মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রতিবাদে দেশব্যাপী হরতাল ডেকেছে জামায়াতে ইসলামী আর এদিকে হরতালের মাঝেও প্রায় সব রকমের গাড়ি পুরোদমে চলছে, এমনকি রাস্তায় প্রতিদিনের চেয়ে বেশি যানযট...এ যেন রীতিমতো হরতাল শব্দেরই অপমান। কাস্টমস ব্রীজ ক্রস করার সময় দেখলাম রাস্তার পাশে একটা রাইডার উল্টে আছে, আশেপাশে কেউ নেই। এক সময় এই গাড়িগুলোর নাম ছিল “দুরন্ত”, বয়স বেড়েছে...কলকব্জায় ক্ষয় পড়েছে কিন্তু প্রায় একযুগ পরও এরা নামকরণের সার্থকতা বজায় রেখেছে। কি মনে করে আজ বাসে উঠেছিলুম, নয়তো রাইডারে চড়তেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।
ক্যাম্পাসে পৌঁছে সকালের ক্লাস শেষ করেই শুনি আজকে
সাধারণ ছুটি, ভার্সিটির ক্রিকেট টিম আন্তঃ বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেটের ফাইনালে উঠেছে
আর তাই ক্রিকেট টিমের সমর্থনে এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে চলে যাবো আমরা সবাই। স্টেডিয়াম
ক্যাম্পাসের কাছেই , এক রকম হেঁটেই চলে গেলাম বন্ধুরা মিলে। গেট দিয়ে ঢুকে
গ্যালারিতে গিয়ে বসলাম আমি, জাহিদ, রিয়াদ, সাব্বির, প্রসেনজিত ও আরো কয়েকজন।
সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বনাম প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি ফাইনাল, টানটান উত্তেজনা বিরাজ
করছে গ্যালারিতে। পূর্ব গ্যালারি প্রিমিয়ারের ছাত্রছাত্রীদের দখলে, আর পশ্চিম
গ্যালারিতে বিরাজ করছে সাউদার্নের ছাত্রছাত্রীদের রাজত্ব।
- ওয়াহ, কি ডান্স রে দেখ সানি, ম্যাচ হারলে কি এরা মুখ দেখাইতে পারবো?
- কই? কে কই নাচে?
- ওই যে দেখ, মাঠের একপাশে আমাদের ভার্সিটির চিয়ার লিডাররা।
আইপিএল এর সৌজন্যে চার-ছক্কা কিংবা উইকেট পড়লে একটা ছোট স্টেজে উঠে মেয়েদের নাচানাচি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারই অনুকরণে এখানে মেয়েরা নাচানাচি প্র্যাক্টিস করছে। সম্প্রতি বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ফ্লাস-মব সংস্কৃতি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে, আমাদের ক্যাম্পাসও এর ব্যাতিক্রম ছিল না। ক্যাম্পাসের ওই ফ্ল্যাশ মব দলের ছেলেপিলেরা মাঠের এক পাশে খেলা শুরুর আগেই ফ্ল্যাশ মব করে দেখাল। এই ফ্ল্যাস মব কে আমি অনেকগুলো বানর একসাথে ছাড়া পেলে বিনোদনের জন্য যা যা করে তার সাথেই কেবল মিলাতে পারলুম, অবশ্য বানরের ইহা সহজাত প্রবৃত্তি আর মানুষ এসব অনেক অনুশীলন করে রপ্ত করেছে। অনেক হইহুল্লোর করে ক্রিকেট দলকে উৎসাহ দিয়েও কাজ হয়নি, জাহিদের কথাই শেষমেশ ফলে গেল। ১৩০ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে প্রিমিয়ারের একের পর এক উইকেট পড়তে থাকে, অধিনায়ক পঙ্কজ দাদা শেষ পর্যন্ত লড়ে গেলেও দলের হার ঠেকাতে পারেননি।
পরদিন ক্যাম্পাসে পৌঁছে তাড়াহুড়ো করে ইলেকট্রনিক্স ল্যাবে ঢুকলাম, দেখি সবাই ল্যাব রিপোর্ট নিয়ে ব্যাস্ত। এক একটা ল্যাবের পর এই রিপোর্ট লিখার জন্যে এক সপ্তাহ সময় পাওয়া যায়, কিন্তু আমরা রেখে দেই বাকিদের থেকে দেখে লিখব বলে। আবার অনেকে রিপোর্টের অধিকাংশ লিখে আনলেও সামান্য কিছু বাকি রেখে দেয় ল্যাবে এসে কমপ্লিট করবে বলে। পাঁচজনের গ্রুপের একজনকে দায়িত্ব দেয়া হয় এক্সপেরিমেন্ট এর রেজাল্ট প্রিন্ট করে আনবে বলে, কেউবা থাকে ফ্রন্ট পেজ দাতা, আবার কেউবা সাদা অফসেট পেপার, কেউবা স্ট্রাপলিং। এভাবে কাগজ, ফ্রন্ট পেজ, রেজাল্ট এর প্রিন্ট কপি ও স্ট্র্যাপলিং সকলের সমন্বিত প্রয়াসে সম্পন্ন হয় এক একটি ল্যাব রিপোর্ট যা কিনা প্রতিনিয়ত আমাদের টিম-ওয়ার্কের শক্তিকে উদ্দীপ্ত করে। আমার কাজ হচ্ছে ল্যাবে গিয়ে রিপোর্ট লিখা, আমার লিখা শেষ হতে হতে স্যার ল্যাবে চলে আসতেন...এরমধ্যেই প্রায় সবাই রিপোর্ট জমা দিয়ে দিতো, আর আমি ল্যাবের এক কোণে লিখতাম আর লিখতাম । এরপর স্যার এসে প্রস্তুতি নিতে নিতে ওইদিনকার এক্সপেরিমেন্ট বোর্ডে লিখতেন...আর আমি এরই মধ্যে মোটামুটি সব শেষ করে পিন-আপ করে আস্তে করে স্যারের টেবিলে জমা দিয়ে দিতাম। রিপোর্ট জমা করার ক্ষেত্রে যতটা নিচে রাখা যায়- এই নীতি কাজ করতো সবার মধ্যে, কেননা শিক্ষকের মন-মেজাজ খারাপ থাকলে ভুলত্রুটি যা ধরার উপরের গুলোর উপর দিয়ে যেত। তার উপর আবার রিপিট খাওয়ার ভয়ও কাজ করতো।
এই হচ্ছে আজকের এক্সপেরিমেন্ট এর থিওরি, এইবার
তোমরা ইন্সট্রুমেন্ট কালেক্ট করো- এই কথাটা শোনার পরপরই আমি সবার আগে হাজির
ইন্সট্রুমেন্ট কালেক্ট করার জন্যে। ল্যাব এসিসট্যান্ট ভাই ইন্সট্রুমেন্ট দেয়ার
বেলায় একদম হাড়কিপটে, সামান্য পাঁচ-দশ টাকার রেজিস্টর, ক্যাপাসিটর, ট্রানজিস্টর
গুণে গুণে দেয়...তার উপর নাকি কিছু নষ্ট করলেই জরিমানা। ইন্সট্রুমেন্ট নেয়ার পরপরই
আমার কাজ হচ্ছে সবকিছু মাল্টিমিটার দিয়ে চেক করে নেয়া, এরপর গ্রুপ মেম্বার জাহিদের
উদ্দেশ্যে-
- নে, সব ঠিকঠাক আছে। কানেকশন দে এবার।
- আইজকা সব্বার আগে মিলাই তাড়াতাড়ি শেষ করব।
- হুম, ঠিক আছে। আমি ডেস্কের কোনে গিয়া ঘুম দিচ্ছি। কানেকশন দেয়া হইলে ডাকিস।
- আইজকা আমি একাই মিলাই ফেলব দেখিস।
বেশ খানিক্ষণ পর বন্ধু শহীদের ডাকাডাকি…
- অই, দেখ তো। সবাই মিলাই ফেলতেছে, আর জাহিদ চাচা এখনো মাথার চুল ছিড়ে যাচ্ছে।
চোখ দুটি হালকা লেগে এসেছিল, উঠে দেখি জাহিদের রীতিমতো ঘাম ঝরছে। এরপর দুজনে মিলে সার্কিট চেক করে দেখলাম কানেকশন ভুল ছিল। ঠিক করার কিছুক্ষণ পরই পাঠ চলে আসলো আর ওইদিনের মতো মুক্তি।
ল্যাব শেষ করে গেলাম লাইব্রেরিতে, লাইব্রেরি কার্ড দিয়ে কিছু বই নেয়া দরকার। প্রমথ চৌধুরী তার “বই পড়া” প্রবন্ধে লাইব্রেরির গুরুত্ব যতটা ফুটিয়ে তুলেছেন তা এরকম সুবিশাল বইয়ের রাজ্যে এলেই কেবল উপলব্ধি করা যায়, কিন্তু এই লাইব্রেরিতে বই পড়া ছাড়া আর সবকিছুই হয় বলা চলে। কেবলমাত্র পরীক্ষার সিজনে ছেলেপিলেরা একটু মনযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে এই লাইব্রেরিতে, আর বাকিটা সময় ল্যাব রিপোর্ট, এসাইনমেন্ট এর নাম করে গল্প-গুজব আর আড্ডায় মেতে থাকে। লাইব্রেরিয়ান স্যার-ম্যামরাও বকা-ঝকা করতে করতে বিরক্ত হয়ে এই পরিবেশকেই স্বাভাবিক মেনে নিয়েছেন। বই নিলাম দুটো, একটা ডিপার্টমেন্টাল...আরেকটা নন ডিপার্টমেন্টাল। ডিপার্টমেন্টাল বই কেবল এমনিতেই নেয়া, আজকাল সব গুগল মামার কাছেই পাওয়া যায়। ক্লাস ক্যান্সেল হলে পরে দুপুরের আগেই ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে পড়লাম, আমি আর জাহিদ গিয়ে উঠলাম মামার টঙে ছোলা-মুড়ি খেতে।
দুয়েক চামচ মুখে দিতে না দিতেই হঠাৎ আশেপাশে
প্রচুর চিৎকার চেচামেচি, আমরা উঠে আশেপাশে তাকাতেই দেখলাম বেশ কিছু ছেলেপিলে
আমাদের প্রবর্তক মোড়ের ক্যাম্পাসের দিকে ছুটে যাচ্ছে। টঙের মামা আমাদের উদ্দেশ্য
করে…
- মামা, ভার্সিটি তে কিছু হইছে নাকি?
- কই না তো, একটু আগেই বের হলাম ক্লাস করে।
- কিছুক্ষণ আগে আরেক গ্রুপ ছেলেপিলে দৌঁড়ে যাচ্ছিল, আকজনের গেঞ্জি দেখলাম লাল।
- আরেহ, র্যাগ ডে ছিল মনে হয় কোন ডিপার্টমেন্ট এর।
- না মামা, মামামারি হইছে নাকি প্রিমিয়ারে।
‘খাইছে’- মুখ দিয়ে অস্ফুষ্টভাবে বেরিয়ে এলো শব্দটি। আর দেরি না করে আমি আর জাহিদ তাড়াতাড়ি জিইসি-র দিকে হাঁটা শুরু করলাম। আপাতত বাসে উঠতে পারলেই হলো, কি না কি হয় বলা যায় না। বাড়ি ফিরে সোশাল মিডিয়াতেই খবর পেলাম আমাদের ভার্সিটির ওয়াসা ক্যাম্পাসে ব্যাবসায় অনুষদ বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা বিদায় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র মারামারি করেছে, মারামারি থেকে খুনোখুনি পর্যন্ত হয়ে গেছে এবং একজন ভিক্টিম স্পট ডেড… লাশ চট্রগ্রাম মেডিকেলে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন