শুক্রবার, ১১ জুন, ২০২১

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ৩১

                                                 

“যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায় …”

জীবনের এই কঠিন সত্যটি অনেক আগেই বলে গিয়েছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সেই ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি বিভিন্ন বিদায় অনুষ্ঠানে এই পঙতিটি পাঠ একরকম অত্যাবশ্যকীয় বলা চলে। উচ্চ মাধ্যমিকের বিদায় অনুষ্ঠানের পর দীর্ঘ প্রায় চারটে বছর পর চিরচেনা সেই কলেজ প্রাঙ্গন, চারদিকে আলোর রোশনাই…এ যেন পুরোপুরি এক নতুন ক্যাম্পাস। সন্ধ্যা নেমেছে মাত্রই… টিউশন শেষ করে বাসায় ফিরছিলাম, পথে স্কুলের বন্ধুদের সাথে হঠাৎ দেখা। বেশ খানিকক্ষণ আড্ডা  শেষে বন্ধু ফয়সাল এর জোড়াজুড়িতে আমি, আবদুল্লাহ আর সাদি আমাদের সেই চিরচেনা শাহীন কলেজের গেটের সামনে। এক রকম বলা যায় বিনা রেজিস্ট্রেশনে চলে এলুম, বন্ধু ফয়সাল আয়োজক কমিটির লোক হওয়ায় ঢুকতে তেমন একটা অসুবিধে হলো না।

বহুদিন ধরে হবে হবে করে অবশেষে বেশ ঘটা করে আয়োজন হলো বিএএফ শাহীন কলেজ চট্রগ্রামের এই প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী পুনর্মিলনী। ও করলে আমি করব কিংবা আমরা কজন একসাথে রেজিস্ট্রেশন করব এইরকম হাবিজাবি ধ্যানধারণা, ছোটখাটো গ্রুপিং কিংবা রেজিস্ট্রেশন ফি-র পরিমাণকে কেন্দ্র করে আমাদের ব্যাচের বিজ্ঞান বিভাগে বলতে গেলে কেউই রেজিস্ট্রেশন করেনি। হাতে গোনা দুয়েকজন রেজিস্ট্রেশন করেছে, আর আমরা এই কজন বন্ধুরা মিলেতো বলা চলে একরকম চোরের মতো ঢুকে পড়লুম এই পুনর্মিলনীতে। ব্যাবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগের অনেকেই রেজিস্ট্রেশন করেছে, তাদের অনেকের সাথেই দেখা হয়ে গেলো যেতে যেতে। বহুদিন পর কলেজের আঙ্গিনায় পা রাখলুম, এ যেন এক ভিন্ন অনুভূতি। এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করে ক্ষাণিকের জন্যে বসে পড়লুম শ্রেণিকক্ষের বেঞ্জিতে। প্রায় একযুগ, শিক্ষাজীবনের প্রায় পুরোটাই জুড়ে এই বিদ্যাপীঠ…মনে পড়ে গেলো বহু পুরোনো স্মৃতি। ফয়সাল কিছুক্ষণ পর কোত্থেকে বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়ে এলো… এরপর আমি, আবদুল্লাহ, সাদি ও আরিফ মিলে প্যাকেটগুলো সাবাড় করে নিলুম। শিক্ষকদের অনেকেই ইতোমধ্যে চলে গেছেন, মাঠের ওদিকটায় কনসার্ট হচ্ছে … আশেপাশে সিনিয়র জুনিয়র ভাই-বোনেরা আনন্দ-উল্লাস করছে। রাত বাড়ায় বন্ধুদের থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম, সকালে আবার ভার্সিটির ক্লাস আছে।

নতুন সেমিস্টারে এনরোলমেন্ট এর সময় মেশিন-১ কোর্সখানার নাম শুনে যতটা না উৎসাহী হয়েছিলাম, বাস্তবে এসে দেখি ঠিক তার উল্টো স্বাধ। সামিনা ম্যাম স্লাইডে একের পর এক শীট পড়িয়ে যান, আর এদিকে আমরা সমানে গল্প করে যাই। আজ হঠাৎ করেই ম্যাম বলনেন- “গত ক্লাস আর আজকে মিলে যা পড়াইলাম তার উপর টেস্ট নিবো এখন। বই, খাতা শিট সব বন্ধ করো, CR গিয়ে অফিস থেকে খাতা নিয়ে আসো।” পুরো ক্লাস একসাথে চেঁচামেচি শুরু করে দিলো- “না না ম্যাম, আজকে না।” হঠাৎ করে ম্যাম গর্জে উঠে দিলেন এক ধমক , আর সাথে সাথে পুরো ক্লাস চুপ। 

এতটা কড়াকড়িভাবে পরীক্ষা নেয়া হবে তা কেউই আঁচ করতে পারেনি, এমনকি কোন টপিক নিয়ে পড়ানো হচ্ছিল তা উপস্থিত ছেলেপিলেদের অর্ধেকই জানে না। ম্যাম বোর্ডে প্রশ্ন লিখা শুরু করলেন, বোর্ডের দুই ভাগে দুটি প্রশ্ন লিখলেন যাতে করে পাশাপাশি দুজনের প্রশ্ন ভিন্ন হয়। আমার ভাগ্যে পড়ল- “Four point DC motor starter construction, diagram and working principle” আজকের ক্লাসেই এই টপিকখানা পড়িয়েছেন ম্যাম, আর এটাই কিনা আমার ভাগ্যে পড়ল! মোটরের স্টার্টার নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, ডিসি মোটর অন করার সাথে সাথে  হাই কারেন্ট ফ্লো হয় যা মোটরের কয়েলের ক্ষতি করতে পারে, আর তাই স্টার্টারের মাধ্যমে মোটর চালু করা হয় যা কিনা সেই হাই কারেন্টকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এই বিষয়ে আমি জানতাম কিছু ইন্ডিয়ান চ্যানেলের ইউটিউব ভিডিও দেখে, পাশাপাশি জাহিদের সাথে একখানা মোটর রিপেয়ারিং শপে গিয়ে এই স্টার্টার এর হাতে কলমে কাজ দেখেছি। কিন্তু ম্যাম যখন এই টপিকখানাই পড়াচ্ছিলেন তখন অন্যমনস্ক ছিলাম। এই স্টার্টার এর ভিতরে কি আছে না আছে আর কিভাবেই বা কাজ করে তা লিখতে পারব, কিন্তু ডায়াগ্রামখানা ঠিকঠাক আঁকার কনফিডেন্স ছিলনা... আর তাই ম্যাম প্রশ্ন লিখতে লিখতেই গুগল মামার কাছ থেকে ডায়াগ্রামখানা এক নজর দেখে নিয়েছিলাম।খাতা হাতে পাওয়ার পর-পরই নাম-ধাম না লিখে আগে ডায়াগ্রামখানা আঁকা শুরু করে দিলাম।কোন রকমে ছবিখানা অংকন করে বানিয়ে বানিয়ে নিজের মতো করে বর্ণনা লিখে দিলাম। কাহিনী আরো অপেক্ষা করছিল, ম্যাম পরীক্ষা শেষেই বসে বসে সবগুলো খাতা কাটলেন। এরপর একে একে নাম ডেকে খাতা দিচ্ছিলেন…

- ৭২৮, এই খাতাটা কার? নাম-ধাম কিচ্ছু লিখে নাই কেন?

- ম্যাম, ৭২৮ আমি। ভয়ে ভয়ে দাঁড়ালাম, না জানি কপালে কি আছে আজ!

- উঠে সামনে এসে দাঁড়াও । 

মাথা নিচু করে কাঁচুমাচু হয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম…

- আজকের পরীক্ষায় হায়েস্ট পেয়েছে ও, নাম ধাম কিছু লিখ নাই কেন?

- ম্যাম, তাড়াহুড়ায় মনে ছিল না। (নাম ধামের চেয়ে মাথায় থাকা ডায়াগ্রাম তাড়াতাড়ি আঁকতেই বেশি মনযোগী ছিলাম) 

- এই সবাই চুপচাপ কেন? ওকে কনগ্রেটস জানাও। 

খাতা হাতে নিয়ে দেখি দশে দশ। কি থেকে কি হয়ে গেল কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না, শুধু এটুকু বুঝতে পারছিলাম ক্লাসের মধ্যে অপ্রত্যাশিতভাবে সাময়িকের ভালো ছাত্র বনে গেছি আর তাই একটু ভাবসাব নিতে হবে যে পড়ালেখা করে আসছিলাম !!!  

একটা ক্লাস শেষ হবার পর আরেকটা শুরু হবার মাঝের সময়টাতে যা হইচই চলে ক্লাসে, নানাজন নানা কাজে ব্যাস্ত এই সময়টাতে। বেশ খানিক্ষণ পর আসিফ স্যার ক্লাসে ঢুকলেন। আসিফ স্যার আমাদের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড এন্ড ওয়েভ কোর্সখানা পড়াচ্ছেন। ফিল্ড এন্ড ওয়েভের আগামাথা পুরোটাই মাথার উপর দিয়ে যায়, আর সবার কি হয় না হয় জানিনা…তবে কেন জানি আমার কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে বলে মনে হয়। মাথায় কেবল ঘুরপাক খায়, এই কোর্সে কিভাবে পাশ করব?

- এই তুমি দাঁড়াও,হ্যাঁ… সবুজ শার্ট।

- স্যার আমি?

- হ্যাঁ, বলো বাউন্ডারী কন্ডিশন গুলা কি?

- “এইটা আবার কি? বাউন্ডারী মানে তো চার-ছক্কা, বল গড়িয়ে সীমানায় লাগলে চার আর উড়ে গিয়ে পড়লে ছক্কা-এইটাই মনে হয় বাউন্ডারী কন্ডিশন” – মনে মনে বিড়বিড় করছিলাম কিন্তু বলবার সাহস পেলাম না।

- এভাবে ঘুমাই ঘুমাই পাশ কেমনে করবা? এরপর রিটেক আর রিকোর্স নিতে নিতে জান বাইর হই যাবে। দাড়াই থাকো,তাইলে আর ঘুম আসবে না।

কি এক বিপদে পড়লাম, মাত্রই চোখ দুটো লেগে আসছিল আর সাথে সাথেই স্যারের চোখে পড়ে গেলাম। নাহ ভবিষ্যৎ অন্ধকার আমার, একই দিনে দুরকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম...একবার ভালো ছাত্র, আরেকবার অমনযোগী। এই দুপুরের অসময়ের ক্লাসটা শেষ হতে না হতেই হইহই করে সকলে বেরিয়ে পড়লাম, আজকে আর ক্লাস নাই। অন্য গ্রুপের ল্যাব আছে, আমরা কয়েকজন মিলে শিল্পকলার দিকে চললাম। জিগর না কে যেন বলেছিল শিল্পকলায় Archfest-2016 আয়োজিত হচ্ছে, মানে স্থাপত্যশৈলীর প্রদর্শনী হবে হয়তো। হাটতে হাটতে আমরা জনা সাতেক বন্ধুরা মেহেদিবাগ পেরিয়ে শিল্পকলায় এসে পৌঁছলুম, সেই মুক্তমঞ্চ…মিলনায়তন…আর্ট গ্যালারি। শিল্পকলায় প্রথম এসেছিলাম মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে, “মার্কস অলরাউন্ডার” নামে এক প্রতিযোগীতার জেলা পর্যায়ের সিলেকশান পেয়েছিলাম। প্রাথমিক বাছাইয়ে আবৃত্তি, ছবি আঁকা আর কুইজ বিভাগে মনোনীত হয়ে জেলা পর্যায়ে এসেছিলাম। কিন্তু জেলা পর্যায়ে আগের তিনটার সাথে নাচতে ও গাইতে বলার পর আমার খেল খতম। বন্ধুরা সবাই শিল্পকলায় ঢুকেই আর্ট গ্যালারির দিকে গেলাম, সত্যিই আর্কিটেকচার এর ছাত্রছাত্রীরা খুব সৃষ্টিশীল। কাঠ, পেরেক, বোর্ড, কাগজ, কাপড়,লোহা-লক্কর, ইট-রড-সিমেন্ট, বাঁশ ইত্যাদি যে কোন উপাদান দিয়ে দারুণ দারুণ সব চিত্রকর্ম থেকে শুরু করে সৃষ্টিশীল উদ্ভাবনীতে তাদের জুড়ি মেলা ভার। আমরা সব বন্ধুরা শিল্পকর্ম বোঝার চেয়ে ছবি তোলায় বেশি মনযোগী ছিলা, এদিক সেদিক গিয়ে বিভিন্ন পজিশন নিয়ে ছবি তুলে ঘোরাঘুরি করে বেরিয়ে এলাম। ভেবেছিলাম নাস্তা-পানির কোন ব্যাবস্থা থাকবে, কিন্তু নাহ…সবকয়টা বেরিয়ে এসে বাইরে চা-নাস্তা করে যে যার গন্ত্যব্যে পা বাড়ালাম।  

<<< আগের পর্ব         পরের পর্ব>>>

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...