আমাদের নবগঠিত সমাজসেবামূলক সংগঠন “Youth Renaissance” এর উদ্যোগে পতেঙ্গায় একটা বড়সড় প্রোগ্রাম আয়োজনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। একের পর এক মিটিং আর কার্যকরী পরিষদ এর সিদ্ধান্তে দিনক্ষণ ঠিক হবার পর বুঝতে শুরু করলাম...সমাজসেবা করা চারটেখানে কথা নয়। দুটি ব্যানারে প্রোগ্রাম হবে “ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্প” আর “এডুকেশন ফেয়ার-২০১৬”। ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্প সবার জন্যে উন্মুক্ত হলেও এডুকেশন ফেয়ার ছিল শুধুমাত্র স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের জন্যে। এডুকেশন ফেয়ারের মধ্যে ছিল ম্যাথ অলিম্পিয়াড, কুইজ আর প্রোগ্রামিং কন্টেস্ট এর মতো আকর্ষণীয় সব ইভেন্ট।
আমার উপর দায়িত্ব পড়ল একটি কার্যকরী গঠনতন্ত্র প্রণয়নের,
দুদিন সময় নিয়ে খেটেখুটে বেশ কিছু সংগঠনের গঠনতন্ত্র স্টাডি করে ৩২ ধারা বিশিষ্ট
একটি সুস্পষ্ট গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করে ফেললাম...যদিও একাজে আমার কোন পূর্ব-অভিজ্ঞতা
ছিল না। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পরই সংগঠনের কাজ আর কোচিং-টিউশন, এসবেই কাটছিল আমার
দিনগুলো। প্রোগ্রামের জন্যে ব্যানার ডিজাইনের কাজ করছিলেন সাখাজিল ভাই, আমি আর
আরমান ভাই লেগে পড়লাম ফান্ডরাইসিং এর কাজে, লিস্ট করে দেয়া বেশ কিছু শুভাকাঙ্খীদের
কাছে পৌঁছে অর্থ সংগ্রহের অভিজ্ঞতাটা বেশ মজার ছিল। রাকিব স্যার আর লিংকন স্যার
করছিলেন প্রোগ্রামিং কন্টেস্ট এর গ্রুমিং সেশন আর প্রশ্নপত্র প্রণয়নের কাজ, হালিম
স্যার আর কামরুজ্জামান স্যার ম্যাথ অলিম্পিয়াড এর, প্রান্ত সকল প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট
টাইপিং ও প্রিন্টিং আর আমিও নতুন দায়িত্ব নিয়ে নিলাম মেডেল, ক্রেস্ট আর অতিথি
সম্মাননার। কোচিং এর সিনিয়র ছাত্র-ছাত্রীরা করছিল ইভেন্ট গুলোতে রেজিস্ট্রেশন এর
কাজ। আমাদের অধিকাংশ কাজই ছিল প্রিন্টিং-প্রেস নির্ভর আর যে কারণে ভার্সিটির ক্লাস
শেষে ঘন ঘন আন্দরকিল্লা প্রেস পাড়ার ঢু মারতে হচ্ছিল।
এরই মধ্যে একদিন হঠাৎ বন্ধু জাহিদের ফোন...
-কিরে দোস্ত, ট্রান্সফরমারের রেটিং নিতে যাবি না?
-হ, পরশু তো ল্যাব আছে। কই থেকে নিবি রেটিং? পোলাপান
দেখলাম রেটিং নেয়ার জন্যে ইলেকট্রিক এর খাম্বার উপর উঠে যাচ্ছে।
-আরে পাগল, আমার বাসার পাশেই বিদ্যুৎ অফিস। ডজন ডজন
ট্রান্সফরমার পরে আছে এইখানে।
-তাই নাকি? আচ্ছা বিকালের দিকে যাব তাহলে, ভাল কথা...কই
অফিসটা?
-আরেহ বন্দরটিলা সিটি কর্পোরেশন এর উল্টা দিকে যে রাস্তা
টা আসছে।
-ও আচ্ছা, হালিশহর বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ? কয়দিন আগেই তো
গেছিলাম কারেন্টের বিলের সমস্যা নিয়ে।
-তাহলে তো চিনসই।
বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে দেখলাম পেছনের দিকটায় বেশ কিছু ট্রান্সফরমার
পড়ে আছে। নষ্ট হবে হয়তো, এলাকার বিভিন্ন বৈদ্যুতিক পোল থেকে খুলে এনে রাখা হয়েছে।
আমি আর জাহিদ কাছে যেতেই বেশ ক’জন টেকনিশিয়ান স্যার স্যার করে জায়গা ছেড়ে দিল।
আমাদের অফিসের কর্মকর্তা ভেবেছে হয়তো, ব্যাপারটা বেশ মজাই লাগলো। আমরা নিজেদের
মধ্যে আলোচনা করতে করতে ভালভাবে ট্রান্সফরমারগুলো পর্যবেক্ষণ করছিলাম আর কিছু
ট্রান্সফরমারের রেটিং প্লেটের ছবি তুলে নিলাম। যাক, এবার আরামছে রিপোর্ট লিখা
যাবে। বিদ্যুৎ অফিস থেকে চলে গেলা সিমেন্স হোস্টেল একটা টিউশনে। দশম শ্রেণির
বিজ্ঞান বিভাগের এই ছাত্রটা আমার খুব ফাজিল, যে কোন কিছুই ও বুঝবে কিন্তু না বোঝার
ভান করে থাকবে।
-স্যার, রেডিয়ান কোণ তো বুঝতেছি না।
-বললাম না, বৃত্তের ব্যাসার্ধের সমান চাপ বৃত্তের
কেন্দ্রে যে কোণ উৎপন্ন করে তাকে...
-তাও মাথায় ঢুকছে না স্যার। কিভাবে উৎপন্ন করে কোণ?
এরই মধ্যে স্টুডেন্ট এর আম্মু নাস্তা নিয়ে এলেন। বাহ,
আজকে দেখি ভাল খাবার দিয়েছে...কিন্তু মাঝেমধ্যে বেলা বিস্কুট দিয়ে চা দিলেই আমার
মাথা গরম হয়ে যায়।
-এই যে দেখো, তোমার আম্মু পিৎজা দিয়েছে।
-জ্বি স্যার, পিৎজা আমারও পছন্দ।
-আচ্ছা দেখ বৃত্তাকার একটা পিৎজা কে যেভাবে কাটা হয়েছে...আর
প্রত্যেকটা পিৎজা এক একটা রেডিয়ান কোণ তৈরী করেছে।
-এইবার বুঝছি স্যার।
-ওকে, এক পিছ রেডিয়ান পিৎজা নাও। খেতে খেতে ম্যাথ করি।
-আচ্ছা স্যার, যদি আম্মু এভাবে না কেটে অন্যভাবে কাটত তাহলে ত রেডিয়ান কোণ হতো না কি বলেন?
-😡😡😡😡
শুক্রবার...সাপ্তাহিক ছুটির দিন, কিন্তু আমাদের জন্যে ছিল মহা-ব্যাস্ততম একটি দিন। বিগত কয়েক মাসের পরিশ্রমের আয়োজন আজ ... পতেঙ্গায় আয়োজিত হচ্ছে ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্প আর প্রথমবারের মতো শিক্ষামেলা বা “এডুকেশন ফেয়ার”। গতকাল রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত আমরা ভেন্যু পতেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় এ ছিলাম। অডিটোরিয়াম সাজানোর কাজ থেকে শুরু করে জেনারেটর, সাউন্ড সিস্টেম, ডেকোরেশন থেকে চেয়ার-টেবিল আনানো সব কিছুতেই হাতে হাতে লাগিয়ে কাজ করছিলাম সংগঠনের সবাই মিলে। সকাল সকাল গিয়ে দেখি ব্যানার-ফেস্টুন এসে পড়েছে, বেশ একটা উৎসব উৎসব পরিবেশ। ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্পে আমাদের সহযোগিতা করছিল আরেকটি সমাজসেবামূলক সংগঠন CTG Blood Bank এর টেকনিক্যাল টিম। এলাকার কাউন্সিলর মহোদয় সকাল ন’টায় ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্প এর উদ্ভোদন করেন। এরপর একে একে ভিড় বাড়তে থাকে পতেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে। প্রায় তিনশ মানুষের ব্লাড গ্রুপিং এর মধ্য দিয়ে ঠিক জুমার নামাজের আগে শেষ করতে হলো আমাদের প্রথম ইভেন্ট। যদিও শেষদিকে সময়সল্পতার কারণে অনেক লোকের ব্লাড গ্রুপিং করাতে না পারায় কিছুটা অপ্রাপ্তি কাজ করছিল মনে।
জুমার নামাজ আর মধ্যাহ্নভোজন শেষে আবার হাই-স্কুল প্রাঙ্গন মুখরিত হতে শুরু করল ছাত্রছাত্রীদের পদচারণায়। দুপুরের ইভেন্ট ম্যাথ অলিম্পিয়াড আর প্রোগ্রামিং কন্টেস্ট। ম্যাথ অলিম্পিয়াড এর বিচারকার্যে সহযোগিতার জন্যে চবি’র গণিত বিভাগে অধ্য্যনরত বন্ধু আমিনুলকে আমন্ত্রণ করেছিলাম গতকালই। ইতোমধ্যেই সে এসে পড়েছে, স্থানীয় স্কুল কলেজের আমন্ত্রিত শিক্ষকবৃন্দ, অতিথি, ইভেন্টে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের সমন্বিত জাতীয় সংগীত এর মাধ্যমে শুরু হয়ে গেল দ্বিতীয় অধিবেশন এর প্রোগ্রাম। সিট প্ল্যান অনুযায়ী ছাত্রছাত্রীরা তাদের যার যার হলের সিটে বসে পড়ল, মাইকে ঘোষণা আসতেই আমরা তাদের গণিত অলিম্পিয়াড এর প্রশ্নপত্র বিতরণ করলাম। পাশাপাশি অন্য হলে হচ্ছিল একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণে প্রোগ্রামিং কন্টেস্ট। ইভেন্ট দুটি সামলাতে আমাদের কম ঝক্কি পোহাতে হয়নি, এত্তগুলা গণিত অলিম্পিয়াড এর খাতা সন্ধ্যার আগেই কাটাটা একটু বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল। এই সময়ে হই-হুল্লোর সামাল দেয়ার জন্যে “স্বপ্ন” নামে আমার করা একটা বিশেষ স্লাইড-শো ছিল ছাত্রছাত্রীদের জন্যে।
সন্ধ্যা নামতেই একে একে এলাকার গণ্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ ও আমন্ত্রিত অতিথিরা আসতে থাকে, শুরু হয় পুরস্কার বিতরণী পর্ব। রাকিব স্যারের সঞ্চালনায় একে একে আমরা আমাদের সংগঠনের পরিচয় তুলে ধরলাম সবার মাঝে। অতিথীদের মূল্যবান বক্তব্য শেষে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দিনব্যাপী আমাদের এই কর্মযজ্ঞ যা আজীবন চলার পথের পাথেয় হয়ে রইবে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন