রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ১৫


মুসলিমাবাদ রোডে এসেই ভাবলাম আজ বেড়িবাঁধ এর দিকে যাওয়া যাক, ভালো কিংবা খারাপ সময়ে আমার পছন্দের স্থানগুলির মধ্যে এই মুসলিমাবাদ বেড়িবাঁধ অন্যতম। বন্ধু সৈকতকে একটা কল দিলাম…

-হ্যালো, দোস্ত কই তুই? আমি মুসলিমাবাদ বেড়িবাঁধ এর দিকে যাচ্ছি, সাইকেল নিয়ে পারলে আইসা পড়।

-ওকে মাম্মা। স্লুইস গেটের কাছাকাছি থাকিস।

-আচ্ছা।

আমাদের উত্তর পতেঙ্গার এই মুসলিমাবাদ এলাকার বিশাল অংশ জুড়ে জেলে সম্প্রদায় এর বসবাস। জীবিকা অন্বেষণের তাগিদে জেলেরা সাগর পাড়েই গড়ে তুলেছে তাদের আবাসস্থল। সাগর পাড়ের বাঁধের পরেই উঁচু মাটির ঢিপিতে গড়ে তোলা তাদের ছোট্ট ছোট্ট কুটির। এই এলাকারই সন্তান প্রখ্যাত লেখক হরিশংকর জলদাস তার বিভিন্ন উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলেছেন এই জেলেপল্লীর জীবনচিত্র।

সন্ধ্যা নামতে আরো কিছু সময় বাকি আছে, এই সময়টা সাগরপাড়ে কাটাতে আমার খুব ভাল লাগে। সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি শেষে জেলেরা তাদের বিশাল বিশাল জাল নিয়ে ঘরে ফেরে, সাথে থাকে হরেক রকমের সামুদ্রিক মাছের সমাহার। তবে ইলিশ আর লইট্টা ইচা মাছের জন্যে এই স্থানটি বিখ্যাত। আশে-পাশের বিভিন্ন বাজার থেকে ব্যাবসায়ীয়া আসে মাছ কিনতে। জেলেরা একে একে সাগর থেকে মাছ নিয়ে ফেরে আর শুরু হয় নিলাম ডাকাডাকি। নিলামে কম-বেশি দাম হেঁকে ছোট-বড় ব্যাবসায়ীরা নিয়ে যায় সামুদ্রিক মাছ আর চওড়া দামে বিক্রি করে স্থানীয় বাজারে।

আশেপাশে আছে বেশ কিছু চিংড়ির ঘের, সাগরের নোনা জল নিয়ন্ত্রণ করার তাগিদে তৈরী করা হয়েছে বড় বড় দুটি স্লুইস গেইট। এই স্লুইস গেইট এর পাশেই আমার জগতের চির প্রশান্তি, শোঁ শোঁ করে বইতে থাকা প্রাণবন্ত বাতাস আর নিচে বন্ধ স্লুইস গেটে ঝাপটে এসে পড়া স্রোত। পেছনের চিংড়ির ঘেরগুলিতে নিয়ম করে স্লুইস গেট খুলে পানি নেওয়া হয়। কিছুক্ষণ বসতেই পেছন থেকে ডেকে উঠে একটি পরিচিত কণ্ঠ…

-কি অবস্থা দোস্ত? দিনকাল কেমন যায় ?

-এইতো চলছে ভালোই। তোর ?

-আর কইস না ভাই, মাইয়া মাইনষের ঝামেলা বহুত বড় ঝামেলা।

-হা হা হা, এজন্যে কথায় আছে “সিঙ্গেলই মঙ্গল”।

-হুম ঠিক। তা তোর কাজ কামের কি খবর? নতুন কিছু বানাইলি ?

-কই আর, অই একটা মিনি আইপিএস বানাইছি আরকি।

-ও আচ্ছা। ভালো।

এভাবে গল্প-আড্ডায় সূর্যাস্ত উপভোগ করছিলাম দুজন, আর রোমন্থন করছিলাম আমাদের ফেলে আসা স্কুলজীবনের স্মৃতিগুলো। কিছু সময় গড়াতে না গড়াতেই আকাশ ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেল, শুরু হলো বজ্রপাত। এবার বোধ হয় বাড়ির পথ ধরতে হবে, যেকোন সময় বৃষ্টি নামতে পারে।

বাড়ি ফিরেই কাজে লেগে গেলাম… টি-শার্ট এ প্রতিবাদী কিছু একটা লিখতে হবে। গোলাপী রঙটা আমার একেবারেই পছন্দ না, ছোট খালার এই ঈদে দেয়া একটা গোলাপী টি-শার্ট কেই তাই বলির পাঁঠা করলাম। গেঞ্জিটার মাঝামাঝি প্রথমে পেন্সিল দিয়ে VAT লিখলাম। এরপর একটা বড় গোলাকার বাটি নিয়ে গোল্লা এঁকে দিলাম এর চারপাশে, গোল্লার উপর দিক করে আঁকলাম একখানা আশ্চর্যবোধক চিহ্ন। ডানদিকে বুকের উপরে কিছু বই-পুস্তক আঁকলাম। সবশেষে বড় গোল্লাটাকে একপাশ থেকে কেটে দিলাম…আর পেন্সিলের আঁকাআঁকি গুলো কালো মার্কার পেন দিয়ে বোল্ড করে দিলাম। গায়ে দিয়েই আয়নার সামনে দাঁড়ালাম আর মনে মনে বলছিলাম- নাহ, আমরা উচ্চশিক্ষায় কোন ভ্যাট দিব না। হঠাৎ বেজে উঠল ফোন…

-বন্ধু, বাসায় আছিস?

-হ্যাঁ, লিমন …আছি। তুই চিটাগং আসলি কখন?

-এইতো, আজকেই এলাম। ন্যাশনাল আইডি কার্ড তোলা লাগবে, নির্বাচন কমিশন অফিস যাওয়া লাগবে কাল।

-আচ্ছা, আমার ক্যাম্পাস এর কাছেই অফিস। আমার সাথে যাস সকালে।

লিমন আমার স্কুলের বন্ধু, ঢাকায় বেশ নামকরা এক প্রাইভেট ভার্সিটি তে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। সকালে ওকে নিয়ে ক্যাম্পাসে আসার পথে আলোচনায় যা বুঝলাম এই ভ্যাট নিয়ে ওর তেমন কোন মাথা ব্যাথা নাই। ওর ভাষ্য মতে ৩০-৪০ হাজার টাকা সেমিস্টার ফি দিতে পারলে এই অতিরিক্ত পাঁচ-ছয় হাজার টাকা কিছুই না। অথচ আমাদের কাছে এই পাঁচ-ছয় হাজার টাকাই অনেক কিছু তা ওকে কি-করে বোঝাই?

ক্যাম্পাসে পৌঁছেই দেখি নিচতলার ক্যান্টিনে সব সেমিস্টার এর শ্রেণী-প্রতিনিধিরা মিলে একসাথে আলোচনা করছে, আজকের মানববন্ধন কিভাবে সফল করা যায় এই নিয়ে। ইতোমধ্যেই উচ্চশিক্ষায় ভ্যাট ১৫% থেকে নামিয়ে ৭.৫% করার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু আমাদের দাবী একটাই- আমরা এক পয়সাও ভ্যাট দিব না।

ক্লাসের শুরুতেই আমি আর রাশেদ সবার সামনে গিয়ে কিছু বক্তব্য রাখলাম। আমরা Mecceleration নামের একটা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছি, রেজিস্টেশন আর যাওয়া আসা নিয়ে প্রায় তিন-চার হাজার টাকা যাবে। তাই ক্লাসের বাকিদের থেকে ভেবেছিলাম অন্তত এক হাজার টাকা হলেও সাহায্য পাবো। কিন্তু আমাদের কে হতাশ করে দিয়ে কেউ কেউ দু-চার-পাঁচ-দশ টাকা করে দিল, আর অধিকাংশই দিল না। গুণে দেখি ৭৫ টাকা মাত্র, ১০০ টাকাও দিতে পারল না এই ৪০-৫০ জন মিলে। রাগে ক্ষোভে যার যার টাকা তাকে ফিরিয়ে দিলাম, দু-এক সপ্তাহের হাত খরচার টাকা বাঁচিয়ে নিজেদের টাকা দিয়েই যাবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। সকালের ক্লাসগুলো শেষে আমি আর রাশেদ গিয়ে সেন্ট্রাল লাইব্রেরি তে বসলাম, মানববন্ধন শুরু হতে আরো ঘন্টাখানেক সময় আছে। আলোচনার এক পর্যায়ে রাশেদ জানালো, চট্রগ্রামে জলাবদ্ধতা সমস্যা একটা চিরাচরিত সমস্যা। এইটা নিয়ে কিছু করতে পারলে ভাল হবে। কিন্তু মাত্র প্রথম বর্ষের ছাত্র হয়ে কি করব মাথায় ঢুকছিল না…তাই ভাবলাম চাক্তাই খাল নিয়ে কিছু একটা করা যায়। চাক্তাই খাল চট্রগ্রামের ব্যাবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র, প্রতিদিনকার ময়লা আবর্জনায় ভর্তি হয়ে এই খাল এখন মৃতপ্রায়। এই খালের বিভিন্ন পয়েন্টে আবর্জনা পরিষ্কারের কোন সয়ঙ্ক্রিয় ব্যাবস্থা রাখার প্রস্তাবনা দিয়ে কিছু একটা করা যায়। যেই ভাবা সেই কাজ আমি আর রাশেদ দুজনে মিলে লাইব্রেরির কম্পিউটারে বিভিন্ন বই-পুস্তক ও পিডিএফ ডকুমেন্ট ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করলাম।

চাক্তাই খাল নিয়ে একখানা গবেষণাপত্র পড়ে দীর্ঘ আলোচনার পর আমরা দুজনে স্বিদ্ধান্তে আসলাম, চাক্তাই খালের ম্যাপটা আমরা ত্রিমাত্রিকভাবে উপস্থাপন করব…আর্কিটেকচার এর ছাত্রছাত্রীরা যেমনটা করে আরকি। কিছু পয়েন্ট সিলেক্ট করে আমার ডিজাইন করা একটা সয়ঙ্ক্রিয় যন্ত্রের মডেল বসিয়ে দেব। রাশেদের ভাষায় – “একটা প্রজেক্টে সব রকম ফ্লেভার থাকবে, আর্কিটেকচার, সিভিল-এনভাইরনমেন্ট, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল ডিজাইন এই আরকি”। তখন যে কি রকম বোকা ছিলাম আর কিসব বিদঘুটে কাজ করছিলাম তা ভাবলেই এখনো হাসি পায়।

-দোস্ত, এই পিডিএফ থেকে ম্যাপটাকে বড় করে প্রিন্ট করতে হবে। রাশেদকে উদ্দেশ্য করে বললাম আমি।

-অ আইচ্ছে। ওমর ফারুক আছে, ইতা গ্রাফিক্স এর কাজ পারে। ওকে বলে দেখি চল।  

বিশাল লাইব্রেরির একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতেই দেখলাম মুখে ঘন শ্মশ্রুমন্ডিত এক যুবককে কেন্দ্র করে বেশ কিছু ছেলেপিলে কম্পিউটার এর বেসিক পাঠ নিচ্ছে। পরিচয় হতে না হতেই তাকে আমাদের সমস্যার কথা জানালাম। বাকি সব কাজ ফেলে খুব হাসিখুশিভাবে ছেলেটা আমাদের সাহায্য করতে শুরু করল।

-পিডিএফ উর তুন ম্যাপ ইবে বাইর গরি এনে আরেউজ্ঞে সিংগেল ম্যাপ পিডিএফ বানাই দিলে অইবু নে?

-অ, অইবু। যাতে ডাইরেক্ট ম্যাপ প্রিন্ট গরন যা।

-অ, যাইবু যাইবু। দুই মিনিট উর কাম।

রাশেদের কলেজের বন্ধু এই ওমর ফারুক, আমাদের সাথেই দ্বিতীয় সেমিস্টার। তবে এ সেকশানে, আর আমরা বি সেকশানে। ওইদিন ফারুকের সাথে সাথে সুব্রত নামের আরেকটা ছেলের সাথেও খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেল। সুব্রত আমাদের সাথে Mecceleration প্রতিযোগিতায় যাবার জন্যে একপায়ে খাড়া, প্রয়োজনে অর্ধেক টাকা সে দেবে। একদিকে টাকাপয়সার সংকট আরেকদিকে তিনজন হলে রেজিস্ট্রেশন টাও করে ফেলা যেত…এই ভেবে সুব্রত কে দলে নিয়ে রাশেদ কে রেজিস্টেশন করে ফেলার দায়িত্ব দিলাম।

দুপুরের কড়া রোদ, এর মাঝেও প্রবর্তক মোড়ে ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির সব ছাত্রছাত্রীরা একে একে জমায়েত হতে শুরু করেছে। শাওন এর কাছে শুনলাম, বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম-কে নাকি আগে থেকেই জানানো হয়েছে আর থানা থেকেও অনুমতি নেয়া হয়েছে এই শান্তিপূর্ন মানববন্ধনের। আমিও আর দেরি না করে ব্যাগ থেকে টি-শার্ট খানা বের করে পরে নিলাম…ওয়ারিফ ও পরে নিল তার টি-শার্ট। নোবেল, সিফাত, ওয়ারিফ, রাশেদ, সাব্বির, রিয়াদ, তানভীর সহ আমরা বেশ কজন মিলে গ্রুপ ছবি তুলে নিলাম ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাইকে ঘোষণা আসল- “এই, তোমরা সবাই লাইন করে ফেল, প্রবর্তক মোড় থেকে শুরু হবে এই হিউম্যান চেইন…হাতে হাত ধরে দুই নাম্বার একাডেমিক ভবন পর্যন্ত”। কম্পিউটার প্রকৌশল অনুষদের রাহুল ভাই হ্যন্ডমাইকে কথাগুলো বলছিলেন।

“সি-আর রা সবাই যার যার সেকশনের ছেলেপিলেদের লাইনে নিয়ে আস”

আমরা আর কালবিলম্ব না করে লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। ওয়ারিফ আর নাদিয়া দেখলাম বেশ কিছু রঙিন কাগজে স্লোগান লিখে লিখে প্রত্যেকের হাতে হাতে দিচ্ছে, আমিও লাইন থেকে বের হয়ে ওদের সাথে হাতে হাত লাগালাম। এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল না তাই। সময় যত গড়াচ্ছিল সূর্যের দাবদাহ ততোই বাড়ছিল, ইতোমধ্যে আমরা সমাই ঘেমেনেয়ে একাকার। উপর থেকেও কোন ঘোষণা আসছিল না, ঠিক কতক্ষণ ধরে চলতে পারে এই মানববন্ধন। রাস্তার এপাশে-ওপাশে ছাত্রছাত্রীরা লাইন করে দাঁড়িয়ে গেছে। আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে আশে পাশের দু-একটি প্রাইভেট ভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা। সবার মুখে একটাই স্লোগান “NO VAT, NO VAT”। এই নো-ভ্যাট, নো-ভ্যাট করতে করতে বার কয়েক আমার হাসি চলে আসছিল…কিভাবে সম্ভব !

টিভি ক্যামেরা আর সাংবাদিকদের দেখেই ছাত্রছাত্রীরা সবাই সিরিয়াস হয়ে উঠেছে। আগের চেয়ে গর্জনের ধ্বনি খানিকটা বেড়েছে বলা চলে। সবার সমস্বরে মিলিত ধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলছিল আশে পাশের দেয়ালে। এ এক চরম অভিজ্ঞতা, যা আগে কখনো হয়নি। সিনিয়র ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বেশ ক’জন মিডিয়ার সামনে তাদের বক্তব্য রাখলো আর এই প্রতিবাদ সমাবেশ নিয়মিত হবে বলে ইঙ্গিত দিয়ে গেল। দিনশেষে সবাই ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত, সুশৃঙ্খলভাবে এমন একটা মানববন্ধন করা গেছে সেই অনেক। সামনের দিনগুলি অনিশ্চয়তায় ভরা, কি হবে না হবে এই আন্দোলনের ফলাফলই বা কি হতে পারে এই ভাবতে ভাবতে বাড়ির পথ ধরা।


<<<<আগের পর্ব     পরের পর্ব>>>> 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...