শুক্রবার, ১৩ আগস্ট, ২০২১

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ৪০


“ভাইনে কি কারন ওর কাম গর দে নে?” অপ্রত্যাশিত এই প্রশ্নে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেলাম। সকালে গিয়েছিলাম মেজো খালার বাসায়, উপস্থিত থাকাকালীন সকেটবোর্ড এর সমস্যা দেখা দেয়ায় নিজেই লেগে পড়েছিলাম ঠিক করতে। কিছু প্রয়োজনীর মালামাল আনতে হার্ডওয়্যার দোকানে যেতেই মামা আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে, আর অতি চালাক দোকানী ইলেকট্রিক মিস্ত্রী ভেবে বসেন। বাসার ওয়্যারিং করতে করতে বিষয়খানা আন্টিকে বলছিলাম আর আন্টি কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিলেন- “ঠিক তো, তোর চালচলন মিস্ত্রির ডুইল্লে। তোরে মিস্ত্রি ন কই আর কি কইবু?” মনে মনে ভাবছিলাম এই শেষ ইলেকট্রিক এর কাজ, এরপর থেকে আর না। কিন্তু বিকেলের দিকে বাসায় ফিরে সবভুলে আবার লেগে পড়লাম আইপিএস এর কাজ নিয়ে। 

সামনেই কুরবানীর ঈদ, আর গরুর বাজার দু-তিনটা ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত আমি আর ছোট ভাই। কাটগড় বাজারে আব্বু আর হুজুর অপেক্ষা করছিলেন, আমি আর ছোট ভাই গিয়ে দেখলাম তারা একটা গরু দরদাম করছেন... 

-     ও-বা দাম কত ইবের? ঠাস করে সজোরে গরুর পশ্চাদদেশে এক চপেটাঘাত করে গরু বিক্রেতাকে প্রশ্ন করলেন আব্বু।

-       বদ্দা আশি। 

-       ইয়া দিলি নি গলাত ফাঁসি !!

-       দাম তো কইয়ো ঠাসি !!!

আব্বু এরকম কথার সাথে কথা মিলিয়ে বলতে পছন্দ করেন, পেছন থেকে হুজুরও আব্বুর সাথে তালে তাল মেলালেন। এভাবে আরো কিছুক্ষণ দরদাম করে বাজেটের মধ্যে একখানা গরু মেলানো গেলো। হাসিল পরিশোধ করেই গরুর রশি ধরে আমি আর ছত ভাই চললাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে বেশ কয়েকবার গরু এদিও-ওদিক ছুটে পালানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু আমার মাথায় ঘুরছিল গরুর সাথে গরু হয়ে যেতে হয়। আর তাই গরুর গলার একদম কাছ থেকেই রশি ধরে গরুকে নিয়ন্ত্রণ করছিলাম। মাঝে দুয়েকবার বিরক্ত হয়ে বেচায়া হাঁটা বন্ধ করে দেয়, আর আমার ছোটভাই এর লেজ ধরে টান দেয়ার বিশেষ টেকনিকে আবার হাঁটা শুরু করে। 

বরাবরের মতো একদিনের কসাই আর একদিনের ডেলিভারীম্যান হিসেবে কাটলো কুরবানীর ঈদ। ঈদের পরপরই মিড টার্ম পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। মেশিন ২ পরীক্ষার জন্যে পড়তে পড়তে একরকম যা-তা অবস্থা, ইন্ডাকশন মোটরের স্ট্যাটর ফ্লাক্সের স্পীড আর রোটর ফ্লাক্সের স্পীডের পার্থক্যকেই বলে নাকি  স্লিপ। এই স্লিপ বুঝতে বুঝতে আর স্লিপের ম্যাথ করতে করতে করতে আমার এমনিতেই চোখে চোখ লেগে আসছিল, পরবর্তীতে স্বাভাবিকভাবেই যা স্লীপে রূপ নিল। পরদিন কোন রকমে পরীক্ষাটা দিয়ে দিলাম, ম্যাথ দুইটা কোন রকমে সলভ করেছি আর থিওরি বানিয়ে বানিয়ে কি লিখেছি নিজেও জানি না। দুপুরের দিকে জাহিদকে ধরে নিয়ে গেলাম পেটুকে, “আজলে তো আমি হেল্প না করলে তুই গেছিলি, তাই ট্রিট মাস্ট।” পেটুকে ঢুকে দেখি ওয়ারিফ আর কামরুল গোগ্রাসে গিলছে, এদের কেসটাই সেইম মনে হচ্ছে। পরীক্ষার হলে সহযোগিতার প্রতিদান বলুন আর বন্ধুত্বের নিদর্শন বলুন, ট্রিট ট্রিটই। খাওয়া দাওয়া সেরে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতেই সিফাতের সাথে দেখা, নাকেমুখে বিড়ি ফুঁকছে ...

-       কিরে বন্ধু, কি অবস্থা? বিড়ি খাবি?

-       এই না না, বিড়ি খাই না। চা খাওয়া ।

-       এই পিচ্চি, চা লাগা তো দুই কাপ।

-       তারপর বল, এক্সাম কেমন দিলি?

-       কেমন দিছি সেইটা তো নিজেও জানিনা। খাতা কি লিখছি নিজেও জানিনা, উপর ওয়ালা পার কারেগা !!!

-       হা হা হা ...

ক্যাম্পাস থেকে ফিরে এসে গেলাম কোচিং সেন্টারে, পদার্থবিজ্ঞানের দুটো ক্লাস শেষ করে যখন বের হচ্ছিলাম তখন সাখাজিল ভাই এর সাথে দেখা…

-       কি অবস্থা ভাই? কেমন যায় দিনকাল?

-       এইতো ভাই ভালো, আপনার কি অবস্থা?

-       এই চলে আরকি কোন রকম। একটা সেমিনার আছে আমগো ভার্সিটি তে। ক্লাউড কম্পিউটিং এর উপর। ডি-ইঞ্জিনিয়ার ক্লাব আয়োজন কইরছে...। 

-       ক্লাউড মানে তো মেঘ , মেঘ কম্পিউটারে কি করবে?

-       আরে ওই ক্লাউড না, ক্লাউড ক্লাউড…

-       জানি তো ভাই, স্টোরেজ। কিডিং, চলেন তাহলে যাই, হালিম ভাইকেও বলেন, তিনজনে গিয়ে দেখে আসি। 

পরদিন বিকেলের দিকে তিনজন কাটগড় থেকে রওনা দিলাম, গন্তব্য সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি। কাছাকাছি ক্যাম্পাস হলেও এই দিকটায় তেমন একটা আসা হয়না। অবশ্য সকাল বিকাল ক্লাস আর ল্যাব করে যে সময়টুকু পাওয়া যায় তা টঙে আর কেন্টিনে আড্ডা দিতে দিতেই কেটে যায়। সাউদার্নের অডিটোরিয়ামে এসে ঢুকলাম আমরা, কোন এর প্রফেসর না আসবেন ঢাকা থেকে এই সেমিনারের স্পেশাল গেস্ট। সাখাজিল ভাই কিছুক্ষণ পর পর মাঞ্জা মারছিলেন আর প্রশ্ন করছিলেন “আমারে কি খারাপ দেখাচ্ছে? ছবি তুলি দেন চাই একখান”। বেশ খানিকক্ষণ পর অনুষ্ঠান শুরু হলো, ভেবেছিলাম হাতে কলমে কিছু শেখানো হবে। ডি-ইঞ্জিনিয়ার ক্লাব চিটাগং তাদের পরিচয় দিতে দিতেই অর্ধেকটা সময় পার করে দিলো। অবশেষে যখন স্লাইড-শো আর প্রেজেন্টেশন শুরু হলো, তখন এই ক্লাউডের মাথা-মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমাদের কথা নাহয় বাদ দিলাম, গণিতের হালিম ভাই না বুঝেও বুঝার ভান ঠিকই করে যাচ্ছিলেন আর মাঝে মধ্যে দুয়েকটা প্রশ্নও করছিলেন।

-       কিরে হালিম? পিছদির মাইয়া গুনরে পটাইবার নি চেষ্টা গরর?

-       ধুর...। কি যা তা বলছ। ইন্টারেস্টিং লাগছে ত প্রেজেন্টেশন। 

-       হ, কালে কালে আর কত কিই যে লাইগবো। 

সেমিনার শেষে সন্ধ্যার দিয়ে হালকা নাস্তা করে তিনজনই চলে গেলাম শিল্পকলা। মুক্তমঞ্চের একপাশে বসে আড্ডায় আড্ডায় শুরু হয়ে গেল ছোটখাটো এক বিতর্ক। সমসাময়িক রাজনীতি, পররাষ্ট নীতি, মানব সভ্যতা থেকে শুরু করে জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, দার্শনিকতা বাদ গেলনা গেলনা কিছুই। যুক্তি-তর্কের মুক্ত চর্চার এক ফাঁকে খেয়াল করলাম রাত বাড়ছে , বাড়ির পথ ধরা উচিত আমাদের । 

<<<আগের পর্ব             পরের পর্ব>>>


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...