। এই মুন্না, আমি গেলাম…ক্লাস আছে।
ঠিক বুঝলামনা ব্যাপারখানা কোনদিকে মোড় নিচ্ছে। আসন্ন বিপদের সম্ভাবনা এখনো জিইয়ে রেখেছি মনে মনে। ঠিক তখনই থমথমে পরিবেশ ঠান্ডা করলেন মুন্না স্যার।
-হ্যাঁ, তারপর বলো ওইখানে কি কি শিখছ? কারা কারা আসছে?
-অনেক কিছুই তো দেখলাম স্যার। ঢাকার অনেক নামকরা ভার্সিটি থেকে ছেলেপিলেরা আসছে। চট্রগ্রাম থেকে শুধু আমরা গেছিলাম।
-কি কি প্রজেক্ট আনছে মনে আছে?
-আর্ডিনো আর রাসবেরি পাই নিয়ে বেশির ভাগ প্রজেক্ট। আমরা জাস্ট একটা মডেল নিয়ে গেছিলাম।
-যাই হোক, প্রথমবার গেছ শিখছ তো। এভাবে বিভিন্ন কন্টেস্ট এ যাবা, নতুন নতুন প্রযুক্তি শিখে নিজেরা অইটা নিয়ে কাজ করবা, আরো ডেভেলপ করে বেটার কিছু বানাবা। আর কোন হেল্প লাগলে আমিতো আছিই।
-ঠিক আছে স্যার।

আমাদের সবার কলিজায় পানি আসল, যা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। মুন্না স্যার আমাদের ইইই ডিপার্টমেন্ট এর প্রথম ব্যাচের স্টুডেন্ট ছিলেন। স্নাতক শেষ করে নিজের ভার্সিটি-তেই ফ্যাকাল্টি হিসেবে যোগ দেন। গত সেমিস্টার থেকেই এর-ওর কাছে উনার ব্যাপারে শুনে যাচ্ছি, স্টুডেন্টদের কোন সমস্যার সমাধান হচ্ছে না…মুন্না স্যার আসলেন তো প্রব্লেম সলভ। একজন ভার্সিটির শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের সাথে এতোটা আন্তরিক হতে পারে তা আমার জানা ছিল না। এককথায় প্রতিনিয়ত ডিপার্টমেন্ট এর শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের মাঝে এক মধুর মেলবন্ধন সৃষ্টি করে যাচ্ছেন সবার প্রিয় এই মুন্না স্যার। শুনেছি রোবোটিক্স ক্লাবটাও নাকি উনারই সুন্দর চিন্তার ফসল। টিচার্স রুম থেকে বেরুতে গিয়ে আবার কি মনে করে ঢুকলাম…
-স্যার, আর্ডিনো কিভাবে শিখব ?
-তুমি এক কাজ কর, আগে সার্কিট ডিজাইন শিখ, মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে জান। “প্রোটিয়াস” আর “মিক্রো-সি” সফটওয়্যার দুইটা আমার কাছ থেকে নিয়ে যাবা ।
-আচ্ছা ঠিকাছে, আসি স্যার। আসসালামু-আলাইকুম।
টিচার্স রুম থেকে বেরিয়ে সোজা ক্লাসে ঢুকে গেলাম। অনিল স্যারের ক্লাস, স্যার আজ রেজোনেন্স নিয়ে পড়াচ্ছিলেন।
-একটা ফ্রিকোয়েন্সি আরেকটা ন্যাচারাল ফ্রিকোয়েন্সির সমান বা কাছাকাছি হইলে তাঁকে রেজোনেন্স বলে। এসি সার্কিটে যখন দুইটা রিএকটেন্স একটা আরেকটা কে ক্যান্সেল করে দেয়, মানে XL = XC  হয় তখন যে ফ্রিকোয়েন্সি পাই অইটাকে রেজোনেন্স ফ্রিকোয়েন্সি বলে।
-স্যার বুঝতেছিনা । মিশন স্যারকে লক্ষ্য করে বলল।
-আচ্ছা, তাহলে একটা ঘটনা বলি। জাপানে প্রচুর ভূমিকম্প হয়, আমার ছেলে জাপানে পিএইচডি করছে ওর থেকে শুনা ঘটনা টা। একদিন ভূমিকম্প হচ্ছিল, আমার ছেলেসহ ফ্লাটের সবাই নিচে নেমে আসে। পুরা বিল্ডিং এমনে এমনে দুলছিল (হাত নাড়িয়ে স্যার বুঝানোর চেষ্টা করছিলেন, বিল্ডিং ঠিক কিভাবে দুলছিল)…কিন্তু বিল্ডিং এর কিছুই হচ্ছিল না।
-নিচে মনে হয় রাবারের পাইলিং করছে স্যার। কেউ একজন আগ্রহ নিয়ে স্যারকে জানাল।
-হতে পারে। এইখানে মেইন পয়েন্টটা হচ্ছে রেজোনেন্স। ভূমিকম্পের ফ্রিকোয়েন্সি বিল্ডিং এর নিজস্ব ফ্রিকোয়েন্সি কাছাকাছি হয়ে গেছিল , তাই একটা আরেকটা কে ক্যান্সেল করে দিচ্ছিল বলে বিল্ডিং ভেঙ্গে পড়ে নাই।

যাহ বাবা, ওদিন সত্যি বলতে কি এসি সার্কিট এর মাথা-মুণ্ডু কিছুই বুঝি নাই। কেবল এই বিল্ডিং এর রেজোনেন্স জিনিসটা মাথায় ঢুকে গেছিল যা এখনো পর্যন্ত আর বের হয় নাই। ক্লাস শেষে নিচে ক্যান্টিনে গিয়ে দেখি একটা বড়সড় মিটিং হচ্ছে। মিটিং এর বিষয় “ভ্যাট আন্দোলন”।
-“যে, করেই হোক আমাদের এই আন্দোলন কে ত্বরান্বিত করতে হবে। এভাবে বসে বসে ক্লাস করলে চলবে না। ক্লাস বর্জন করতে হবে এখন থেকে।”
কথাগুলো বলছিলেন একটু বেটে করে গৌরবর্ণের একজন দিদি। দেখেই মনে হচ্ছিল উনি আমাদের ক্যাম্পাসের নন, পরে অবশ্য জানতে পেরেছি চবির বামফ্রন্ট এর একজন নারী নেত্রী উনি। ছাত্রদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করতে করতে চেহারার এই বেহাল দশা। আমাদের এমনই কাউকেই হয়তো প্রয়োজন ছিল, শান্তিপূর্ণ ছাত্র-আন্দোলন সংগঠিত করা থেকে শুরু করে সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মতো বিচক্ষণ দিক নির্দেশনা উনার মাথা থেকেই আসছিল।
-দিদি, তাহলে কি কাল থেকে আমরা ক্লাস করব না ? বন্ধু সাজিদ দিদিকে কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করল।
-ক্লাসে ঠিকই আসবে, পরশু আমরা একটা সংহতি সমাবেশ এর পরিকল্পনা করেছি। প্রতিবাদ জানাতে দুপুর ১২ টা থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান নেব আমরা। অন্যান্য ভার্সিটিতেও জানানো হয়েছে এই কর্মসূচি।
-আমাদের ভার্সিটি থেকে কারা কারা আছেন ?
-তোমরা তো আছই প্রত্যেক সেকশন এর শ্রেণি প্রতিনিধি রা ছেলেপিলেদের সংগঠিত করবে, আর তোমাদের বিবিএ ডিপার্টমেন্ট এর সিনিয়র ভাই শিমুল এই সমাবেশ এর নেতৃত্ব দেবে।
-আপনি থাকেন না দিদি।
-নাহ, আমি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সক্রিয় আছি। আমার নেতৃত্ব দেয়া মানায় না, তবে সবসময় পাশে আছি তোমাদের।

হালকা চা-নাস্তা শেষে সমাবেশ শেষ হলো। এরপর যে যার মতো চলে এলো। এদিকে সকাল থেকে সমানে ফোন করে যাচ্ছে ছোটবোন তামান্না।
-ভাইয়া, কই তুই? আজ না আমাদের প্রতিযোগিতা !
-ও হ্যাঁ হ্যাঁ। তোরা কোথায়?
-আমরা জামালখান…এখানে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। আমাদের প্রজেক্ট টা প্রব্লেম করতেছে। তাড়াতাড়ি আয়…
-আচ্ছা, ২০ মিনিট…আমি আসতেছি।
এরই মধ্যে বিজ্ঞান জয়োৎসব এর জন্যে আমার নির্দেশনা মতো প্রকল্প তৈরী করে ফেলেছে ছোট বোন ও তার সঙ্গীরা। সমুদ্রের উপরের আর নিচের স্তরের তাপমাত্রার পার্থক্য-কে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প। এক্সপেরিমেন্ট এর সেটআপ হিসেবে দুটো বীকারে থাকা ঠান্ডা-আর গরম পানির মধ্যে কপার আর জিঙ্কের পার ডুবিয়ে একটা এমিটার দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহ পাওয়া যাচ্ছিল। প্রতিযোগিতাস্থলে পৌঁছে দেখি এমিটার টা কোন কারণে মান দিচ্ছে না, এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ প্রবাহ দেখানো টাও খুব জরুরি । নয়তো এই প্রকল্প মাঠে মারা যাবে। বিশাল এক কনভেনশন সেন্টারে হচ্ছে এই প্রতিযোগিতা, আশে পাশে শয়ে শয়ে প্রতিযোগী তাদের উদ্ভাবনী প্রকল্প প্রদর্শন করছে। এরকম একটা সিরিয়াস কন্ডিশনে প্রকল্প কাজ না করলে কি পরিমাণ টেনশন হয় তা আমার নিজেরো অভিজ্ঞতা আছে। বিসিএসআইআর ল্যাব আয়োজিত বিজ্ঞান মেলায় স্কুল-কলেজ থেকে যখন প্রতিবার অংশ নিতাম তখনও এরকম হরহামেশা ঘটত। কিন্তু এদের জন্যে এই অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ নতুন, যত দ্রুত সম্ভব একটা সমাধান করতে হবে।
-ভাইয়া, কি হবে এখন? একটু পরই বিচারক আসবে।
-টেনশন করিছ না। ভাইয়া আছি না। সব আমার উপর ছেড়ে দে।
ব্যাগ থেকে আমার নিজের ডিজিটাল মাল্টিমিটার বের করে সংযুক্ত করলাম…তাও কোন মান পাচ্ছিলাম না, এরপর জিঙ্ক আর দস্তার পাত দুটো পানি থেকে বের করে হালকা ঘষে পরিষ্কার করে নিলাম। আগের পানিগুলো ফেলে ছোট বোনের ফ্রেন্ড তাসনিয়া কে বললাম…
-এবার পানি ঢাল তো দেখি …ঠান্ডা, গরম।
-ইয়েহহহহ…

মাল্টিমিটারে রিডিং দিচ্ছে… মেয়েরা খুব খুশি এখন। এতটাই নার্ভাস হয়ে পড়েছিল যে তিনজন … বিচারক এলে হয়তো কান্নাই করে দিত। ওদিকে বেশ কটা দিন কোচিং এ ক্লাস কামাই করা হয়েছে, তাই আমাকে কোচিং এ ক্লাস নিতে যেতে হবে। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সারাটা দিন ওদের সাথে থাকতে পারলাম না। ফিরে আসার পথে ওদের অভয় দিলাম। “আমার দায়িত্ব শেষ, যা বলার এবং করার তোমাদেরই করতে হবে এখন”।
>>>>>> 
সন্ধ্যায় কোচিং এ ক্লাস নিয়ে বের হচ্ছিলাম…হঠাৎ বেজে উঠল ফোন…অপরিচিত নাম্বার।
-ভাইয়া, আমরা কলেজ সেকশন থেকে “চ্যাম্পিয়ন” হয়েছি। অনেক অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া।
-ধুর পাগলি, কিসের ধন্যবাদ? এ আমার কর্তব্য ছিল, উপস্থাপন তো তোরাই করেছিস।
আনন্দের আতিশয্যে আমার দু-চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। ফোনের ওপাশেও হয়ত ওরা খুব কান্নাকাটি করছিল। তাদের অনেক পরিশ্রমের ফসল এই জয়। আমি কেবল পেছনে থেকে প্রযোজকের ভূমিকা পালন করে গেছি। দুদিন আগে ঢাকার IUT থেকে খালি হাতে ফিরে আসার আফসোস কেটে গেছে ওদের বিজয়ে। সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনা বোঝা সত্যিই কঠিন, দুচোখ মুছে আবারো দুহাত তুলে মন থেকে বললাম…আলহামদুলিল্লাহ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...