মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না, আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর
জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেমাস থেকে একটা আর্ডিনো কিনে নিলাম,
আর সাথে নিলাম একটা সার্ভো মোটর, কিছু এলইডি
লাইট, ভেরোবোর্ড, জাম্পার ওয়্যার আর
কিছু L293D মোটর ড্রাইভার আইসি। টিউশন এর জমানো টাকার বেশ
খানিকটাই খরচ করে ফেলেছি এই শখের ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর পেছনে। রাতে বাসায় ফিরে এই
আর্ডিনো নিয়ে বসলাম, নীল রঙের একখানা বোর্ড...দুপাশে জাম্পার
তার কানেক্ট করার জন্য রেইল আর মাঝখানে লম্বা একটা আইসি। খুব কাছ থেকে ওই আইসির
গাইয়ে লিখা আছে ATmega328, আইসির নাম হবে হয়তো। এর আগে
রোবোটিক্স ক্লাবের ওয়ার্কশপে ও সিনিয়র ভাইদের ফাইনার প্রজেক্টে এই আর্ডিনো
ব্যাবহার করতে দেখেছি। আর এই হচ্ছে আমার নিজের প্রথম আর্ডিনো বোর্ড। অনেক
ঘাঁটাঘাঁটি করে ক্যাবল লাগিয়ে কম্পিউটার এর সাথে সংযুক্ত করলাম এই আর্ডিনোকে,
কিন্তু বারবার আননোন ড্রাইভার দেখাচ্ছিল। এই ড্রাইভার সেটাপের
নিশ্চয়ই কোন কারিকুরি আছে, এর আগে ওয়ার্কশপে এই ড্রাইভারটার
কথাই বলেছিল হয়তোবা। মোবাইলের ইন্টারনেটের উপর ভরসা নেই, এমন
এলাকায় থাকি যে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কানেকশনও সহজলভ্য হয়র উঠেনি। যাগ গে,
কাল ক্যাম্পাসে গিয়ে ফ্রি ওয়াইফাই দিয়ে ডাউনলোড করে নিব এই ড্রাইভার
ফাইল আর কিছু টিউটোরিয়াল কিংবা পিডিএফ।
এর মধ্যেই ফাইনাল পরীক্ষার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল, আর আমিও ইলেকট্রনিক্স
যন্ত্রপাতি সব গুছিয়ে বইপত্র নিয়ে বসলাম। এই সপ্তাহটাই ফাইনালের আগে শেষ সপ্তাহ,
স্যার-ম্যামরা সবাই দেদারছে ইন্সট্রাকশন দিচ্ছে, সিলেবাস রিভিউ করছে… আর আমাদের মতো ফাঁকিবাজ স্টুডেন্টদের সব মাথার উপর
দিয়ে যাচ্ছে। জুলিয়ানা ম্যাম সিগনাল এন্ড সিস্টেম ক্লাসে ইলেকট্রিকাল টু মেকানিকাল
সিস্টেম এনালজিস নিয়ে পড়াচ্ছিলেন, আর আমি চোখে ঘুম ঘুম ভাব
নিয়ে কোন রকমে ক্লাস করছিলাম। হঠাৎ মেকানিকালের গন্ধ পেয়েই আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো
আর মনযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলাম ইলেকট্রিকাল সিস্টেম কে কিভাবে মেকানিকালে নেয়?
অতি উৎসাহী হয়ে প্রশ্নও করে বসলাম - “ম্যাম,
এই কনভার্শন টা রিয়েল লাইফে কি কাজে লাগবে?” ম্যামের
উত্তর- “কেন?ইন্ডাস্ট্রিতে লাগবে,
যেখানে মেকানিকাল আর ইলেকট্রিকাল সিস্টেম একসাথে আছে ওখানে”। ম্যামের উত্তর শুনে যা বুঝলাম এই কনভার্শনের
বাস্তবে অস্তিত্ত্ব নাই, শুধুমাত্র খাতায়-কলমে হিসাব-নিকাশ করে রাখার জন্যেই এই এনালজি। অথচ আমি
কতোটাই না বোকা ! এতক্ষণ ভাবছিলাম এ আবার কেমন জিনিস, মেকানিকাল
রে ইলেকট্রিক্যাল করে ফেলল...আবার ইলেকট্রিকাল রে মেকানিকাল !!! ক্লাস শেষে বন্ধু রাশেদের ডাক…
- বন্ধু, পরীক্ষার প্রিপারেশন কেমন নিচ্ছস?
- আর বলিস না, ইলেকট্রনিক্স ২ আর সিগনাল সিস্টেম নিয়ে বেশি টেনশনে আছি।
- এই মেডামগুলা এতো দ্রুত সিলেবাস শেষ করে দেয়, কি পড়ায় না পড়াই কিছুই বুঝিনা।
- সাজেশনও তো দেয় নাই কোন। কিছু সিলেক্টিভ টপিক ঠিক করে দিলে ভাল হইতো।
- চল নাদিয়া আর ইশিতার খাতার ছবি তুলে নিয়ে নেই, ইতারা সব ক্লাস করছে।
- এডমিট কার্ড কালেক্ট করছস ?
- নাহ, আমার এখনো সেমিস্টার ফি দেয়া বাকি। ফাইন কতো আসছে কেজানে?
- আমিও দেই নাই ফি এখনো। চল আগামীকাল গিয়ে লেনদেন ক্লিয়ার করে আসি।
ফাইনাল পরীক্ষার একটা মাস যেন কাটতেই চাচ্ছিল না, পুরো সেমিস্টারের পড়া এই একমাসের জন্যে জমিয়ে রাখলে যা হয় আরকি। “কুল নাই কিনার নাই নাইকো দরিয়ার পানি” - এখান থেকে কিছু, ওখান থেকে কিছু এভাবে ভাঙ্গাচোরা প্রিপারেশন নিয়ে মোটামুটি এবারের মতোও পার পাওয়া গেল। আগের বারের মতো এবারও দৃঢ় সংকল্প- এই সেমিস্টারটা যাক, পরের সেমিস্টারে একেবারে ফাটিয়ে দেবো। পরীক্ষা শেষ করে টানা কদিন ঘুমিয়েছি, এরপর এক ফাঁকে আবার বসলাম আর্ডিনো নিয়ে। টানা কয়েক ঘণ্টা লেগে থেকে মোটামুটি ড্রাইভার আর সফটওয়্যার সেটাপ করে ফেললাম। আমি তো তখন মহাখুশি, প্রোগ্রাম করে দিচ্ছি আর সে অনুযায়ী এলিডি লাইট ব্লিংকিং করছে। পরদিন ঠিক করলাম, এই আর্ডিনো দিয়ে ছোটখাটো কোন একটা প্রজেক্ট বানিয়ে ফেললে মন্দ হয়না। গ্রামীণফোন এর দুই জিবি নেট কিনে শুরু করে দিলাম রিসার্চ, ইন্টারনেটের এখানে ওখানে খুজতে লাগলাম এই আর্ডিনো দিয়ে কে কি বানালো...আর কিভাবেই বা বানালো। যেখানে আমার উচিত ছিলো এই ডিভাইসটা নিয়ে পড়াশোনা করা, এর বিভিন্ন কম্পোনেন্ট নিয়ে জানা...তা না করে সরাসরি লেগে পড়লাম হার্ডওয়্যার নিয়ে। অনেক খুঁজতে খুঁজতে একটা প্রজেক্ট বেশ ভালো লাগলো- “সিএনসি প্লটার”। নষ্ট ডিভিডি রাইটার থেকে বানানো এই ড্রইং করার মেশিন কি সুন্দর কম্পিউটার এর থেকে দেয়া ছবি এঁকে দিচ্ছে, বাহ। এইটা বানাতে হবেই আমাকে, কিন্তু এই ডিভিডি রাইটার জোগাড় করতে হবে, এলুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেল জোগাড় করতে হবে ফ্রেম বানানোর জন্যে, সার্ভো আর মোটর ড্রাইভার আইসি তো আছে।
একদিন বিকেলে হালিম ভাইয়ের ফোন। সিটিজি ব্লাড ব্যাংক এর নাকি একটা বড়সড় আয়োজন আছে শিশু একাডেমীতে। অনেকগুলো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মধ্যে আমাদের সংগঠন “ইয়ুথ রেনেসাঁ”- কেও আমন্ত্রিত করা হয়েছে। সন্ধ্যার আগে করে রাকিব ভাই, আরমান ভাই, সাখাজিল ভাই হালিম ভাই এর সাথে চললাম শিশু একাডেমী। বেশ বড়সড় আয়োজন করা হয়ে শিশু একাডেমী প্রাঙ্গনে, আমাদের ক্যাম্পাস থেকে কাছেই। ভেতরে প্রবেশ করতেই সূর্য ভাই এর সাথে দেখা হয়ে গেলো, আমাদের ক্যাম্পাসের সিনিয়র ভাই যিনি এই সিটিজি ব্লাড ব্যাংক এর প্রতিষ্টাতা। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত পর্যন্ত চললো অনুষ্ঠান, আমাদের সংগঠনের নাম ডাকার পর আমরা তিন-চারজন মঞ্চে গিয়ে সম্মাননা ক্রেস্ট গ্রহণ করলাম। সংগঠনের পক্ষ থেকে আরমান ভাই সিটিজি ব্লাড ব্যাংক-কে ধন্যবাদ জানিয়ে শুভেচ্ছা বক্তব্য দিলেন। এরপর খাওয়া দাওয়া শেষে যখন বাড়ির পথ ধরছিলাম তখন ঝুম বৃষ্টি...সবাই মিলে একসাথে কাটগড় পর্যন্ত এলেও ছাতা না থাকার দরুণ রাত বিরাতের এই বৃষ্টিতে ভিজেচুপসে বাসায় ফিরতে হলো আমায়।
.....................................................................................................................................................................
- হ্যালো, বন্ধু তানভীর। কি অবস্থা? দিনকাল কেমন যায়?
- এইতো ভালো, তোর কি অবস্থা?
- চলতেছে, আচ্ছা শোন। তোর কাছে কি পুরাতন কম্পিউটার এর ডিভিডি রাইটার আছে?
- আছে মনে হয়, কিন্তু এগুলা তো নষ্ট- চলবে না লাগাইলে।
- আরেহ, আমার নষ্টই লাগবে রে। খুলব, খুলে ভেতরের স্টেপার মোটর একটা কাজে লাগাবো।
- আচ্ছা, কি বানাবি?
- আরেহ এমনি, দেখিনা কি বানানো যায়।
- আমার বাসার দিকে চলে আয় তাহলে আগামীকাল।
ভার্সিটির বন্ধু তানভীর কম্পিউটার এর বিজনেস করে, অধিকাংশ ক্লাসেই তানভীরকে দেখা যায় এর নাহয় ওর ল্যাপটপ সেটআপ দিচ্ছে, টুকিটাকি প্রব্লেম ক্লাসে বসেই ঠিক করে দিচ্ছে...একরকম কম্পিউটারের পোকা বলা চলে। যাক, ডিভিডি রাইটার জোগাড় হয়ে যাবে কাল, এখন এলুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেলটাও খুঁজে দেখতে হবে মার্কেটের দিকে গিয়ে।
কিছু টিউটোরিয়াল দেখে আর ডায়াগ্রাম দেখে কানেকশন দিয়ে L293D ড্রাইভার আইসি দিয়ে
স্টেপার মোটর ভালোভাবেই রান করালাম, এরপর বসলাম ফ্রেমের কাজ
নিয়ে। দিনরাত পরিশ্রম করে কাটাকুটি, নাট-বোল্ট-স্কু হাবিজাবি
করে ফ্রেমখানাও দাঁড়িয়ে গেলো। দুদিনের মধ্যেই হার্ডওয়্যার রেডি, নাওয়া নাই খাওয়া নাই, মাথায় শুধু একটাই চিন্তা...যে
করেই হোক, এই হার্ডওয়্যারকে এখন সফটওয়্যার দিয়ে ঠিকভাবে
চালাতে হবে !!!
বিদ্রঃ লেভেল ২, টার্ম ২ (দ্বিতীয়
বর্ষ) সম্পন্ন। ২০১৬ ইং


