মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ১৬



রাশেদ কে নিয়ে কোর্ট বিল্ডিং এলাম ম্যাপ প্রিন্ট করাব বলে। বেশ কিছু দোকান ঘুরে কোথাও ম্যাপ প্রিন্ট এর দোকান মিলল না, এখানকার সবাই ম্যাপ ফটোকপি করে। এরপর এক দোকানীর কাছে জানতে পারলুম কোতোয়ালী মোড়ে একটা ম্যাপ প্রিন্ট এর দোকান আছে। গেলাম প্রিন্টের দোকানে, গিয়ে দেখি এ দোকান না … পুরাই একখানা ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম। বিভিন্ন সিভিল আর আর্কিটেকচারাল ম্যাপ ডিজাইন ও প্রিন্ট করে থাকে এরা। বুঝতেই পারলাম, গলাকাটা দাম নেবে। কিন্তু কিছুই করার নেই আমাদের, এতদূর এগিয়ে এসেছি আর পেছানো যাবেনা। আমার থেকে সফট কপি নিয়ে বিশাল এক ডিজিটাল প্রিন্টারে দোকানী আমাদের চাক্তাই কমার্শিয়াল এলাকার ম্যাপখানা প্রিন্ট দিলেন, এতো বড় প্রিন্টার আগে কখনো দেখিনি। এই বিশাল প্রিন্টারের জন্যেই আলাদা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ। প্রিন্ট শেষে গুণে গুণে দিলুম ৫০০ টাকা, ব্যাটা ৮০০ টাকা চাচ্ছিল এই সামান্য ম্যাপ প্রিন্ট এর জন্যে। কি আর করার, অভিজ্ঞতা নাই আক্কেল সেলামি তো দিতেই হবে।

তাড়াহুড়ো করে কোচিং ক্লাস নিতে এসেই দেখি ছাত্রছাত্রীরা সব আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। এই একটা বিশেষ সময়ে আমার জগতের সব ভালো লাগা কাজ করে – জ্ঞান দান ও আহরণের জন্যে সবার তীব্র প্রতীক্ষা। আমি নিতান্তই নগণ্য একজন শিক্ষক, উপর ওয়ালার কৃপায় দু-চার কলম লেখাপড়া করেছি বলেই এই নগণ্য জ্ঞান ফেরী করে বেড়াই। তবে মাঝে মাঝে তাজ্জব বনে যাই আমার ছাত্রছাত্রীদের কাজকর্ম দেখে, মন থেকে একটা ভালো লাগা কাজ করে…ওদের থেকেও নিত্য নতুন কিছু শিখতে পারি।
ক্লাসে ঢুকেই দেখি অর্পনের আনা প্লাস্টিকের এক জারভর্তি পানি নিয়ে বাকি সবার রাজ্যের কৌতুহল। মুচকি হেসে কৌতুহল নিয়ে অর্পনকে জিজ্ঞাস করলাম-
-কিরে? কি জিনিস বানাইলি এটা?
-ভাইয়া, আপনি গত ক্লাসে তড়িৎ বিশ্লেষণ পড়াইছিলেন না? ওটা বাসায় চেষ্টা করছিলাম, একটু দেখেন তো।
-বাহ, দারুণ তো। এদিকে নিয়ে আয় তো দেখি।

জারভর্তি পানি আর কাগজে মুড়ানো খাবার লবণ নিয়ে সামনে এলো অর্পন, সাথে দুটো ছোট স্টিলের স্কেল, পেপার ক্লিপ আর ব্যাটারি। বেচারা বাসায় সংযোগ দিয়েই বুদবুদ উঠতে দেখে ঘাবড়ে যায়, তাই আজ ক্লাসেই সবকিছু নিয়ে এসেছে। যাই হোক, জানার আগ্রহ তৈরী করা গেছে এদের মাঝে তাতেই আমি খুশি। পানিতে খাবার লবন ঢেলে স্কেল দিয়ে ভালভাবে নেড়ে স্কেলদুটো জারের ভেতর রাখলাম আর ক্লিপ দিয়ে আটকে দিলাম। স্কেলের সাথে তার সংযুক্ত করে ব্যাটারি সংযুক্ত করতেই তড়িৎ বিশ্লেষণ চালু হয়ে গেল আর জারে ক্লোরিং গ্যাসের বুদবুদ উঠতে শুরু করল। ছাত্রীদের মধ্যে নিতু মেয়েটা বলে উঠল
-ভাইয়া, আমরা কি একটু দেখতে পারি?
-হ্যাঁ, অবশ্যই। এই অর্পন, এটা ওদের বুঝিয়ে দে।
-না, ভাইয়া আপনি বুঝাই দেন।
-আচ্ছা, ঠিক আছে কথা বলে নেই একটু…একটা জরুরি ফোন আসছে
এই মেয়েদের নিয়ে একটা সমস্যা, বকাও দেয়া যায় না রাগ করে কথাও বলা যায় না। আকাশের মেঘ কালো হতে হতে এমন এক অবস্থায় চলে যাবে যেন যে কোন সময়ই হতে পারে ভারী বর্ষণ। একবার আমার বন্ধু ইমরান বকা দিয়েছিল খুব করে, পরদিন মেয়ে তার বাবাকে নিয়ে হাজির। আর তাই এই বিষয়গুলো খুব সতর্কতার সাথে সামলাতে হয় যাতে সাপও মরে লাঠিও না ভাঙ্গে। 
-হ্যালো, ভাইয়া। কোথায় তুই?
-আমি কোচিং এ, ক্লাস নেই।
-শোন না, “প্রথম আলো বিজ্ঞান জয়োৎসব” এর জন্যে একটা প্রজেক্ট বানাই দিতে হবে। আমার মাথায় কিছু আসছে না।
-লাস্ট ডেট কবে? ফরম নিছিস?
-আরো দুদিন সময় আছে। ফরমে বিস্তারিত লিখে জমা দিতে হবে কাল-পরশু।
-আচ্ছা, সমুদ্রের পানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে একটা আইডিয়া আছে। রাতে বাসায় গিয়ে বিস্তারিত বলব।
-আচ্ছা, তুই ক্লাস নে। রাতে ফোন দিব।
ফোনের ওপাশে আমার ছোট খালার মেয়ে…তামান্না। নিজের কোন আপন বোন নাই, তাই তামান্নাকে আমি নিজের ছোট বোনের চেয়ে বেশি বলে মনে করি। তাড়াতাড়ি ক্লাস শেষ করে বাসায় ফিরে সমুদ্রের পানি থেকে বিদুৎ উৎপাদন নিয়ে লিখতে বসলাম। উচ্চ মাধ্যমিকের বইতে পড়েছিলাম, সীবেক ক্রিয়া। দুটি বস্তুর মধ্যে তাপমাত্রার পার্থক্য থাকলে এবং বস্তু দুটিকে একটি পরিবাহী তার দিয়ে যুক্ত করলে তারের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। যেহেতু সমুদ্রের পানির উপরের স্তর উষ্ণ এবং নিচের স্তর ঠান্ডা তাই এই তাপমাত্রার পার্থক্য কে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। আর এর একটা এক্সপেরিমেন্ট আগেই করে দেখছিলাম দুটি পাত্রে ঠান্ডা আর গরম পানি নিয়ে। যতদূর পারলাম লিখে শেষ করে চিত্রসহ বিশ্লেষণ করে পৌঁছে দিলাম ছোট খালার বাসায়।
>>>>> 

সকাল সকাল ক্লাস থাকলেই রাজ্যের যতো আলসেমি ভর করে আমার উপর। একেবারেই উঠতে ইচ্ছে করে না এই সাত সকালে আর তার ফলস্বরূপ ক্লাসগুলোতে ২০-৩০ মিনিট করে লেট। আজও দেরি করেই ল্যাবে এসেছি, প্রশাসনিক ভবনের তিনতলায় সার্কিট-২ ল্যাব। আমাদের এই ল্যাব কোর্সের শিক্ষক আকরাম স্যার খুব সাদাসিদে মনের মানুষ, অনেক দূর থেকে আসি এই বলতেই স্যারের মন গলে গেল…তেমন একটা ঝামেলা করলেন না।  
এই সার্কিট ল্যাবে গত সেমিস্টারেও কাজ করেছি, ল্যাবের ইন্সট্রুমেন্ট গুলো এমন যে ভালই পাঠ দিতে দিতে হঠাৎ করে এদের মাথা বিগড়ে যাবে। আর তাই প্রত্যেক গ্রুপের কিছু নির্দিষ্ট করা টেবিল থাকে, আর তারা ভাবে এই টেবিলের সেট করা ইন্সট্রুমেন্ট গুলাই তাদের জন্যে পয়া। আমার গ্রুপের টেবিল একদম শেষে চার নম্বর টেবিলটা। আমার অবশ্য কোন টেবিল নির্দিষ্ট করা নাই, আমি সব টেবিলেই কমবেশি ঘুরঘুর করি। টেবিলে এসেই প্রথম কাজ হচ্ছে অসিলোস্কোপ কেলিব্রেশন করা, এই এনালগ অসিলোস্কোপ গুলো কেলিব্রেট করা যে কত ঝামেলার তা এখন যারা ডিজিটাল অসিলোস্কোপ ব্যাবহার করছে তারা বুঝবে না।

-কিরে জাহিদ, আমাদের ফাংশান জেনারেটর ডিস্টার্ব দিচ্ছে কেন রে আজ?
-আমার মনে হচ্ছে পাশের টেবিলের প্রসেনজিত এটা ওদেরটার সাথে চেঞ্জ করে ফেলছে।
-কেমনে বুঝলি ? প্রমান আছে?
-গত ল্যাবে আমরা আগে আগে মিলিয়ে চলে গেলাম না, এরপর করছে শয়তানটা এই কাজ।
-যাই হোক, না দেখে কিছু বলা ঠিক না,
-আমাদের ইন্সট্রুমেন্ট এর পেছনে আমি J লিখে দিছিলাম, এইটার পিছে নাই।
-দাঁড়া, আমি দেখছি ব্যাপারটা।
ঘুরঘুর করতে করতে পাশের টেবিলে গেলাম, এরা আজ খুব হাসিখুশি। গতদিন আমরা আগে মিলিয়ে ফেলছি দেখে আমাদের সাথে আজ কথাই বলছে না, অন্যান্যদিন আমাদের টেবিলে এসে খোঁজ খবর নেয়। একটু ভাব জমানোর চেষ্টা করলাম প্রসেনজিত এর সাথে…
-বাহ, আজকে তো তোরা সবার আগে মিলাই ফেলবি দেখছি।
-হ্যাঁ দোস্ত, দেখ তো সার্কিট কানেকশন ঠিক আছে কিনা?
-ঠিকই তো আছে দেখছি।
-আজকে তাড়াতাড়ি মিলাই তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যাব।
-“হ, মিলাচ্ছি তোমাদের”। মনে মনে বললাম আমি।

এদের ফাংশান জেনারেটর এর পেছনে লক্ষ্য করলাম বড় করে J লিখা, আমার মনে আর কোন সন্দেহ রইল না। এদের কিভাবে জব্দ করা যায় তা ঘুরপাক খাচ্ছিল মাথায়। এই ইন্সট্রুমেন্ট তো এখন চাইলে আর দেবে না এরা। আমার চোখ পড়ল পাশেই থাকা ভ্যারিয়াক এর দিকে,নব ঘুরিয়ে ভ্যারিয়েবল এসি সাপ্লাই দেবার একটা যন্ত্র…অনেকটা কাঁধে ঝুলানো সেকেলে টিফিন বক্সগুলির মতো। কথা বলতে বলতেই ভ্যারিয়াক এর প্লাগ খুলে দুই তার শর্ট করে দিলাম। আজ দেখব “কত ধানে কত চাল”। কাজ সেরেই আমি আমার টেবিলে চলে এলাম।
-স্যার হয়ে গেছে আমাদের। প্রসেনজিত এর গ্রুপ থেকে সাব্বির স্যারকে ডাকল।
-কই দেখি। হ্যাঁ, ঠিক আছে এবার ভ্যারিয়াক থেকে এসি সাপ্লাই দাও।

প্রসেনজিত ভ্যারিয়াক এর প্লাগ সকেটে লাগাতেই বুম…মম, সাথে সাথে ওই টেবিলের ব্রেকার পড়ে গেল। স্যার এগিয়ে গিয়ে দেখলেন শর্ট সার্কিট…ভ্যারিয়াকের প্লাগ পুড়ে গেছে। আমি আর জাহিদ তো মনে মনে এত্তো খুশি…না পারছি গলা ছেড়ে গান গাই-“আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে…”
পরিদর্শকের ভাব নিয়ে পাশের টেবিলে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করে জানালাম…
-স্যার, ভ্যারিয়াক ঠিক আছে…ফিউজ আর প্লাগটা চেঞ্জ করে দিলে আবার চলবে।
-যাই হোক, অই টেবিলে আর কাজ কইরো না প্রসেনজিত। তোমরা পাশের গ্রুপের সাথে কাজ করো আজকে।

<<<<আগের পর্ব   পরের পর্ব>>>>

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...