হে মহাজীবন, আর কাব্য নয়, এবার কঠিন কঠোর গদ্যে আনো,
পদ-লালিত্য ঝংকার মুছে
যাক, গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো!
সাদামাটা
জীবনের চরম বাস্তবতা-কে গদ্যীয় ঢঙে কবিতার মধ্যে ফুটিতে তুলতে পেরেছেন হাতে গোনা
কিছু কবি-সাহিত্যিক। ছোটবেলায় যখন স্কুলে ছিলাম তখন প্রায়ই গদ্য-পদ্যের মধ্যে
গুলিয়ে ফেলতাম...আর বড়বেলায় এসে যখন জীবনানন্দের কবিতাগুলো পড়া শুরু করলাম তখন মনে
খটকা লাগলো- এ কি গদ্য, পদ্য নাকি দুটোর মিশেল কোন কিছু? সে যাই হোক আমাদের মতো
আনাড়িদের জন্যে এই কঠিন কঠোর গদ্য্য আসেনি, মন যখন যা চায় তাই লিখে ফেলি...একে কি
আর গদ্য বলা সাজে?
কড়া
এলার্মের শব্দে ঘুম থেকে উঠলাম, উঠেই মনে পড়ল ... এই যা, আজকে তো ভার্সিটি তে
আব্বুকে নিয়ে যেতে হবে। সেই কবে ছোটবেলায় আব্বুকে স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলাম, সেই
দিনটার কথা মনে পড়লে আজো হাসি পায়। তখন শিশু শ্রেণিতে পড়ি, কোন এক সহপাঠী বেশ কদিন
ধরে আমার গায়ের বর্ন নিয়ে খুবই খোঁটা দিচ্ছিল...মাঠে খেলতে গেলেই খেলাচ্ছলে ধাক্কা
দিয়ে ফেলে দিতো। বাসায় এসে মন খারাপ করে বসে থাকতাম, কাউকেই কিছুই বলতাম না। মনে
মনে ভাবতাম, আমার সমস্যা আমাকেই সমাধান করতে হবে... কিন্তু কই আর, আম্মার কাছ থেকে
তো কিছুই লুকোতে পারিনা। ঘটনা জানতে পেরে আমার অতি উৎসাহী আব্বা পরদিন স্কুল ছুটির
পর স্কুলের গেটে হাজির। আমাকে কাছে টেনে নিয়েই আব্বু...
-কোন পুয়া
ইভে তোরে মাইজ্জে আরে খালি দেখাই দে।
-থাক না
আব্বু, কিছু হবেনা...চল, বাসায় চলে যাই।
-আই ইতেরে
কান চাই ধরি তুলি ফেলাইউম, আর পোয়ারে কিল্লাই মারিল।
ঘটনার
আকষ্কিকতা দেখে আমি ওই সহপাঠীকে দেখিয়ে দিয়েই আব্বুর কাছ থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে
মুখ লুকাই। আর আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে আব্বু কিছুক্ষণ আগে যা বললেন তাই
করে বসবেন। আমার আর প্রেস্টিজ বলে কিছু রইল না। সেই থেকে একাডেমিক যে কোন ব্যাপার
আব্বুকে তেমন একটা জানাই না।
আজ অবশ্য
তেমন কোন ঝামেলা নয়, আসলে হচ্ছে কি চেয়ারম্যান স্যার গার্ডিয়ান ডেকেছেন...না কোন
অপরাধের জন্যে নয়। Poor Fund এর
ওয়েইভারের জন্যে আবেদন করেছিলাম, এর আগে হচ্ছিল কি দুষ্টু ছেলেপিলেরা এই ওয়েইভারের
টাকা পরিবার থেকে নিয়ে নিজেরা খরচ করে ফেলত। আর তাই এবার থেকে নতুন নিয়ম হয়েছে
আবেদন করলে সাথে গার্ডিয়ান নিয়ে আসতে হবে। আব্বাকে সবকিছু বোঝানোর পর আমার অতি
উৎসাহী আব্বা সকাল সকাল উঠে বসে আছেন, আর আমি আবারো কোন না কোন বিপদের গন্ধ
পাচ্ছিলাম। নাস্তা করে দুজনে ক্যাম্পাসে গেলাম, অন্য্যান্য অভিভাবকদের সাথে আব্বু
চেয়ারম্যান স্যারের সাথে দেখা করার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন আর আমি চলে গেলাম
ক্লাসে।
মিটিং শেষ
হলে পরে যখন আব্বুর সাথে দেখা হলো তখন আব্বু একগাদা অভিযোগ নিয়ে হাজির। আমার আগের
সেমিস্টার এর ফলাফল ভালো হয়নি, আরো মনযোগী হতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। টিচার্স রুম
থেকে নাকি মুন্না স্যার আমার ব্যাপারে আব্বুর কাছে প্রশংসা করেছেন, এটা জানতে পেরে
কিছুটা স্বস্তি এলো মনে। যাক বাবা, এদিক-ওদিক ব্যালেন্স করা গেছে। এরপর আর ক্লাস
না থাকায় আব্বুকে সাথে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।
কোচিং আর
টিউশন শেষ করে বাসায় এসে ল্যাপটপ খুলে বসলাম, মুন্না স্যার প্রোটিয়াস নামের একটা
সার্কিট ডিজাইন এর সফটওয়্যার দিয়েছিলেন...ওটা নিয়েই গুতোগুতি করছিলাম। কি সুন্দর
ইলেকট্রনিক্স লাইব্রেরি, যেটারই নাম লিখে সার্চ দিচ্ছি ওটাই পাওয়া যাচ্ছে...এরপর
একটার সাথে আরেকটা কানেক্ট করে যেমন খুশি সার্কিট বানাচ্ছিলাম, কি যে আনন্দ
লাগছিলো ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা। কাজ করতে করতে হঠাৎ মনে পড়লো শুভ স্যারের ল্যাব
এসাইনমেন্ট এর কথা, একটা বাড়ির ফ্লোর বড় আর্ট পেপার এ ড্র করতে হবে। তাড়াতাড়ি সাইকেল
নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম... আঁকাআঁকির যোগার-যন্তর করতে হবে যে। লাইব্রেরি থেকে আর্ট
পেপার, পেন্সিল আর বড় দেখে একটা স্কেল নিয়ে নিলাম। বাসায় আসার পর টেবিলে আর্ট
পেপার লাগিয়ে নিয়ে আয়োজন করতে করতে সময় গড়িয়ে চলছিল। ঠিক কোত্থেকে শুরু করব এটা বুঝে
উঠতে পারছিলাম না। অনেক খাটাখাটুনির পর যখন একটা মাল্টি-স্টোরেজ বিল্ডিং এর সিভিল
ড্রয়িং শেষ করলাম তখন বাজে রাত দুইতা...কিভাবে যে রাত মধ্যরাত থেকে গভীর হয়ে গেলো
টেরই পেলাম না।
সকালে বেরোনোর
সময় একটা ইঞ্জিনিয়ার ইঞ্জিনিয়ার ভাব এসে গেল নিজের মধ্যে, ব্যাগের ভিতর আর্ট পেপার
রোল করে ঢুকিয়ে নিয়ে কিছু অংশ বাইরে রের করে দিলাম, লম্বা স্কেলটাও এভাবে বের করে
রাখা হলো। নেহাত আর্কিটেকচার আর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্টদের মতো লম্বা ওই
ইন্সট্রুমেন্ট বক্স কেনার সামর্থ্য ছিল না, তাই দুধের স্বাধ ঘোলে মেটানো যাকে বলে
আরকি।
>>>>>>চলবে>>>>>>>

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন