“এইটা হইছে যে ডিচি চার্কিট, আমরা একন এই চার্কিট টা সোজা করি মানাব। এইটাকে সোজা করি
আকলে এই রকম হয়। আব্বার আমরা জানি যে V=IR”- সকাল সকাল ক্লাসে এসেই এই রকম বিদঘুটে লেকচারে
মাথা ঝিম ঝিম করছে...ওমা এখনো তো টিচারই আসেনি, তাহলে এই লেকচার দিচ্ছিল কে?
ঘুম
ভাঙতেই খেয়াল করলাম সাত-আট জনের মতো ছেলেপেলে গোল করে একজনের লেকচার শুনছে...ওদের
মধ্যমনি খুব ফর্সা করে একটা ছেলে রাশেদ।
আজ
খুব তাড়াতাড়ি ক্লাসে এসে পড়েছি, তাই একটু ঘুম পেয়ে
গিয়েছিল, কিন্তু রাশেদ হতচ্ছাড়া টা আর
ঘুমোতে দিল কই। যাই হোক, আগা মাথা কিছু বুঝতে না পেরে জটলা থেকে একজন একজন করে কেটে
পড়ছিল। জহিরকে হতাশ ভঙ্গিতে ফিরে আসতে দেখেই
প্রশ্ন করলাম-
-ছেলেটা কে ভাই, সিনিয়র নাকি?
-আরে না না, আমাদের সাথেই। IIUC
তে ইইই
তে ছিল ১ বছর, এরপর এখানে চলে আসছে।
-ও আচ্ছা, এজন্যেই এখানে এসেই আমাদের মাস্টারবাবু হয়ে গেছে... ধুর।
রাশেদ ছেলেটার সাথে কদিন পরই আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়, এককথায় বলতে পারি “আমার বন্ধু রাশেদ”। এখনো পর্যন্ত আর কেউ আমার খোজ খবর রাখে না রাখুক, এই রাশেদ ঠিকই রাখে। এই রাশেদের সাথেই আমার আজকের সানি হয়ে উঠা, দুজনে মিলে বড় ভাইদের প্রজেক্টগুলো দেখতাম আর বুঝে নিতাম, ক্লাসের গ্যাপগুলোতে সিনিয়রের বেশ ধরে CSE ডিপার্টমেন্ট এরও টুকটাক ল্যাব করে আসতাম। মজার ব্যাপার হচ্ছে মাত্র দ্বিতীয় সেমিস্টারেই আমরা একটা রোবোটিক্স ওয়ার্কশপ এর আয়োজন করে বসি, সেই থেকে সবাই রাশেদকে “ওয়ার্কশপ ম্যানেজার” বলে ডাকে। সব সময় ছেলেটা বলত – “যেটা দেখবি বা শিখবি সাথে সাথে অইটা মানাই ফেলতে হবে, আর ওজ্ঞে টিউটোরিয়াল মানাই রাখিবি যাতে পরদি ভুলি গেলে চাই এনে শিখি লইত তারছ”। কিন্তু কেন জানিনা এই অনুপ্রেরণা যোগানো বন্ধুটি পরবর্তীতে এসে একটু খেই হারিয়ে ফেলে।
দীর্ঘক্ষণ
ধরে শিক্ষক ক্লাসে না আসায় ছাত্রছাত্রীরা ধরেই নিয়েছে আজ স্যার আসবেন না। মাঝের
সারিতে আনিস তার ভাঙ্গা গলায় গান ধরেছে। পাশে থাকা সিফাত আর নুহাশও তাতে কোরাস
দিয়ে যাচ্ছে, আর ঠিক পেছনে বসেই ঘুম ঘুম
চোখের ছেলেটা সমানে চেয়ারের হাতল চাপড়িয়ে যাচ্ছে। নেহাত ওটা হাতল ছিল বলে, তবলা হলে এতক্ষণে ঠিকই ফেটে যেত। আমিও কিছুটা আগ্রহী হয়ে
ঘুম ঘুম চোখের ছেলেটার পাশে গিয়ে বসলাম।
-কি অবস্থা বন্ধু?
অবস্থা শব্দটিকে কেমন দাঁত থেকে ফস করে বাতাস ছেঁড়ে দিয়ে প্রশ্ন করল ইফতেখার, ডাক নাম
তার “ব্রাভো”,আমাদেরই দেয়া নাম।
-এইতো ভালো, রাতে
ঘুমাস নাই?
-ঘুমাইছি তো, চেহারা
এমনি এরকম যে।
-ও আচ্ছা, চল গান
ধরি।
আমিও তাদের সঙ্গে
কোরাস ধরলাম, যদিও এই কোরাসের কোন তাল-লয় নেই, যে যেভাবে পারছে সেভাবেই গলা ফাটিয়ে
গাইছে…
“চল সবাই …… জীবনের আহ্বানে , সামনে এগিয়ে যাই”
একসাথে সবার চিন্তাবিহীন
আর প্রফুল্ল মন নিয়ে গান করার মধ্যে যে কি মজা তা কজনই বা জানে? হঠাৎ আমাদের মাঝে কিছুটা
গম্ভীর চেহারা নিয়ে হাজির হলো সবুজ পাগড়ি পরিহিত সফেদ পোশাকের শ্মশ্রুবহুল এক যুবক…
-“ভাই, আমরা চাইলে
এভাবে নাত-এ-রাসুল কিংবা ইসলামী সংগীত গাইতে পারি। কি বলেন সবাই?”
-“তুই আগদি শুরু
গর, ভালা লাইলে আরা তর ল ধইজ্জুম”- আনিস ছেলেটা সফেদ পোশাকধারী মনির-কে উদ্দেশ্য করে
বলল।
-হু হু ঠিক। ইফতেখার
আনিসের কথায় সায় দিল।
ফিক করে হেসে দিয়ে
সফেদ পোশাকধারী মনির নামের ছেলেটা শুরু করল…
“দে দে পাল তুলে দে, মাঝি হেলা করিস না, ছেড়ে দে নৌকা আমি যাবো মদিনায়…
দুনিয়ার নবী এলো মা আমেনার ঘরে, হাসিলে হাজার মানিক কাঁদিলে মুক্তা ঝরে…”
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেলেগুলো সব যেন বদলে গেল… একেকজন আধ্যাত্মিকতার চরম শিখরে পৌঁছে গেল।
হই-হুল্লোরের মাঝে
দেখলাম পেছনে দুটো ছেলে প্রচুর তর্কাতর্কি করছে। এদের মধ্যে একজন কে ভাল করেই চিনি,
আমাদের দুজন শ্রেণি প্রতিনিধিদের মধ্যে একজন … সাজিদ। আরেক জন কে সবসময়ই দেখি একে ওকে
হুমকি ধমকি দিচ্ছে, মেরে ফেলব কেটে ফেলব , চেয়ার তুলে মারব, আমি সিটি কলেজে পড়ে আসছি।
তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে হঠাৎ হুমকি দিতে থাকা ছেলেটা চেয়ার তুলে নিয়ে সাজিদকে তাড়া
করল। তাড়া করার এক পর্যায়ে চেয়ারের কিছু অংশ আমার মাথায় লাগাতে কিছুক্ষণ ঘোরের মধ্যে
ছিলাম, ঘোর কাটতেই দেখি ছেলেটা চেয়ার রাখতে আসছে। আমার মেজাজ গেল চটে, আমি উঠে ছেলেটার
গালে বসিয়ে দিলাম এক চড়। আর রেগেমেগে বললাম…
-“শো ডাউন করবি
মারামারির আর আমার মাথায় আঘাত লাগবে কেন?”
ঘটনাকে আর বাড়তে
না দিয়ে কোরাস গাইতে থাকা বন্ধুরা নোবেলকে সামলে নিল। আমাকেও দুজন এসে সরিয়ে নিল।
-“কাজটা তুই ভাল
করলি না, তোরে আমি দেখে নিব” -তর্জেগর্জে বললে লাগল নোবেল।
এরকম কিম্ভুতকিমাকার আকৃতির ছেলে আমি আগে কখনো দেখিনি। সামনে ভুঁড়ি আর পেছনে পশ্চাতদেশ, দুটোই দুই দিকে বেড়ে গিয়ে যা তা অবস্থা। তার উপর গালখানা গোলআলু টাইপের, যেন কেউ একপাশ থেকে বাড়ি মেরে এমন দশা করেছে। খুব জানতে ইচ্ছে করছিল ব্যাটা নোবেল নামটা পাবার মতো কি কাজটা করেছে? আচ্ছা, মারামারি করে কিংবা এরকম পশ্চাতদেশ দুলিয়ে পায়নি তো কোন?
থার্মোডাইনামিক্স
এর লেকচারটা আজ কেমন যেন ভাল লাগছে না, কেননা লেকচার দেয়ার চেয়ে প্রফেসর বোর্ডে লিখান
বেশি উনার সেই স্নাতক-পিএইচডির নোট খাতা দেখে দেখে। আশির দশকের নোট খাতা ধুলোয় মলিন
হয়েছে, কিছু কিছু পাতা ঘুণে ধরেছে … বিজ্ঞান তার আপন গতিতে এগিয়ে গেলেও প্রফেসর রয়ে
গেছেন সেকেলে। ক্লাস শেষ করেই স্যার বললেন -“আজকের লেকচার এর উপর এখন হবে ইন্সট্যান্ট
সিটি”।
একথা শুনেই সবার
মাথায় যেন বাজ পড়ল। হাজার অনুনয় বিনয় করেও স্যারকে মানানো গেল না। এই প্রফেসর নাকি
দশমিক দুই পাঁচ এর জন্যেও অনেক ছাত্রকে ফেলের কোটায় আটকে রাখেন কিংবা আধা-দুয়েক নাম্বার
এর জন্যে এ প্লাস আটকে দেন- এমন কুখ্যাতি আছে উনার নামে। আর তাই আমরা আর কথা না বাড়িয়ে
পরীক্ষায় বসলাম।
কার্নো চক্র নিয়ে প্রশ্ন এসেছিল, উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির পদার্থবিজ্ঞান পড়াতে গিয়ে “র্যাসনিক হ্যালিডে”-র বই থেকে টুকটাক যতটুকু জ্ঞানার্জন হয়েছে তাই ইংরেজি-তে বানিয়ে বানিয়ে লিখে দিলাম।
দুপুরের ঠিক আগেই
খবর পেলাম সরকারদলীয় একটি নেতৃস্থানীয় ছাত্রসংগঠনের আয়োজনে মুসলিম ইন্সটিউট হলে বিশ্ববিদ্যালয়
এর ছাত্রছাত্রীদের নবীনবরণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দুপুরের একবেলা খাবারের লোভে ক্লাসের সবাই
দলবেঁধে সিদ্ধান্ত নিলাম আজকের শারমিন ম্যামের সার্কিট ক্লাস বাংক করব, যেহেতু মিডিয়ার
সামনে আগের দিন এক অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে গেছে। যেই কথা সেই কাজ, দুপুর একটার মধ্যেই
পৌঁছে গেলাম সবাই ঐতিহ্যবাহী মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে।
দুপুরে খাঁ খাঁ রোদে প্রবর্তক থেকে নিউ মার্কেট এসে সবাই ক্লান্ত পরিশ্রান্ত। হলে ঢুকতেই দেখি স্লোগানে স্লোগানে হল গমগম করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব-কটি অনুষদের ছাত্রছাত্রীরা ইতোমধ্যেই এসে পড়েছে। আমরা আমাদের অনুষদের জন্যে নির্ধারিত আসনগুলোতে গিয়ে বসলাম। সামনে থেকে কোন এক ছাত্রনেতার কণ্ঠে ভেসে আসছে স্লোগান “জয় বাংলা”… নবীন ছাত্রছাত্রীরা সমোস্বরে বলছে “জয় বঙ্গবন্ধু…” । শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাবসায় শিক্ষা অনুষদ আর আঈন অনুষদে ব্যাপকভাবে রাজনীতি চর্চা হয়, যেখানে আমাদের বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদে রাজনীতি চর্চা বলতে গেলে শূন্যের কোঠায়। আর তাই স্বাভাবিকভাবেই ব্যাবসায় শিক্ষা ও আঈন অনুষদের ছাত্রছাত্রীরা পুরো অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব করছিল, আর আমরা কাঁচুমাচু হয়ে এক কোণে বসে বসে নেতাদের বক্তৃতা শুনছিলাম।
-“এই মাম্মা, মাইয়া
টা তো চরম… দেখ না দেখ না।“-আমার পাশে বসে থাকা নোবেল সাজিদকে বলছিল। কে বলবে মাত্র
সকালেই এই দুজন মারামারি করছিল, পরে গিয়ে আমিও যোগ দেই। কিন্তু এখন আবার ক্যাম্পাসের
বাইরে এসে সবাই এককাট্টা।
-“এইটা কোন মেয়ে
হইল রে, অই দেখ আমাদের CSE ডিপার্টমেন্ট এর গুলা কি সুন্দর সুন্দর” -পাশে বসে থাকা
সাজিদ নোবেলকে উদ্দেশ্য করে বলল।
নারীসৌন্দর্য বরাবরের
মতোই সৃষ্টিকর্তার অপূর্ব সৃষ্টি, কিন্তু কেন জানিনা আধুনিকতার নামে আজকালকার নারীরা
যেভাবে নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়ায় তা আমাকে টানে না… তবে বন্ধুদের প্ররোচনায় পড়ে সৃষ্টিকর্তার
সৌন্দর্য এক পলকের জন্যে হলেও উপভোগ করা আরকি। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারলাম অধিকাংশ
বন্ধুদের এই অনুষ্ঠানে আসার উদ্দেশ্য “নারী দেখা, বিরানি খাওয়া”- কিন্তু আমার শুধু
বিরানি পেলেই চলবে, আর তাই আমি মোবাইল গেমস এ মনোনিবেশ করলাম।
দুপুরের খাবারের
প্যাকেট নিয়ে এসে আমরা আবার আমাদের আসনে এসে বসলাম।
-“এই আমাদের মধ্য
থেকে বক্তৃতা কে দেবে?”-হন্তদন্ত ভঙ্গিতে এসে প্রশ্ন করল ওয়ারিফ।
-“আমি যাব”-শ্রেণি
প্রতিনিধি শাওন উত্তর দিল।
সেদিন শাওনের মঞ্চ
বক্তৃতা শুনেই আমরা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করে নিলাম, এই ছেলেই হচ্ছে আসল নেতা। হঠাৎ
খোঁজ খবর নিয়ে কে যেন আবিষ্কার করল আমাদের সাথে একজন আসে নাই , “জহির”- যে কিনা শারমিন
ম্যামের সার্কিট ক্লাস করেছে। ম্যাম খুব রেগে গেছে আমাদের উপর, অনেক কিছু পড়াই ফেলছে,
পরের ক্লাসে ফাটাবে। আমরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা আগে জহিরকে ফাটাব, যা হয়
দেখা যাবে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন