“Life is like riding a bicycle. To keep your balance you must keep moving”
বিখ্যাত পদার্থবিদ আলবার্ট
আইনস্টাইন তার ছেলে এডওয়ার্ডকে লেখা একটা চিঠিতে জীবনকে সাইকেলের সাথে তুলনা
করেছিলেন। আপাতত আমার একটা সাইকেল খুবই দরকার, তাও আবার কিন্তু গিয়ার সাইকেলই হতে
হবে। সেই ক্লাস সিক্স থেকে সাধারণ সাইকেল চালিয়ে আসছি, গিয়ার সাইকেলের স্বপ্নটা কি
তবে অপূর্নই রয়ে যাবে? টিউশনের টাকা জমিয়ে রেখেছি সাইকেল কিনবো বলে, কিন্তু নতুন
সাইকেলের দেখছি অনেক দাম- আমার বাজেটের দু-তিনগুন প্রায়। শেষমেশ অনলাইনের কিছু
গ্রুপে পুরাতন সাইকেলের খোঁজ শুরু করলাম। ওদিকে ঘূর্নিঝড়ের কদিন পরেই ম্যাথ-৩
পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের সেমিস্টার ফাইনাল। রমজান মাস এসে
গেল এরই মধ্যে, আপাতত সেহরি-ইফতার, টিউশন করা আর ঘুমানো ছাড়া কোন কাজ নাই। রেজাল্ট
হতে হতে আরো সপ্তাহ দুয়েক বাকি, এরপর এনরোলমেন্ট হয়ে গেলে ক্লাস শুরু হবে হয়তোবা
ঈদের পর। এই ঘূর্নিঝড়টা না হলে ক’টা দিন ছুটি অতিরিক্ত পাওয়া যেত। যাই হোক, এই
সেমিস্টার ব্রেকটা কাজে লাগানো দরকার।
নেট ঘাটতে ঘাটতে “SkilTrain” নামের একটা ইন্ডিয়ান ইউটিউব চ্যানেলের বেশ কিছু রিপেয়ারিং ভিডিও পেলাম। সপ্তাখানেক বাদেই লাইট, ফ্যান, বাল্বসহ টুকিটাকি বাসায় ব্যবহৃত ইলেকট্রিক জিনিস রিপেয়ারিং এর উপর ভালোই ধারনা হয়ে গেল আর তারই ফলশ্রুতিতে অনেকদিন ধরে পড়ে থাকা নষ্ট আইরনটা সারিয়ে তুললাম। ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হবার আগে ভাবতাম, হয়তোবা এরকম জিনিসপত্র ঠিকঠাক করার বিদ্যেটাও শেখানো হবে কিন্তু পরবর্তীতে বুঝতে পারলাম এসব আসলে পলিটেকনিকে ডিপ্লোমা কোর্সে শেখানো হয়। যাই হোক, আপাতত নিজের জিনিস নিজে ঠিক করতে পারলেই হলো। গত সেমিস্টারের শেষে ইলাস্টেটর নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম, গ্রাফিক্স ডিজাইনের হাতেখড়ি বলা চলে। মাঝে-মধ্যে টুকটাক ডিজাইন আপলোড করতাম... সবই শখের বশে। একদিন হঠাৎ জিহাদ ভাইয়ের মেসেজ-
- একটা ব্যানার ডিজাইন করতে
পারবা?
- হ্যাঁ ভাই, করা যাবে… কিসের
ব্যানার ভাই?
- রমজান উপলক্ষে একটা
পুনর্মিলনী ও ইফতার মাহফিল, আমাদের স্কুলের ব্যাচের।
- আচ্ছা, ভাই। সমস্যা নাই, কি কি লিখতে হবে আর কোথায় কি বসবে একটা প্যাডে লিখে পাঠাই দেন।
পারিশ্রমিক চুলোয় যাক ,ডিজাইন করব আর সেই ডিজাইনখানা প্রেসে প্রিন্ট হবে এর চেয়ে ভালোলাগা আর কি হতে পারে !! দিনরাত এক করে একের পর এক ডিজিটাল তুলির আঁচড় দিয়ে যেতে লাগলাম। অবশেষে দু-তিনদিন পর মানানসই একখানা ব্যানার দাঁড়িয়ে গেল, এক কোণে বাঁকিয়ে লিখে দিলাম “Ahsan’s Graphics” আমার ডিজাইন করা ব্যানার প্রথম প্রিন্ট হবে… এর চেয়ে ভালোলাগার মুহূর্ত আর কিই বা হতে পারে? এরপর মেইল করে দিলাম জিহাদ ভাইকে। দুদিন বাদেই পরীক্ষার ফলাফল দেয়া হলো, রেজাল্ট আগের দুই সেমিস্টার থেকে তুলনামূলক ভালো এবং এবারই প্রথম সিজিপিএ তিন এর উপর।
- দোস্ত, এই সাইকেলটা কেমন দেখতো। - একখানা সাদা সাইকেলের ছবি ইনবক্স করে বন্ধু সৈকতের মতামত জানতে চাইলাম।
- কোন ব্র্যান্ড? মডেল কতো?
- Nekro , Omega
- আমারটা Ash-10, এইটা তো দেখতেছি আরেকটু আপডেটেট মামা।
- কস কি? তোরটা নতুন না
সেকেন্ড হ্যান্ড নিছিলি?
- ভার্সিটির এক পোলার থেকে
নিছিলাম, নতুনই পাইছি বলা যায়। বেশিদিন ইউজ করে নাই।
- কত দিয়া নিছিলি?
- এইতো, হেলমেট আর লকসহ সাড়ে
আট । মার্কেট প্রাইজ ষোল এর মতো।
- যাহ, ভালই তো পাইছিস তাহলে।
কাল-পরশু তাহলে আমার লগে চল, এইটা কিনে নিয়ে আসি।
- ওকে, চল। লোকেশন কই?
- আন্দরকিল্লা।
- খাইছে, তাইলে তো আর্লি বের
হইতে হবে রে।
- বের হইলাম আরকি, প্রয়োজনে সেহরির পর আর ঘুমাবো না।
সেহরির পর গিয়ার সাইকেল নিয়ে নেটে সার্চ করতে করতে
ঘুমিয়ে পড়েছি, উঠে দেখি সকাল দশটা। তাড়াতাড়ি সৈকতকে ফোন দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। সার্চ
করতে গিয়ে সাসপেনশন, গিয়ার, ডিস্ক ব্রেক, ডেরা নতুন নতুন শব্দের সাথে পরিচিত
হচ্ছিলাম। একমাত্র এক্সপার্ট হিসেবে তাই বন্ধু সৈকত কে নিয়ে যাওয়া, নাহয় কোনটা কি
আবার গুলিয়ে ফেলব। সকাল সকাল বলে বেরোতে বেরোতে বেলা হয়ে গেল, কাটগড় থেকে স্কুলের
বন্ধু সৈকতকে সাথে নিলাম, যার
কাছ থেকে সাইকেল কিনব তাকেও ফোন করে জানিয়ে দিলাম ঘন্টা-খানেকের মধ্যে আসছি। যানজট
পেরিয়ে আন্দরকিল্লা পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘন্টা পেরিয়ে গেল। লালদীঘি নেমেই সাইকেল এর
মালিককে ফোন দিলাম, মিনিট দশেকের মধ্যেই আমাদেরই সমবয়সী এক ছেলে সাদা একখানা
সাইকেল চালিয়ে সামনে এলো।
সৈকত সাইকেলের বিভিন্ন পার্টস ঠিকঠাক আছে কিনা চেক
করে নিলো,অনুমতি নিয়ে হালকা চালিয়েও নিলো সে। এই বিষয়ে যেহেতু আমার দক্ষতা
নেই তাই আপাতত চুপচাপ থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। দরদাম করে সাড়ে নয় হাজারে নিয়ে নিলাম
নিজের উপার্জিত টাকায় কেনা আমার প্রথম গিয়ার সাইকেল। দশ হাজার নিয়ে এসেছিলুম, এই
পাঁচশত বাচানো গেল। এটা দিয়ে সিএনজি ভাড়া দেওয়া যাবে।
- খুশি এবার?
- হুম বন্ধু, সাইকেল তো ভালোই দেখতেছি। একটান দিব
নাকি রে এটা নিয়ে। ডাইরেক্ট বাসা?
- পাগল নাকি তুই? রোজা আছিস না?
- হ, কীই বা আর হোবে? একটু টায়ার্ড হয়ে পড়বো আরকি।
- তো আমি কেমনে যাব? সিএনজি নে।
- আচ্ছা, চালাইয়া নিউমার্কেট পর্যন্ত যাই। তালা
কিনতে হবে।
- আচ্ছা , ঠিকাছে।
নিউমার্কেট এসে একটা ভালমানের তালা নিয়ে নিলাম, এরপর সিএনজি দরদাম করছিলাম। সিএনজি চালক সাথে সাইকেল দেখায় ভাড়া বেশি চাচ্ছিল, কিন্তু আমরা নাছোড়বান্দা। সিএনজি চালকের যুক্তি- সাইকেল একপাশে বাইর হয়ে থাকবে...তাই সাবধানে চালাইতে হবে হাবিজাবি ইত্যাদি। ড্রাইভারের এহেন যুক্তি শুনে সৈকত মুহূর্তের মধ্যেই সাইকেলের সামনের চাকা খুলে সেটিং করে নিল আর বলল “ব্যাস,প্রব্লেম সলভড”। দুইপাশেই আটকানো গেছে, আর তাই বেশি ভাড়ার প্রশ্নই উঠে না। ড্রাইভার কিছু সময়ের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন আর না পেরে যাত্রা শুরু করলেন। কাটগড় নেমে বেচারা ড্রাইভারের গোমরা মুখখানা দেখে আরো বিশটা টাকা বাড়িয়ে দেয়া গেলো।
<<<আগের পর্ব পরের পর্ব>>>

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন