পহেলা বৈশাখ,বাংলা বর্ষের প্রথম দিন। খাজনা আদায়ের
সুবিধার্তে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন, এরপর থেকে প্রতিবছর
নিয়মিতভাবে পালিত হচ্ছে চৈত্র সংক্রান্তি আর পহেলা বৈশাখ। সকাল সকাল নাস্তা করে
বেরিয়ে পড়লাম, গন্তব্য বটতলী স্টেশন। প্রসেনজিত, নাঈম আর আসাদ আমার আগেই এসে পড়েছে
স্টেশনে, আমি গিয়ে পৌঁছতেই সবাই মিলে ডেম্যু ট্রেনে উঠলাম। এই রুটে ডেম্যু ট্রেন
চালু হয়েছে বেশিদিন হয়নি, আর তাই ট্রেনগুলো এখনো অনেকটা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন আছে।
ট্রেনে উঠেই সাব্বিরকে ফোন দিয়ে জানা গেল তারা নাকি বাসে করে যাবে, অল্প কিছুক্ষণের
মধ্যেই চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়গামী ট্রেন ছেড়ে দিল আর আমরা সবাই সেলফি তুলছিলাম।
-কিরে প্রসেন? তোর পানির বোতল আনছিস?
-হ্যাঁ, এইতো । যেখানেই যাই সাথে থাকে সবসময়।
-দে , আমাকে একটু পানি দে।
-ধর, মুখ লাগাবিনা কিন্তু দেখিছ।
ট্রেন ছাড়ার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ষোলশহর স্টেশন
এসে পড়ল, কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাত্রছাত্রীরা উঠে পুরো বগি ভর্তি করে ফেলল। হুইসেল
বাজিয়ে আবার চালু হলো ট্রেন, ছাত্রছাত্রীরা সবাই বর্ষবরণ করতে সেজেগুজে ক্যাম্পাসে
যাচ্ছে। তরুণীদের অধিকাংশই লাল পাড়ের সাদা শাড়ি আর তরুণের পোশাক পাঞ্জাবি। প্রায়
ঘন্টা দেড়েক পর ট্রেন ক্যাম্পাসে এসে পৌঁছল, নেমে টঙের সামনে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে
সাব্বির আর রাশেদের দেখা পেলাম। এরপর সবাই ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলাম। জিরো পয়েন্ট
থেকে গল্প করতে করতে হাঁটছি সোজা, ক্যাম্পাস আজ অন্যরকম সাজে সেজেছে। কাঁটা পাহাড়
পেরিয়ে কিছুদূর যেতেই চোখে পড়ল বেশ কয়েক ধরণের দেশীয় খেলাধুলার আয়োজন করা হয়েছে।
কুস্তি লড়াই, কাবাডি, হা-ডু-ডু ইত্যাদি। শহীদ মিনারের একপাশে আয়োজন কয়া হয়েছে পালা
গানের আসর।
-কিরে অডা, খালি হাডিবি নি? এক মিক্কে যাই এনে বই চল।
-চল কুস্তি লড়াই দেখি গিয়ে।
হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত রাশেদ আমাকে বলল কিছুক্ষণ
জিরিয়ে নিতে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে সূর্যের তেজ বেড়েছে অনেক, আর তাই এমনিতেই সবাই
ক্লান্ত। কুস্তি লড়াই দেখতে দেখতে আবিষ্কার করলাম আমি আর রাশেদ বাদে আর কাউকেই
আশেপাশে দেখছি না। এরপর ফোন দিয়ে প্রসেনজিত ও বাকিদের খুজে বের করলাম। নাইম খবর
নিয়ে আসলো…
-এই, ওদিকে পান্তা-ইলিশ দিচ্ছে মনে হয়। চল যাই খাই আসি।
-হ, তোরে মাগনা খাবাইবে। গিয়ে দেখ বেচতেছে। প্রত্যুত্তরে প্রসেনজিত
নাঈমকে হালকা ধমক দিল।
ডক্টর ইউনুস ভবনের সামনে একটা ছোট জটলা দেখে সামনে
গেলাম, গিয়ে দেখি আসলেই পান্তা-ইলিশ, আর তা টাকার বিনিময়ে। ফ্রি-তে কিছু আছে কিনা
খুঁজতে গিয়ে শুনলাম অডিটোরিয়ামে একখানা শর্টফিল্ম আছে, একটু পরই শুরু হবে।
শর্টফিল্ম এর নাম “কাটুস-কুটুস”, নাম শুনতে পেয়ে আসাদ বলে উঠল-
-ক-অরাই ব নি কোন ?
-আরে পাগলা কামড়াবে কেন? চল..
-চাইছ আবার।
সবাই মিলে অডিটোরিয়ামে ঢুকে আসন গ্রহণ করলাম, কিছুক্ষণ পর শুরু হলো “”কাটুস-কুটুস”। ক্যাম্পাসের প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে ডিপার্টমেন্টের ছাত্রছাত্রীদের নির্মিত গতানুগতিক শর্টফিল্ম, তবে সময় কেটেছে ভালোই। অডিটোরিয়ামে ঢুকার আগে বাদাম নিয়ে এসেছিলাম, সবাই মিলে খেয়েছি ...শর্টফিল্ম শেষ হয়ে গেছে কিন্তু বাদাম শেষ হয়নি!!!
প্রচন্ড পিপাসায় গলা শুকিয়ে আসছিল, ফিল্ম দেখে
বাইরে এসে সবাই মিলে ঠান্ডা কোক আর নাস্তা খেয়ে নিলাম। এরপর সিএনজি করে এক নম্বর
গেটে এসে শহরে ফেরার বাস ধরলাম। যেখানেই যাচ্ছিলাম নিজেরা নিজেদের মতো আনন্দ
করছিলাম, প্রচন্ড গরমের মধ্যেও আমাদের এই হাসি-ঠাট্টা দেখে বাসে আশপাশের লোকজন
একটু কটু দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। কিন্তু তাতে আমাদের থোরাই কেয়ার, এই সোনালী সময় যে
আর ফিরে আসবেনা।
………………………………………………………………………..
সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেই ল্যাব ফাইনালের ডেট
দেয়া হয়েছে, শেষ না করা ল্যাব রিপোর্টগুলো লিখতে লিখতে ত্রাহিদশা, তার উপর আবার
প্রতিদিন এইটা-ওইটা এসাইনমেন্ট। বেশ কয়েকদিন বন্ধ থাকার ফলে স্বাভাবিকভাবেই একটু
বেশি চাপ পড়েছে পড়াশুনার। ক্যাম্পাস থেকে ফিরে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম, বিমান
বাহীনি ঘাটিতে একটা ব্যাচ পড়াচ্ছিলাম- উচ্চ মাধ্যমিক পদার্থবিজ্ঞান এর ব্যাচ।
বিল্ডিং এর নিচে সাইকেল রাখতে রাখতেই লক্ষ্য করলাম ক্রিকেট ফেলে দৌড়ে আসছে
দু-তিনটে ছেলে। কাছে আসতেই চিনতে পারলাম... সাকিব, তুহিন আর এলেক্স।
- আসসালামু-আলাইকুম ভাই, ভালো আছেন?
- হ্যাঁ, আমি তো আছি ভালো। কিন্তু তোমরা আজকে পড়ালেখা বাদ দিয়ে মাঠে কেন?
- ভাইয়া, আজকে একটা ক্রিকেট ম্যাচ আছে। আজকে না পড়াইলে হয় না?
- তো , এটা তোমরা আগে ফোন করে বলবা না?
- সরি ভাইয়া। আজকের ম্যাচটা খুব ইম্পরটেন্ট।
- আচ্ছা যাও, খেল গিয়ে, কি আর করা!
আমার ইচ্ছে করছিল আমিও ওদের সাথে গিয়ে খেলি,
কিন্তু মন চাইলেও খেলতে পারছিলাম না। আমার মনের কথা ধরতে পেরেই হয়তোবা সাকিব বলে
উঠল
-ভাইয়া, আপনি খেলবেন আমাদের টিমে?
-আরে, আমি খেললে আজকের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ তোমরা হেরে যাবা। বহুদিন খেলার সাথে নাই।
-আচ্ছা ভাই, আরেকদিন খেইলেন।
এরপর সাইকেল নিয়ে সোজা চলে গেলাম মুসলিমাবাদ বেড়িবাঁধ, এই বেড়িবাঁধ আসলেই মনটা অনেক ভালো হয়ে যায়। সাগরের কোলঘেঁষে সুবিশাল গাছের সারি আর জেলেপাড়া। স্লুইজ গেট এর পাশে গিয়ে বসে পড়লাম, এভাবে আনমনা হয়ে বসে থেকে আছড়ে পড়া ঢেউ গুনছিলাম আর কখন সন্ধ্যা নেমে এলো টেরই পেলাম না। সাঁজের আকাশে আজ ঘন কালো মেঘের আনাগোনা, একটু পরপর বাজ চমকাচ্ছে আকাশে। একবার ভেবেছিলাম বাড়ি ফিরে যাই, পরে আবার কি মনে করে বসে পড়লুম। মোবাইল সুইচড অফ করে দিয়ে সাগরপাড়ে একাকি জোৎস্না উপভোগ করছিলাম । ঘন কালো মেঘ, জোৎস্না, মৃদু বাজ চমকানো আর ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি … এ যেন এক অন্য রকম পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। প্রকৃতির বিশালতায় মুগ্ধ হয়ে ভার্সিটির ল্যাব রিপোর্ট, এসাইনমেন্ট থেকে শুরু করে সেমিস্টার ফি জমা দেয়ার লাস্ট ডেট সবই ভুলে গেলাম ক্ষানিকের জন্যে। এরপর হঠাৎ করে একটু কাছেই এক বড়সড় বাজ পড়লো, উপর ওয়ালাও আমার সাথে মজা নিচ্ছেন......যেন ধমক দিয়েই বাড়ির পথ ধরতে বললেন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন