বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ২৯

 


শুনেছি জাপানিরা নাকি খুবই সময়সচেতন আর প্রচন্ড তৎপর তাদের কাজের প্রতি। কোন এক স্যারের কাছ থেকে একবার জেনেছিলাম তাদের প্রচন্ড ক্ষুরধার মস্তিষ্ক আর অনুভূতির ব্যাপারে। ব্যাপারটা ছিল এমন, স্যার ট্রেনে করে রওনা দিয়েছিলেন ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে, কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর দেখলেন আশে-পাশের অনেক জাপানি ঘুমিয়ে পড়েছে। স্যারও তাদের দেখাদেখি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, পরে যখন ঘুম থেকে উঠলেন তখন আবিষ্কার করলেন গন্তব্য ছেড়ে অনেক দূরে চলে এসেছেন অথচ সাথের যাত্রীরা ঠিকঠাক গন্তব্যে নেমে পড়েছে। অর্থাৎ জাপানীরা তাদের সেন্সকে এমনভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে যে গন্তব্য আসলেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কিভাবে যেন মিলে যায় বুঝিনা, অথচ আমি জাপানি না। সেই কাটগড় থেকে বাসে উঠে প্রায় এক ঘন্টার বাস-জার্নি করে জিইসি আসতে না আসতেই কিভাবে যেন আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়...মজার ব্যাপার হচ্ছে কখনোই ক্যাম্পাসে যাবার পথে গন্তব্য মিস করিনি।

এভাবে যেখানে সেখানে ঘুমিয়ে পড়াতে আমার জুড়ি মেলা ভার, একবার তো এতোটাই ক্লান্ত ছিলাম যে বাসে সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ঘুমিয়ে পড়েছি। আজকের সকালের ক্লাস ছিল সামিনা ম্যামের মেশিন-১, সেই সাতসকাল থেকে ম্যাম শিটের পরে শিট পড়িয়েই যাচ্ছেন। ডিসি জেনারেটর এর গঠন, ক্যারেকটারিস্টিক কার্ভ, অপারেশন ইত্যাদি ইত্যাদি। এভাবে প্রজেক্টারে স্লাইড আর শিট দেখে কি কোন ইন্টারেস্ট আসে...ধুর...ভেবেছিলাম মেশিন নিয়ী বিস্তারিত কতো কিছু জানবো এই কোর্সে...সব আশাই গুড়েবালি। এসব ভাবতে না ভাবতেই ম্য্যাম হঠাৎ করী বললেন- “এখন একটা ভিডিও দেখাব, ডিসি জেনারেটর কিভাবে কাজ করে”। ভিডিও দেখাবার কথা শুনে পোলাপান কিছুটা নড়েচড়ে বসল। কিন্তু ভিডিও শুরু হতে না হতেই...ওমা একি? সাদাকালো কেন? ইংরেজিতে মোটা ও ভারী গলায় ডিসি জেনারেটর এর ভেতরের গঠন, কলকব্জা, কার্যপ্রণালী ইত্যাদি প্রদর্শিত হচ্ছিল কিন্তু সাদা-কালো ভিডিওতে ঠিক কেন যেন মনঃপূত হচ্ছিল না। সবশেষে ম্যাম একটা ছোট এনিমেশান ভিডিও দেখিয়ে লেকচার শেষ করলেন।

থিওরি ক্লাস শেষ করে কাজল মামার টঙ্গে নাস্তা করতে করতে আড্ডা দিচ্ছিলাম আমি আর ওয়ারিফ। কথাচ্ছলে হঠাৎ ওয়ারিফ বলে বসল-“কিরে, তোদের সেকশান এর না এখন মেশিন ল্যাব?”... “এই যা, একেবারেই ভুলে গিয়েছিলাম। আসি বন্ধু...” এই বলে দৌড়াতে দৌড়াতে মেশিন ল্যাবে পৌঁছলাম, গিয়ে দেখি আজিম স্যার এরই মধ্যে নাম ডাকা শুরু করে দিয়েছে।

-“রোল নাম্বার সেভেন টুয়েন্টি এইট?”

-“ইয়েস স্যার।” ল্যাবের দরজা খুলেই সৌভাগ্যক্রমে আমার রোল নাম্বার শুনতে পেয়ে প্রেজেন্ট দিয়ে দিলাম।

-“কে আপনি?”

-“স্যার, মেশিন-১ ল্যাব। এই সেকশান এর স্টুডেন্ট”।

-“ল্যাব ক্লাস তো অর্ধেক হয়ে গেছে, এসে কি করবেন?”

-“প্রেজেন্ট তো দিলাম স্যার, আর দেরি হবেনা”।  

-“ঠিক আছে, আপনার প্রেজেন্ট দিয়ে দিব। একটা এসাইনমেন্ট নেন তাহলে। আগামী ল্যাব ক্লাসে এসাইনমেন্ট নিয়ে আসবেন, নাহয় আপনার এই ল্যাব এবসেন্ট দিয়ে দিব”।

-“ওকে স্যার, সমস্যা নাই”। চাহিবামাত্র ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্টদের কাছে, এসাইনমেন্ট দিতে বাধ্য থাকিবে--- মনে মনে বললাম।  

-“আপনার এসাইনমেন্ট হচ্ছে একটা পেন ক্যামেরার সার্কিট এর ভেতর কি কি আছে তা দেখে বিস্তারিত লিখবেন”।

-“কিন্তু স্যার, এটাতো মেশিন ল্যাব...মেশিন রিলেটেড কিছু দেন”।

-“বেশি কথা বলেন ক্যান এ? যেটা বলছি ওইটাই লিখে আনবেন”।

-“ওকে স্যার”

আজকের ল্যাবে নাকি ট্রান্সফরমার নিয়ে পড়ানো হয়েছে, ল্যাব টেকনিশিয়ান ভাইয়ের কাছে জিজ্ঞাস করলাম...

-ভাই, এখানে কি হাই-ভোল্টেজ ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফরমার আছে?

-এখানে এমন এমন ঈন্সট্রুমেন্ট আছে যেটা চট্রগ্রামে আর কোথাও নাই।

এই ভাঙ্গা রেকর্ড উনার কাছে শুনতে শুনতে বিরক্ত, আমার মাথায় আসছিল না আদৌ ট্রান্সফরমার কি ইন্সট্রুমেন্ট না মেশিন? এইসব ভাবতে ভাবতে বাকি সময়জুড়ে এই টেবিল থেকে ওই টেবিলে ঘুরে কাটিয়ে দিলাম। ল্যাব ক্লাস শেষে স্যার সবার জন্যে একটা ল্যাব রিপোর্ট দিলেন ...

-“শুনেন, আপনারা সবাই পরের ল্যাবে একটা ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফ্রমারের রেটিং এর ছবি তুলে রিপোর্ট লিখে আনবেন”।

-“স্যার, ডিস্ট্রিবিউশান ট্রান্সফরমার কি আমাদের ল্যাবে নাই?” – ফস করে মুখ দিয়ে কথাটা বেরিয়ে গেল।

-“আপনি চিনেন ডিস্ট্রিবিউশান ট্রান্সফরমার কি?”

-“স্যার, ওই যে রাস্তার পাশে খাম্বার উপর থাকে না...ওইগুলা”।

-“তো? আপনি আমার সাথে ফাইজলামি করেন?”

-“না স্যার, সরি”

দেখলাম এরই মধ্যে ল্যাব টেকনিশিয়ান কোথায় গায়েব হয়ে গেল, অথচ কিছুক্ষণ আগেই সে আমাকে বলছিল...এখানে এমন কিছু আছে যা চট্রগ্রামে নাই। এভাবেই দিনের পর দিন ফেঁসে গেছি আমি, আমার বাবা, তার বাবা, তারও বাবা।

ক্যাম্পাস থেকে বাসায় ফেরার পর গোছল সেরে খেয়েদেয়ে কোচিং এ গিয়ে জানতে পারলাম আমার দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র হুমায়ুন আর আমাদের মাঝে নেই। বেশ কয়েকদিন ধরে দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে ভুগছিল সে। খুব হাসিখুশি আর প্রানবন্ত ছেলেটার মুখ আমার চোখে ভেসে উঠল, মনে পড়ল উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর পদার্থবিজ্ঞান পড়ানো যেদিন শুরু করেছিলাম...কোচিং এ একাদশ শ্রেণীর তিনজন ছাত্রী আর একজন ছাত্র। সেই দিনগুলোর কথা ভেবে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল আর মনে পড়ে গেল জীবনানন্দের কবিতার দুটি লাইন...

“মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়;

অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে।”

<<<আগের পর্ব       পরের পর্ব >>>>


বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ২৮


 

হে মহাজীবন, আর কাব্য নয়, এবার কঠিন কঠোর গদ্যে আনো,

পদ-লালিত্য ঝংকার মুছে যাক, গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো!

 

সাদামাটা জীবনের চরম বাস্তবতা-কে গদ্যীয় ঢঙে কবিতার মধ্যে ফুটিতে তুলতে পেরেছেন হাতে গোনা কিছু কবি-সাহিত্যিক। ছোটবেলায় যখন স্কুলে ছিলাম তখন প্রায়ই গদ্য-পদ্যের মধ্যে গুলিয়ে ফেলতাম...আর বড়বেলায় এসে যখন জীবনানন্দের কবিতাগুলো পড়া শুরু করলাম তখন মনে খটকা লাগলো- এ কি গদ্য, পদ্য নাকি দুটোর মিশেল কোন কিছু? সে যাই হোক আমাদের মতো আনাড়িদের জন্যে এই কঠিন কঠোর গদ্য্য আসেনি, মন যখন যা চায় তাই লিখে ফেলি...একে কি আর গদ্য বলা সাজে?

কড়া এলার্মের শব্দে ঘুম থেকে উঠলাম, উঠেই মনে পড়ল ... এই যা, আজকে তো ভার্সিটি তে আব্বুকে নিয়ে যেতে হবে। সেই কবে ছোটবেলায় আব্বুকে স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলাম, সেই দিনটার কথা মনে পড়লে আজো হাসি পায়। তখন শিশু শ্রেণিতে পড়ি, কোন এক সহপাঠী বেশ কদিন ধরে আমার গায়ের বর্ন নিয়ে খুবই খোঁটা দিচ্ছিল...মাঠে খেলতে গেলেই খেলাচ্ছলে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতো। বাসায় এসে মন খারাপ করে বসে থাকতাম, কাউকেই কিছুই বলতাম না। মনে মনে ভাবতাম, আমার সমস্যা আমাকেই সমাধান করতে হবে... কিন্তু কই আর, আম্মার কাছ থেকে তো কিছুই লুকোতে পারিনা। ঘটনা জানতে পেরে আমার অতি উৎসাহী আব্বা পরদিন স্কুল ছুটির পর স্কুলের গেটে হাজির। আমাকে কাছে টেনে নিয়েই আব্বু...

-কোন পুয়া ইভে তোরে মাইজ্জে আরে খালি দেখাই দে।

-থাক না আব্বু, কিছু হবেনা...চল, বাসায় চলে যাই।

-আই ইতেরে কান চাই ধরি তুলি ফেলাইউম, আর পোয়ারে কিল্লাই মারিল।

ঘটনার আকষ্কিকতা দেখে আমি ওই সহপাঠীকে দেখিয়ে দিয়েই আব্বুর কাছ থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে মুখ লুকাই। আর আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে আব্বু কিছুক্ষণ আগে যা বললেন তাই করে বসবেন। আমার আর প্রেস্টিজ বলে কিছু রইল না। সেই থেকে একাডেমিক যে কোন ব্যাপার আব্বুকে তেমন একটা জানাই না।

 

আজ অবশ্য তেমন কোন ঝামেলা নয়, আসলে হচ্ছে কি চেয়ারম্যান স্যার গার্ডিয়ান ডেকেছেন...না কোন অপরাধের জন্যে নয়। Poor Fund এর ওয়েইভারের জন্যে আবেদন করেছিলাম, এর আগে হচ্ছিল কি দুষ্টু ছেলেপিলেরা এই ওয়েইভারের টাকা পরিবার থেকে নিয়ে নিজেরা খরচ করে ফেলত। আর তাই এবার থেকে নতুন নিয়ম হয়েছে আবেদন করলে সাথে গার্ডিয়ান নিয়ে আসতে হবে। আব্বাকে সবকিছু বোঝানোর পর আমার অতি উৎসাহী আব্বা সকাল সকাল উঠে বসে আছেন, আর আমি আবারো কোন না কোন বিপদের গন্ধ পাচ্ছিলাম। নাস্তা করে দুজনে ক্যাম্পাসে গেলাম, অন্য্যান্য অভিভাবকদের সাথে আব্বু চেয়ারম্যান স্যারের সাথে দেখা করার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন আর আমি চলে গেলাম ক্লাসে।

মিটিং শেষ হলে পরে যখন আব্বুর সাথে দেখা হলো তখন আব্বু একগাদা অভিযোগ নিয়ে হাজির। আমার আগের সেমিস্টার এর ফলাফল ভালো হয়নি, আরো মনযোগী হতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। টিচার্স রুম থেকে নাকি মুন্না স্যার আমার ব্যাপারে আব্বুর কাছে প্রশংসা করেছেন, এটা জানতে পেরে কিছুটা স্বস্তি এলো মনে। যাক বাবা, এদিক-ওদিক ব্যালেন্স করা গেছে। এরপর আর ক্লাস না থাকায় আব্বুকে সাথে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। 

 

কোচিং আর টিউশন শেষ করে বাসায় এসে ল্যাপটপ খুলে বসলাম, মুন্না স্যার প্রোটিয়াস নামের একটা সার্কিট ডিজাইন এর সফটওয়্যার দিয়েছিলেন...ওটা নিয়েই গুতোগুতি করছিলাম। কি সুন্দর ইলেকট্রনিক্স লাইব্রেরি, যেটারই নাম লিখে সার্চ দিচ্ছি ওটাই পাওয়া যাচ্ছে...এরপর একটার সাথে আরেকটা কানেক্ট করে যেমন খুশি সার্কিট বানাচ্ছিলাম, কি যে আনন্দ লাগছিলো ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা। কাজ করতে করতে হঠাৎ মনে পড়লো শুভ স্যারের ল্যাব এসাইনমেন্ট এর কথা, একটা বাড়ির ফ্লোর বড় আর্ট পেপার এ ড্র করতে হবে। তাড়াতাড়ি সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম... আঁকাআঁকির যোগার-যন্তর করতে হবে যে। লাইব্রেরি থেকে আর্ট পেপার, পেন্সিল আর বড় দেখে একটা স্কেল নিয়ে নিলাম। বাসায় আসার পর টেবিলে আর্ট পেপার লাগিয়ে নিয়ে আয়োজন করতে করতে সময় গড়িয়ে চলছিল। ঠিক কোত্থেকে শুরু করব এটা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। অনেক খাটাখাটুনির পর যখন একটা মাল্টি-স্টোরেজ বিল্ডিং এর সিভিল ড্রয়িং শেষ করলাম তখন বাজে রাত দুইতা...কিভাবে যে রাত মধ্যরাত থেকে গভীর হয়ে গেলো টেরই পেলাম না।  

সকালে বেরোনোর সময় একটা ইঞ্জিনিয়ার ইঞ্জিনিয়ার ভাব এসে গেল নিজের মধ্যে, ব্যাগের ভিতর আর্ট পেপার রোল করে ঢুকিয়ে নিয়ে কিছু অংশ বাইরে রের করে দিলাম, লম্বা স্কেলটাও এভাবে বের করে রাখা হলো। নেহাত আর্কিটেকচার আর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্টদের মতো লম্বা ওই ইন্সট্রুমেন্ট বক্স কেনার সামর্থ্য ছিল না, তাই দুধের স্বাধ ঘোলে মেটানো যাকে বলে আরকি।

 

>>>>>>চলবে>>>>>>>

<<<<< আগের পর্ব    পরের পর্ব>>>>>

বৃহস্পতিবার, ১২ নভেম্বর, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ২৭

 



জানুয়ারীর এক শীতের দিনে আড়মোড়া ভেঙ্গে ঘুম থেকে উঠলাম, বেশ কটা দিন ছুটি কাটিয়ে আজ মনটা কেমন দুরুদুরু করছেআজকেই যে সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট পাবলিশ হবে !!! আগের সেমিস্টারের রেজাল্ট তেমন ভাল হয়নি, আর তাই এবারের রেজাল্ট কেমন হবে টা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছিল মনে। ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে ফেসবুকে ঢুকতেই দেখলাম সিআর শাওনের পোস্টঃ

কেউ অযথা কল দিয়ে বিরক্ত করবেন না, দুপুর একটার পর রেজাল্ট নোটিশ বোর্ডে টাঙিয়ে দেয়া হবে

য়ারিফকে ফোন করলাম ...

-অই, কাম্পাসে যাবি রেজাল্ট দেখতে?

-হুম, যাবো তো। তুই আসবি না?

-নাহ, আমার রেজাল্ট টা দেখে জানাইছ তো।

-আচ্ছা।

রেজাল্ট মোটামুটি ভালোই হয়েছিল, এই আমাদের মতো মিডবেঞ্চার দের যেমনটা আশা করা উচিত আরকি। দুপুরে খেয়েদেয়ে “স্টাডি জোন” কোচিং এ গেলাম। উচ্চ মাধ্যমিকের চলতড়িৎ পড়াতে পড়াতে আবিষ্কার করলাম ছাত্রছাত্রীরা খুব হাঁপিয়ে পড়েছে। কি আর করার, সার্কিট সলভ করা বাদ দিয়ে গল্প জুড়ে দিলাম। Current War এর গল্প, ছাত্রছাত্রীরা প্রথমে বিশ্বাসই করছিল না যে সাইন্টিস্টরা বিদ্যুৎ নিয়ে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করতে পারে। নিকোলা টেসলা আর এডিসন এর মধ্যে সেই ঐতিহাসিক এসি কারেন্ট আর ডিসি কারেন্ট এর যুদ্ধ। গল্প-গুজব শেষে যখন ছুটি হলে পরে পরিচালক হালিম স্যার মিটিং এ ডাকলেন। ইতোমধ্যেই “Youth Renaissance” নামে একটি সমাজসেবামূলক সংগঠন চালাচ্ছিলাম আমরা। সামনে একটা বড়সড় প্রোগ্রাম করার প্রাথমিক পরিকল্পনা হয়েছিল ওই আলোচনায়। সকলের মতামতে আলোচনার ফলাফল হিসেবে উঠে আসল “এডুকেশন ফেয়ার” ও “ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্প” এর আয়োজন।

নতুন সেমিস্টার এর কোর্স এনরোলমেন্ট শেষ করে পুরোদমে ক্লাসও শুরু হয়ে গেছে। ডিপার্টমেন্টাল কোর্সের মধ্যে মেশিন-১ আর ইলেকট্রনিক্স-১ মোটামুটি ভালই লাগছিল কিন্তু Electromagnetic Field & Wave কোর্সের ক্লাস শুরু হলেই সবার মাথাব্যাথা শুরু হয়ে যায়, এই কোর্সের সবকিছু একদম মাথার উপর দিয়ে যায়। সকাল সকাল ক্লাস থাকলে ক্যাম্পাসে আসাটা একটু বিরক্তিকর লাগলেও এক বছর পেরিয়ে এক রকম ক্যাম্পাসের মায়ায় পড়ে গিয়েছি। নিজের পরিবারের বাইরে এ যেন আরেকটা পরিবার, না আসলে...বন্ধুদের সাথে গল্প-আড্ডা না হলে কেমন খালি খালি অনুভব হয়। ক্লাসে সবার মুখে মুখে খুশির সংবাদ হচ্ছে- সাজ্জাদ ভাই বাবা হয়েছেন। আর ছেলেপিলেরাও নাছোড়বান্দা, ট্রিট না নিয়ে ছাড়বে না। শেষমেষ বাধ্য হয়ে ওদিন লাঞ্চ ট্রিট দিয়ে দিলে আমাদের জন-সাতেক ছেলেপিলেদের।

সকাল সকাল ক্লাস বাদ দিয়েই গেলাম মেডিকেলে, চট্রগ্রাম মেডিকেল এর ব্লাড ব্যাংক এর সামনে দাঁড়িয়ে রোগীর বড় ভাইকে কল দিলাম। একটা পাঁচ বছরের বাচ্চার ও পজেটিভ ব্লাডের প্রয়োজন ছিল, গতকাল রাতেই আমাদের CTG Blood Bank গ্রুপে জানতে পেরে সকাল সকাল চলে এসেছি আর এসেই ফয়েজ ভাই এর সাথে দেখা। চেনা নাই জানা নাই, শুধুমাত্র মানসেবার উদ্দেশে একজন এভাবে রক্ত দিতে আসবে এটা ফয়েজ ভাইয়ের অজানা ছিল। প্রতিটি রক্তদান শেষে আত্মীয় কিংবা রোগীর মুখের এই হাসি আর কৃতজ্ঞতা আমাকে আরো বেশি সমাজসেবার অনুপ্রেরণা জোগায়...জীবনের সার্থকতা আমি খুঁজে পাই এইসব ছোট ছোট গল্পে। তাড়াহুড়ো করে এসে ক্লাসে ঢুকলাম, দুঘন্টার ক্লাসের একঘন্টা ইতোমধ্যেই ফুরিয়ে গেছে...কারণ জানতে পেরে ম্যাম এটেন্ডেন্স দিয়ে দিলেন।

দুপুরের লাঞ্চের পর তিনঘন্টার বিশাল ল্যাব থাকলেই বিরক্ত লাগতো, কিন্তু সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন ল্যাবে শুভ স্যারের আন্তরিকতায় সেই ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে যায়।  অটোক্যাডের প্রাথমিক পাঠ দিতে দিতে স্যার নানান রকমের অনুপ্রেরণামূলক কথাবার্তায় ল্যাব মাতিয়ে রাখতেন আর নিজের উঠে আসার গল্প শোনাতেন। এদিকে স্যারের কথায় কর্নপাত না করে জাহিদ অনেক্ষণ ধরে নেট ব্রাউজিং করছিল। স্যারের চোখে পড়লে তাকে দাঁড় করালেন...

-এই তুমি হ্যাঁ, সাদা গেঞ্জি...দাঁড়াও।

-জ্বি স্যার?

-বলো কোন সফটওয়্যার নিয়ে বলছিলাম?

-স্যার...ইয়ে মানে কি যেন...অটোকাঠ মনে হয়।

অটোক্যাড কে অটোকাঠ বলায় পুরো ক্লাস অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল, স্যার নিজেও মুচকি হাসলেন। সেদিন ল্যাব শেষে বাড়ি ফেরার পথে জাহিদ আমাকে কথার পর কথা শুনিয়ে গেল- তার পাশে বসেও কেন আমি তাকে বললাম না কোন সফটওয়্যার। ফেরার পথে পুরো কান ঝালাপালা করতে করতে যখন দুজনে সীমেন্স হোস্টেল নামলাম তখন আমাদের প্রচন্ড ক্ষুদা। এরপর জাহিদ পাশের একটা দোকান থেকে দশ টাকায় এক প্লেট ছোলা আর বিশ টাকায় এক প্যাকেট মুড়ি কিনে নিলো, দোকানের টেবিলেই পেপার বিছিয়ে সামান্য ছোলার সাথে এক প্যাকেট মুড়ি মিশিয়ে গোগ্রাসে গিলতে শুরু করল জাহিদ। আমি প্রথমে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম, কি করছে এসব ও? জাহিদের ভাষ্যমতে ...

 

“কম টাকায় এর চেয়ে ভালো খাবার আর হয়না, দাঁড়াই আছস কেন? নে খাওয়া শুরু কর...”

মনে পড়ে গেল কবি সুকান্তের সেই বিখ্যাত কবিতার দুলাইন...

“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়

পূর্নিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।।”

<<<আগের পর্ব    পরের পর্ব>>>>

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...