“চলে আমার সাইকেল হাওয়ার বেগে উইড়া উইড়া…”
যখনই সাইকেল নিয়ে বের হই বাংলা সিনেমার এই গান মাথার
মধ্যে ঘুরপাক খায়। সাইকেল কেনার পর থেকেই পুরো এলাকা চষে বেড়াতে শুরু করলাম,
এরমধ্যেই বন্ধু সৈকতের সাথে একখানা সাইকেল রেসও হয়ে গেল- রেসে অবশ্য সে পেরে উঠেনি
শেষ পর্যন্ত। নিয়ম করে পতেঙ্গা বীচ, মুসলিমাবাদ বেড়িবাঁধ, নেভাল থেকে শুরু করে নয়
নাম্বার ঘাট এদিক ওদিক চষে বেড়ানো আমার নিত্যদিনের কাজ। এদিকে রোজার শেষদিকে এসে
ভার্সিটির বন্ধুরা সবাই মিলে একখানা ইফতার পার্টির আয়োজন করলো। বন্ধু প্রসেনজিত
ছিল এই আয়োজনের অন্যতম সংগঠক। গোলপাহাড় মোড় MFC রেস্টুরেন্ট, ইফতারের বেশ
খানিকক্ষণ আগে গিয়ে পৌঁছলাম। গিয়ে দেখি মোটামুটি সবাই এসে পড়েছে, রাশেদ আর জাহিদের
জন্যে অপেক্ষা করছিলাম আমরা। যদিও ইফতারের আগ মুহূর্তে বেশি বকবক করাটা ঠিক না,
এতদিন পর বন্ধুরা সব একসাথে হয়ে কথার ফুলঝুরি ছুটছে। তার উপর একে ওকে নিয়ে
হাসি-ঠাট্টা আর আড্ডা চলছে একসাথে।
-ওডা, কও এত মাইজ্জুস?
-বেশি ন, দু এত। তুই কও এত?
-আই চারগেত মারি দি! হা হা আহা।
-ওডা তোরা এড়ে আই এনেও রেজাল্ট লই এনে কথা হবি নি?
-আইচ্ছা বাদ দে, আযান পরের… আল্লাহর নাম লই শুরু গর।
পরদিন স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন PFC ক্লাবের উদ্যোগে আমি আর কোচিং এর পরিচালক হালিম স্যার এলাম ঈদবস্ত্র বিতরণী কার্যক্রমে। ছোট ছোট সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের হাতে উপহারসামগ্রী তুলে দিতে পেরে কি যে ভালো লাগছিল, এই পরিতৃপ্তি হাজার টাকা দিয়ে চাইলেও কেনা সম্ভব নয়। ঈদের ঠিক আগেরদিন, চাঁদরাত। আলসেমিতে কিছুই কেনা হয়নি, তার উপর সাইকেল কিনে হাত একেবারেই ফাঁকা। তারপরও কিছু আনুষঙ্গিক কেনাকাটা আর একখানা পাঞ্জাবি নিতে ছুটলাম মার্কেটে। ছোটবেলা থেকেই মার্কেটে ঘুরতে আমার ঘোর আপত্তি, নিতান্তই বাধ্য হয়ে মার্কেটে আসা। দুয়েক দোকান ঘুরেফিরে পাঞ্জাবি কিনে ফেললাম, ব্যাস জুতো একজোড়া কিনে নিলেই শপিং শেষ।
বরাবরের মতোই ঈদের নামাজ শেষে বাসায় এসে খাওয়া দাওয়া করে ঘুম। এখানে ওখানে ছুটোছুটি করার বয়স সে অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছি। দুপুরের দিকে হালিম স্যার এলে পরে একটু বেরানো হলো এদিক সেদিক। বেরানোর সুবাধে সাইকেলের প্রসঙ্গ উঠে এলে পরে ততক্ষনাত একখানা সাইকেল ট্যুর দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। আপাতত আমাদের তিনজনের ছোট একখানা টিম- আমি , হালিম ভাই আর সাখাজিল ভাই। পরশুদিন বেরিয়ে পড়ব সাইকেল নিয়ে, গন্তব্য ঠিক করা হলো কর্নফুলীর ওপারে আনোয়ারা।
যাত্রার আগের দিন রাতে বসে ম্যাপিং করে ফেললাম
একদিনে সর্বোচ্চ ঠিক কতদুর যাওয়া সম্ভব। সকাল সকাল এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল,
আর তাই সকাল সাতটায় বেরোনোর কথা থাকলেও বেরোতে বেরোতে আটটা বেজে গেল। পুবের আকাশে
সূর্য উঁকি দিচ্ছে, কর্নফুলীর পাড়ের মৃদুমন্ত বাতাস আর সকাল সকাল এই আর্দ্র পরিবেশ
মনটা জুড়িয়ে এলো। অনেক্ষণ ধরে ঘাটে দাঁড়িয়ে থেকেও তরীর দেখা পাচ্ছিলাম না,
অবশেষে একখানা বোট ঘট ঘট শব্দ করে ওপার থেকে যাত্রী নিয়ে ঘাটে ভিড়ল।
-বদ্দা, সাইকুল লই এনে উডন যাইবু নে? - মাঝিকে প্রশ্ন করলাম আমি।
-তিন জন নে? উঠি য গুই, এক মিক্কে দি সাইড গরি রাইখখু। সাইকুল ওর ভাড়া দন ফরিবু।
-সমস্যা নাই, দিলাম এরি।
তিনজনে মিলে ধরাধরি করে সাইকেল তিনটি নিয়ে বোটে
উঠলাম। আরো কয়েকজন উঠে আসন পরিপূর্ন হতেই মাঝি বোটের ইঞ্জিন চালু করে দিলেন। মিনিট
বিশেকের নৌকাভ্রমণ শেষে আমরা ডাঙ্গার চর ঘাটে এসে নামলাম। ঘড়িতে তখন প্রায় পৌনে
ন’টা, এখান থেকেই শুরু হচ্ছে আমাদের আজকের সাইক্লিং। সাখাজিল ভাই গুগল ম্যাপ ও
জিপিএস লোকেশন অন করে নিলেন, ডাঙ্গার চর হয়ে জুলধা, এরপর শাহমিরপুর… পথে পথে
যাত্রাবিরতী নিতে হচ্ছিল বারংবার কেননা হালিম ভাইয়ের সাইকেল সাধারণ চেইনের আর
আমাদের দুজনের গিয়ার সাইকেল। স্বাভাবিকভাবেই হালিম ভাই বারবার পিছিয়ে পড়ছিলেন, আর
আমরা আস্তে ধীরে চালাতে লাগলাম। চলতে চলতে চট্রগ্রাম-আনোয়ারা মহাসড়কে উঠে পড়লাম,
খানিক বাদেই চিন্তা করলাম ভেতর দিয়ে গেলেই বুঝি ভালো হবে। আর তাই KEPZ এর পাশ
ঘেঁষে রওনা হলাম। দারুণ এক পাহাড়ি অরণ্যের ছোঁয়া পেয়ে আমরা সত্যিই মুগ্ধ, যদিও
ইপিজেড এর ভেতরটায় ঢুকার অনুমতি পাইনি। এরপর মরিয়ম আশ্রমের দিকে গিয়ে পেলাম দারুণ
একখানা পাহাড়ি ট্র্যাক। পাহাড়ি উচু-নিচু ট্র্যাকে সাইকেল চালাতে যে কি মজা তা আজ
এখানে না এলে হয়তোবা উপলব্ধি করাই হতো না। এদিকে হালিম ভাইয়ের নাজেহাল অবস্থা
দু-দুটো গিয়ার সাইকেলের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে তার যায় যায় অবস্থা-
-থামেন থামেন একটু, একটা যাত্রাবিরতি নেয়া দরকার।
-সামনের ওই বাজারে বিরতি দেই চলেন।
বাজারে এসে একখান চায়ের দোকানে ঢুকে গরম গরম সিঙ্গারা, পুরি আর চা সাবাড় করে আবার সাইকেল নিয়ে টান। বদলাপুর-মেরিন একাডেমি হয়ে আনোয়ারার মাঝামাঝি আমরা এখন, মধ্যগগনে সূর্য প্রতিনিয়ত তার রোদ্রের তেজ বাড়াচ্ছে। আপাতত আমাদের উদ্দেশ্য সাংগু নদী, ম্যাপে দেখে ঠিক করলাম তৈলারদ্বীপ সেতু পর্যন্ত গিয়ে দুপুরের খাবার খেয়েদেয়ে ফেরার পথ ধরব। চলতে চলতে চৌমুহনী এসে পৌঁছলাম, এইখানে এসে আমাদের মাথা নষ্ট হবার জোগাড়। ভুল পথ ধরে অনেকদূর এসে বুঝতে পারলাম আমরা পথ হারিয়েছি, গুগল ম্যাপের লোকেশনও ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারছি না, তার উপর মোবাইলের চার্জ প্রায় শেষের দিকে। সাখাজিল ভাই এক সিএনজি ড্রাইভার ভাইয়ের সাথে গুগল ম্যাপ দেখিয়ে পরামর্শ করে আবার ঠিক রাস্তা ধরলেন। চৌমুহনী হতে আবারো চট্রগ্রাম-আনোয়ারা মহাসড়কে উঠে তৈলারদ্বীপ এর উদ্দেশ্যে যাত্রা। অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে প্রায় দুপুর দু’টার দিকে আমরা এসে পৌঁছাই তৈলারদ্বীপ, যার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সাংগু নদী। ব্রীজের উপর থেকে কিছুক্ষণ নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করার পর নদীতে নামার ভুত মাথায় চাপলো। ব্রীজ থেকে নেমে এদিক ওদিক তন্ন তন্ন করে খুঁজে নদীদে নেমে গোসল করার মতো কোন ঘাট পেলাম না। লোকমুখে শুনলাম এদিকে নাকি কোন ঘাট নাই , আর একজন তো আরো এককাঠি সরেশ- “নদীতে কুমির আছে !!!” সেই সকাল থেকে সাইকেল চালাতে চালাতে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে যদি একটু গোছলই করতে না পারি তবে ফিরে যাবার জোরটা পাব কোত্থেকে?
অবশেষে ভাগ্য আমাদের সহায় হলো, কাছেই দেখলাম এক
জেলে তার নৌকা নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের অনুরোধে আশপাশটায় নৌকায় চড়িয়ে মাঝের ওই ছোট্ট
চর থেকে ঘুরিয়ে আনতে সম্মত হলো। নৌকায় করে ব্রীজের নিচ থেকে ঘুরে এসে নদীর মাঝে
জেগে উঠা চরে এসে থামলাম। এরপর আমরা তিনজন হালকা দাপাদাপি করে নদীতে গোছল সেরে
নিলাম। গোছল শেষে পাড়ে এসে আবার সাইকেল নিয়ে যাত্রা, মাঝে একখানা হোটেল থেকে
দুপুরের খাবার সেরে নেয়া গেল। খাওয়া দাওয়া
শেষে হালিম ভাইয়ের নিশ্চুপ স্বীকারুক্তি - “আমার দ্বারা আর সম্ভব না, একটা সিএঞ্জি
নিয়ে ফিরে যাবো আমি”। হালিম ভাইকে সাইকেলসহ সিএনজিতে তুলে দিয়ে আমি আর সাখাজিল ভাই
সাইকেলে ঝড় তুললাম, দুর্বার গতিতে সাঁই সাঁই করে ছুটে চলছিল আমাদের দ্বিচক্রযান।
মাত্র চল্লিশ মিনিটেই সেই তৈলারদ্বীপ থেকে চৌমুহনী, কাফকো হয়ে পনের নাম্বার ঘাটে
এসে পৌঁছলাম। সিএনজি করে মাত্রই মিনিট পাঁচেক এসে পৌঁছেছেন হালিম ভাই। পশ্চিমের
আকাশে সূর্য আস্ত যাবার অপেক্ষায়, আর আমরা সাইকেলগুলো নিয়ে পতেঙ্গায় ফিরে আসার
বোটে উঠে পড়লাম।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন