শুক্রবার, ২০ আগস্ট, ২০২১

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪১


উচ্চ আপেক্ষিক রোধের নাইক্রোম এর তার বৈদ্যুতিক কেটলিতে ব্যবহার করা হয় কেন  ?”

-“কারণ নাইক্রোম তার খুব শক্তিশালী। এটিতে অনেক ভোল্টেজ দিলেও তারের কোন ক্ষতি হয় না। এটি সাধারণত স্টেপ ডাউন আপ ট্রান্সফরমার এ ব্যাবহার করা হয়, কারণ ট্রান্সফরমার এ উচ্চ আপেক্ষিক রোধের ছোট তার ব্যবহার করলে তা গলে পড়ে যায়। তাই উচ্চ আপেক্ষিক রোধের নাইক্রোম তার ব্যবহার করা হয়।”

কোচিং এ দশম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার খাতা কাটতে গিয়ে মাথা গেলো বিগড়ে। মানে পরীক্ষার খাতাকে এরা যে কি মনে করে, যাচ্ছেতাই লিখে দিলুম,ব্যাস !!! অবশ্য আমরাও বা কম যাই কিসে। ক্লাসে গিয়ে সেই ছাত্রকে কিছুক্ষণ বোঝালাম নাইক্রোম তার কেন ব্যাবহার করা হয়। এরপর একটা উদাহরণ দেয়ার চেষ্টা করলাম... 

-ধরো, তোমার কিছু টাকা দরকার … এখন তুমি ঠিক করতে পারছ না কিভাবে আব্বুকে বলবে, গিয়ে বললে তোমার আম্মুকে কারণ আম্মু খুব নরম মনের মানুষ। আর তোমার কথায় তোমার আম্মু গলে যায়, তোমার আব্বু গলে তমার আম্মুর কথায়। এখন তোমার আম্মু আব্বুকে গিয়ে বললে খুব সহজেই টাকা ম্যানেজ হয়ে যাবে।আপেক্ষিক রোধ বেশি হওয়ায় নাইক্রোমও অন্যান্য ধাতুর চেয়ে অল্প ইলেক্ট্রিক এনার্জিতেই গরম হয়ে যায়। বুঝলেতো এবার?

-ও আচ্ছা স্যার, বুঝসি। কিন্তু আপনি তো গলানোর কথা বললেন, কেটলি তো হয় গরম?

-আরেহ এমনি উদাহরণ দিছি বুঝাবার জন্যে কোনটা সহজ। লোহা বা তামার তার সারাদিন কারেন্ট দিয়ে ফেলে রাখলে কতটুকুই বা গরম হবে? তোদের মাথায় ফিজিক্স ঢুকবে না !!!!

 

এদিকে বাংলাদেশ আর ইংল্যান্ডের টেস্ট সিরিজ চলছে চট্রগ্রামে, কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যেতে পারছিনা। একের পর এক ল্যাব ফাইনাল আর ভাইবার সিডিউল। পুরো সেমিস্টার জুড়ে যা যা ল্যাব করেছি সবগুলো রিভিউ করা, ল্যাব রিপোর্ট বাকি থাকলে সেগুলো কমপ্লিট করা, ভাইবার জন্যে প্রস্তুতি নেয়া এটা সেটা আরও কতো কি!! তার মধ্যে প্রতিদিন একটা-দুটা এসাইনমেন্ট লেগেই থাকে।

আজ মেশিন-২ ল্যাব ভাইবা, রুম নম্বর-২০১, টিচার্স কমন রুম! “খাইছে”, সব শিক্ষক মিলে ভাইবাতে ইনসাল্ট করবেনাকি! দুজন দুজন করে ভাইবা শুরু হলো, এক গ্রুপ ঢুকার পরপরই শুরু হয়ে যায় টিচার্স রুমে ঝুঁকি নিয়ে উঁকি দেয়া। প্রায় মিনিট দশেক পর দুজন বের হতে না হতেই সবাই পড়িমড়ি করে তাদের উপর হামলে পড়ছিল... “এই কি জিজ্ঞেস করছে?”, “দোস্ত তোর শিটটা দে?”, “এই, বেল্ট টা দিস তো একটু?”, “অডা, তুর পাম শো গিন দিছ তো” । এভাবে এটা সেটা চেয়ে সবাই হামলে পড়ছিল মাত্রই ভাইবা দিয়ে বেরিয়ে আসা বন্ধুদের উপর। ভাইবা রুম থেকে একটু দূরে ২০৩ নাম্বার রুমখানা আমাদের জন্যে একটা ড্রেসিং রুম হয়ে গেছে বলা চলে। মাঠে ক্রিকেটাররা আউট হয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরে বোলারের উপর যেভাবে ক্ষোভ ঝাড়ে, ব্যাট-প্যাড ছুড়ে মারে… ঠিক তেমনই হচ্ছিল এখানে। অবশ্য ব্যাতিক্রম বলতে ব্যাট-প্যাড ছুড়ে মারতে হচ্ছিল না, ড্রেসিং রুমে ঢুকার সাথে সাথেই বন্ধুরা এসে জুতো, জামা, বেল্ট, কলম, ঘড়ি নিয়ে টানাটানি শুরু করে দেয়। কেউবা আবার প্রিয় বন্ধুর কাছে ফরমাল প্যান্টখানাও আবদার করে বসে।

তখন প্রায় দুপুর তিনটে, আমি আর মোজাম্মেল ঢুকলাম ভাইবা দিতে। ঢুকতেই দেখি আকরাম স্যার আর হেলাল স্যার চা খাচ্ছেন আর বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড ম্যাচ উপভোগ করছেন। “আচ্ছা, ভেতরেও তাহলে খেলা চলছে”- মনে মনে বললাম। ঢুকে সালাম দেবার পর স্যাররা বসতে বললেন।

- “বল, কি জিজ্ঞেস করবো তোমাদের? আপনি জিজ্ঞাস করেন হেলাল ভাই।”- আকরাম স্যার পাশে বসে থাকা হেলাল স্যারকে ওপেনিং বোলিং করতে বল হাতে তুলে দিলেন।

- এই তুমি বল দেখি, স্প্লিপ কি? ওহহহ, শিট … দেখছেন আকরাম ভাই। একটা স্লিপ থাকলে এইটা ক্যাচ ছিল ।

- স্যার, স্লিপ মানে … স্লিপ মানে …  মোজাম্মেল আমতা আমতা করছিল।

- পড়ালেখা তো করনা, পারবা কেমনে? আচ্ছা বল, ডেম্পার ওয়ান্ডিং কি?

এদিকে আকরাম স্যার আমাকে লক্ষ্য করে বললেন -

-আচ্ছা, তুমি বলো Synchronous Motor এ সাপ্লাই দিলে ঘুরেনা কেন? ঘুরাইতে হলে কি মেথড এপ্লাই করতে হয়?

- স্যার, সিঙ্ক্রোনাস মোটরের স্টার্টিং টর্ক শূন্য থাকে, এজন্যে মোটরকে স্টার্ট করতে হলে রোটরকে স্টেটরের ম্যাগনেটিক ফিল্ডের গতির কাছাকাছি আনতে হয়। আলাদা ডিসি ফিল্ড দিয়ে একসাইটেশন দিলে এই কাজটা হয় আর মোটর ঘুরে।

ইয়েস ! ইয়েস ! উইকেট পড়ছে পড়ছে… পাশ থেকে হেলাল স্যারের উৎযাপন দেখে আকরাম স্যারও যোগ দিলেন। এদিকে আমি আর মোজাম্মেলও উঁকি দিয়ে দেখতে যাচ্ছিলাম… হঠাত মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল স্যার, স্কোর কত?”

-এই, তোমরা এখন যাও। আর কয়জন আছে? পাঠাই দাও পরের গ্রুপ।

কোন রকমে ভাইবা শেষ করে ড্রেসিং রুমে ফিরতেই বন্ধু জাহিদ ঝাপিয়ে পড়লো…

-অই দোস্ত, তুর শার্টটা দেনা একটু। আমি তো জানতামই না আজকে ভাইবা, গেঞ্জি পরেই চলে আসছি।

-শার্ট কেমনে দেই তোকে? গেঞ্জি ইন করে চলে যা ভাইবা দিতে।

-দিলি না তো? মনে থাকবে দেখিস।


ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে এসে আনমনে হাঁটছিলাম, আর তখনই ফোনটা বেজে উঠল…মেজ খালা নাকি নতুন এলইডি টিভি কিনেছেন, কেনার দু-সপ্তাহের মধ্যেই টিভিতে সমস্যা, একরকম পানির দামেই ওয়ারেন্টি ছাড়াই কেনা হয়েছে… আর তাই সস্তার তিন অবস্থা। এতো করে বললাম, আমি টিভির কিছুই বুঝিনা টিভির মিস্ত্রির কাছে নিয়ে যেতে- নাহ, আমাকেই নাকি যেতে হবে। এরপর একরকম বাধ্য হয়েই চলে গেলুম সরাসরি খালার বাসায়। বাইরে থেকে দেখে যা বুঝলাম সেটিংস এ কোন সমস্যা হবে হয়তো, পাউয়ার অন হয় আর পুরো ডিসপ্লে নীল হয়ে থাকে। ব্যাপারটা যা বুঝলাম,পিসির এলইডি মনিটর এর সাথে টিভিকার্ড সেট করে এলইডি টিভি বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে ! রিমোট নিয়ে সেটিংস অনেক চেষ্টা করেও কিছু না হওয়ায় ব্যাগ থেকে স্কু-ড্রাইভার নিয়ে এদিক ওদিক খোলার চেষ্টা করলাম...কিন্তু কি মনে করে আর খুললাম না। পাউয়ার অফ করে আবার পাউয়ার দিতেই দেখি অবস্থা আরো খারাপ, ডিসপ্লে পুরো ব্লাকআউট। এই যাহ, দোষ পড়লো আমারই ঘাড়ে...আমি টিভি নষ্ট করছি। আগে তাও নাকি নীল আলো আসতো...এখন তাও আসেনা। অনেক কথা শুনে প্রচন্ড মন খারাপ করে বাসায় ফিরে এলাম, মনে মনে ভাবছি- এই ইলেকট্রিক্যাল রিপেয়ারিং এর কাজ ছেড়ে দিতে হবে...ইলেকট্রনিক্সের পাশাপাশি মাইক্রোকন্ট্রোলার আর প্রোগ্রামিং শিখতে হবে।  

<<<আগের পর্ব             পরের পর্ব>>>

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...