এই সেমিস্টার
ব্রেক এ টুকটাক কাজ শেখার পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কার্যক্রমও কম করা হয়নি। আমাদের নব্য
গঠিত সমাজসেবামূলক সংগঠন “Youth Renaissance” বা “যুব নবজাগরণ” গুটি গুটি পায়ে তার
পথচলা শুরু করেছে। ইতোমধ্যেই বেশ কিছু ফলপ্রসূ সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। অথচ এই
আলোচনা, গোলটেবিল বৈঠক এক সময় আমার খুব বিরক্ত লাগতো। বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন রকম
মতামত আর দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা করে যে খুব সুন্দরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তা আমার এই
সংগঠনে থেকেই শেখা। এরই ফলাফল হচ্ছে পতেঙ্গা এলাকায় প্রথম ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্প।
প্রাথমিকভাবে আমরা প্রায় এক-দেড়শ মানুষের ব্লাড গ্রুপিং করে দিয়ে তাদের যোগাযোগের নাম্বার
সংগ্রহে রাখলাম ও সকলকে স্বেচ্ছায় রক্তদানে উৎসাহিত করলাম। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের
সাথে কাজ করতে গিয়ে নিত্য নতুন কিছু অভিজ্ঞতা যুক্ত হচ্ছে ঝুলিতে।
নতুন সেমিস্টার
এর এনরোলমেন্ট শেষ হয়েছে কদিন হলো, মজার ব্যাপার হচ্ছে বন্ধু রাশেদের প্ররোচনায় পড়ে
পরের সেমিস্টার এর ইকোনোমিক্স এই সেমিস্টারেই নিয়ে ফেলেছি দুজনে, এখন এডভাইজার স্যার
এক্সেপ্ট করলেই হলো। গতকাল ২০১৫-১৬ অর্থবছর এর বাজেট জাতীয় সংসদ এ উত্থাপন করলেন মাননীয়
অর্থমন্ত্রী। রাস্তা-ঘাটে-বাসে-চায়ের আড্ডায় সব জায়গাতেই এবারের বাজেট নিয়ে প্রচুর
কথা হচ্ছে। প্রায় ২৯৫ কোটি টাকার এই বাজেট আগের সব বাজেটের চেয়ে অনেক উচ্চাভিলাষী।
এই কর সেই কর-এ বাজেট পুরো জর্জরিত। তবে ক্যাম্পাসে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে প্রাইভেট
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপর আরোপিত ভ্যাট, কেননা এই ভ্যাট আগে পরে ছাত্রছাত্রীদেরই বহন
করতে হবে।
প্রবীণ অধ্যাপক
দৃঢ়তার সহিত ক্লাস নিয়ে যাচ্ছেন…
-তাহলে আমরা
কি পাইলাম? RLC সিরিজ সার্কিটে রেজিসটিভ ভোল্টেজ কারেন্টের সাথে ইন ফেইজ এ থাকবে, ইন্ডাকটর
ভোল্টেজ কারেন্ট কে ৯০ ডিগ্রী লীড করবে আর ক্যাপাসিটর ৯০ ডিগ্রী ল্যাগ করবে।
এই যে বাবা
তুমি বল তো দেখি, এই ইম্পিডেন্স টা কি?
- ম ম ম , বুঝিনাই
স্যার।
-আমি কি তোমাদের
বেশি দ্রুত পড়াই ? তোমরা বলবা না। যতবার বলবা ততবার বোঝাই দিব, না বুঝে মাথা নাড়বা
না। আর এগুলা তো সার্কিট-১ এ পড়ে আসার কথা, শারমিন পড়ায় নাই তোমাদের।
-আমাদের স্যার
এগুলা কিছুই বুঝাই দেয়া হয় নাই, দ্রুত পড়াই সিলেবাস শেষ করে দিছেন ম্যাম।
-বড়ই দুঃখজনক,
শারমিন আমার ছাত্রী…এখন ও যেহেতু বোঝায় নাই আমাকেই তো বোঝাতে হবে। নয়ত মাথার উপর বোঝার
মতো চেপে থাকবে। আমি তো আর দায়িত্ব ছেড়ে দিতে পারি না, এই যে মিশন তুমিই বলো ঠিক বলছি
কি-না?
-জ্বি স্যার
ঠিক।
ভাঙ্গা ভাঙ্গা
গলায় কথাগুলো বলছিলেন অধ্যাপক অনিল কান্তি ধর স্যার। উনি আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির
ডিন, তাই উনার উপর দায়িত্ব অনেক। হাজারো ব্যাস্ততার মাঝেও তিনি চেষ্টা করেন দুর্বল
ছাত্রছাত্রীদের জন্যে এক্সট্রা ক্লাস দিতে, ক্লাস শেষে কখনো কখনো প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের
নিজের অফিসে চা-বিস্কিটের দাওয়াত দেন। সত্য বলতে কি অনিল স্যারকে নিয়ে লিখার মতো যোগ্যতা
আমার নাই, পাতার পর পাতা শেষ হয়ে যাবে অনিল স্যারকে নিয়ে লিখা শেষ হবে না। যদিও আমরা
উনাকে খুব ভয় পেতাম কিন্তু উনি আমাদের খুবই স্নেহ করতেন। ক্লাস নিতে নিতে বার কয়েক
স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েও আবার আমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন বীরদর্পে। একমাত্র
উনার ক্লাসেই সিনিয়র জুনিয়র রিকোর্স-রেগুলার সবাই মিলেমিশে একাকার, কেননা উনি ঠিকঠাক
না লিখলে নাম্বার দিতেন না। এই ঠিকঠাক বোঝার জন্যে কারো কেটে যেত বছরের পর পর রিকোর্স
নিতে নিতে। তাই পাশ করতে না পারা ছাত্রছাত্রীরা মোটেই স্যারকে দেখতে পারত না।
-এই দোস্ত,
চল আজকে আশে পাশের কোথাও থেকে ঘুরে আসি। জাহিদ আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল।
-হুম,যাওয়া
যায় আশেপাশে কোথাও। কিন্তু কই যাবি ?
-প্রসেনজিত
রা সেদিন ওয়ার সেমেট্রি গেল, অইখানে যাওয়া যায়…এই নাঈম তুই যাবি?
-ক্লাস তো হবেনা
আজকে আর, চল যাই।
কমনওয়েলথ এর
“ওয়ার সেমেট্রি” হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাধিসৌধ। বাংলাদেশে দুটি সমাধিসৌধের মধ্যে
একটি কুমিল্লায়
এবং আরেকটি
চট্রগ্রামে বাদশা মিয়া রোডে অবস্থিত যা আমাদের ক্যাম্পাসের খুব কাছেই। এই সমাধিসৌধে
অবশ্য আগে আরো একবার আসা হয়েছিল, মাধ্যমিকের পর বন্ধুরা সবাই একসাথে। পাহাড়ি পিচঢালা
রাস্তা বেয়ে উঠতে বেশ কষ্ট হয়, খানিকটা উঠেই সমাধিসৌধের বিশাল ফটক। ফটকের বাইরে সবুজের
সমারোহ, খুব সুন্দরভাবে পরিচর্যা করে রাখা হয়েছে প্রতিটি গাছ। প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই
কাঁচের বাক্সে বিশাল একটি উন্মুক্ত বই যাতে প্রায় ৬৫০০ নাবিকের নাম লিখা আছে, এদের
সবাই ১৯৩৯-১৯৪৫ এ বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সমুদ্রে মৃত্যুবরণ করেছেন যাদের দেহাবশেষ মিলেনি
কখনো। প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই সমাধিএলাকার মাঝামাঝি বিশাল এক ক্রুশ। যদিও খ্রিস্টান,
মুসলিম, হিন্দুসহ কমনওয়েলথ দেশসমূহের বিভিন্ন ধর্মালম্বীদের বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মৃতদেহ
এখানে সমাহিত হয়েছে। প্রতিটা সমাধির উপর একটা করে বর্গাকার পাথরে নাম-ধাম পরিচয় লেখা।
-এই দেখ দেখ
কয়েকজন বিদেশী। নাঈম আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল।
-হ্যাঁ, ওদেরই
তো আত্মীয় ঘুমিয়ে আছে সৌধে।
দেখলাম খুব
কান্নাকাটি করছে কিছু বিদেশী মানুষ, দেখে ব্রিটিশ মনে হলো। বাবা,মা, পিচ্চি ছেলে…একটা
পরিবারই মনে হলো। ছেলেকে বোধ হয় দাদু কিংবা পরদাদুর সমাধি দেখাতে নিয়ে এসেছেন বাবা।
খুবই পবিত্র এই স্থান তাদের কাছে। আমরা বেশ কিছু ছবি তুলে সময়টুকু ফ্রেমবন্দী করে নিলাম।
বাইরে বেরিয়ে আসতে দেখলাম কিছু কলেজের ছেলেমেয়ে মিলে জন্মদিন উৎযাপন করছে। হায়-মনে
মনে আফসোস করলাম, কারো জন্যে এ স্থান মন খুলে দু-ফোটা চোখের জল ফেলার আর কারো জন্যে
হাসি রঙ্গ তামাশায় মেতে উঠার।
বাড়ি ফেরার
পথে গেলুম দেবপাহাড় সেই ছাত্রীকে পড়াতে। আজই তাকে শেষ পড়ানো, আমার পড়া নাকি ছাত্রীর
ভালো লাগছে না। অবশ্য ছাত্রীর নাকি ছাত্রীর বাবার পছন্দ হচ্ছিল না তা উপর ওয়ালাই ভাল
জানেন, ছাত্রীর বাবা পড়ানোর মাঝে এসেই আমাকে জানিয়ে গেলেন। এতদিন আরো ভালো টিউটর পাচ্ছিলেন
না, তাই আমাকেও সাফ সাফ জানিয়ে দিচ্ছিলেন না। নতুন টিউটর নাকি বুয়েট পাশ করা ইঞ্জিনিয়ার,
চট্রগ্রামে একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। হঠাৎ এমন এক ধাক্কায় আমার হিসেবটা
খানিক গোলমেলে হয়ে গেল, নতুন সেমিস্টার এর ফি দিতে হবে…তার উপর কদিন আগেই ঈদ গেল। জমানো
সব টাকা নিজের আর পরিবারের জন্যে এটা ওটা কিনে খরচ করে ফেলেছি, ফোনটাও নষ্ট হয়ে গেছে,
আম্মুর ফোনে সিম লাগিয়ে কোনরকমে জরুরি কথাটুকু সারছি।ওদিকে আবার পলোগ্রাউন্ড এর টিউশনটাও হাতছাড়া হয়ে গেছে, অবশ্য এরকম ঘেমে-নেয়ে কি কেউ টিউশন এ যায়? দোষটা তো আমারই ছিল। মুখে খুব সুন্দর হাসি নিয়ে বললাম-“জ্বি
আঙ্কেল, সমস্যা নাই। আপনি যেটা ভাল মনে করেন সেটাই”। ছাত্রীর বাবা যেতেই আবারো পড়ানো
শুরু করলাম। আমি মানুষটাই এমন, ভেতরে ভেতরে কষ্ট চেপে রেখেও হাসিমুখে আমার দায়িত্বগুলো
পালন করে যাই নিরন্তর। অথচ মনের ভেতরটা পুড়ে ছারকার হয়ে যাচ্ছে এ কষ্টটুকু বোঝার মতো
কেউ নেই। প্রথম দিনটির মতোই আমার অঙ্কগুলো আজও মিলছিল না, তাই সেই প্রিয় ফিজিক্স এর
কিছু গল্প করেই ইতি টানলাম আর রেখে গেলাম কিছু কথা।
-দেখ, আমি হয়ত
ধরে ধরে সৃজনশীল প্রশ্ন সমাধান করে দিচ্ছি না। আমি চেষ্টা করেছি তোমার মধ্যে সমাধান
করার ক্ষমতাটুকু গড়ে দেবার। শুধুমাত্র পরীক্ষা কে পাখির চোখ করে পড়লেই হবেনা, কি পড়ছি
কেন পড়ছি, কি শিক্ষা পেলাম তাও অনুধাবন করতে হবে। আশা করি বুঝতে পেরেছ, আর সময় পেলে
টুকটাক গল্পের বইও পড়বে… পাওলো কোয়েলহোর “দি আলকেমিস্ট” বইটা অবশ্যই পড়ে শেষ করবে,
ওটা আর ফেরত নেবো না।
-জ্বি স্যার,
শেষ করব।
বিদায় নেয়ার
সময় ছাত্রীর ছলছল চোখ তার মনের কথাগুলো বলে দিচ্ছিল। এভাবে আজ ঘরে ঘরে বাবা-মায়ের কড়া
শাসনে ছেলে-মেয়েরা নিষ্পেষিত। অন্ধকার গলি ধরে বেরিয়ে আসতে আসতে ভাবছিলাম সামনের দিনগুলির
কথা, কোত্থেকে যে সেমিস্টার ফি’র এতো টাকা জোগাড় হবে এই ভেবে চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল
জল। কিন্তু সে জল মাটিতে পড়ার আগেই শুকিয়ে যাচ্ছিল মিলিন মুখের ভাঁজ। বড়ই অনিশ্চিত
এ জীবন… মধ্যবিত্ত নামের এক অভিশাপে বন্দী।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন