বৃহস্পতিবার, ১২ নভেম্বর, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ২৭

 



জানুয়ারীর এক শীতের দিনে আড়মোড়া ভেঙ্গে ঘুম থেকে উঠলাম, বেশ কটা দিন ছুটি কাটিয়ে আজ মনটা কেমন দুরুদুরু করছেআজকেই যে সেমিস্টার ফাইনালের রেজাল্ট পাবলিশ হবে !!! আগের সেমিস্টারের রেজাল্ট তেমন ভাল হয়নি, আর তাই এবারের রেজাল্ট কেমন হবে টা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছিল মনে। ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে ফেসবুকে ঢুকতেই দেখলাম সিআর শাওনের পোস্টঃ

কেউ অযথা কল দিয়ে বিরক্ত করবেন না, দুপুর একটার পর রেজাল্ট নোটিশ বোর্ডে টাঙিয়ে দেয়া হবে

য়ারিফকে ফোন করলাম ...

-অই, কাম্পাসে যাবি রেজাল্ট দেখতে?

-হুম, যাবো তো। তুই আসবি না?

-নাহ, আমার রেজাল্ট টা দেখে জানাইছ তো।

-আচ্ছা।

রেজাল্ট মোটামুটি ভালোই হয়েছিল, এই আমাদের মতো মিডবেঞ্চার দের যেমনটা আশা করা উচিত আরকি। দুপুরে খেয়েদেয়ে “স্টাডি জোন” কোচিং এ গেলাম। উচ্চ মাধ্যমিকের চলতড়িৎ পড়াতে পড়াতে আবিষ্কার করলাম ছাত্রছাত্রীরা খুব হাঁপিয়ে পড়েছে। কি আর করার, সার্কিট সলভ করা বাদ দিয়ে গল্প জুড়ে দিলাম। Current War এর গল্প, ছাত্রছাত্রীরা প্রথমে বিশ্বাসই করছিল না যে সাইন্টিস্টরা বিদ্যুৎ নিয়ে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করতে পারে। নিকোলা টেসলা আর এডিসন এর মধ্যে সেই ঐতিহাসিক এসি কারেন্ট আর ডিসি কারেন্ট এর যুদ্ধ। গল্প-গুজব শেষে যখন ছুটি হলে পরে পরিচালক হালিম স্যার মিটিং এ ডাকলেন। ইতোমধ্যেই “Youth Renaissance” নামে একটি সমাজসেবামূলক সংগঠন চালাচ্ছিলাম আমরা। সামনে একটা বড়সড় প্রোগ্রাম করার প্রাথমিক পরিকল্পনা হয়েছিল ওই আলোচনায়। সকলের মতামতে আলোচনার ফলাফল হিসেবে উঠে আসল “এডুকেশন ফেয়ার” ও “ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্প” এর আয়োজন।

নতুন সেমিস্টার এর কোর্স এনরোলমেন্ট শেষ করে পুরোদমে ক্লাসও শুরু হয়ে গেছে। ডিপার্টমেন্টাল কোর্সের মধ্যে মেশিন-১ আর ইলেকট্রনিক্স-১ মোটামুটি ভালই লাগছিল কিন্তু Electromagnetic Field & Wave কোর্সের ক্লাস শুরু হলেই সবার মাথাব্যাথা শুরু হয়ে যায়, এই কোর্সের সবকিছু একদম মাথার উপর দিয়ে যায়। সকাল সকাল ক্লাস থাকলে ক্যাম্পাসে আসাটা একটু বিরক্তিকর লাগলেও এক বছর পেরিয়ে এক রকম ক্যাম্পাসের মায়ায় পড়ে গিয়েছি। নিজের পরিবারের বাইরে এ যেন আরেকটা পরিবার, না আসলে...বন্ধুদের সাথে গল্প-আড্ডা না হলে কেমন খালি খালি অনুভব হয়। ক্লাসে সবার মুখে মুখে খুশির সংবাদ হচ্ছে- সাজ্জাদ ভাই বাবা হয়েছেন। আর ছেলেপিলেরাও নাছোড়বান্দা, ট্রিট না নিয়ে ছাড়বে না। শেষমেষ বাধ্য হয়ে ওদিন লাঞ্চ ট্রিট দিয়ে দিলে আমাদের জন-সাতেক ছেলেপিলেদের।

সকাল সকাল ক্লাস বাদ দিয়েই গেলাম মেডিকেলে, চট্রগ্রাম মেডিকেল এর ব্লাড ব্যাংক এর সামনে দাঁড়িয়ে রোগীর বড় ভাইকে কল দিলাম। একটা পাঁচ বছরের বাচ্চার ও পজেটিভ ব্লাডের প্রয়োজন ছিল, গতকাল রাতেই আমাদের CTG Blood Bank গ্রুপে জানতে পেরে সকাল সকাল চলে এসেছি আর এসেই ফয়েজ ভাই এর সাথে দেখা। চেনা নাই জানা নাই, শুধুমাত্র মানসেবার উদ্দেশে একজন এভাবে রক্ত দিতে আসবে এটা ফয়েজ ভাইয়ের অজানা ছিল। প্রতিটি রক্তদান শেষে আত্মীয় কিংবা রোগীর মুখের এই হাসি আর কৃতজ্ঞতা আমাকে আরো বেশি সমাজসেবার অনুপ্রেরণা জোগায়...জীবনের সার্থকতা আমি খুঁজে পাই এইসব ছোট ছোট গল্পে। তাড়াহুড়ো করে এসে ক্লাসে ঢুকলাম, দুঘন্টার ক্লাসের একঘন্টা ইতোমধ্যেই ফুরিয়ে গেছে...কারণ জানতে পেরে ম্যাম এটেন্ডেন্স দিয়ে দিলেন।

দুপুরের লাঞ্চের পর তিনঘন্টার বিশাল ল্যাব থাকলেই বিরক্ত লাগতো, কিন্তু সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন ল্যাবে শুভ স্যারের আন্তরিকতায় সেই ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে যায়।  অটোক্যাডের প্রাথমিক পাঠ দিতে দিতে স্যার নানান রকমের অনুপ্রেরণামূলক কথাবার্তায় ল্যাব মাতিয়ে রাখতেন আর নিজের উঠে আসার গল্প শোনাতেন। এদিকে স্যারের কথায় কর্নপাত না করে জাহিদ অনেক্ষণ ধরে নেট ব্রাউজিং করছিল। স্যারের চোখে পড়লে তাকে দাঁড় করালেন...

-এই তুমি হ্যাঁ, সাদা গেঞ্জি...দাঁড়াও।

-জ্বি স্যার?

-বলো কোন সফটওয়্যার নিয়ে বলছিলাম?

-স্যার...ইয়ে মানে কি যেন...অটোকাঠ মনে হয়।

অটোক্যাড কে অটোকাঠ বলায় পুরো ক্লাস অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল, স্যার নিজেও মুচকি হাসলেন। সেদিন ল্যাব শেষে বাড়ি ফেরার পথে জাহিদ আমাকে কথার পর কথা শুনিয়ে গেল- তার পাশে বসেও কেন আমি তাকে বললাম না কোন সফটওয়্যার। ফেরার পথে পুরো কান ঝালাপালা করতে করতে যখন দুজনে সীমেন্স হোস্টেল নামলাম তখন আমাদের প্রচন্ড ক্ষুদা। এরপর জাহিদ পাশের একটা দোকান থেকে দশ টাকায় এক প্লেট ছোলা আর বিশ টাকায় এক প্যাকেট মুড়ি কিনে নিলো, দোকানের টেবিলেই পেপার বিছিয়ে সামান্য ছোলার সাথে এক প্যাকেট মুড়ি মিশিয়ে গোগ্রাসে গিলতে শুরু করল জাহিদ। আমি প্রথমে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম, কি করছে এসব ও? জাহিদের ভাষ্যমতে ...

 

“কম টাকায় এর চেয়ে ভালো খাবার আর হয়না, দাঁড়াই আছস কেন? নে খাওয়া শুরু কর...”

মনে পড়ে গেল কবি সুকান্তের সেই বিখ্যাত কবিতার দুলাইন...

“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়

পূর্নিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।।”

<<<আগের পর্ব    পরের পর্ব>>>>

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...