দ্বিতীয়
ইনিংস এ ফিল্ডিং করতে এসে আমাদের “স্টাডি জোন একাদশ” খুবই চাঙ্গা ছিল। আমি সহ-অধিনায়ক
সোহেলের হাতে বল তুলে দিলাম আর মনে মনে হিসেব কষছিলাম, প্লান-এ, প্লান-বি, প্লান-সি
মাথায় কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে। সোহেলের প্রথম ওভারটি বেশ ভালোই হলো, এক ওভারে আট রান দিয়ে
এক উইকেট নিয়েছে। উইকেট গেলেও রানের চাকার গতি আটকে দিতে হবে। পরবর্তী ওভারগুলোও তেমন
একটা ভালো হচ্ছিল না, কোন উইকেট না হারিয়ে বিপক্ষ দল পাঁচ ওভারেই ত্রিশ রান সংগ্রহ
করে ফেলে। ঠিক ওই সময়েই এলো জনি ছেলেটা, “ভাই, আমি বল করব?”
জনি গড়পড়তা
মানের বোলার, লাইন-লেন্থ ঠিক থাকলেও ওর বোলিং খুব স্লো। প্লান-বি এর অংশ হিসেবে জনিকেই
বল তুলে দিলাম আর তাতেই কেল্লাফতে…… বেচারার “রসগোল্লা” বল-এ মুগ্ধ হয়ে একেকটা ব্যাটসম্যান
একের পর এক ভুল করে বসে। ছয় ওভারে ফুটন্ত পথিক একাদশের সংগ্রহ ৩৫/৪ ।
যেহেতু সাত
জনের শর্ট-পিচ খেলা, আর মাত্র দুটি উইকেট দরকার আমাদের, আর বিপক্ষ দলের প্রয়োজন চার
ওভারে ৪৫ রান। কিন্তু ঠিক ওই মুহূর্তেই আমাদের দল খেই হারিয়ে ফেলে। সোহেল, আরিফ,জনি
প্রচুর মার খায় পরবর্তী ওভারগুলোতে গিয়ে, প্রথম দিয়ে এক ওভার করে দুটো চার খাবার পর
ভয়ে আমিও আর বল হাতে তুলে নেইনি। শেষ ওভারে এসে বিপক্ষ দলের প্রয়োজন আট রান, আর আমাদের
একটিমাত্র উইকেট।
-“ভাই আপনি
বল করেন, আমরা সবাই নার্ভাস”। সহ-অধিনায়ক সোহেল এসে আমাকে বলল, বাকি দুজন ফিল্ডারও
এতে সায় দিল।
অনেক ভেবেচিন্তে
বল হাতে তুলে নিলাম। প্লান-সি এপ্লাই করার এখনই মুখ্য সময়। প্রথম বলটাই ইয়র্কার দিতে
গিয়ে হয়ে গেল ওয়াইড… পরের বলে আমার পা বোলিং লাইন ক্রস, আর আম্প্যায়ার এর নো-বলের সংকেত।
এই নো বলেই ব্যাটসম্যান হাঁকিয়ে দিল বাউন্ডারি। কোন সঠিক বল না করেই দিয়ে দিলাম ছয়টি
রান।
চোখের সামনে
পরাজয়ের শংকা, কোচিং এ গিয়ে মুখ দেখাতে পারব তো?
হঠাৎ মাঠের
পাশেই দেখলাম দুটো পিচ্চি এদিক ওদিক বোলিং করছে, মাটি থেকে খুব বেশি উপরে উঠছে না তাদের
বল।
“আরেহ, ব্যাটসম্যান
তো দেখি কাঠখোট্টা লম্বা আর আমার হাইটের কারনে বল বাউন্স করে তার ব্যাটেই আসছে”।-এই
ব্যাপারটা ত এতক্ষণ খেয়াল করিনি… মনে মনে ভাবলাম আমি।
পরেই বলটাই
নিচু করার জন্যে ডান পা ভেঙ্গে বল করলাম, হাত ভাঙ্গার ব্যাপারে কড়াকড়ি থাকলেও পা ভাঙ্গার
ব্যাপারে কোন কড়াকড়ি নেই… আর ভাঙ্গা পায়ের অনেকটা লো হাইটের বল ব্যাটসম্যান বোঝার আগেই
মিডল স্ট্যাম্প উপড়ে ফেলেছে।
পায়ে ব্যাথা
পেয়েছি ভান করে মাটিতে পড়ে থাকলাম, যাতে আম্পায়ার ভুল ধরতে না পারে।
যাক, সেদিনের
মতো ম্যাচ জিতে আমাদের দল সেমি ফাইনালে আর আমি পেলাম অপ্রত্যাশিত “ম্যান অব দ্যা ম্যাচ”
এর পুরষ্কার।
>>>>>>>>>>>>>>>>
আজ সবাইকে ৩০
কিলোবাইট এর এক কপি ছবি নিয়ে আসতে বলা হয়েছে। ভার্সিটির স্টুডেন্ট এনরোলমেন্ট সফটওয়্যার
এ নাকি আপলোড করতে হবে। ছবিকে কিভাবে ৩০ কেবি করা যায় সে নয় রাতের বেলায় অনলাইন এ কম
জল ঘোলা হয়নি, তার উপর আজ আবার আমাদের প্রথম ম্যাচ সপ্তম সেমিস্টার এর সাথে। আজকের
খেলাটা বরং একপেশেই হয়েছে,এক আমাদের ডিজে মামার কাছেই বলতে গেলে পুরো সপ্তম সেমিস্টার
উড়ে গেছে। আমিসহ অনেকেই ব্যাট নিয়ে নামার সুযোগ পাইনি। আর নোবেলের কথা কিই বা বলব…
জোর করে ব্যাট নিয়ে মাঠে নেমে গোল্ডেন ডাক মেরে ফিরে আসার দৃশ্যটা অসাধারণ ছিল। আমাদের
চিয়ার গার্ল ছিল নাদিয়াসহ দু-তিনজন মেয়ে, তখন কেবল নাদিয়াকেই চিনি। এরকম অদ্ভুত অট্টহাসির
চিয়ার্স আর বিদঘুটে হাততালি আগে কখনো দেখিনি।
ম্যাচ শেষ করে
সবাই মিলে জম্পেশ খেয়ে দেয়ে যে যার মতো রওনা দিলাম, আমি গেলুম সিটি কলেজের দিকে, ইলেকট্রনিক্স
ইন্সট্রুমেন্ট নিতে হবে… রাশেদ সার্কিট মানিয়ে সফলতা পেয়েছে। “নেহাত ক্লাসে সময় নষ্ট
না করে মাঝে মাঝে নিয়ম করে এসব ইলেকট্রনিক্স এর দোকানে এসে দাঁড়িয়ে থাকলেও অনেক কিছু
শেখা যায়”- মনে মনে ভাবছিলাম আমি। ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ এলো ফোন…
-“স্যার, আজ
আপনি আসবেন”? – ফোনের ওপারে মিষ্টি গলায় প্রশ্ন করল আমার নতুন ছাত্রী।
-“হ্যাঁ, আসব
তো… এই যে আমি তোমার বাসার কাছেই”। মিডিয়া থেকে একটা টিউশন নিয়ে ওই ছাত্রীর রেফারেন্স
এ আরেকটা টিউশন পেয়ে গেলাম। ছাত্রীর বাসা পলোগ্রাউন্ড এর পাশেই, বাবা রেলওয়ের কর্মকর্তা।
সারাদিন জুতা-মোজা
পড়ে ক্রিকেট খেলে পায়ের যাচ্ছেতাই অবস্থা…তার উপর গা থেকেও প্রচুর ঘামের গন্ধ বের হচ্ছে।
কিছু করার নেই এই মুহূর্তে, বাসায় গিয়ে গোসল করে আসাটাও সম্ভব না এখন… কিন্তু টিউশন
এ যে যেতেই হবে, ছাত্রী যে আসব বলে ফেলেছি। এসব ভাবতে ভাবতে নিউ মার্কেট মোড়ের ফুটপাত
থেকে ১০০ টাকা দিয়ে একটা বডি স্প্রে কিনলাম। যেতে যেতে ভাল করে গায়ে স্প্রে করে নিলাম,
কিন্তু বিধি বাম… বটতলী স্টেশন পার হতে না হতেই সব সুগন্ধী উবে গেল। পকেটেও আর মাত্র
পঞ্চাশ টাকা আছে, অনেক ভেবে চিনতে শেষমেশ পঁচিশ টাকা দিয়ে একটা আঁতর কিনে নিলাম। এটাই
শেষ ভরশা, আল্লাহর নাম নিয়ে মেরে দেই গায়ে। জুতা-মোজায় আঁতর দিলে পাপ হবে নাকি হবেনা
এই দোটানায় আর জুতোয় কিছুই দেয়া হয়নি।
-“আসসালামু-আলাইকুম
আঙ্কেল, নিধি বাসায় আছে” ?
-“জি হ্যাঁ
বাবা, আসো আসো”। - এই ভদ্রলোকের বাবা ডাকটা আমার কেমন বিরক্তি লাগে, তারপরও কি আর করা।
-“তো বাবা,
কেমন যেন আঁতরের গন্ধ বের হচ্ছে”?
-“আংকেল আসলে
আসার সময় একটা জানাজা পড়তে গেছিলাম ত তাই।” – জানাজা টা যে আমার নিজের প্রেস্টিজ এর
ছিল কিভাবে বুঝাই !!!
-“ও আচ্ছা আচ্ছা।
আস আস… ”।
বাইরে জুতো-মোজা
খুলে রেখে ভেতরে ঢুকতেই ব্যাপন প্রক্রিয়ায় রুমের পরিবেশে আমার স্পেশাল সুগন্ধী ছড়াতে
লাগল।
-“আংকেল, ফ্যানটা
একটু ছেড়ে দেন” - ভেবেছিলাম ফ্যান ছেড়ে দিলে
পরিবেশ কিছুটা শান্ত হবে … আর আমিও একটু ঠান্ডা হাওয়ায় জিরিয়ে নেব। কিন্তু ওই যে কথায়
আছে “অভাগা যেদিকে যায়, সাগর শুকিয়ে যায়।”
ঘাম আর আঁতরের
মিশ্রিত গন্ধে বাতাসে ঘামাতুর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। বইতে পড়া “Great Smog of
London-1952” এর কথা মনে পড়ে গেল, ইন্ডাস্ট্রির কালো ধোঁয়া বাতাসের কুয়াশার সাথে মিশে
বিষাক্ত ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেছিল যা কিনা টানা ৪-৫ দিন পর্যন্ত স্থায়ী ছিল… এখানেও তার
ব্যাতিক্রম নয় বলা চলে। ছাত্রী বইপত্র হাতে নিয়ে আসতেই নাকে-মুখে হাত দিল, আমার কোন
ভাবান্তর নেই… যেন কিছুই হয়নি। পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টায় আমি-
-“পলোগ্রাউন্ড
তো কাছেই, মেলায় টেলায় যাও না নাকি”?
-“না স্যার,
আমার ভাল্লাগে না। আম্মু যায় বেশি”।
-“ও আচ্ছা,
তোমাকে নিয়ে যায় না?”
-“নাহ, আমার
ভীড় ভাল্লাগে না”
কথা শেষ করতে
না করতেই …… ওয়াক…ওয়াক…
মুখভর্তি বমি
করে পুরো টেবিল ভাসিয়ে দিল ছাত্রী আমার, লজ্জায় তাড়াতাড়ি বই-খাতা নিয়ে ভেতরে চলে গেল।
আমিও বেকুবের
মতো এক টেবিল বমি সামনে নিয়ে বসে রইলাম।
-“বাবা, আজকে
ওর শরীর খারাপ। সুস্থ হলে ফোন করব তোমাকে”
সালাম দিয়ে জুতো-মোজা বেরোতে বেরোতে ভাবছিলাম… ভাগ্যিস, বমিটা আমারও হতে পারতো, যাক বাবা ছাত্রীর উপর দিয়ে সব গেছে। এভাবেই নিজের পিঠ বাঁচানোকেই আমরা পরমধর্ম মনে করি।
রেলওয়ে কলোনী
থেকে বেরিয়ে ভবঘুরের মত হাঁটতে থাকলাম, কেমন যেন নিজেকে অপরাধী অপরাধীও লাগছিল… বেচারি
মেয়েটা। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ পেছন থেকে …
-“আরে সানি
ভাই না? তুমি এখানে কি কর”? ভার্সিটির বন্ধু শোয়েব বিপরীত দিক থেকে ডাক দিল, তার সাথেই
ছিল জিগর।
-“কামলা খাটি
রে ভাই, এখানে ওখানে কামলা খাটি”
-“টিউশন ছিল
নাকি ভাই?”
-“হ, ভাই…এইত
রেলওয়ে কলোনী।”
-“তো ভাই, টাকা-পয়সা
তো ভালই কামাও… খাওয়াও না কিছু।”- জিগর যোগ করল।
-“ল চল , মেলায় যাই”
মেলায় ঢুকতে
যাবার টিকেট কাউন্টারেই প্রচুর মজা করলাম আমরা। মহিলা টিকেট কাউন্টার থেকে শোয়েবের
টিকেট কাটা নিয়ে। মেলাই ঢুকেই ভবঘুরের মতো এদিক আর ওদিক , থাই প্যাভিলিয়ন এ গিয়ে বেশ
খানিক্ষণ মজা করলাম আমরা থাই সেলসম্যানদের সাথে। ঘুরতে ঘুরতে একটা ইন্ডিয়ান স্টলের
সামনেই শোয়েবের সাথে ধাক্কা লাগে এক মেয়ের, দোষটা শোয়েবেরই ছিল। কোন এক কথার ছলে শোয়েব
মাতলামির অভিনয় করতে গিয়ে এই কাণ্ড… যাই হোক আমরা তরুণীর থেকে মাফ-সাফ চেয়ে ঘটনা মিটমাট
করলাম। এরপর খাবারের স্টল দেখেই …
-“ভাই চলেন,
ফুচকা খাই” জিগর আমাকে লক্ষ্য বলল।
-“আচ্ছা চল”
ফুচকার স্টলের
দিকে যেতে যেতেই পকেটে হাত দিয়ে দেখি… “এই যা, টাকা তো সব বডি স্প্রে আর আঁতর কিনে
শেষ করে ফেলেছি, পঁচিশ টা টাকা আছে মাত্র। এখন কি একটা ভোঁ দৌঁড় দেব এদের ফেলে?” –
এসব ভাবতে ভাবতেই দেখি জিগর
-“ভাই ফুচকার
দাম বেশি, ১০০ টাকা করে প্লেট। চল অন্য কিছু খাই”
-“আচ্ছা চল,
কফি বা স্যুপ টাইপ কিছু খাই”- এরা কি বুঝতে পারছে আমার পকেট ফাঁকা?
স্যুপ-কফি খাওয়া
শেষে দেখি শোয়েব আর জিগর মিলে বিল পরিশোধ করে দিল। আমি বোকার মতো মানিব্যাগ হাতড়ে পঁচিশ
টাকা বের করে দিচ্ছিলাম।
-“ভাই রাখ এটা
, বাসায় যাবা কিভাবে? হেঁটে হেঁটে ?” -জিগর আমার কাঁধে হাত রেখে বলল।
-“এই বয়সে এরা এতো বুঝধার, মনের কথা পড়ে ফেলল… বাহ !!! এরা বন্ধু না, বন্ধুর চেয়ে অনেক বেশি”
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন