উচ্চ মাধ্যমিক পদার্থবিজ্ঞান -শাহজাহান তপন এর বই হাতে কোচিং সেন্টারের দিকে ছুটছি। কাটগড় মুসলিমাবাদ রোড ধরে সামান্য গেলেই পতেঙ্গা গ্রামার স্কুল, এরই দোতলায় “স্টাডি জোন” নামক কোচিং সেন্টার। উঁচু উঁচু সিঁড়ি বেয়ে শিক্ষক রুমে মার্কার আর ডাস্টার নিতে নিতেই হালিম স্যারের চোখাচোখি হলো। গণিতের হালিম স্যার অত্র কোচিং এর পরিচালক, আমার রোজ রোজ এই ১৫-২০ মিনিট দেরি করে ক্লাসে আসাতে উনি বেশ বিরক্ত। দু-বছর ধরে এই কোচিং এর সাথে আছি- অনেকটা মায়া পড়ে গেছে। প্রথম দিকে অস্থায়ী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও এখন এখানে স্থায়ী… সপ্তাহে ৩ দিন ক্লাস। মাসশেষে পাঁচ হাজার টাকা মাইনে। পদার্থবিজ্ঞানের বিশেষায়িত লেকচারার… হা হা হা , দুধের স্বাধ ঘোলে মেটানো যাকে বলে আরকি।
ক্লাসে ঢুকতেই ফিসফিস করতে থাকা ছাত্রছাত্রীরা একদম চুপ হয়ে গেল।
-“আজ আমরা কোন টপিক টা পড়ব?”-পকেট থেকে একটা লাটিম বের করতে করতে বললাম।
-“বলবিদ্যা স্যার, নিউটনিয়ান বলবিদ্যা ” – উচ্চঃস্বরে বলে উঠল রেহানা। ইতু, মিতু, তানিয়া, ফারজানা একসাথে হেসে উঠল।
-“কি আজব? একসাথে হাসার কি আছে? মেকানিক্স
কি হাসির টপিক্স?”-একটু গম্ভীর হয়ে বলার চেষ্টা করলাম।
-“স্যার, এইটা ওদের ব্যারাম, আপনি কি
এখনো লাড্ডুম খেলেন স্যার”- পেছন থেকে এক ছাত্র বলে উঠল।
-“বলছি, আগে চুপ সব, এমনিতেই অনেক দেরি
হয়ে গেছে। আজ তাহলে আমরা টর্ক, কৌণিক গতি, কেন্দ্রমুখী ত্বরণ এসব নিয়ে আলোচনা করব।
তার আগে সবার জন্যে একটা প্রশ্ন- কে কে লাটিম ঘুরাতে পারো?”
-“স্যার আমি আমি”- হুমায়ুন ছেলেটা হাত
তুলল।
মজায় মজায় পদার্থবিজ্ঞান শিখতে গেলে আশেপাশের বাস্তব উদাহরণ থেকে শেখার বিকল্প নেই, আমিও এমনটি করার চেষ্টা করি। ক্লাসের টপিক অনুযায়ী একেক দিন একেক জিনিস নিয়ে আসি, আজ যেমন আনলাম লাটিম আর সুতা।হুমায়ুন সামনে এসে লাটিম ঘুরিয়ে দেখাল, আর আমি লাটিম কিভাবে ঘুরে কেন ঘুরে এসব ব্যাখ্যা করলাম।নবম-দশম শ্রেণীর আরেকটি পদার্থবিজ্ঞান এর ক্লাস শেষ করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
বাসায় পৌঁছেই মোবাইল খুলে দেখি বেশ কিছু
নটিফিকেশন, ভার্সিটির গ্রুপে Engineer Akash নামের একজনের পোস্ট নিয়ে ব্যাপক হাসাহাসি
চলছে। পোস্টটি ঠিক এমন -
“Hala vondu ra, kaman aso? Grop ar all vondu k janai spike boy akash ar pako thake subocca. Amar movile er hadpone ta harai gaca. Keo jada paya takesh tahole amar sathe gogagong cor. Hadpone ar calar sada. Band samsam.”
ইঞ্জিনিয়ার আকাশ নামের আইডি হতে ছেলেটি নাকি এভাবেই লিখে, এভাবেই মেসেজ করে। এরপর থেকে গ্রুপে বাকি সবাই মজা করে ইঞ্জিনিয়ার আকাশের মতো করে লেখালেখি শুরু করল এবং এই রেশ দু-তিনদিন পর্যন্ত চলল।
আজ নাকি সপ্তাহের শেষ ক্লাস, আগামী দুদিন ছুটি। একাকি হেঁটে হেঁটে ক্যাম্পাসের কাছাকাছি আসতেই চোখে পড়ল সানগ্লাস পড়া হোমরা চোমরা চেহারার এক যুবক রিকসা থেকে নামছে। “আরে, একে তো আমি চিনি। কলেজের বন্ধু প্রিয়ম না?” – মনে মনে বললাম। কথা বলব নাকি পাশ কেটে চলে যাব, ২ বছর পরে এসে আমি এখনো ফার্স্ট সেমিস্টার… প্রিয়ম নিশ্চয়ই সিনিয়র হবে – হাজারো জল্পনা কল্পনা চলতে লাগল মনের মধ্যে। আমাকে দেখতে পেয়েই সদা হাসোজ্জ্বল আর প্রাণখোলা অভ্যার্থনায় সামনে এগিয়ে এলো প্রিয়ম...
-“আরে বন্ধু ? তুই এইখানে কি করস? তুই না CU তে ছিলি? ”
-না মানে ছেড়ে দিছি, এখন এখানে ইইই তে আছি।
-আমিও তো ইইই তে, কোন সেমিস্টারে তুই
?
-না মানে … এইতো ফার্স্ট ইয়ার, তুই?
-পরে বলব, দেখা হবে তাহলে, আসি।
ফিক করে একটা গাল ভেটকানো হাসি দিল সে,
এটা তার ট্রেডমার্ক হাসি- কলেজ লাইফ থেকে দেখে আসছি। ক্লাসের দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে
প্রিয়ম দ্বিতীয় একাডেমিক ভবনের সদর দরজার দিকে চলে গেল, আমার ল্যাব ক্লাস থাকায় আমি
লিফট এ উঠলাম, গন্তব্য ৭ম তলা- মেকানিক্যাল ড্রয়িং ল্যাব।
ক্লাস রুটিনে লিখা MED-MAW-703, অর্থাৎ
মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং , শিক্ষক MAW-উচ্চারণ করলে দাঁড়ায় ম্যাঁও-কি মজার। ল্যাব ক্লাসে ঢুকার পর থেকেই সমানে
ম্যাঁও ম্যাঁও করে যাচ্ছি, এই ম্যাঁও স্যারই যে সামনে ক্লাস নিচ্ছেন তাতে কোন ভ্রুক্ষেপই
নেই আমার। AutoCAD
নামক একটা সফটওয়্যার এ কিসব বাচ্চাদের আঁকিবুঁকি শেখাচ্ছেন স্যার। ফ্রন্ট ভিউ, ব্যাক
সাইড ভিউ, আইসোমেট্রিক ভিউ আরো কত কি…
-“এই এই “অটোকাঠ” কেমনে খুলব একটু দেখায়া দে না রে
?”- পাশেই বসা মধ্যবয়সী এক ভদ্রলোক আমার পিঠে হাত রেখে বলল সফটওয়্যার টা কিভাবে ওপেন
করতে হবে।
-“আঙ্কেল, আপনাকে
তো আগে ক্লাসে দেখি নাই?”
-“আমি জাহিদ,
ফাস সেমিস্টার”
-“ও আচ্ছা,
সরি। আমি ভাবছিলাম আপনি কোন স্টুডেন্ট এর গার্ডিয়ান হবেন হয়তো”
মাথায় টাক আর আংকেল আংকেল চেহারা এই বেচারার পরবর্তীতে ডাকনামই হয়ে যায় “আঙ্কেল”, কেউবা ডাকতো “চাচা”, “জাহিদ চাচা”। পরে গিয়ে শুনেছি বেচারার বউ আছে, সংসার করছে ৩ বছর ধরে। ইপিজেড-এ ভাল মাইনের সুপারভাইজার পদের চাকুরি ছেড়ে দিয়ে দীর্ঘদিনের পুষে রাখা স্বপ্ন পূরণ করতে এই ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট এ।
দ্বিতীয় তলায় পরের ক্লাস ধরতে গিয়ে দেখি রুম এখনো খালি হয়নি, ভেতরে অনিল স্যার ক্লাস নিচ্ছেন। প্রফেসর অনিল স্যার নাকি ডিপার্টমেন্ট এর ডিন, সার্কিট খুব ভাল পড়ান… যদিও এই সেমিস্টারে আমরা তাঁর ক্লাস পাইনি। অনিল স্যার যেতে যেতে আমরা সবাই যে যার জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম আর মনে পড়ে গেল রবীন্দ্রনাথের "দুরন্ত আশা" কবিতার সেই বিখ্যাত দুটি লাইন-
“ভদ্র মোরা শান্ত বড়ো, পোষ মানা এ প্রাণ… বোতাম আঁটা জামার নিচে শান্তিতে শয়তান” –ইচ্ছে করেই শয়ান কে আমি শয়তান বলি।স্যার যেতে না যেতেই সবাই যে যার মতো হই-হুল্লোর শুরু করল, অনেক্ষণ ধরে একটা ছেলেকে দেখছি ঠায় বসে মোবাইল টিপছে… অনিল স্যার চলে গেল তাতেও তাঁর কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।
-“আর কত ডাউনলোড করবি রে, ভার্সিটির ওয়াইফাই তো ডাউন করে দিছস”-পাশ থেকেই বলে উঠল লিকলিকে কালো এক ছেলে।
-“আরেহ সাব্বির, বুঝছ নাই। যেই টাকা দিচ্ছি সেগুলা উসুল করতে হবে না?”-প্রত্যুত্তরে
বলে উঠল মোবাইল টিপতে থাকা ছেলেটি।
সাব্বির আর মোবাইল পাগলা ছেলেটির কথোপকথন এর মধ্যে ঢুকে বুঝতে পারলাম এই ছেলেটার রুটিন ওয়ার্ক হচ্ছে ওয়াইফাই এর পর্যাপ্ত ব্যাবহার করা। সুযোগ পেলেই আমরা যেখানে গল্প-আড্ডায় মেতে উঠি, এই ছেলেটা সেখানে ডিপার্টমেন্ট অফিসের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে কিংবা বসে গান,মুডি,ড্রামা ইত্যাদি ডাউনলোড করতে ব্যাস্ত থাকে, সিগনাল নাকি ভাল পাওয়া যায়। আর তাই মোজাম্মেল নামের সেই ছেলেটার নাম দিয়েছি আমরা ওয়াইফাই মাল।
AKK স্যারের
ম্যাথ ক্লাস চলছে। পুরো ক্লাস যে যার মতো হই-হুল্লোর এ ব্যাস্ত, স্যার পেছনে ফিরলেই
সবাই চুপ। হঠাৎ কে যেন চিৎকার করে উঠল “স্যার, আমার কলম নিয়ে গেছে”… পুরো ক্লাসে হাসির
রোল পড়ে গেল। দেখলাম শহীদ নামের একটা ছেলের সাথে আশেপাশের সবাই মজা করছে। কেউ কলম নিয়ে
যাচ্ছে, কেউবা খাতা। এই ছেলেটা একদমই হাবাগোবা টাইপের, মাঝে মধ্যে তার কথাবার্তা শুনলে
মনে হবে সে অনেক জ্ঞানী শ্রেণীর লোক…কিন্তু জ্ঞানের বেলুন ফুটো করে দিয়ে নিজেই নিজের
ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে বসে যখন তখন। অবশ্য জ্ঞানী আরেকজন আছে ক্লাসে, নাম তার মিনহাজ।
আমরা তাকে ডাকি প্রফেসর মিনহাজ। কলেজের বাংলা বইতে “কমলাকান্তের জবানবন্দী” নামক গদ্যের
কমলাকান্ত যেন বাস্তবে আমাদের প্রফেসর মিনহাজ। যে কোন সত্য কিংবা যুক্তিযুক্ত কথা উপযুক্ত
স্থানে বলায় প্রফেসর মিনহাজের জুড়ি ছিল মেলা ভার, সে কাউকে পরোয়া করত না।
আজ দুপুরের
বিরতিতে আমি, জাহিদ আর শহীদ গেলাম গোলপাহাড় মোড়ের আগের কিছু টংঘরে। ফুটপাতের পাশেই
বিশাল সীমানা প্রাচীর, প্রাচীরের ওপাশে এসব উঁচু উঁচু টংঘর… অনেকটা উপজাতীদের ঘরের
মতো করে বানানো। কাস্টমারদের জন্যে উপর থেকে সিঁড়ি মেলে দেয়া, সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছি
আর ভাবছি এই বুঝি পড়ে গেলুম।
-“কি খাইবেন
মামা? খিচুড়ি আছে, মাংস আছে, চনা-পিয়াজু”
-“খিচুড়ির দাম
কত?”
-“ত্রিশ টাকা
মামা”
-“আর চনা মুড়ি
?”
-“দশ টাকা” - বাহ বেশ সস্তা তো… মনে মনে বললাম আমি।
আমি মোবাইল বের করে রুটিন দেখে নিলাম। দুপুরে একটা ক্লাস পরেই ছুটি, এখন খিচুড়ি খাওয়ার কোন মানে হয়না। তাই সবাই মিলে চনা-মুড়ি দিয়ে জম্পেশ খেয়ে ক্যাম্পাসে ফিরলাম।
দুপুরের শেষ
ক্লাস ছিল শারমিন ম্যামের সার্কিট। ক্লাস শুরু হতে না হতেই নাদুশ-নুদুস একটা স্যার
আসলেন একজন টিভি রিপোর্টার আর ক্যামেরাম্যান নিয়ে। শুনেছি কাছেই একটি বেসরকারি টিভি
চ্যানেল এর অফিস, ডিপার্টমেন্ট নিয়ে তারা কোন নিউজ করবে হয়তো। আমাদের সবাইকে বুঝিয়ে
দেয়া হলো ম্যামের ক্লাস খুব মনযোগ দিয়ে শোনার জন্যে, আর কিছু প্রশ্ন করার জন্যে। যথারীতি
শারমিন ম্যাম তাঁর বুলেট ট্রেন চালু করে দিলেন আর প্রায় সাথে সাথে আমাদের মিনহাজ দাঁড়িয়ে...
-“ম্যাম একটা
প্রশ্ন আছে”
-“হ্যাঁ, বলো?”
-“ম্যাম আপনার
কি তাড়া আছে? আপনি কি কোথাও যাবেন?”
-“নাহ, কেন?”
-“এই যে আপনি
বুলেটগতিতে ক্লাস নিচ্ছেন আমরা তো কিছুই বুঝতেছি না”
-“কি বুঝতেছ
না ওইটা বলো ?”
-“কি বুঝতেছি
না ওইটাই তো বুঝতেছিনা, আগের ক্লাস গুলাও আপনি এমন করছেন। কিছুক্ষণ এই টপিক, কিছুক্ষণ
ওই টপিক”
এভাবে টিভি
ক্যামেরার সামনে বন্ধু মিনহাজ কে যুক্তিযুক্ত কথা বলতে দেখে আমরা সবাই আতঙ্কিত হয়ে
পড়লেও আমাদের কমলাকান্ত দারুণভাবে প্রতিবাদ করছে ভেবে মনে মনে প্রশান্তি পাচ্ছিলাম। আবার আজকের এই রেকর্ডিং হয়তোবা টিভিতে দেখানো হবে না, তারই ফলশ্রুতিতে আমাদের কি অবস্থা হবে
এই ভাবতে ভাবতে আমার নিজেরই গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল।
<<<<<আগের পর্ব পরের পর্ব>>>>>>
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন