সন্ধ্যার পর থেকেই বাতাসের ঝাঁঝালো গন্ধে নিঃশ্বাস
নেয়াটাই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। ক্যামিস্ট্রি ল্যাবের সেই অ্যামোনিয়ার গন্ধ বাতাসে, আরো
স্পেসিফিকলি বলতে গেলে কলেজের সেই টয়লেটের গন্ধ আকাশে বাতাসে। কিন্তু, এরকমটাতো
কখনো হয়নি…...গণশৌচাগার এর বাজে গন্ধের চেয়ে এই গন্ধ যে আরো বেশি তীব্র !!! আজব
ব্যাপার তো, হলোটা কি? ইতোমধ্যেই আম্মুর বকাঝকা শুরু হয়ে গেছে...আমরা সঠিকভাবে
টয়লেট ব্যাবহার করিনা, ইত্যাদি ইত্যাদি। পরে জানতে পারলাম আনোয়ারায় সিইউএফএল
সংলগ্ন ডিএপি সার কারখানায় নাকি এমোনিয়ার ট্যাংক বিস্ফোরিত হয়েছে।
নদীর ওপারে কারখানায় বিস্ফোরণ, আর নদীর এপারে
পতেঙ্গায় ব্যাপন প্রক্রিয়ায় গ্যাসের অণু-পরমাণুগুলোর ছুটে চলে আসা। আরো অবাক হলাম
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢুকে, পুরো শহরেই নাকি এই এমোনিয়া মিশ্রিত বাতাস ছড়িয়ে
পড়েছে। কি বাজে এক অবস্থা, কোন রকমে মানিয়ে নিয়ে জমে থাকা কাজগুলো করছিলাম। সামনেই
ক্যাম্পাসে নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠান আছে, আর অনুষ্ঠানে ব্যাচের সবার
পরিকল্পনামতো একখানা টিশার্ট ডিজাইন করা। শখের বশে গ্রাফিক্সের কাজ করলে যা হয়
আরকি, কিন্তু মাথায় চলছিল কিছু ব্যাতিক্রম ডিজাইন করা যাক। বলতে না বলতেই নোবেল
অনিকের ফোন, এই নোবেল ছেলেটার একটু বেশি এগ্রেসিভ ব্যাবহারে আমার অস্বস্তি লাগে।
- হ্যালো, বন্ধু ডিজাইন কদ্দুর?
- এইতো প্রায় শেষের দিকে রে, সামনের দিকে ইংরেজিতে ইঞ্জিনিয়ার লিখা একটা ডিজাইন আর্ট,আর পেছনের দিকে ষোল তম ব্যাচ লিখা। চলবে তো?
- আরেহ একটা হইলেই হলো। তুই মেইল করে দে ডিজাইন।
- একটা হইলে কেমনে হইলো ? এরকম হলে ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে নিতিস।
- আরেহ কুল ম্যান কুল। আচ্ছা বল এক্সেপশনাল কি করলি?
- Engineer লেখাটাকেই প্লাগ, আর্থিং দিয়ে একটা সার্কিটের মতো করে ডিজাইন করছি।
- বাহ, তাইলে ত সেই হচ্ছে। ওকে, বাই...কাল দেখা হবে।
পরদিন ক্যাম্পাসে এসে শুনি সকালের ইলেকট্রনিক্স
ল্যাব ক্যান্সেল। সবাই লাইব্রেরিতে বসে বসে আড্ডা দিচ্ছে, কেউবা আবার পড়াশোনা
করছে। আমি আর জাহিদ এক কোণের একটা টেবিলে পেন-ফাইট শুরু করে দিলুম, সেই যখন স্কুলে
ছিলাম তখন প্রতিদিনকার খেলার মধ্যে ছিল এই পেন ফাইট। খেলতে খেলতে হঠাৎ দেখি
লাইব্রেরিয়ান ম্যাম পিছনে এসে দাঁড়িয়ে আছেন, এরপর কি হলো তা আর বলার অপেক্ষা
রাখেনা। বিকেলের দিকে নোবেল, শাওন, নুহাসসহ আমরা ক’জন গেলাম জহুর হকার্স মার্কেট।
প্রায় চল্লিশ পিসের মতো টিশার্ট নিতে হবে, টিশার্টের জন্যে ইতোমধ্যে সবার কাছ থেকে
দুশ টাকা করে সংগ্রহ করা হয়েছে। ঘুরতে ঘুরতে এক দোকান থেকে কাল রঙের ডিজাইনলেস
টিশার্ট কেনা হলো। এরপর টিশার্টে
লগো আর ডিজাইন প্রিন্টিং এর জন্যে দেয়া হলো আরেক দোকানে।
বৃহস্পতিবার, ক্যাম্পাসের সাপ্তাহিক দুটো ছুটির
দিনের মধ্যে একটি। এই ছুটির দিনেও ক্যাম্পাসে এসেছি একটাই কারণ - নবীন বরণ ও বিদায়
অনুষ্ঠান। চট্রগ্রাম মেডিকেলের অডিটোরিয়ামে আয়োজন করা হয়েছে এই প্রোগ্রাম। এই
বিশাল আয়োজনের পেছনে ১২ ব্যাচের সিনিয়র ভাইরা প্রচুর পরিশ্রম করছেন। অনুষ্ঠানের
সবচেয়ে বড় আকর্ষণ “শিরোনামহীন” ব্যান্ড এর তুহিন ভাই আসছেন, পাশাপাশি জনপ্রিয় দুই
ব্যন্ড “নাটাই” আর “তীরন্দাজ”-ও পারফর্ম করবে একই মঞ্চে। সকাল থেকেই তাই
অডিটোরিয়াম প্রাঙ্গন ধীরে ধীরে লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠছিল। আমরা ষোল ব্যাচের সবাই
অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম আমাদের টিশার্টের জন্যে, কিন্তু টিশার্ট আসতে আসতে
দুপুর গড়িয়ে গেল। নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানের সকালের সেশন প্রায় শেষের দিকে,
নবীনদের ফুল দিয়ে বরণ করা হলো আর প্রবীণদের ক্রেস্ট সার্টিফিকেট দিয়ে বিদায় দেয়া
হলো।
মধ্যাহ্নভোজনের বিরতিতে আমরা সবাই টিশার্ট হাতে
পেলাম, আমার নিজের ডিজাইন করা টিশার্ট সবার পরনে দেখে ভালোই লাগছিল। এর সাথে সাথেই
শুরু হয়ে গেল ফটোসেশন, গ্রুপ ছবি আর সেলফির সমারোহ। খাওয়া-দাওয়া শেষে দলবেঁধে সবাই
অডিটোরিয়ামে ঢুকলাম। ভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা
মাতিয়ে রাখছিল পুরো অডিটোরিয়াম। আমরা সবাই আমাদের মতো করে আনন্দ করছিলাম। দ্বিতীয়
সেশন শেষে বিকেলের দিকে সবার অধীর অপেক্ষা… তুহিন ভাই আসবে কবে?
- এই তোরা সবাই এদিকে আয়, একসাথে দাঁড়াই আমরা।
- এই সাব্বির, রিয়াদ, নাইম জাহিদ উঠে চলে আয় এদিক।
প্রসেনজিত এর ডাকে আমরা কয়েকজন নিজ নিজ আসন থেকে
উঠে অডিটোরিয়ামের মাঝামাঝি একটা প্রশস্ত ফাঁকা প্লাটফর্মে দাঁড়ালাম। তীরন্দাজ এর
ব্যান্ড দল খানিক আগেই মঞ্চ কাপিয়েছে, এখন নাটাই ব্যান্ডের তুষি আপু মঞ্চে গান
ধরেছেন…
“খাজার নামে পাগল হইয়া,
ঘুরি আমি আজমীর গিয়া…
পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না...”
এই গান ধরার সাথে সাথে সবাই একরকম পাগল হয়ে গেল
বলা চলে। আমরা যে ক’জন এক সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম সমাই সমানে কাঁধে কাঁধ রেখে
লাফাচ্ছিলাম। পাগল শেষ হতে না হতেই তুষি আপু ধরলেন জলের গান…
“এমন যদি হতো, আমি পাখির মতো
উড়ে উড়ে বেরাই সারাক্ষণ...”
মুহূর্তের মধ্যেই আমরা সবাই পাখি হয়ে গেলাম,
দুদিকে দুহাত তুলে যে যার যার জায়গা থেকে উড়ে বেড়াতে শুরু করলাম। এভাবে আরো
ঘন্টাখানেক কেটে গেলো, সবার অধীর অপেক্ষা তুহিন ভাই কবে মঞ্চে আসবে। সাড়ে সাতটার
দিকে শোনা গেল তুহিন ভাই এসে পৌঁছেছেন, একটু পরেই মঞ্চে আসবেন।
“আবার হাসিমুখ” দিয়ে শুরু করলেন শিরোনামহীনের
তুহিন ভাই। পুরো অডিটোরিয়াম তার সুরের মূর্ছনায় মন্ত্রমুগ্ধ। “তুমি চেয়ে আছো, তাই
আমি পথে হেঁটে যাই...হেঁটে হেঁটে বহুদূর” - সবাই একসাথে লাফাতে লাফাতে পা ব্যাথা
হয়ে গেছে। একই দিনে শিক্ষক, সিনিয়র জুনিয়র ছাত্রছাত্রীরা সবাই যেন এক হয়ে গেল। রাত
বাড়তে থাকলে অনুষ্ঠানের পর্দা নামতে শুরু করে, উপস্থিত সকল ছাত্রছাত্রীদের অনুরোধে
চেয়ারম্যান স্যার পুরোনো দিনের একটা গান ধরেন-
“ময়ূরকণ্ঠী রাতের নীলে , আকাশে তারাদের ওই মিছিলে
তুমি আমি আজ চল চলে যাই, শুধু দুজনে মিলে…”
পুরো একটি দিন আবার চাইলেই হয়তোবা হারিয়ে যাওয়া
হবেনা, একসাথে চাইলেই বন্ধুরা পাখির মতো উড়ে বেড়াতে পারবোনা, কিংবা পারবোনা সবাই একসাথে
কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাগলের মতো লাফালাফি করতে। বিদায়ী শিক্ষার্থীদের প্রতি
শিক্ষকদের আবেগঘন বক্তব্যে অনুষ্ঠানের শেষদিকে পরিবেশ কিছুটা থমথমে হয়ে উঠে, আমিও মনে
মনে আঁচ করতে পারছিলাম… আমাদেরও একদিন এভাবে বিদায় নিতে হবে, ছাত্রজীবনের এই
সোনালী সময়গুলো হয়তোবা আর কখনোই ফিরে পাওয়া যাবেনা।
<<<আগের পর্ব পরের পর্ব>>>



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন