আকমল
আলী রোড ধরে অলি গলি পেরিয়ে রিকসা এসে থামলো বেড়িবাঁধ এর কাছাকাছি, একটু পরেই খেজুরতলা
বীচ। সাগরের কোল ঘেঁষে বাঁধের এপারে গড়ে উঠা জেলেদের ছোট ছোট ঘর আর বেশ কিছু ভাসমান
মানুষের আবাসস্থল। ভাসমান লোক গণনা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মেজো খালার সাথে আজ এদিকটায়
এসেছি। যখনই কোন না কোন সমস্যায় পড়েছি মা-বাবার পরে এই জুলেখা খালার কাছেই সাহায্য
কিংবা পরামর্শ পেয়েছি। আমার এখনো মনে পড়ে, সেই ছোট্টবেলায় বয়স তখন সাত কি আট, জন্মদিন
পালন করতো না আব্বু-আম্মু কখনো। অইদিন কিছুই না জানিয়ে নানু আর মামাদের নিয়ে কেক, গিফট
সহ বাসায় এসে আমাকে চমকে দেয় এই জুলেখা খালা। বয়স যতো বেড়েছে জন্মদিনের উপর আগ্রহটা
ততোটাই কমেছে, মেজো খালাও তার পরিবার সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন আর বিশেষ কারো কোন
তাগিদেও কখনো কেক কাটা হয়ে উঠেনি। ও হ্যাঁ, স্নাতকের তৃতীয় বর্ষে গিয়ে সম্মিলিত কেক
কাটা হয়েছিল বটে…নোবেল, কামরুল আর আমি – তিনজনেরই জন্মদিন ছিল ওদিন। সে যাই হোক, হাঁটতে
হাঁটতে একখানা লম্বা বেড়ার টিনশেড ঘরের সামনে এলুম। দরজার বাইরে একটা এনজিও-র গণশিক্ষা
কার্যক্রমের সাইনবোর্ড।
-আন্টি,
এখন আমাদের কি করতে হবে ?
-কিচ্ছু
করতে হবেনা আজকে। আজকে হবে ট্রেনিং…কিভাবে ঘরে ঘরে গিয়ে গণনা করতে হবে তার বেসিক ট্রেনিং।
-ও
আচ্ছা, তাহলে তো ভালই হবে। নতুন কিছু শিখব।
ভেতরে
ঢুকতেই দেখি স্কুলঘরের মতো টুল-টেবিল বসানো, পুরো কক্ষ বিভিন্ন বয়সী মানুষে গিজগিজ
করছে। মাঝামাঝি গিয়ে বসলাম। মধ্যবয়স্ক একজন অফিসার আর আমার মেঝো খালা সামনে থেকে সবার
ক্লাস নিচ্ছিলেন। উপস্থিত সব গণনাকারীদের কয়েকটা গ্রুপে ভাগ করা হলো আর একজন করে সুপারভাইজার
নির্বাচন করা হলো প্রতিটি গ্রুপে। আন্টি আমাকে তার গ্রুপেই রাখলেন। দীর্ঘ দু-ঘন্টার
ক্লাস শেষে সবাইকে খাতা-কলম, পরিচয়পত্র আর ইন্সট্রাকশন ম্যানুয়েল বুঝিয়ে দেয়া হলো।
ক্লাস শেষে বুঝতে পারলাম ভাসমান মানুষ মানেই শুধু বস্তি এলাকা না, আশেপাশে টিনশেড কলোনীগুলোতে
যেসব দিনমজুর, গার্মেন্টসকর্মী কিংবা বিভিন্ন শ্রেণীপেশার অস্থায়ী মানুষ বসবাস করেন
তাদেরও গণনায় নিতে হবে। আমি আর আন্টি বাইরে বেরিয়ে এলাম…
-চল
আজকেই গিয়ে কিছু গণনা শেষ করে ফেলি। আমি এবং গ্রুপের বাকি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন
আন্টি।
-কিন্তু
আন্টি, এত বিশাল এলাকা। কোত্থেকে শুরু করব, সবাইকে একটা করে ম্যাপ দিলে ভাল হতো না?
-আরেহ,
এই এলাকার অলি-গলি সব আমার মুখস্থ। তোরে কোন কোন ঘরগুলা গুণতে হবে দেখাই দিব চল।
আমার
মাথায় কেবল ঘুরছিল, এভাবে প্রত্যেকটা ঘরে ঘরে গিয়ে গিয়ে কিভাবে প্রশ্ন করব- কোন পূর্ব-অভিজ্ঞতা
নেই এই কাজে। গ্রুপের বাকিদের তাদের গণনা এলাকা বুঝিয়ে দিয়ে আন্টি আমাকে নিয়ে চললেন।
খুব ঘিঞ্জিবস্তি এলাকা…আবর্জনার স্তূপ, নোংরা কলঘর আর অলি গলি পেরিয়ে আন্টির সাথে কয়েকটা
ঘরে গেলাম। আন্টি কিভাবে প্রশ্ন করছিলেন আর সম্পূর্ণ একটা নতুন পরিবেশের সাথে কি-করে
নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছিলেন তা বোঝার এবং শেখার চেষ্টা করছিলাম। এরপর একটা বিশাল টিনশেড
কলোনীর দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন আমাকে, প্রায় ৪০-৫০ খানা ঘর হবে এখানে। প্রতি গণনাকারীদের
১৫০ ঘর/খানার একটা টার্গেট সেট করে দেয়া হয়েছে। (বিবিএস এ খানা বলতে বোঝায় যারা এক
ঘরে থাকেন এবং এক হাঁড়ির খাবার খান ) আন্টি চলে গেছেন, একবুক নিঃশ্বাস নিয়ে মনে মনে
সাহস সঞ্চয় করে বললাম- “আমি পারব, আমাকে পারতেই হবে”।
-আসসালামু-আলাইকুম,
আমি একটা পরিসংখ্যান এর একটা জরিপের কাজে এসেছি। যারা এই এলাকায় অস্থায়ী তাদের গণনা
কার্যক্রম।
-হ্যাঁ,
আসুন।
-আপনিই
কি খানাপ্রধান মানে পরিবারের কর্তা?
-হ্যাঁ।
-আচ্ছা,
আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা জন্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট টি নিয়ে আসুন। আমার এখানে ১৫-২০
টির মতো প্রশ্ন আছে। এতে করে আপনার এবং আমার দুজনেরই সুবিধে হবে।
যতদূর
মনে পড়ে প্রথম ঘরের ওই ব্যাক্তি পেশায় ছিলেন একজন ভ্যানগাড়ি চালক, আর তার স্ত্রী গার্মেন্টসকর্মী।
নদীভাঙ্গনের কবলে ভিটে-মাটি হারিয়ে চলে এসেছেন চট্রগ্রাম। এভাবে দু-তিনটে ঘর গণনা করতে
করতে মোটামুটি আয়ত্ত্বে এসে যায় সবকিছু। প্রশ্নগুলোও মাথার মধ্যে সেট হয়ে যায়। বইখানার
প্রশ্নগুলো এমনভাবে তৈরী করা হয়েছিল যাতে করে একটা পরিবারের আর্ত-সামাজিক অবস্থার চিত্র
ঠিকঠাক তুলে ধরা যায়। কিছু কিছু ঘরে তো সরকারি পরিচয়পত্র দেখানোর পরও তথ্য দিতেই চাইছিল
না, এই গণনার উপর আসন্ন যে কোন দুর্যোগে সরকার থেকে পর্যাপ্ত সাহায্য পাবে- এমন ছাইপাস
বুঝিয়ে তথ্য নিতে হচ্ছিল। অথচ মধ্যসত্ত্বভোগীদের কল্যাণে এইসব সাহায্যের যে সুষম বন্টন
হয়না তা আপনি আমি সবাই জানি।
বিকেল
গড়িয়ে সন্ধ্যে নেমেছে, মাত্র ২০টি ঘর গণনা করতে পেরেছি আজ। প্রচুর গরম পড়েছে সারাদিন,
কাকফাটা রোদ সকাল থেকেই। একফোঁটা পানিও পড়েনি গলায় গত কয়েক ঘন্টায়, শেষের ঘরে পানি
চেয়ে নিয়ে পিপাসা মেটালাম। অনেক হয়েছে, আজ আর না। অধিকাংশ ঘরেই আবার তালা দেয়া, যা
বুঝলাম গার্মেন্টস ছুটির পর মানে সন্ধ্যের পর থেকেই গণনায় আসতে হবে। দিনশেষে এটুকুই
প্রাপ্তি, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে কথোপকথন যা আগে কখনো হয়ে উঠেনি। এরমধ্যে
পেশাজীবী-শ্রমজীবী মানুষ যেমন ছিল, তেমন ছিল আমার মতো ভার্সিটির ছাত্ররাও…ঘরভাড়া কম
হওয়াতে এদিকটায় এসে উঠেছে।
>>>>>>>>>>>>
আজ
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পূর্বঘোষিত সেই সংহতি সমাবেশ। ঢাকার রাজপথ ভ্যাট আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীদের
পদচারণায় মুখর, দেশব্যপী এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। সকালের
একটা ক্লাস শেষ করেই আমরা সবাই সমবেত হলাম ক্যান্টিনে। ব্যানার-ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড
রেডি করা হয়ে গেছে…ক্যাম্পাসের সামনে সবাই সমবেত হতে শুরু করল। পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্যাম্পাসের
সামনে থেকে মিছিল করতে করতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পৌঁছাবো আমরা। রাস্তার একপাশ পুরোপুরি
ব্লকড, আশেপাশের লোকজন সব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে… এ আবার কিসের মিছিল? প্রথম কয়েকটি
সারিতে হাতে হাত ধরে দৃঢ় মানবব্যুহ তৈরী করা হয়েছে…এরপর থেকে সারি সারি করে ছাত্রছাত্রীরা
যুক্ত হচ্ছে। ছাত্রীদের সামনের দিকে দাঁড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন মুক্তা দিদি- এও হয়তো
আন্দোলনের কোন কৌশল। আমি, ওয়ারিফ, শাওন, সাজিদ, নোবেলসহ যে যেভাবে পারছিলাম একটা সুশৃঙ্খল
র্যালির লক্ষ্যে ছাত্রছাত্রীদের সমবেত করছিলাম।
-এই
ওয়ারিফ, এদিকে আয়। আমি তুইসহ কয়েকজন একসাথে থাকব…ছাত্রছাত্রীদের মাঝের এই সারিতে, যাতে
করে কিছু হইলেই আমরা সামনে থাকা আপুদের প্রটেকশান দিতে পারি।
-আচ্ছা ঠিক আছে। আমি মীর, সিফাত আর তাহমিদ কেউ ডাকতেছি।
কিছুক্ষণের
মধ্যেই মাইকে ঘোষণা আসল- “আমরা এখন আমাদের যাত্রা শুরু করব কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের
উদ্দেশ্যে”। তৎক্ষণাৎ সামনে থেকে স্লোগান উঠল “নো ভ্যাট” কিংবা “ভ্যাট দিব না, গুলি
কর” ইত্যাদি। এই “No VAT on Education” এখন আমাদের সকলের প্রাণের দাবী হয়ে উঠেছে। কিছুক্ষণ
পর পর ওয়ারিফ এতোটাই উত্তেজিত হয়ে পড়ছিল যে, মিছিলের সামনে গিয়ে দু-একটা স্লোগান দিয়ে
আসছিল। আবার গলা ভেঙ্গে গেলে পরে পেছনে চলে আসছিল। একজন হাঁপিয়ে গেলে আরেকজন, এভাবেই
চলছিল- এক পর্যায়ে আমিও গেলাম সামনে। স্লোগান দিতে দিতে একটা মিছিলকে লীড করতে যে কি
প্রাণশক্তি তা সেদিন অনুভব করেছিলাম…… স্লোগানের ধ্বনি মিছিলের শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে
আর তারই প্রত্যুত্তরে মিছিলে থাকা সবাই একসাথে কণ্ঠ মেলাচ্ছে।
আমাদের
বিশাল মিছিল নিউ মার্কেট এর পাশ ঘেঁষে চট্রগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে থামল। অন্যান্য
ভার্সিটি থেকেও ছেলেপিলেরা যোগ দিয়েছে আমাদের এই মিছিলে। শিমুল ভাই এর কণ্ঠ মাইকে ভেসে
এলো-“সবাই আমরা রাস্তার একপাশ করে বসে পড়ি, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ হবে।” শহীদ মিনারের
সামনে একটা স্ট্যান্ড মাইকের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। আর তারই সামনে রাস্তার উপর লাইন
করে বসে পড়লাম আমরা সবাই। একে একে অর্পন দাদা, মুক্তা দিদি, শিমুল ভাই সহ আরো অনেকেই
বক্তৃতা দিতে থাকল। আমাদের ছাত্রসমাজের বিভিন্ন বিপ্লবী আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে
উপস্থিত সবাইকে উজ্জীবিত করছিলেন বক্তারা। যতটুকু বুঝলাম সামনে আরো কঠোর আন্দোলনে নামতে
হবে, স্বারকলিপি পেশ, ক্লাস বর্জন ও রাজপথ অবরোধ এর মতো কর্মসূচির ঘোষণা আসল নেত্রী
মুত্তা দিদির ঝাঁঝালো বক্তব্যে। হঠাৎ সামনে থেকে এসে আমার নাম ধরে ডাকল সাজিদ…
-এই,বক্তৃতা
দিবি নাকি ?
-হ্যাঁ,
দেয়া যায়। আর কে কে দিচ্ছে?
-আমি
আর শাওন দিচ্ছি। তুই চাইলে দিতে পারিস।
-সমস্যা
নাই , বলতে পারব।
-তোর
পুরা নামটা বল তো, লিখে নিই।
স্কুল-কলেজে
উপস্থিত বক্তৃতার অভিজ্ঞতা আছে, এছাড়া কোচিং এর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কমবেশি কথা বলতেই
হয় মঞ্চে গিয়ে। কিন্তু এই পরিস্থিতিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন, একগাদা ছেলেপিলে রাস্তার উপর
বসে। এদের অনেককেই আমি চিনি না, মাথার উপর কাঁকফাটা রোদ। একটা ছোট কাগজে বলার জন্যে
কিছু টপিক্স টুকে নিলাম আর মনে মনে একটা ছোটখাটো রিহার্সাল করে নিলাম। মাইকে ভেসে এলো
মুক্তা দির কণ্ঠ-
-“উচ্চশিক্ষার
উপর এই অযৌক্তিক ৭.৫% ভ্যাট এর প্রতিবাদে আজকের এই সমাবেশে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে থেকে
বলতে আসছে ইঞ্জিনিয়ারিং প্রথম বর্ষের ছাত্র, এহসান সানি”
মাইকের
সামনে এগিয়ে গেলাম, বলতে শুরু করলাম নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেই-এই টিউশন ফি
জোগাড় করতে কি পরিমাণ পরিশ্রম করতে হয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মাঝেও
মেধার কমতি নেই, বিসিএস-সহ বিভিন্ন প্রতিযোগীতামূলক পরীক্ষায় পাবলিকের পাশাপাশি মেধার
স্বাক্ষর রেখে চলেছে এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্রছাত্রীরা, তারপরও কেন এতো অবজ্ঞা,
কেন এতো লাঞ্ছনা?...ইত্যাদি ইত্যাদি। বক্তব্য শেষ করে যদিও হাততালি পেলাম, কিন্তু এই
হাততাতিলে বিন্দুমাত্র আনন্দ উপলব্ধি নেই বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন