শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ২


“আমার ক্লাসে দশ মিনিট লেট পর্যন্ত ঢুকতে দেই, এরপর দরজা বন্ধ। তোমাদের সিনিয়রদের থেকে ব্যাপারটা ভালমতো জেনে নিও”

-স্যার,আসি ? জিইসি মোড় থেকে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে এসে জুতো স্লিপ করতে করতে দরজার হাতল ধরে কোনরকমে বেঁচে যাওয়া আমি চাপা গলায় শিক্ষককে প্রশ্ন করলাম। সবাই সমোস্বরে হেসে উঠল… মনে মনে ভাবলাম কি আজব ? এটা কি ফার্স্ট সেমিস্টার এর কেমিস্ট্রি ক্লাস না তবে?

-“ইতোমধ্যেই ২০ মিনিট লেট, আজকের মতো সবাইকে আসতে দিচ্ছি। পরবর্তী ক্লাস থেকে ১০ মিনিট পরেই দরজা লক”

এ কেমন শিক্ষক রে বাপু !!! মাথা নিচু করে শ্রেণীকক্ষে ঢুকতে ঢুকতে ভাবছিলাম।
-দেবাশীষ স্যার, বহুত ডেয়ারিং পাবলিক মামা। বড় ভাইদের থেকে শুনছি পাশ করতে দেয় না নাকি সহজে।
-আইত্তেরি… এরকম পাবলিক এখানেও ?
-হুম বন্ধু , পাবলিকের টিচার তো, তাই।
প্রথম ক্লাসেই রসায়ন শিক্ষক যথারীতি গন্ডাদুয়েক পড়িয়ে বইয়ের নাম লিখে দিয়ে বিকালের ল্যাব ক্লাসের আমন্ত্রণ জানিয়ে বিদায় নিলেন। স্কুল-কলেজে বাংলায় পড়ে আসা পদার্থের ভৌত অবস্থা, রাসায়নিক নাম-সংকেত-সমীকরণ আর পরমাণু মডেল-কে ইংরেজি তে লেকচার দিয়ে যেন ওহী বানিয়ে ফেললেন- সহপাঠীদের মুখের চেহারা দেখে তেমনটাই বোধ হয়েছিল।
তাকিয়ে দেখি লম্বা মেয়েটার খাতা নিয়ে সবাই টানাটানি করছে ছবি তুলবে বলে। কি এক প্রযুক্তি মানুষকে অলস বানিয়ে দিল, পুরো ক্লাস নোট না লিখে ক্লাস শেষে অন্যের খাতার ফটোসেশন। প্রতিটা ক্লাস শেষে সামান্যতম এই বিরতিতে শ্রেণীকক্ষ যেন মাছের বাজারে পরিণত হয়। আর আমি কোন এক কোণে গিয়ে চুপচাপ ঘুমাই, প্রচন্ড হই-হুল্লোর এর মাঝেও ঘুমানোর স্বভাবটা আমার বহুদিনের।

হই-হুল্লোর গুলো হতো ছোট ছোট কিছু গ্রুপে গ্রুপে, এই যেমন নাদিয়া (লম্বা মেয়েটা) আর শ্যামা নামের আরেকটা মেয়েকে কেন্দ্র করে আনিস, মীর, সিফাত, নোবেল, দীপ্ত, ইফতেখার – দের একটা ছোট গ্রুপ। পরবর্তীতে অবশ্য অনেক গ্রুপ গড়ে আবার অনেক গ্রুপ ভাঙ্গে। স্বভাবসুলভ ভাবেই আমি কোন নির্দিষ্ট গ্রুপের সাথে থাকতাম না, আমি থাকতাম আমার মতো। কিছুক্ষণ এদিক কিছুক্ষণ ওদিক আর ভাল না লাগলে যেখানে আছি ওখানেই ঘুম।

ঠিক কিছুক্ষণ আগেই সবার মাঝে হঠাৎ “ভাই” হয়ে যাওয়া আমি মাত্রই আমার ফ্লোর হারিয়েও মনে মনে খুব উৎফুল্ল বোধ করছিলাম। দারিদ্রতার দুষ্টচক্র তখন আমার উদারতার লাগাম টেনে ধরেছে, কেননা উপস্থিত অধিকাংশেরই ষাণ্মাসিক কোর্স ফি হয়ত পরিবার থেকেই আসবে, কিন্তু আমার সবকিছুই তো আমাকেই জোগাড় করতে হবে- নয়তো ছেড়ে দিতে হবে এটাও।
– গম্ভীর গলায় তার লেকচার শুরু করলেন দেবাশীষ পালিত স্যার।

স্যার আরো যোগ করলেন- “আমার ভাল করেই জানা আছে তোমরা যেসব স্কুল-কলেজ থেকে এসেছ হাতে গোনা গুটিকয়েক কলেজ ছাড়া আর কোথাও ল্যাব প্র্যাক্টিকাল গুলো ভালভাবে করানো হয় না,ল্যাব ই তো নাই- শেখাবে কি? আর এজন্যেই একরকম ভীতি তৈরী হয় ছাত্রছাত্রীদের মাঝে”
ল্যাব প্র্যাকটিকাল খাতায় আগে থেকে অই দিনের এক্সপেরিমেন্ট বিস্তারিত লিখে আনতে হবে, এক্সপেরিমেন্ট মিলানো শেষে সব পূরণ করে যেদিনের রিপোর্ট সেদিনেই সাইন করে নিতে হয়ে… নয়তো আর সাইন হবেনা।
-“স্যার আসি?”- ক্লাসের প্রায় আধ ঘন্টা পেরিয়ে যাবার পর একটা খাতা হাতে হেলেদুলে ল্যাবে প্রবেশ করছে ট্রাউজার আর স্যান্ডেল পরে আসা এক ছেলে।
- তুমি কি ভার্সিটির পিওন না স্টুডেন্ট ?
- জ্বি স্যার, স্টুডেন্ট। ইইই ফাস্ট সেমিস্টার।
- এটা কি নিজের বাসা মনে কর তোমরা? যা ইচ্ছা তাই পড়েই চলে আসবে? ভদ্রতার কোন বালাই নেই? আইডি বল তোমার?
- জানিনা স্যার।
- তো ল্যাব করতে আসছ কি জন্যে? নাম বল…
- জ্বি স্যার… সাইদুল। ও, ইসলাম …… না না স্যার , সাইদুল ইসলাম।
- নামও দেখছি ভুলে গেছ , এরপর থেকে আর এভাবে আসবে না।
-দোস্ত, তোদের কারো কাছে ১টা কলম হবে?
“নাহ”- সবাই মনযোগ দিয়ে স্যারের লেকচার শুনছে।
-পিন্সিল হবে পিন্সিল? একটা পিন্সিল হইলেও দে ভাই। আচ্ছা কেউ একটা পৃষ্ঠা ছিড়া দে না, আমি ভুলে লেখাভর্তি খাতা নিয়ে আসছি।
কিছুক্ষণ ধরেই সাইদুলের এসবে প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে স্যার নিজে থেকেই কলমের ব্যাবস্থা করে দিলেন, আমি আমি দিলাম একটা পৃষ্ঠা ছিড়ে। প্রায় আড়াই ঘন্টা ক্লাস হয়ে যাবার পরও শিক্ষক আমাদের ছাড়লেন না। বললেন ৩ ঘন্টার ল্যাব ক্লাস কাঁটায় কাঁটায় ৩ ঘন্টাই অতিবাহিত করতে হবে।

দুপুর আড়াই টা থেকে একটানা দাঁড়িয়ে ল্যাব ক্লাস করতে করতে অবশেষে সাড়ে পাঁচটায় গিয়ে আমাদের মুক্তি মেলে। দলবেঁধে হই-হুল্লোর করে লিফট ধরার জন্যে যাই। নিচে নেমে সহপাঠীরা ছোটখাটো জটলা করে আড্ডা শুরু করে, কিন্তু আমার যে আবার ৬ টা থেকেই দেবপাহাড় একটা টিউশন-এ যেতে হবে। চবির এক বড় ভাই এর মিডিয়ার মাধ্যমে নেয়া এই টিউশন- এখনো প্রথম মাসের টাকা উসুল করা বাকি। আমার আগেই বড় ভাই বলে দিয়েছেন আমি চুয়েটে পড়ি, আর এদিকে আমার হাতে প্রিমিয়ার এর ব্যাগ। এখন কি করি করি ভাবতে ভাবতে টিউশন এ পৌঁছে বাড়ির নিচতলায় আমার ব্যাগখানা লুকিয়ে রাখলাম আর ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীর নিয়ে ছাত্রীকে পড়াতে বসলাম।
খাস্তগীর স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী, আংকেল এর ভাষ্য অনুযায়ী- “উ একটু অংকে দুর্বল, পদার্থবিজ্ঞান ও নাকি তেমন একটা বুঝে না।”
-জ্বি আচ্ছা আঙ্কেল, চিন্তা কইরেন না।
ছাত্রীর সাথে পরিচিতিপর্ব শেষেই পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে কিছুক্ষণ জমিয়ে আড্ডা দিলাম। দৈনন্দিন জীবনে ফিজিক্স যে আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে আর খুব মজার ছলেই ফিজিক্স শেষা যায় তা ছাত্রীকে বুঝানোর চেষ্টা করলাম। এরপর উচ্চতর গণিতের দু-এক টা ম্যাথ করিয়ে দিয়ে ছাত্রীকে নিজে নিজে ম্যাথ করতে দিলাম।
-“স্যার,স্যার। উঠেন । ধরেন চা খেয়ে নেন।”
হঠাৎ ডাকাডাকি তে আবিষ্কার করলাম আমি ঘুমিয়ে পড়েছি ।
-“আসলে বুঝলে, সারাদিন ক্লাস করছি তো আমিও তাই খুব ক্লান্ত। আংকেল কে আবার বলতে যেও না”
-“আব্বু দেখছে আপনি ঘুমাচ্ছেন, আব্বু তো দরজার ওপাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।”

পেছনে গিয়ে গতদিনের চা-খাওয়ানো বন্ধু নুহাশের পাশে গিয়ে বসলাম আর প্রশ্ন করলাম- “এই স্যার এর পরিচয় কি-রে?”

পরবর্তী ক্লাসও ছিল একজন গেস্ট টিচারের – শুকলা ম্যাম। ইংরেজির একজন প্রবীণ শিক্ষিকা যে ছাত্রছাত্রীদের সাথে কতটা স্মার্ট, প্রাণোবন্ত আর মিশুক হতে পারেন তা শুকলা ম্যামের ক্লাস না করলে অজানা থেকে যেত। উনার ক্লাস উপভোগ করেনি এমন ছাত্রছাত্রী খুব কমই পাওয়া যাবে। প্রথম দিনেই শিক্ষিকার সাথে পুরো ক্লাস দল বেঁধে সেলফি তুলল – এ আমার আজীবন মনে থাকবে।

“অই আমার খাতা দাও। ” – উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে উঠল একটি নারীকণ্ঠ। আরেকটু হলেই কান্না করে দেবে বেচারী।

“ক্লাসের CR কে কে হতে চাও দেখি দাঁড়াও?”- শুনেই চেয়ারের হাতলের উপর থেকে মাথা তুলে চোখ কচলাতে কচলাতে দেখি একজন শিক্ষক শ্রেণী প্রতিনিধি নির্বাচন করছেন। অল্প কিছুক্ষণের জন্যে পুরো কক্ষে নিঃস্তব্ধতা নেমে আসলো, CR মানে যে শ্রেণী প্রতিনিধি তখন কেউ ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। অতঃপর শিক্ষক আশ্বস্ত করার পর ৪-৫ জন উঠে দাঁড়াল। ওয়ারিফ আর জিগর জোর করে আমাকেও দাঁড় করিয়ে দেয়। শেষমেষ সকলের মতামত নিয়ে সাজিদ ও শাওন কে দুই-CR নির্বাচিত করা হয়। ভাগ্যিস অইদিন নির্বাচিত হইনি, নয়ত পুরো চারটে বছর ফ্যাকাল্টি আর বন্ধুদের ফায়ফরমেশ খাটতে খাটতে মারা যেতাম।

ক্লাস শেষে নিচতলার সেই বিশাল ক্যান্টিন এ গিয়ে দেখি রমরমা বাজার। একটা ছোটখাটো বলরুম বললেও বোধ হয় চলবে। ছাত্রছাত্রীদের বসার সুবিধার্তে দুপাশের দেয়ালের সাথে কোমর সমান উচ্চতার শেড করা, আর মাঝে উন্মুক্ত পরিসর। এক কোণে ফুড কর্ণার ও ফটোকপি মেশিন এর দোকান। শেডে গ্রুপ করে বসে ছাত্রছাত্রীরা আড্ডা দিচ্ছে, জোড়ায় জোড়ায় কপোত-কপোতীরা তো আছে, কোন কোন আড্ডার মধ্যমণি গিটার হাতে এক যুবক, কেউবা আবার দল বেঁধে দেখাদেখি করে সাদা A4 কাগজে কিসব ছাইপাঁশ লিখেই যাচ্ছে-দুদিন পরেই জেনেছি এসব ল্যাব রিপোর্ট আর এসাইনমেন্ট।

ফুড কর্ণার এর সামনে আসতেই ওয়ারিফ খাওয়ানোর আবদার করে। পাবলিকের মতো ১০ টাকায় চা-সিঙ্গারা-চপ অন্তত না হোক, ১০০ টাকায় তো ৪-৫ জনের নাস্তার বিল হয়ে যাবে, এই ভেবে হ্যাঁ করে দিলাম। মাত্র সিঙ্গারা শেষ করে চায়ের কাপ মুখে তুলে নিয়েছি আর একঝাঁক পঙ্গপাল হাজির। ক্লাসের প্রায় সব বন্ধুরা এসে হাজির, ওয়ারিফ আর জিগর বড়মুখ করে বলে দেয়- “সানি ভাই খাওয়াচ্ছে”। ঠিক অই মুহুর্তেই গলা দিয়ে আর চা নামছিল না, কারণ পকেটে একটা মাত্র ১০০ টাকার নোট আর গুটিকয়েক ভাঙতি পয়সা।

ত্রাণকর্তা হয়ে আসলেন সাজ্জাদ ভাই সাথে জহিরকে নিয়ে। জহিরের ভাষায়-“আমাদের মধ্যে বিবাহিত বড় ভাই। ফ্রিল্যান্সার ভাই – সাজ্জাদ ভাই” “সাজ্জাদ ভাই,সাজ্জাদ ভাই”-আমি মনে মনে কয়েক লাইন স্লোগান দিয়ে দিলাম। এসেই সাজ্জাদ ভাই বললেনঃ “আপনারা যা খুশি খান। পিৎজা,কেক,বার্গার, কোক, চা-নাস্তা …… বিল আমি দিব।”

সাজ্জাদ ভাই-এর ট্রিট এ জম্পেস খেয়েদেয়ে আমরা কেমিস্ট্রি ল্যাব ক্লাসের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। হন্তদন্ত করে ঢুকেই শিক্ষক খুব দ্রুত পরিচিতিপর্ব শেষ করলেন।

“কেমিস্ট্রি থিওরি কোর্স বরাবরের মতো ৩ ক্রেডিট আর এই ল্যাব কোর্সটা ০.৭৫ ক্রেডিটের, বরাবরের মতোই আমার কেমিস্ট্রি ল্যাব কোর্সে পাশ করতে গেলে হাতে হাতে কাজ করতে হবে । Without proper performance I wouldn’t accept anybody for passing this course. And here are some basic instructions for you.”

বলে কি এই ব্যাটা !! আমার তো মাথা গরম হয়ে যাচ্ছিল। দশম শ্রেণীতে থাকতেই শুধুমাত্র পাঠ্যবইয়ের টপিক টা বুঝাইতে গিয়ে তসলিমা ম্যাম নারিকেল তেল আর সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড এর বিক্রিয়ায় সাবান তৈরী হাতে কলমে শেখালেন আর কলেজের টাইট্রেশন, লবন টেস্ট নাহয় বাদই দিলাম।

যাই হোক, জ্ঞানীর ভাব নেয়া আমার তখন সাজেনা তাই বাকি সবার মতো আনকোরার ভঙ ধরে লেকচার শুনতে লাগলাম।

স্যারের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে পড়িমরি করে ব্যাটা সাইদুল আমাদের টেবিলের দিকেই আসল। প্রত্যেকটা টেবিলে স্যার ৫ জন করে নির্দিষ্ট করে দেয়ায় এই বিজোড় পাবলিক-কে কোন গ্রুপ নিতে চাচ্ছিল না। এসেই

মেয়ের ছেলেমানুষি তে ধরা পড়ে গিয়ে আঙ্কেল দরজার ওপার থেকে বেরিয়ে এলেন আর আমি পুলিশের কাছে পাকড়াও হওয়া কোন অপরাধীর মতো জবুথবু হয়ে রইলাম। সেদিন বাসায় ফিরতে প্রায় ন-টা বেজে গিয়েছিল। ঘুমিয়ে পরার অনুশোচনা বাবদ পাক্কা দু-ঘন্টা পড়াই, আর রাস্তায়-ও প্রচন্ড জ্যাম ছিল বৈকি।

<<<<<আগের পর্ব                                       পরের পর্ব>>>>>>>>>

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...