গত দুদিন ওয়ারিফ আর জিগর ধরে ধরে সব
পোলাপান কে গ্রুপে এড করছে, ভার্চুয়াল জগতে আমাদের ভার্চুয়াল আড্ডাখানা।
গ্রুপখানা আমার নিজেরই গঠন করা, সকাল সকালই গ্রুপে ঢুকে শ্রেণি প্রতিনিধিদের দেয়া পোস্ট দেখে জানতে পারলাম সকালে শারমিন ম্যামের ক্লাস , বিষয় সার্কিট-১। ব্যাপারটা বেশ ভালোই, সব রকম খোজ খবর হাতের কাছেই পাওয়া যায়। আম্মুর হাতে বানানো পরোটা আর চা খেয়েই আদ্র আর উষ্কখুষ্ক চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বাসা থেকে বের হচ্ছিলাম।
“তুই আর মানুষ হইলি না, ভার্সিটি তে
পরছ আর চলাফেরা ডোম-চামার এর মতো।”-রান্নাঘর থেকে আম্মার কর্কশধ্বনি।
প্রতিনিয়ত এসব শুনতে শুনতে আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি, স্কুলে তো আয়েশা ম্যাম সরাসরি বস্তির ছেলে বলেই ডাকতো। অনেক সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে চিরুনি নিয়ে চুলে হালকা আঁচড় কাটলাম…… ধুর, ডানহাতে অল্প পানি নিয়ে আমার হালকা ঝাড়ি দেয়া চুলের স্টাইলই ঢের ভালো।
“এই ফ্রিপোট, কাস্টম, বিশ্বরোড, আগ্রাবাদ, ডেনহাট, জিইসি-ওয়াসা, ২ নম্বর, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, টার্মিনাল, রাস্তার মাথা – রাস্তার মাথা ”- কাটগড় বাসস্ট্যান্ড মোড়ে এভাবে হাঁকাতে থাকা এক রাইডারে দৌঁড়ে উঠলাম। বড় বাসে জিইসি পৌঁছতে দেড় ঘন্টার উপর লেগে যাবে, এই ছোট গাড়িগুলা একটু দ্রুত যায় বলে ১ ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছানো যায়।
-“আরে দোস্ত, তুই? তোর বাসা কি এদিকে
নাকি?”- ফ্রিপোর্ট থেকে উঠা গাট্টাগোট্টা চেহারার স্বাস্থ্যবান এক ছেলে আমাকে দেখেই
প্রশ্ন ছুড়ে দিল। ক্লাসের সব বন্ধুদের সাথে এখনো ঠিকঠাক পরিচিতি হয়ে উঠেনি। মুখ দেখা
চেনায় বলে উঠলাম-
-“হ্যাঁ, আমা বাসা তো কাটগড়। তোর? ”
- এইতো , নেভী কলোনী তেই।
-“আচ্ছা নাম কি যেন তোর? ”
-নিলয় , শাহরুল নিলয়।
-“ও আচ্ছা হ্যাঁ হ্যাঁ। ফেসবুক আইডি
শ্যামবালক নিলয়?”
– “হ্যাঁ”
“শ্যাম মানে কালো, এই নাম তো আমার হওয়া উচিত ছিল, বরংচ "গাট্টাগোট্টা নিলয়" বা "হোঁৎকা নিলয়" দিলে মন্দ হতো না” – মনে মনে বললাম আমি। সল্টগোলা ক্রসিং থেকে কাস্টমস ব্রিজ এর দিকে রাস্তা খালি পেইয়ে রাইডার সাঁই সাঁই করে ছুটছে, একদম পেছনে বসা দু-এক জন যাত্রী ভয়ে চেঁচামেচি শুরু করে দিল- “এ ভাই আস্তে চালান, এ ভাই মরি যাইয়ুম তো”
আমি বেশ ভালোই মজা পাচ্ছি, নগদে রোলার কোস্টার এর ফিল নিচ্ছিলাম। শ্যামবালকের সাথে গল্প করতে করতে কবে যে জিইসি এসে পড়লাম খেয়াল নাই, তাড়াহুড়ো করে রাইডার থেকে নেমে দুজনে হাঁটা শুরু করলাম প্রবর্তক এর উদ্দেশ্যে।
আজও দেরি হয়ে গেল রুটিন ধরে রুম নম্বর খুজতে খুজতে। এই রুম নম্বর ধরে রুমে রুমে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতেই স্নাতকের দিনগুলি গেছে। এই রুমে প্রজেক্টার সমস্যা, অই রুমে চল… অই রুমে আবার এসির সমস্যা কিংবা কোন স্যার সিটি নিচ্ছেন, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকো… ইত্যাদি ইত্যাদি।
অনুমতি নিয়ে ক্লাসে ঢুকেই একদম পেছনে গিয়ে বসলাম, পেছনের দিকে এসিগুলো থাকে আর এসির হাওয়ার ঘুমানোর মজাই আলাদা। ইতোমধ্যেই পুরো বোর্ড আঁকিবুঁকি করে ভরিয়ে ফেললেন শারমিন ম্যাম। ডিসি সার্কিট, সিরিজ-প্যারালাল, কার্শফ রুল, ভোল্টেজ ডিভাইডার রুল হাবিজাবি সার্কিটে সার্কিটে পুরো ক্লাসের পরিবেশ থমথমে। ক্লাসেই কেউই আসলে কিছুই বুঝতেছিল না, না পারছিল বলতেও কারণ ম্যাম যে গতিতে পড়াচ্ছিলেন। আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল ম্যাম গলাধঃকরণ করে জ্ঞান হড়হড় করে বমি করছেন শ্রেণিকক্ষে, থামলেই গলায় আটকে যাবে জ্ঞান।
খাতা-কলম নিয়ে একসাথে লিখা আর ঘুমানো খুব স্কিলফুল একটা কাজ, যে সে এটা পারেনা। বরাবরের মতো আমিও ব্যর্থ, লিখতে লিখতে কয়েকবার ঘুমিয়ে কয়েকবার উঠেছি। ক্লাস শেষে সবাই "এই নদী ","এই নদী" করে হাঁকছিল। আমিও নদীর খাতার ছবি তুলে নিয়ে আবার আমার চেয়ারে গিয়ে বসলাম, এই যা… কোন নদী সেটা তো জানা হলো না। পরে অবশ্য জেনেছিলাম- "নাদিয়া নদী"।
একঘন্টার একটা ক্লাস বিরতির পরেই
ICS ল্যাব। আনিস-মীরদের সাথে আজ গেলুম মজনুর টং এ নাস্তা করতে।
“এ মামা চা লন, মামা কি কফি চা খাবেন ? এই নেন মামা গোল্ডলিফ” – একাহাতে সমান তালে সার্ভ করছে, টাকা নিচ্ছে আবার ভার্সিটির ছেলেদের সাথে একান্তই আপনজনের মতো কথোপকথন চালিয়ে যাচ্ছে। চট্রগ্রাম মেডিকেলের এই উত্তর দিকের গেটটা প্রায়ই বন্ধ থাকে, মাঝে মধ্যে খোলা হয়। আর গেটের পাশ ঘেঁষেই মজনু মামার টং, প্রশস্ত হিজলার খালের উপর ছোট্ট কালভার্টের উপর জমে ভার্সিটির ছেলেমেয়েদের আড্ডার আসর। কফি চা টা খেতে মন্দ না, কিন্তু আজ লাঞ্চ করা যায় কোথায়? ভার্সিটির ক্যাফেটেরিয়া তে খাবারের দামের কারণে আজ বাইরে বের হওয়া, প্রবর্তক মোড়ে বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট। গলাকাটা দাম নেয়ার ভয়ে ওদিকে আর গেলুম না, বন-কলা দিয়েই লাঞ্চ সেরে নিলাম।
কম্পিউটার ল্যাবটা অনেক সাজানো গোছানো,
শুনেছি সব মিলিয়ে ৬-৭ টার মতই কম্পিউটার ল্যাব আছে। ল্যাবে ঢুকেই একটা ডেস্কটপের সামনে
বসে পড়লাম। যে কোন কম্পিউটার পেলেই কি কি সফটওয়্যার ইন্সটল আছে এটা চেক করা আমার পুরোনো
স্বভাব। এদিকে বাকি সবাই যে যার মতো আড্ডায় ব্যাস্ত। হঠাৎ করেই সুন্দরী একজন ম্যাম
ক্লাসে ঢুকলেন।
“আমি সাবরিনা তারান্নুম, তোমাদের CSE ডিপার্টমেন্ট এর লেকচারার। তোমাদের Theory ক্লাস আর ল্যাব দুটোই আমি নেব। এই যে দেখ বালাগুরুস্বামীর সি প্রোগ্রামিং এর এই বইটা তোমরা কিনে নিবা”- এসেই পরিচয়পর্ব শেষে সরাসরি টপিকে চলে গেলেন ম্যাম। প্রোগ্রামিং বলতে গেলে কিছুই বুঝিনা তখন, কি থেকে যে কি হয়ে যাচ্ছে আগা মাথা কিছুই ঠুকছিল না মাথায়। বেশ কিছুক্ষণ থিওরেটিক্যাল কথাবার্তা শেষে “Turbo-C” নামের একটি সফটওয়্যার খুলে বোর্ডে লিখে দেয়া প্রোগ্রাম টাইপ করতে বললেন ম্যাম। চোখে শুধু নীল আর নীল দেখছিলাম তখন, টাইপ করতে করতে ত্রাহিদশা।
সময় গড়িয়ে চলে, বেশ কজনই প্রোগ্রাম কমপাইল করে রান করে ফেলেছে। আমি এখনো টাইপিং শেষ করে উঠতে পারিনি। যেইনা টাইপ শেষ করে কমপাইল দিয়েছি, ওমা একি এতো এরর কেন?
“সি প্রোগ্রাম হলো কেস সেনসিটিভ, এইযে এখানে stdio.H এর H ছোট হাতের , মেইন এর ভেতর প্রত্যেকটা লাইন শেষে সেমিকোলন হবে”- মিষ্টি গলায় বুঝিয়ে দিলেন ম্যাম।
এই কেস, এত ক্যারেক্টার যে মেইনটেইন করে কোড লিখতে হয় এইটা তো ক্লিয়ার করল না, নাকি ক্লাসে ঘুমাই ছিলাম কে জানে… এসব ভাবতে ভাবতেই দেখি কোড রান হয়েছে। উপস্থিত অনেকেই দেখলাম নিজ নিজ মোবাইল এর ক্যামেরা দিয়ে মনিটর স্ক্রীনের ছবি তুলছে। জীবনে প্রথম প্রগ্রামিং এর প্রথম কোড এর সাথে ছবি না তুললেই নয় এই ভেবে আমি মুখখানা কম্পিউটার এর মনিটর এর সামনে নিয়ে গিয়ে একটা সেলফি তুললাম। পরে ক্লাস শেষে জানতে পারলাম, সবাই বাসায় গিয়ে প্রোগ্রামিং অনুশীলন করার জন্যে কোডের ছবি নিচ্ছি। এখন আমার কি হবে ? আমার সেলফি তে তো থোবড়াটার কারণে কোডই বোঝা যাচ্ছে না।
<<<<<<আগের পর্ব পরের পর্ব>>>>>>
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন