শুক্রবার, ৩০ জুলাই, ২০২১

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ৩৮

 

সিগনাল এন্ড সিস্টেম, ইলেকট্রনিক্স-২, মেশিন-২, ম্যাথ-৪ আর সিএমইপি এই পাঁচটা থিওরি কোর্স এবারের সেমিস্টারে, আর সাথে এই কোর্সগুলার ল্যাব। সকাল দশটায় থেকে ক্যাম্পাসে এসে বসে আছি নতুন সেমিস্টারের কোর্স এনরোলমেন্ট করব বলে। সাড়ে এগারোটার দিকে সফটওয়্যার এ ঢুকে রেজিস্ট্রেশন করলাম, অনেওদিন পর সবার সাথে দেখা হয়ে ভালোই লাগছিল। কয়েকজন বন্ধুর অনুরোধে ক’দিন আগেই কেনা সাইকেল নিয়ে এসেছি ক্যাম্পাসে। বন্ধুরা দুয়েকজন নিয়ে কিছুক্ষণ চালানোর পর টঙের আড্ডায় সাইকেল নিয়ে এলো, এরপর সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। 

চালাতে চালাতে মনে পড়ল কিছু ইলেকট্রনিক্স জিনিসপত্র কেনা দরকার, আবার একটা স্পিডোমিটারও কিনতে হবে সাইকেলের জন্যে... আর তাই সিটি কলেজের দিকে রওনা দিলাম। স্পিডোমিটার কিনে সাইকেলে লাগিয়ে গেলাম বিখ্যাত বাগদাদ ইলেকট্রনিক্স মার্কেট, মার্কেটের সামনে সাইকেল লক করে রেখে ভেতরে গেলাম। একখানা আইপিএস বানানোর জন্যে আইসি, মসফেট, লেড এসিড ব্যাটারি, ট্রান্সফরমারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নিলাম। শখের বশেই এই কম ওয়াটেজের আইপিএস বানানোর পরিকল্পনা করেছিলাম, তখনো সবেমাত্র ইলেক্ট্রনিক্স এর গভীরে প্রবেশ করতে শুরু করেছি। বেলা প্রায় আড়াইটা বাজে ঘড়িতে, জিনিসপত্রগুলো নিয়ে বসলাম মাত্রই বেরিয়েছি সাইকেল নিয়ে। স্পিডোমিটারে গতি বাড়ছেই, মুহূর্তের মধ্যেই ৩০-৩৫-৪০ এমপিএইচ। এবার অনেকটা ভালো লাগছে, মনে হচ্ছিল যেন মোটর সাইকেল চালাচ্ছিলাম। বারিক বিল্ডং মোড়ের কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ করে পি...ইইই...কক 

-আআআউউচ...। দেখেশুনে সাইকেল চালাতে পারেন না? আরেকটু হলেই তো গায়ের উপর উঠাই দিচ্ছিলেন। 

-দেখেশুনেই তো চালাচ্ছিলাম আপু, আপনিই তো দৌড় দিয়ে বাসে উঠছিলেন !!

হঠাৎ সাইকেলের হার্ড ব্রেকের প্রচন্ড শব্দে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বিস্ফোরিত চোখে কটমট করে আমার দিকে তাকালেন এক তরুণী। যদিও সাইকেল উনার গায়ে লাগেনি, যথেষ্ঠ দক্ষতায় পাশ কাটিয়ে ব্রেক করে নিয়েছি। আমি আর কথা বাড়ালাম না, সরি বলে তাড়াতাড়ি প্যাডেলে চাপ দিয়ে গতি বাড়ালাম। এক্সিডেন্ড হয়ে গেলেই বোধ হয় ভালো হতো ওই তরুণীর সাথে...নেহাত ভালমানুষি করে ব্রেক করলাম, আজকাল ভালোমানুষের কোন দাম নেই।  

বাড়ি ফিরে এসে কিছুক্ষণ আইপিএস এর সার্কিট নিয়ে ঘাটাঘাটি করলাম, CD4047 আইসিখানা নিয়ে অনেক্ষণ গবেষণা করলাম। ইন্টারনেট ঘেটেঘুটে বের করলাম এর বিভিন্ন পিন কনফিগারেশন। কাজ করতে করতেই স্টুডেন্ট এর ফোন…

-হ্যালো ভাইয়া, আজকে আসবেন না?

-আজকে কিবার?

-বুধবার ভাইয়া। 

-ও আচ্ছা, তাই নাকি ? আসতেছি আমি, তুমি বসে বসে ম্যাথ করতে থাক।

কখন কবে টিউশন থাকে তাও ঠিকঠাক মনে থাকেনা, কাজে ব্যাস্ত থাকলে সব ভুলে যাই। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও সন্ধ্যের দিকে আবার সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেলাম টিউশনে। স্টুডেন্টকে কয়েকটা বীজগনিতের সমস্যার সমাধান করে দিয়েই বললাম- 

-এইগুলা তুমি করে ফেল দেখি এইবার, একটা নতুন এপস আসছে...প্রিজমা নাম। এটার কি কাজ একটু দেখি।

-ভাই, আমাকে দেন ভাই। আমি এডিট করছি ছবি এই এপস দিয়ে।  

কথোপকথনের মাঝেই স্টুডেন্ট এর আব্বা এসে হাজির, হাতে একখানা সাদা খাম দেখা যাচ্ছে। যাক বাবা, অনেকদিন ধরে বলতে বলতে দুমাসের বেতন একসাথে দিচ্ছে। ঈদের মাসের টাকা না দিয়েই স্টুডেন্ট বাড়ি চলে গিয়েছিল, যাই হোক এই টাকা দিকে কি কি ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি কেনা যাবে তার একটা ছক আঁকছিলাম মনে মনে। প্যাকেটটা হাতে পাওয়ার পর অনেকটা ভালোই লাগছে, সাধারণ খামের চেয়ে অনেকটা মোটা...দুমাসের টাকা একসাথে আছে বলেই হয়তোবা। এরপরই যে আমার জন্য কি অপেক্ষা করছিল তা কল্পনায়ও আনিনি। পড়ালেখার উন্নতি নিয়ে কথা শেষ হবার পরপরই হঠাৎ স্টুডেন্ট এর আব্বা বলে উঠলেন

- অনিক আগামীকাল থেকে আর পড়বে না, ওকে একটা কোচিং এ দিচ্ছি। আগামীকাল থেকে আর না আসলেও চলবে।  

আমার মনটা কিছুক্ষণের জন্য খারাপ হয়ে গেল, যাই হোক সবকিছু ভুলে গিয়ে স্টুডেন্ট কে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে আসলাম। বাইরে এসে খাম খুলে দেখলাম অনেকগুলো একশত টাকার নোট। যাক বাবা, এতো ভাংতি টাকা দিল কিজন্যে !! গুনে দেখি মোটেই একমাসের বেতন, আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল। মনের মধ্যে আঁকা ছকগুলো নিমিষেই মিলিয়ে গেল অজানার পানে। 

দুদিনের ছুটিতে আইপিএস মোটামুটি বানিয়ে ফেলেছি বলা চলে। তিন-চার খানা এসি বাল্ব সহজেই জ্বালানো যায়। কলেজের প্রথম বর্ষে যখন ছিলাম তখন এসি থেকে ডিসি রুপান্তর করে ব্যাটারি চার্জ করেছিলাম হাতে-কলমে, আর এখন ডিসি থেকে এসিতে রুপান্তরের বেসিকটা হাতেকলমে শেখা হয়ে গেলো। শনিবার ক্যাম্পাসে পৌঁছেই শুনি আজকের কোন ক্লাস হবেনা, তার পরিবর্তে হবে বিক্ষোভ মিছিল। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এর সম্মানিত ভিসি মহোদয় কে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে তথাকথিত উগ্রগোষ্ঠী। আর আমরাও তাই চুপ করে বসে থাকিনি, বিশ্ববিদ্যালয় এর সকল অনুষদ থেকে মিছিল নিয়ে সমবেত হলাম প্রেসক্লাব চত্বরে। 

সময় গড়ানোর সাথে সাথে সকল ব্যাবসায় অনুষদ, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদ এবং কলা অনুষদ সকল শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রীরা একত্রিত হলো জামালখান প্রেসক্লাব চত্বরে। রাস্তার দুপাশে হাতে হাত রেখে তৈরী করা হলো মানববন্ধন। সবার হাতে হাতে প্রতিবাদী পোস্টার, ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন। আমাদের শ্রেণি প্রতিনিধি শাওন তার প্লাকার্ডে লিখেছে- 

-“হুমকি দেয়া কাপুরুষের কাজ, আদর্শের কখনো হয়না বিনাশ” 

ঘন্টাখানেকের মানববন্ধন ও প্রতিবাদী কর্মসূচি শেষে বন্ধুরা সবাই মিলে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে বাড়ির পথ ধরলাম। আদৌ জানা নেই হুমকিদাতা কে বা কারা, জানা নাই এই মানববন্ধনের কার্যকারিতার মাপকাঠি। তবে মনে মনে ভাবছিলাম...

“প্রতিবাদের ভাষা আমি জানি শুধু একটাই,

সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমি স্লোগান দিতে চাই।” 

<<<আগের পর্ব                    পরের পর্ব>>>  



 

শুক্রবার, ২৩ জুলাই, ২০২১

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ৩৭

 


“চলে আমার সাইকেল হাওয়ার বেগে উইড়া উইড়া…”  

যখনই সাইকেল নিয়ে বের হই বাংলা সিনেমার এই গান মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়। সাইকেল কেনার পর থেকেই পুরো এলাকা চষে বেড়াতে শুরু করলাম, এরমধ্যেই বন্ধু সৈকতের সাথে একখানা সাইকেল রেসও হয়ে গেল- রেসে অবশ্য সে পেরে উঠেনি শেষ পর্যন্ত। নিয়ম করে পতেঙ্গা বীচ, মুসলিমাবাদ বেড়িবাঁধ, নেভাল থেকে শুরু করে নয় নাম্বার ঘাট এদিক ওদিক চষে বেড়ানো আমার নিত্যদিনের কাজ। এদিকে রোজার শেষদিকে এসে ভার্সিটির বন্ধুরা সবাই মিলে একখানা ইফতার পার্টির আয়োজন করলো। বন্ধু প্রসেনজিত ছিল এই আয়োজনের অন্যতম সংগঠক। গোলপাহাড় মোড় MFC রেস্টুরেন্ট, ইফতারের বেশ খানিকক্ষণ আগে গিয়ে পৌঁছলাম। গিয়ে দেখি মোটামুটি সবাই এসে পড়েছে, রাশেদ আর জাহিদের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম আমরা। যদিও ইফতারের আগ মুহূর্তে বেশি বকবক করাটা ঠিক না, এতদিন পর বন্ধুরা সব একসাথে হয়ে কথার ফুলঝুরি ছুটছে। তার উপর একে ওকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা আর আড্ডা চলছে একসাথে।  

-ওডা, কও এত মাইজ্জুস? 

-বেশি ন, দু এত। তুই কও এত? 

-আই চারগেত মারি দি! হা হা আহা। 

-ওডা তোরা এড়ে আই এনেও রেজাল্ট লই এনে কথা হবি নি?

-আইচ্ছা বাদ দে, আযান পরের… আল্লাহর নাম লই শুরু গর।

পরদিন স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন PFC ক্লাবের উদ্যোগে আমি আর কোচিং এর পরিচালক হালিম স্যার এলাম ঈদবস্ত্র বিতরণী কার্যক্রমে। ছোট ছোট সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের হাতে উপহারসামগ্রী তুলে দিতে পেরে কি যে ভালো লাগছিল, এই পরিতৃপ্তি হাজার টাকা দিয়ে চাইলেও কেনা সম্ভব নয়। ঈদের ঠিক আগেরদিন, চাঁদরাত। আলসেমিতে কিছুই কেনা হয়নি, তার উপর সাইকেল কিনে হাত একেবারেই ফাঁকা। তারপরও কিছু আনুষঙ্গিক কেনাকাটা আর একখানা পাঞ্জাবি নিতে ছুটলাম মার্কেটে। ছোটবেলা থেকেই মার্কেটে ঘুরতে আমার ঘোর আপত্তি, নিতান্তই বাধ্য হয়ে মার্কেটে আসা। দুয়েক দোকান ঘুরেফিরে পাঞ্জাবি কিনে ফেললাম, ব্যাস জুতো একজোড়া কিনে নিলেই শপিং শেষ। 

বরাবরের মতোই ঈদের নামাজ শেষে বাসায় এসে খাওয়া দাওয়া করে ঘুম। এখানে ওখানে ছুটোছুটি করার বয়স সে অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছি। দুপুরের দিকে হালিম স্যার এলে পরে একটু বেরানো হলো এদিক সেদিক। বেরানোর সুবাধে সাইকেলের প্রসঙ্গ উঠে এলে পরে ততক্ষনাত একখানা সাইকেল ট্যুর দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। আপাতত আমাদের তিনজনের ছোট একখানা টিম- আমি , হালিম ভাই আর সাখাজিল ভাই। পরশুদিন বেরিয়ে পড়ব সাইকেল নিয়ে, গন্তব্য ঠিক করা হলো কর্নফুলীর ওপারে আনোয়ারা।  

যাত্রার আগের দিন রাতে বসে ম্যাপিং করে ফেললাম একদিনে সর্বোচ্চ ঠিক কতদুর যাওয়া সম্ভব। সকাল সকাল এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল, আর তাই সকাল সাতটায় বেরোনোর কথা থাকলেও বেরোতে বেরোতে আটটা বেজে গেল। পুবের আকাশে সূর্য উঁকি দিচ্ছে, কর্নফুলীর পাড়ের মৃদুমন্ত বাতাস আর সকাল সকাল এই আর্দ্র পরিবেশ মনটা জুড়িয়ে এলো। অনেক্ষণ ধরে ঘাটে দাঁড়িয়ে থেকেও তরীর দেখা পাচ্ছিলাম না, অবশেষে একখানা বোট ঘট ঘট শব্দ করে ওপার থেকে যাত্রী নিয়ে ঘাটে  ভিড়ল। 

-বদ্দা, সাইকুল লই এনে উডন যাইবু নে? - মাঝিকে প্রশ্ন করলাম আমি।

-তিন জন নে? উঠি য গুই, এক মিক্কে দি সাইড গরি রাইখখু। সাইকুল ওর ভাড়া দন ফরিবু।

-সমস্যা নাই, দিলাম এরি। 

তিনজনে মিলে ধরাধরি করে সাইকেল তিনটি নিয়ে বোটে উঠলাম। আরো কয়েকজন উঠে আসন পরিপূর্ন হতেই মাঝি বোটের ইঞ্জিন চালু করে দিলেন। মিনিট বিশেকের নৌকাভ্রমণ শেষে আমরা ডাঙ্গার চর ঘাটে এসে নামলাম। ঘড়িতে তখন প্রায় পৌনে ন’টা, এখান থেকেই শুরু হচ্ছে আমাদের আজকের সাইক্লিং। সাখাজিল ভাই গুগল ম্যাপ ও জিপিএস লোকেশন অন করে নিলেন, ডাঙ্গার চর হয়ে জুলধা, এরপর শাহমিরপুর… পথে পথে যাত্রাবিরতী নিতে হচ্ছিল বারংবার কেননা হালিম ভাইয়ের সাইকেল সাধারণ চেইনের আর আমাদের দুজনের গিয়ার সাইকেল। স্বাভাবিকভাবেই হালিম ভাই বারবার পিছিয়ে পড়ছিলেন, আর আমরা আস্তে ধীরে চালাতে লাগলাম। চলতে চলতে চট্রগ্রাম-আনোয়ারা মহাসড়কে উঠে পড়লাম, খানিক বাদেই চিন্তা করলাম ভেতর দিয়ে গেলেই বুঝি ভালো হবে। আর তাই KEPZ এর পাশ ঘেঁষে রওনা হলাম। দারুণ এক পাহাড়ি অরণ্যের ছোঁয়া পেয়ে আমরা সত্যিই মুগ্ধ, যদিও ইপিজেড এর ভেতরটায় ঢুকার অনুমতি পাইনি। এরপর মরিয়ম আশ্রমের দিকে গিয়ে পেলাম দারুণ একখানা পাহাড়ি ট্র্যাক। পাহাড়ি উচু-নিচু ট্র্যাকে সাইকেল চালাতে যে কি মজা তা আজ এখানে না এলে হয়তোবা উপলব্ধি করাই হতো না। এদিকে হালিম ভাইয়ের নাজেহাল অবস্থা দু-দুটো গিয়ার সাইকেলের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে তার যায় যায় অবস্থা-   

-থামেন থামেন একটু, একটা যাত্রাবিরতি নেয়া দরকার। 

-সামনের ওই বাজারে বিরতি দেই চলেন। 

বাজারে এসে একখান চায়ের দোকানে ঢুকে গরম গরম সিঙ্গারা, পুরি আর চা সাবাড় করে আবার সাইকেল নিয়ে টান। বদলাপুর-মেরিন একাডেমি হয়ে আনোয়ারার মাঝামাঝি আমরা এখন, মধ্যগগনে সূর্য প্রতিনিয়ত তার রোদ্রের তেজ বাড়াচ্ছে। আপাতত আমাদের উদ্দেশ্য সাংগু নদী, ম্যাপে দেখে ঠিক করলাম তৈলারদ্বীপ সেতু পর্যন্ত গিয়ে দুপুরের খাবার খেয়েদেয়ে ফেরার পথ ধরব। চলতে চলতে চৌমুহনী এসে পৌঁছলাম, এইখানে এসে আমাদের মাথা নষ্ট হবার জোগাড়। ভুল পথ ধরে অনেকদূর এসে বুঝতে পারলাম আমরা পথ হারিয়েছি, গুগল ম্যাপের লোকেশনও ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারছি না, তার উপর মোবাইলের চার্জ প্রায় শেষের দিকে। সাখাজিল ভাই এক সিএনজি ড্রাইভার ভাইয়ের সাথে গুগল ম্যাপ দেখিয়ে পরামর্শ করে আবার ঠিক রাস্তা ধরলেন। চৌমুহনী হতে আবারো চট্রগ্রাম-আনোয়ারা মহাসড়কে উঠে তৈলারদ্বীপ এর উদ্দেশ্যে যাত্রা। অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে প্রায় দুপুর দু’টার দিকে আমরা এসে পৌঁছাই তৈলারদ্বীপ, যার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সাংগু নদী। ব্রীজের উপর থেকে কিছুক্ষণ নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করার পর নদীতে নামার ভুত মাথায় চাপলো। ব্রীজ থেকে নেমে এদিক ওদিক তন্ন তন্ন করে খুঁজে নদীদে নেমে গোসল করার মতো কোন ঘাট পেলাম না। লোকমুখে শুনলাম এদিকে নাকি কোন ঘাট নাই , আর একজন তো আরো এককাঠি সরেশ- “নদীতে কুমির আছে !!!” সেই সকাল থেকে সাইকেল চালাতে চালাতে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে যদি একটু গোছলই করতে না পারি তবে ফিরে যাবার জোরটা পাব কোত্থেকে? 

অবশেষে ভাগ্য আমাদের সহায় হলো, কাছেই দেখলাম এক জেলে তার নৌকা নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের অনুরোধে আশপাশটায় নৌকায় চড়িয়ে মাঝের ওই ছোট্ট চর থেকে ঘুরিয়ে আনতে সম্মত হলো। নৌকায় করে ব্রীজের নিচ থেকে ঘুরে এসে নদীর মাঝে জেগে উঠা চরে এসে থামলাম। এরপর আমরা তিনজন হালকা দাপাদাপি করে নদীতে গোছল সেরে নিলাম। গোছল শেষে পাড়ে এসে আবার সাইকেল নিয়ে যাত্রা, মাঝে একখানা হোটেল থেকে দুপুরের খাবার সেরে নেয়া গেল।  খাওয়া দাওয়া শেষে হালিম ভাইয়ের নিশ্চুপ স্বীকারুক্তি - “আমার দ্বারা আর সম্ভব না, একটা সিএঞ্জি নিয়ে ফিরে যাবো আমি”। হালিম ভাইকে সাইকেলসহ সিএনজিতে তুলে দিয়ে আমি আর সাখাজিল ভাই সাইকেলে ঝড় তুললাম, দুর্বার গতিতে সাঁই সাঁই করে ছুটে চলছিল আমাদের দ্বিচক্রযান। মাত্র চল্লিশ মিনিটেই সেই তৈলারদ্বীপ থেকে চৌমুহনী, কাফকো হয়ে পনের নাম্বার ঘাটে এসে পৌঁছলাম। সিএনজি করে মাত্রই মিনিট পাঁচেক এসে পৌঁছেছেন হালিম ভাই। পশ্চিমের আকাশে সূর্য আস্ত যাবার অপেক্ষায়, আর আমরা সাইকেলগুলো নিয়ে পতেঙ্গায় ফিরে আসার বোটে উঠে পড়লাম।

<<<আগের পর্ব         পরের পর্ব>>> 

 


শুক্রবার, ১৬ জুলাই, ২০২১

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ৩৬

 


“Life is like riding a bicycle. To keep your balance you must keep moving”

বিখ্যাত পদার্থবিদ আলবার্ট আইনস্টাইন তার ছেলে এডওয়ার্ডকে লেখা একটা চিঠিতে জীবনকে সাইকেলের সাথে তুলনা করেছিলেন। আপাতত আমার একটা সাইকেল খুবই দরকার, তাও আবার কিন্তু গিয়ার সাইকেলই হতে হবে। সেই ক্লাস সিক্স থেকে সাধারণ সাইকেল চালিয়ে আসছি, গিয়ার সাইকেলের স্বপ্নটা কি তবে অপূর্নই রয়ে যাবে? টিউশনের টাকা জমিয়ে রেখেছি সাইকেল কিনবো বলে, কিন্তু নতুন সাইকেলের দেখছি অনেক দাম- আমার বাজেটের দু-তিনগুন প্রায়। শেষমেশ অনলাইনের কিছু গ্রুপে পুরাতন সাইকেলের খোঁজ শুরু করলাম। ওদিকে ঘূর্নিঝড়ের কদিন পরেই ম্যাথ-৩ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের সেমিস্টার ফাইনাল। রমজান মাস এসে গেল এরই মধ্যে, আপাতত সেহরি-ইফতার, টিউশন করা আর ঘুমানো ছাড়া কোন কাজ নাই। রেজাল্ট হতে হতে আরো সপ্তাহ দুয়েক বাকি, এরপর এনরোলমেন্ট হয়ে গেলে ক্লাস শুরু হবে হয়তোবা ঈদের পর। এই ঘূর্নিঝড়টা না হলে ক’টা দিন ছুটি অতিরিক্ত পাওয়া যেত। যাই হোক, এই সেমিস্টার ব্রেকটা কাজে লাগানো দরকার। 


নেট ঘাটতে ঘাটতে “SkilTrain” নামের একটা ইন্ডিয়ান ইউটিউব চ্যানেলের বেশ কিছু রিপেয়ারিং ভিডিও পেলাম। সপ্তাখানেক বাদেই লাইট, ফ্যান, বাল্বসহ টুকিটাকি বাসায় ব্যবহৃত ইলেকট্রিক জিনিস রিপেয়ারিং এর উপর ভালোই ধারনা হয়ে গেল আর তারই ফলশ্রুতিতে অনেকদিন ধরে পড়ে থাকা নষ্ট আইরনটা সারিয়ে তুললাম। ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হবার আগে ভাবতাম, হয়তোবা এরকম জিনিসপত্র ঠিকঠাক করার বিদ্যেটাও শেখানো হবে কিন্তু পরবর্তীতে বুঝতে পারলাম এসব আসলে পলিটেকনিকে ডিপ্লোমা কোর্সে শেখানো হয়। যাই হোক, আপাতত নিজের জিনিস নিজে ঠিক করতে পারলেই হলো। গত সেমিস্টারের শেষে ইলাস্টেটর নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম, গ্রাফিক্স ডিজাইনের হাতেখড়ি বলা চলে। মাঝে-মধ্যে টুকটাক ডিজাইন আপলোড করতাম... সবই শখের বশে। একদিন হঠাৎ জিহাদ ভাইয়ের মেসেজ-

- একটা ব্যানার ডিজাইন করতে পারবা?

- হ্যাঁ ভাই, করা যাবে… কিসের ব্যানার ভাই?

- রমজান উপলক্ষে একটা পুনর্মিলনী ও ইফতার মাহফিল, আমাদের স্কুলের ব্যাচের। 

- আচ্ছা, ভাই। সমস্যা নাই, কি কি লিখতে হবে আর কোথায় কি বসবে একটা প্যাডে লিখে পাঠাই দেন।

পারিশ্রমিক চুলোয় যাক ,ডিজাইন করব আর সেই ডিজাইনখানা প্রেসে প্রিন্ট হবে এর চেয়ে ভালোলাগা আর কি হতে পারে !! দিনরাত এক করে একের পর এক ডিজিটাল তুলির আঁচড় দিয়ে যেতে লাগলাম। অবশেষে দু-তিনদিন পর মানানসই একখানা ব্যানার দাঁড়িয়ে গেল, এক কোণে বাঁকিয়ে লিখে দিলাম “Ahsan’s Graphics” আমার ডিজাইন করা ব্যানার প্রথম প্রিন্ট হবে… এর চেয়ে ভালোলাগার মুহূর্ত আর কিই বা হতে পারে? এরপর মেইল করে দিলাম জিহাদ ভাইকে। দুদিন বাদেই পরীক্ষার ফলাফল দেয়া হলো, রেজাল্ট আগের দুই সেমিস্টার থেকে তুলনামূলক ভালো এবং এবারই প্রথম সিজিপিএ তিন এর উপর।


- দোস্ত, এই সাইকেলটা কেমন দেখতো। - একখানা সাদা সাইকেলের ছবি ইনবক্স করে বন্ধু সৈকতের মতামত জানতে চাইলাম।

- কোন ব্র্যান্ড? মডেল কতো?

- Nekro , Omega

- আমারটা Ash-10, এইটা তো দেখতেছি আরেকটু আপডেটেট মামা।

- কস কি? তোরটা নতুন না সেকেন্ড হ্যান্ড নিছিলি?

- ভার্সিটির এক পোলার থেকে নিছিলাম, নতুনই পাইছি বলা যায়। বেশিদিন ইউজ করে নাই।

- কত দিয়া নিছিলি?

- এইতো, হেলমেট আর লকসহ সাড়ে আট । মার্কেট প্রাইজ ষোল এর মতো। 

- যাহ, ভালই তো পাইছিস তাহলে। কাল-পরশু তাহলে আমার লগে চল, এইটা কিনে নিয়ে আসি।

- ওকে, চল। লোকেশন কই?

- আন্দরকিল্লা।

- খাইছে, তাইলে তো আর্লি বের হইতে হবে রে।

- বের হইলাম আরকি, প্রয়োজনে সেহরির পর আর ঘুমাবো না।

সেহরির পর গিয়ার সাইকেল নিয়ে নেটে সার্চ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছি, উঠে দেখি সকাল দশটা। তাড়াতাড়ি সৈকতকে ফোন দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। সার্চ করতে গিয়ে সাসপেনশন, গিয়ার, ডিস্ক ব্রেক, ডেরা নতুন নতুন শব্দের সাথে পরিচিত হচ্ছিলাম। একমাত্র এক্সপার্ট হিসেবে তাই বন্ধু সৈকত কে নিয়ে যাওয়া, নাহয় কোনটা কি আবার গুলিয়ে ফেলব। সকাল সকাল বলে বেরোতে বেরোতে বেলা হয়ে গেল, কাটগড় থেকে স্কুলের বন্ধু  সৈকতকে সাথে নিলাম, যার কাছ থেকে সাইকেল কিনব তাকেও ফোন করে জানিয়ে দিলাম ঘন্টা-খানেকের মধ্যে আসছি। যানজট পেরিয়ে আন্দরকিল্লা পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘন্টা পেরিয়ে গেল। লালদীঘি নেমেই সাইকেল এর মালিককে ফোন দিলাম, মিনিট দশেকের মধ্যেই আমাদেরই সমবয়সী এক ছেলে সাদা একখানা সাইকেল চালিয়ে সামনে এলো। 


সৈকত সাইকেলের বিভিন্ন পার্টস ঠিকঠাক আছে কিনা চেক করে নিলো,অনুমতি নিয়ে হালকা চালিয়েও নিলো সে। এই বিষয়ে যেহেতু আমার দক্ষতা নেই তাই আপাতত চুপচাপ থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। দরদাম করে সাড়ে নয় হাজারে নিয়ে নিলাম নিজের উপার্জিত টাকায় কেনা আমার প্রথম গিয়ার সাইকেল। দশ হাজার নিয়ে এসেছিলুম, এই পাঁচশত বাচানো গেল। এটা দিয়ে সিএনজি ভাড়া দেওয়া যাবে। 

 

- খুশি এবার? 

- হুম বন্ধু, সাইকেল তো ভালোই দেখতেছি। একটান দিব নাকি রে এটা নিয়ে। ডাইরেক্ট বাসা?

- পাগল নাকি তুই? রোজা আছিস না?

- হ, কীই বা আর হোবে? একটু টায়ার্ড হয়ে পড়বো আরকি। 

- তো আমি কেমনে যাব? সিএনজি নে। 

- আচ্ছা, চালাইয়া নিউমার্কেট পর্যন্ত যাই। তালা কিনতে হবে। 

- আচ্ছা , ঠিকাছে। 

নিউমার্কেট এসে একটা ভালমানের তালা নিয়ে নিলাম, এরপর সিএনজি দরদাম করছিলাম। সিএনজি চালক সাথে সাইকেল দেখায় ভাড়া বেশি চাচ্ছিল, কিন্তু আমরা নাছোড়বান্দা। সিএনজি চালকের যুক্তি- সাইকেল একপাশে বাইর হয়ে থাকবে...তাই সাবধানে চালাইতে হবে হাবিজাবি ইত্যাদি। ড্রাইভারের এহেন যুক্তি শুনে সৈকত মুহূর্তের মধ্যেই সাইকেলের সামনের চাকা খুলে সেটিং করে নিল আর বলল “ব্যাস,প্রব্লেম সলভড”। দুইপাশেই আটকানো গেছে, আর তাই বেশি ভাড়ার প্রশ্নই উঠে না। ড্রাইভার কিছু সময়ের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন আর না পেরে যাত্রা শুরু করলেন। কাটগড় নেমে বেচারা ড্রাইভারের গোমরা মুখখানা দেখে আরো বিশটা টাকা বাড়িয়ে দেয়া গেলো। 

<<<আগের পর্ব                         পরের পর্ব>>>

 


শুক্রবার, ৯ জুলাই, ২০২১

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ৩৫


স্যার, আপনার টাউন হল কতো? 

- কিসের টাউন হল?

- আপনি সিওসি খেলতেছেন না, তাই…

- এই বেশি না, পাঁচে এখনো। শুরু করছি বেশিদিন হয়নাই। তোমার কতো ?

- আমার তিনটা আইডি স্যার। একটা সেভেন ম্যাক্স, আর দুইটা রাস আইডি।

- রাস আইডি আবার কি জিনিস?

- আরে এইটা জানেন না স্যার? যে আইডি শুধু এটাকের সময় ইউজ হয়। 

“এই আকবর, আবার গেম নিয়ে বসছিস তুই” - অন্দরমহল থেকে বড় আপুর হাঁকডাক শোনা গেল। না আপু, পড়তেছি, স্যার আসছে -- ছাত্রের সহজ সরল উত্তর।  

আকবর, দশম শ্রেণি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। সামনেই তার টেস্ট পরীক্ষা, আর এই পরীক্ষাকে লক্ষ্য করে ওর বড় আপু আমাকে পই পই করে বুঝিয়েছেন কিভাবে তাকে পড়াতে হবে। আপুর একটাই কথা- “নেহাত আমি সাইন্সে পড়িনাই বলে, নাইলে ওরে পিটাই পিটাই চামড়া চুলে নিতাম।” বড় আপু চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আঈনের ছাত্রী আর তাই ভয়ে সব কথা চুপচাপ শুনে গেছি, না-জানি কখন আবার আঈনের কোন মারপ্যাঁচে ফেলে দেন। ভেবেছিলাম গেমটার কিছু ট্রিক শিখে নিবো, তাড়াতাড়ি মোবাইল বন্ধ করে আবার পড়ানো শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পরেই ফোন আসল…

- আসসালামু-আলাইকুম, ভাইয়া। আমি নিতু।

- ওয়ালাইকুম সালাম। কি অবস্থা ? তোমার না আজকে রেজাল্ট দেয়ার কথা?

- হ্যাঁ ভাইয়া। জিপিএ ফাইভ আসছে।

- যাক, আলহামদুলিল্লাহ। 

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় কোচিং এর ছাত্রছাত্রীরা গড়পড়তা রেজাল্ট করেছে, দুয়েকজন এ-প্লাসও পেয়েছে। কিন্তু টিউশন এর ছাত্রছাত্রীদের এপ্লাস পাওয়াটা নিজের কাছে অনেকটা গৌরবের। এসব ভাবতে ভাবতেই আকবরের বড় আপু এসে হাজির। ভাবছিলাম একটু মুড নিতে যাবো, কিন্তু কোথায় কি আমাকে একগাদা উপদেশ দিয়ে চলে গেলেন।   

এদিকে ছাত্রছাত্রীদের রেজাল্ট ভালো হলে কি হবে, আমার পড়াশোনার যে যাচ্ছেতাই অবস্থা। তৃতীয় সেমিস্টার এদিকে ছাত্র-ছাত্রীদের রেজাল্ট ভালো হলে কি হবে, আমার পড়াশোনার যে যাচ্ছেতাই অবস্থা। তৃতীয় সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়েছে ইতোমধ্যেই, ফার্স্ট সেমিস্টার এর ব্যাকলগ সার্কিট-১ পরীক্ষা দিয়ে কিছুটা স্বস্তি বোধ করছিলাম। দুইটা ব্যাকলগ নিয়ে দ্বিতীয় বর্ষে উঠার পর খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম, ক্লিয়ার হবে তো আদৌ? তার উপর দু-দুটো ম্যাথ কোর্স...ম্যাথ-১ আর ম্যাথ-৩ । মোটামুটি সবগুলো পরীক্ষাই ভালোভাবে দেয়া গেলো, আশা করছি এবার দুটো লগই ক্লিয়ার হয়ে যাবে। আগামীকাল ম্যাথ-৩ পরীক্ষা...আর সন্ধ্যার খবরেই শুনলাম ঘূর্নিঝড় রোয়ানুর বিপদসংকেত নম্বর ৭।  দুপুরের দিকেও ছিল তিন কি চার, আর এখন হঠাৎ করে সাত!!! একানব্বই এর ঘূর্নিঝড় এর পর থেকে চট্রগ্রামের মানুষজন এই ঘূর্নিঝড়ের বিপদসংকেতকে আমলে নিচ্ছে, আব্বু-আম্মুর কাছ থেকে একানব্বই এর ঘূর্নিঝড় এর ভয়াবহতা শুনতাম আর  ভাবতাম আমরা কতটাই না অসহায় আল্লাহর সৃষ্টির কাছে। সন্ধ্যার পর থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে আর সাথে প্রবল দমকা হাওয়া। রাত আটটার দিকে বিপদসংকেত নয় ঘোষণা করা হলো, এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে আর জনসাধারণকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বলা হচ্ছে। আর আমি আছি এখনো দোটানায়, পরীক্ষা হবে কি হবেনা!!! ডিপার্টমেন্ট থেকেও এখনো পর্যন্ত কোন ঘোষণা আসেনি।  

-অডা, বই কিল্লেই আছস দে? বই-খাতা বস্তা বাঁধি ফেলাছুনা, তুয়েন আইলে টাইম পাবি-নি? আব্বু বলছিলেই বইপত্র বস্তায় বেঁধে রাখতে যাতে করে শেষ মুহূর্তে উপরে তুলে ফেলা যায়। একানব্বই এর ঘূর্নিঝড় আর জলোচ্ছ্বাস বাড়িতে চিহ্ন রেখে গেছে, আর তাই স্বভাবতই ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়। আম্মু ওদিকে সমানে বকাঝকা করছেন- কবে বাড়ি করবি, আর এইসব উঠানো নামানো থেকে মুক্তি মিলবে? ভেক্টর আর কমপ্লেক্স এনালাইসিস এর বই দুটো বাইরে রেখে সব বইখাতা বস্তায় ভরে ফেললাম। এ আমাদের চিরাচরিত জীবন সংগ্রাম, সেই ছোটবেলা থেকেই এতে আমরা অভ্যস্ত। একটা আঞ্চলিক গানের দুটো লাইন মনে পড়ে গেলো…  

“ও-ভাই আরা চাটগাঁইয়া নওজোয়ান, 

দইজ্জের কূলত বসত গরি মোরা

সিনা দি ঠেকাই ঝড়-তুফান “।।

আঞ্চলিক গান সাহসী করে তুললেও কমপ্লেক্স এনালাইসিস এর ম্যাথ কিছুতেই শেষ হচ্ছিল না। পরীক্ষার আগের রাতে একগাদা ম্যাথ নিয়ে বসলে যা হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আগামীকালের পরীক্ষাটা বাতিল হলেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। অবশেষে রাত দশটা কি এগারোটার দিকে পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা এলো। বাকি বই খাতাগুলোও বস্তায় ভরে চিলেকোঠায় তুলে রাখলাম। এরই মধ্যেই বিদ্যুৎ চলে গেলো, মোমবাতি জ্বালিয়ে বাসার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ন জিনিপত্র গোছাচ্ছি আর মনে মনে ভাবছি- “পরীক্ষার সাথে এই ঘূর্নিঝড়ের কতোই না মিল! পরীক্ষা যদিও দিন তারিখ ঠিক করে আসে আর এই ঘূর্নিঝড় তো একেবারেই কথা নাই বার্তা নাই হাজির তার দানবীয় চোখ রাঙিয়ে” । মোবাইলে রেডিও চালু করে দিয়ে লাউড স্পিকারে খবর শুনছি। অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে অবশেষে ঘুমিয়ে পড়লাম, আব্বু সারারাত জেগে ছিলেন।

“কাডি গেইয়ে... কাডি গেইয়ে” - আব্বুর হঠাৎ এই ডাকে ধরফড় করে ঘুম থেকে উঠলাম। দুপুরের দিকে রেডিওর খবর শুনতে শুনতে কখন চোখ দুটো লেগে এসেছিল খেয়ালই ছিল না। সকাল থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর দমকা বাতাস ছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ঘেটে জানতে পারলাম সন্দ্বীপ, হাতিয়া ও সীতাকুন্ড উপকূল হয়ে ঘূর্নিঝড়টি উত্তর দিকে চলে গেছে। সন্দ্বীপ ও বাঁশখালী উপজেলায় বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে উপকূলবর্তী এলাকাসমূহে। এদিকে পতেঙ্গায় সাগর এখনো উত্তাল, নেভাল একাডেমির সড়ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। যাক-এবারও প্রলঙ্কারী জলোচ্ছ্বাস থেকে আল্লাহ রক্ষা করলেন, যাই জিনিসপত্র সব আবার উপর থেকে নামাতে হবে।

<<<আগের পর্ব         পরের পর্ব>>>

শুক্রবার, ২ জুলাই, ২০২১

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ৩৪

পহেলা বৈশাখ,বাংলা বর্ষের প্রথম দিন। খাজনা আদায়ের সুবিধার্তে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন, এরপর থেকে প্রতিবছর নিয়মিতভাবে পালিত হচ্ছে চৈত্র সংক্রান্তি আর পহেলা বৈশাখ। সকাল সকাল নাস্তা করে বেরিয়ে পড়লাম, গন্তব্য বটতলী স্টেশন। প্রসেনজিত, নাঈম আর আসাদ আমার আগেই এসে পড়েছে স্টেশনে, আমি গিয়ে পৌঁছতেই সবাই মিলে ডেম্যু ট্রেনে উঠলাম। এই রুটে ডেম্যু ট্রেন চালু হয়েছে বেশিদিন হয়নি, আর তাই ট্রেনগুলো এখনো অনেকটা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন আছে। ট্রেনে উঠেই সাব্বিরকে ফোন দিয়ে জানা গেল তারা নাকি বাসে করে যাবে, অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়গামী ট্রেন ছেড়ে দিল আর আমরা সবাই সেলফি তুলছিলাম। 

-কিরে প্রসেন? তোর পানির বোতল আনছিস?

-হ্যাঁ, এইতো । যেখানেই যাই সাথে থাকে সবসময়।

-দে , আমাকে একটু পানি দে।

-ধর, মুখ লাগাবিনা কিন্তু দেখিছ।

ট্রেন ছাড়ার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ষোলশহর স্টেশন এসে পড়ল, কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাত্রছাত্রীরা উঠে পুরো বগি ভর্তি করে ফেলল। হুইসেল বাজিয়ে আবার চালু হলো ট্রেন, ছাত্রছাত্রীরা সবাই বর্ষবরণ করতে সেজেগুজে ক্যাম্পাসে যাচ্ছে। তরুণীদের অধিকাংশই লাল পাড়ের সাদা শাড়ি আর তরুণের পোশাক পাঞ্জাবি। প্রায় ঘন্টা দেড়েক পর ট্রেন ক্যাম্পাসে এসে পৌঁছল, নেমে টঙের সামনে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সাব্বির আর রাশেদের দেখা পেলাম। এরপর সবাই ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলাম। জিরো পয়েন্ট থেকে গল্প করতে করতে হাঁটছি সোজা, ক্যাম্পাস আজ অন্যরকম সাজে সেজেছে। কাঁটা পাহাড় পেরিয়ে কিছুদূর যেতেই চোখে পড়ল বেশ কয়েক ধরণের দেশীয় খেলাধুলার আয়োজন করা হয়েছে। কুস্তি লড়াই, কাবাডি, হা-ডু-ডু ইত্যাদি। শহীদ মিনারের একপাশে আয়োজন কয়া হয়েছে পালা গানের আসর। 

-কিরে অডা, খালি হাডিবি নি? এক মিক্কে যাই এনে বই চল। 

-চল কুস্তি লড়াই দেখি গিয়ে।

হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত রাশেদ আমাকে বলল কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিতে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে সূর্যের তেজ বেড়েছে অনেক, আর তাই এমনিতেই সবাই ক্লান্ত। কুস্তি লড়াই দেখতে দেখতে আবিষ্কার করলাম আমি আর রাশেদ বাদে আর কাউকেই আশেপাশে দেখছি না। এরপর ফোন দিয়ে প্রসেনজিত ও বাকিদের খুজে বের করলাম। নাইম খবর নিয়ে আসলো…

-এই, ওদিকে পান্তা-ইলিশ দিচ্ছে মনে হয়। চল যাই খাই আসি।

-হ, তোরে মাগনা খাবাইবে। গিয়ে দেখ বেচতেছে। প্রত্যুত্তরে প্রসেনজিত নাঈমকে হালকা ধমক দিল। 

ডক্টর ইউনুস ভবনের সামনে একটা ছোট জটলা দেখে সামনে গেলাম, গিয়ে দেখি আসলেই পান্তা-ইলিশ, আর তা টাকার বিনিময়ে। ফ্রি-তে কিছু আছে কিনা খুঁজতে গিয়ে শুনলাম অডিটোরিয়ামে একখানা শর্টফিল্ম আছে, একটু পরই শুরু হবে। শর্টফিল্ম এর নাম “কাটুস-কুটুস”, নাম শুনতে পেয়ে আসাদ বলে উঠল- 

-ক-অরাই ব নি কোন ? 

-আরে পাগলা কামড়াবে কেন? চল..

-চাইছ আবার। 

সবাই মিলে অডিটোরিয়ামে ঢুকে আসন গ্রহণ করলাম, কিছুক্ষণ পর শুরু হলো “”কাটুস-কুটুস”। ক্যাম্পাসের প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে ডিপার্টমেন্টের ছাত্রছাত্রীদের নির্মিত গতানুগতিক শর্টফিল্ম, তবে সময় কেটেছে ভালোই। অডিটোরিয়ামে ঢুকার আগে বাদাম নিয়ে এসেছিলাম, সবাই মিলে খেয়েছি ...শর্টফিল্ম শেষ হয়ে গেছে কিন্তু বাদাম শেষ হয়নি!!!

প্রচন্ড পিপাসায় গলা শুকিয়ে আসছিল, ফিল্ম দেখে বাইরে এসে সবাই মিলে ঠান্ডা কোক আর নাস্তা খেয়ে নিলাম। এরপর সিএনজি করে এক নম্বর গেটে এসে শহরে ফেরার বাস ধরলাম। যেখানেই যাচ্ছিলাম নিজেরা নিজেদের মতো আনন্দ করছিলাম, প্রচন্ড গরমের মধ্যেও আমাদের এই হাসি-ঠাট্টা দেখে বাসে আশপাশের লোকজন একটু কটু দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। কিন্তু তাতে আমাদের থোরাই কেয়ার, এই সোনালী সময় যে আর ফিরে আসবেনা।  

……………………………………………………………………….. 

সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেই ল্যাব ফাইনালের ডেট দেয়া হয়েছে, শেষ না করা ল্যাব রিপোর্টগুলো লিখতে লিখতে ত্রাহিদশা, তার উপর আবার প্রতিদিন এইটা-ওইটা এসাইনমেন্ট। বেশ কয়েকদিন বন্ধ থাকার ফলে স্বাভাবিকভাবেই একটু বেশি চাপ পড়েছে পড়াশুনার। ক্যাম্পাস থেকে ফিরে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম, বিমান বাহীনি ঘাটিতে একটা ব্যাচ পড়াচ্ছিলাম- উচ্চ মাধ্যমিক পদার্থবিজ্ঞান এর ব্যাচ। বিল্ডিং এর নিচে সাইকেল রাখতে রাখতেই লক্ষ্য করলাম ক্রিকেট ফেলে দৌড়ে আসছে দু-তিনটে ছেলে। কাছে আসতেই চিনতে পারলাম... সাকিব, তুহিন আর এলেক্স। 

- আসসালামু-আলাইকুম ভাই, ভালো আছেন?

- হ্যাঁ, আমি তো আছি ভালো। কিন্তু তোমরা আজকে পড়ালেখা বাদ দিয়ে মাঠে কেন?

- ভাইয়া, আজকে একটা ক্রিকেট ম্যাচ আছে। আজকে না পড়াইলে হয় না?

- তো , এটা তোমরা আগে ফোন করে বলবা না?

- সরি ভাইয়া। আজকের ম্যাচটা খুব ইম্পরটেন্ট।

- আচ্ছা যাও, খেল গিয়ে, কি আর করা!

আমার ইচ্ছে করছিল আমিও ওদের সাথে গিয়ে খেলি, কিন্তু মন চাইলেও খেলতে পারছিলাম না। আমার মনের কথা ধরতে পেরেই হয়তোবা সাকিব বলে উঠল

-ভাইয়া, আপনি খেলবেন আমাদের টিমে?

-আরে, আমি খেললে আজকের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ তোমরা হেরে যাবা। বহুদিন খেলার সাথে নাই। 

-আচ্ছা ভাই, আরেকদিন খেইলেন। 

এরপর সাইকেল নিয়ে সোজা চলে গেলাম মুসলিমাবাদ বেড়িবাঁধ, এই বেড়িবাঁধ আসলেই মনটা অনেক ভালো হয়ে যায়। সাগরের কোলঘেঁষে সুবিশাল গাছের সারি আর জেলেপাড়া। স্লুইজ গেট এর পাশে গিয়ে বসে পড়লাম, এভাবে আনমনা হয়ে বসে থেকে আছড়ে পড়া ঢেউ গুনছিলাম আর কখন সন্ধ্যা নেমে এলো টেরই পেলাম না। সাঁজের আকাশে আজ ঘন কালো মেঘের আনাগোনা, একটু পরপর বাজ চমকাচ্ছে আকাশে। একবার ভেবেছিলাম বাড়ি ফিরে যাই, পরে আবার কি মনে করে বসে পড়লুম। মোবাইল সুইচড অফ করে দিয়ে সাগরপাড়ে একাকি জোৎস্না উপভোগ করছিলাম । ঘন কালো মেঘ, জোৎস্না, মৃদু বাজ চমকানো আর ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি … এ যেন এক অন্য রকম পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। প্রকৃতির বিশালতায় মুগ্ধ হয়ে ভার্সিটির ল্যাব রিপোর্ট, এসাইনমেন্ট থেকে শুরু করে সেমিস্টার ফি জমা দেয়ার লাস্ট ডেট সবই ভুলে গেলাম ক্ষানিকের জন্যে। এরপর হঠাৎ করে একটু কাছেই এক বড়সড় বাজ পড়লো, উপর ওয়ালাও আমার সাথে মজা নিচ্ছেন......যেন ধমক দিয়েই বাড়ির পথ ধরতে বললেন।

<<<আগের পর্ব                             পরের পর্ব>>>

 


স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...