শুক্রবার, ৩০ জুলাই, ২০২১

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ৩৮

 

সিগনাল এন্ড সিস্টেম, ইলেকট্রনিক্স-২, মেশিন-২, ম্যাথ-৪ আর সিএমইপি এই পাঁচটা থিওরি কোর্স এবারের সেমিস্টারে, আর সাথে এই কোর্সগুলার ল্যাব। সকাল দশটায় থেকে ক্যাম্পাসে এসে বসে আছি নতুন সেমিস্টারের কোর্স এনরোলমেন্ট করব বলে। সাড়ে এগারোটার দিকে সফটওয়্যার এ ঢুকে রেজিস্ট্রেশন করলাম, অনেওদিন পর সবার সাথে দেখা হয়ে ভালোই লাগছিল। কয়েকজন বন্ধুর অনুরোধে ক’দিন আগেই কেনা সাইকেল নিয়ে এসেছি ক্যাম্পাসে। বন্ধুরা দুয়েকজন নিয়ে কিছুক্ষণ চালানোর পর টঙের আড্ডায় সাইকেল নিয়ে এলো, এরপর সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। 

চালাতে চালাতে মনে পড়ল কিছু ইলেকট্রনিক্স জিনিসপত্র কেনা দরকার, আবার একটা স্পিডোমিটারও কিনতে হবে সাইকেলের জন্যে... আর তাই সিটি কলেজের দিকে রওনা দিলাম। স্পিডোমিটার কিনে সাইকেলে লাগিয়ে গেলাম বিখ্যাত বাগদাদ ইলেকট্রনিক্স মার্কেট, মার্কেটের সামনে সাইকেল লক করে রেখে ভেতরে গেলাম। একখানা আইপিএস বানানোর জন্যে আইসি, মসফেট, লেড এসিড ব্যাটারি, ট্রান্সফরমারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নিলাম। শখের বশেই এই কম ওয়াটেজের আইপিএস বানানোর পরিকল্পনা করেছিলাম, তখনো সবেমাত্র ইলেক্ট্রনিক্স এর গভীরে প্রবেশ করতে শুরু করেছি। বেলা প্রায় আড়াইটা বাজে ঘড়িতে, জিনিসপত্রগুলো নিয়ে বসলাম মাত্রই বেরিয়েছি সাইকেল নিয়ে। স্পিডোমিটারে গতি বাড়ছেই, মুহূর্তের মধ্যেই ৩০-৩৫-৪০ এমপিএইচ। এবার অনেকটা ভালো লাগছে, মনে হচ্ছিল যেন মোটর সাইকেল চালাচ্ছিলাম। বারিক বিল্ডং মোড়ের কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ করে পি...ইইই...কক 

-আআআউউচ...। দেখেশুনে সাইকেল চালাতে পারেন না? আরেকটু হলেই তো গায়ের উপর উঠাই দিচ্ছিলেন। 

-দেখেশুনেই তো চালাচ্ছিলাম আপু, আপনিই তো দৌড় দিয়ে বাসে উঠছিলেন !!

হঠাৎ সাইকেলের হার্ড ব্রেকের প্রচন্ড শব্দে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বিস্ফোরিত চোখে কটমট করে আমার দিকে তাকালেন এক তরুণী। যদিও সাইকেল উনার গায়ে লাগেনি, যথেষ্ঠ দক্ষতায় পাশ কাটিয়ে ব্রেক করে নিয়েছি। আমি আর কথা বাড়ালাম না, সরি বলে তাড়াতাড়ি প্যাডেলে চাপ দিয়ে গতি বাড়ালাম। এক্সিডেন্ড হয়ে গেলেই বোধ হয় ভালো হতো ওই তরুণীর সাথে...নেহাত ভালমানুষি করে ব্রেক করলাম, আজকাল ভালোমানুষের কোন দাম নেই।  

বাড়ি ফিরে এসে কিছুক্ষণ আইপিএস এর সার্কিট নিয়ে ঘাটাঘাটি করলাম, CD4047 আইসিখানা নিয়ে অনেক্ষণ গবেষণা করলাম। ইন্টারনেট ঘেটেঘুটে বের করলাম এর বিভিন্ন পিন কনফিগারেশন। কাজ করতে করতেই স্টুডেন্ট এর ফোন…

-হ্যালো ভাইয়া, আজকে আসবেন না?

-আজকে কিবার?

-বুধবার ভাইয়া। 

-ও আচ্ছা, তাই নাকি ? আসতেছি আমি, তুমি বসে বসে ম্যাথ করতে থাক।

কখন কবে টিউশন থাকে তাও ঠিকঠাক মনে থাকেনা, কাজে ব্যাস্ত থাকলে সব ভুলে যাই। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও সন্ধ্যের দিকে আবার সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেলাম টিউশনে। স্টুডেন্টকে কয়েকটা বীজগনিতের সমস্যার সমাধান করে দিয়েই বললাম- 

-এইগুলা তুমি করে ফেল দেখি এইবার, একটা নতুন এপস আসছে...প্রিজমা নাম। এটার কি কাজ একটু দেখি।

-ভাই, আমাকে দেন ভাই। আমি এডিট করছি ছবি এই এপস দিয়ে।  

কথোপকথনের মাঝেই স্টুডেন্ট এর আব্বা এসে হাজির, হাতে একখানা সাদা খাম দেখা যাচ্ছে। যাক বাবা, অনেকদিন ধরে বলতে বলতে দুমাসের বেতন একসাথে দিচ্ছে। ঈদের মাসের টাকা না দিয়েই স্টুডেন্ট বাড়ি চলে গিয়েছিল, যাই হোক এই টাকা দিকে কি কি ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি কেনা যাবে তার একটা ছক আঁকছিলাম মনে মনে। প্যাকেটটা হাতে পাওয়ার পর অনেকটা ভালোই লাগছে, সাধারণ খামের চেয়ে অনেকটা মোটা...দুমাসের টাকা একসাথে আছে বলেই হয়তোবা। এরপরই যে আমার জন্য কি অপেক্ষা করছিল তা কল্পনায়ও আনিনি। পড়ালেখার উন্নতি নিয়ে কথা শেষ হবার পরপরই হঠাৎ স্টুডেন্ট এর আব্বা বলে উঠলেন

- অনিক আগামীকাল থেকে আর পড়বে না, ওকে একটা কোচিং এ দিচ্ছি। আগামীকাল থেকে আর না আসলেও চলবে।  

আমার মনটা কিছুক্ষণের জন্য খারাপ হয়ে গেল, যাই হোক সবকিছু ভুলে গিয়ে স্টুডেন্ট কে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে আসলাম। বাইরে এসে খাম খুলে দেখলাম অনেকগুলো একশত টাকার নোট। যাক বাবা, এতো ভাংতি টাকা দিল কিজন্যে !! গুনে দেখি মোটেই একমাসের বেতন, আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল। মনের মধ্যে আঁকা ছকগুলো নিমিষেই মিলিয়ে গেল অজানার পানে। 

দুদিনের ছুটিতে আইপিএস মোটামুটি বানিয়ে ফেলেছি বলা চলে। তিন-চার খানা এসি বাল্ব সহজেই জ্বালানো যায়। কলেজের প্রথম বর্ষে যখন ছিলাম তখন এসি থেকে ডিসি রুপান্তর করে ব্যাটারি চার্জ করেছিলাম হাতে-কলমে, আর এখন ডিসি থেকে এসিতে রুপান্তরের বেসিকটা হাতেকলমে শেখা হয়ে গেলো। শনিবার ক্যাম্পাসে পৌঁছেই শুনি আজকের কোন ক্লাস হবেনা, তার পরিবর্তে হবে বিক্ষোভ মিছিল। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এর সম্মানিত ভিসি মহোদয় কে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে তথাকথিত উগ্রগোষ্ঠী। আর আমরাও তাই চুপ করে বসে থাকিনি, বিশ্ববিদ্যালয় এর সকল অনুষদ থেকে মিছিল নিয়ে সমবেত হলাম প্রেসক্লাব চত্বরে। 

সময় গড়ানোর সাথে সাথে সকল ব্যাবসায় অনুষদ, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদ এবং কলা অনুষদ সকল শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রীরা একত্রিত হলো জামালখান প্রেসক্লাব চত্বরে। রাস্তার দুপাশে হাতে হাত রেখে তৈরী করা হলো মানববন্ধন। সবার হাতে হাতে প্রতিবাদী পোস্টার, ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন। আমাদের শ্রেণি প্রতিনিধি শাওন তার প্লাকার্ডে লিখেছে- 

-“হুমকি দেয়া কাপুরুষের কাজ, আদর্শের কখনো হয়না বিনাশ” 

ঘন্টাখানেকের মানববন্ধন ও প্রতিবাদী কর্মসূচি শেষে বন্ধুরা সবাই মিলে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে বাড়ির পথ ধরলাম। আদৌ জানা নেই হুমকিদাতা কে বা কারা, জানা নাই এই মানববন্ধনের কার্যকারিতার মাপকাঠি। তবে মনে মনে ভাবছিলাম...

“প্রতিবাদের ভাষা আমি জানি শুধু একটাই,

সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমি স্লোগান দিতে চাই।” 

<<<আগের পর্ব                    পরের পর্ব>>>  



 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...