শুনেছি জাপানিরা নাকি খুবই সময়সচেতন আর প্রচন্ড তৎপর তাদের কাজের প্রতি। কোন এক স্যারের কাছ থেকে একবার জেনেছিলাম তাদের প্রচন্ড ক্ষুরধার মস্তিষ্ক আর অনুভূতির ব্যাপারে। ব্যাপারটা ছিল এমন, স্যার ট্রেনে করে রওনা দিয়েছিলেন ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে, কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর দেখলেন আশে-পাশের অনেক জাপানি ঘুমিয়ে পড়েছে। স্যারও তাদের দেখাদেখি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, পরে যখন ঘুম থেকে উঠলেন তখন আবিষ্কার করলেন গন্তব্য ছেড়ে অনেক দূরে চলে এসেছেন অথচ সাথের যাত্রীরা ঠিকঠাক গন্তব্যে নেমে পড়েছে। অর্থাৎ জাপানীরা তাদের সেন্সকে এমনভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে যে গন্তব্য আসলেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কিভাবে যেন মিলে যায় বুঝিনা, অথচ আমি জাপানি না। সেই কাটগড় থেকে বাসে উঠে প্রায় এক ঘন্টার বাস-জার্নি করে জিইসি আসতে না আসতেই কিভাবে যেন আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়...মজার ব্যাপার হচ্ছে কখনোই ক্যাম্পাসে যাবার পথে গন্তব্য মিস করিনি।
এভাবে যেখানে সেখানে ঘুমিয়ে পড়াতে আমার জুড়ি মেলা ভার,
একবার তো এতোটাই ক্লান্ত ছিলাম যে বাসে সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ঘুমিয়ে পড়েছি।
আজকের সকালের ক্লাস ছিল সামিনা ম্যামের মেশিন-১, সেই সাতসকাল থেকে ম্যাম শিটের পরে
শিট পড়িয়েই যাচ্ছেন। ডিসি জেনারেটর এর গঠন, ক্যারেকটারিস্টিক কার্ভ, অপারেশন
ইত্যাদি ইত্যাদি। এভাবে প্রজেক্টারে স্লাইড আর শিট দেখে কি কোন ইন্টারেস্ট আসে...ধুর...ভেবেছিলাম
মেশিন নিয়ী বিস্তারিত কতো কিছু জানবো এই কোর্সে...সব আশাই গুড়েবালি। এসব ভাবতে না
ভাবতেই ম্য্যাম হঠাৎ করী বললেন- “এখন একটা ভিডিও দেখাব, ডিসি জেনারেটর কিভাবে কাজ
করে”। ভিডিও দেখাবার কথা শুনে পোলাপান কিছুটা নড়েচড়ে বসল। কিন্তু ভিডিও শুরু হতে
না হতেই...ওমা একি? সাদাকালো কেন? ইংরেজিতে মোটা ও ভারী গলায় ডিসি জেনারেটর এর ভেতরের
গঠন, কলকব্জা, কার্যপ্রণালী ইত্যাদি প্রদর্শিত হচ্ছিল কিন্তু সাদা-কালো ভিডিওতে ঠিক
কেন যেন মনঃপূত হচ্ছিল না। সবশেষে ম্যাম একটা ছোট এনিমেশান ভিডিও দেখিয়ে লেকচার শেষ
করলেন।
থিওরি ক্লাস শেষ করে কাজল মামার টঙ্গে নাস্তা করতে করতে আড্ডা
দিচ্ছিলাম আমি আর ওয়ারিফ। কথাচ্ছলে হঠাৎ ওয়ারিফ বলে বসল-“কিরে, তোদের সেকশান এর না
এখন মেশিন ল্যাব?”... “এই যা, একেবারেই ভুলে গিয়েছিলাম। আসি বন্ধু...” এই বলে দৌড়াতে
দৌড়াতে মেশিন ল্যাবে পৌঁছলাম, গিয়ে দেখি আজিম স্যার এরই মধ্যে নাম ডাকা শুরু করে
দিয়েছে।
-“রোল নাম্বার সেভেন টুয়েন্টি এইট?”
-“ইয়েস স্যার।” ল্যাবের দরজা খুলেই সৌভাগ্যক্রমে আমার রোল
নাম্বার শুনতে পেয়ে প্রেজেন্ট দিয়ে দিলাম।
-“কে আপনি?”
-“স্যার, মেশিন-১ ল্যাব। এই সেকশান এর স্টুডেন্ট”।
-“ল্যাব ক্লাস তো অর্ধেক হয়ে গেছে, এসে কি করবেন?”
-“প্রেজেন্ট তো দিলাম স্যার, আর দেরি হবেনা”।
-“ঠিক আছে, আপনার প্রেজেন্ট দিয়ে দিব। একটা এসাইনমেন্ট নেন
তাহলে। আগামী ল্যাব ক্লাসে এসাইনমেন্ট নিয়ে আসবেন, নাহয় আপনার এই ল্যাব এবসেন্ট
দিয়ে দিব”।
-“ওকে স্যার, সমস্যা নাই”। চাহিবামাত্র ইঞ্জিনিয়ারিং
স্টুডেন্টদের কাছে, এসাইনমেন্ট দিতে বাধ্য থাকিবে--- মনে মনে বললাম।
-“আপনার এসাইনমেন্ট হচ্ছে একটা পেন ক্যামেরার সার্কিট এর
ভেতর কি কি আছে তা দেখে বিস্তারিত লিখবেন”।
-“কিন্তু স্যার, এটাতো মেশিন ল্যাব...মেশিন রিলেটেড কিছু
দেন”।
-“বেশি কথা বলেন ক্যান এ? যেটা বলছি ওইটাই লিখে আনবেন”।
-“ওকে স্যার”
আজকের ল্যাবে নাকি ট্রান্সফরমার নিয়ে পড়ানো হয়েছে, ল্যাব
টেকনিশিয়ান ভাইয়ের কাছে জিজ্ঞাস করলাম...
-ভাই, এখানে কি হাই-ভোল্টেজ ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফরমার আছে?
-এখানে এমন এমন ঈন্সট্রুমেন্ট আছে যেটা চট্রগ্রামে আর কোথাও
নাই।
এই ভাঙ্গা রেকর্ড উনার কাছে শুনতে শুনতে বিরক্ত, আমার মাথায়
আসছিল না আদৌ ট্রান্সফরমার কি ইন্সট্রুমেন্ট না মেশিন? এইসব ভাবতে ভাবতে বাকি
সময়জুড়ে এই টেবিল থেকে ওই টেবিলে ঘুরে কাটিয়ে দিলাম। ল্যাব ক্লাস শেষে স্যার সবার
জন্যে একটা ল্যাব রিপোর্ট দিলেন ...
-“শুনেন, আপনারা সবাই পরের ল্যাবে একটা ডিস্ট্রিবিউশন
ট্রান্সফ্রমারের রেটিং এর ছবি তুলে রিপোর্ট লিখে আনবেন”।
-“স্যার, ডিস্ট্রিবিউশান ট্রান্সফরমার কি আমাদের ল্যাবে
নাই?” – ফস করে মুখ দিয়ে কথাটা বেরিয়ে গেল।
-“আপনি চিনেন ডিস্ট্রিবিউশান ট্রান্সফরমার কি?”
-“স্যার, ওই যে রাস্তার পাশে খাম্বার উপর থাকে না...ওইগুলা”।
-“তো? আপনি আমার সাথে ফাইজলামি করেন?”
-“না স্যার, সরি”
দেখলাম এরই মধ্যে ল্যাব টেকনিশিয়ান কোথায় গায়েব হয়ে গেল, অথচ
কিছুক্ষণ আগেই সে আমাকে বলছিল...এখানে এমন কিছু আছে যা চট্রগ্রামে নাই। এভাবেই দিনের
পর দিন ফেঁসে গেছি আমি, আমার বাবা, তার বাবা, তারও বাবা।
ক্যাম্পাস থেকে বাসায় ফেরার পর গোছল সেরে খেয়েদেয়ে কোচিং এ
গিয়ে জানতে পারলাম আমার দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র হুমায়ুন আর আমাদের মাঝে নেই। বেশ
কয়েকদিন ধরে দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে ভুগছিল সে। খুব হাসিখুশি আর প্রানবন্ত ছেলেটার
মুখ আমার চোখে ভেসে উঠল, মনে পড়ল উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর পদার্থবিজ্ঞান পড়ানো যেদিন
শুরু করেছিলাম...কোচিং এ একাদশ শ্রেণীর তিনজন ছাত্রী আর একজন ছাত্র। সেই দিনগুলোর
কথা ভেবে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল আর মনে পড়ে গেল জীবনানন্দের কবিতার দুটি লাইন...
“মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়;
অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে।”
