রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ২৬

 

সারাদিনের কোলাহল শেষে মধ্যরাতের নির্জনতা ক্রমেই ডানা বাঁধছে পৃথিবীর দীর্ঘতম এই সমুদ্র সৈকতে, খোলা জানালা দিয়ে এখন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে সাগরের শোঁ শোঁ গর্জন। রুমের ভেতর বন্ধুরা সকলে মিলে গল্প-আড্ডার এক ফাঁকে ওয়ারিফ একে একে আকাশ, মীর ও নাঈমকে অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন দিয়ে মজা করছিল। হঠাৎ সবার মাথায় এলো আমাদের সহপাঠী জাহিদের কথা, যাকে সবাই আঙ্কেল নামে ডাকে। এবার আঙ্কেলের সাথে মজা নেয়ার পালা, ওয়ারিফকে দিলাম জাহিদের নাম্বার।

-হ্যালো, আপনি কি জাহিদ স্যার বলছেন?

-হ, আমি জাহিদ। আফনি কে?

-একটা টিউশনি আছে, পড়াইতে পারবেন ?

-কোন ক্লাস? কত টাকা?

-ক্লাস নাইন। ফিজিক্স, ক্যামিস্ট্রি , ম্যাথ…… ৫০০০ টাকা।

-হুম, পড়াব তো। কোথায়?

-কক্সবাজার, লাবনী পয়েন্ট।

-এ? কি বলেন আফনে ? মাথা ঠিক আছে? আমি থাকি চট্রগ্রাম ইপিজেড, আর পড়াব কক্সবাজার গিয়ে?

-এজন্যেই তো বেশি টাকা, পড়াবেন কিনা বলেন?

-ধুর মিয়া, ফাইজলামি করার জায়গা পান না? রাতের বাজে একটা…ঘুমান।

হাসতে হাসতে সবার পেটে খিল ধরার যোগাড়, মাত্রাতিরিক্ত বিনোদন নেয়া হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই। এখনই ঘুমিয়ে না পড়লে ভোরের সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ করা হবেনা। তিনজনের খাটের একপাশটায় কাথা মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম, বাকিরা কে ক’টায় ঘুমিয়েছে জানা নাই। ভোরে চোখ মেলেই দেখি ওয়ারিফ জানালার এক পাশ থেকে আমাদের সবার ছবি তুলছে, আমি ওর ছবি তোলা দেখে তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম। বাকিরা সবাই অঘোরে ঘুমুচ্ছে, এক-জনের পা আরেক জনের মাথায় উঠে গেছে… কোল-বালিশ ভেবে একজন আরেকজনকে বারবার জড়িয়ে ধরছে…ঘুমের মধ্যে একজন আরেকজনের সাথে মারামারি করছে… এসব দেখতে দেখতে আমি আর ওয়ারিফ ফ্রেজ হয়ে নিলাম। বাকিদের ঘুম থেকে জাগিয়ে দিয়ে কিছু সময় পর সবাই মিলে বের হলাম ভোরের সৈকত দর্শনে। ভোরের সৈকতের নীল জল আর বিশুদ্ধ বাতাসে যেন প্রাণটা জুড়িয়ে যাচ্ছিল আমাদের এদিক ওদিক ঘুরাঘুরি করে, পানিতে দাপাদাপি করে, ছবি তুলে যখন সূর্যের তেজ কিছুটা বেড়ে গেল তখন আমরা আবার আমাদের কটেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

সকালের নাস্তা করতে সবাই মিলে আবার বেরুলাম, নাস্তা শেষ করেই আশেপাশে ভাল করে ঘুরে দেখতে হবে আজ। কিন্তু কই আর? কোন রকম গুছানো প্লান ছিল না আমাদের এই সফরের, আর তাই বিক্ষিপ্তভাবে শহরের এদিক-ওদিক ঘুরলাম সারাদিন। দুপুরে খাবার শেষে বিকেলের দিকে ঘুরলাম স্টেডিয়াম এর আশেপাশে ও বার্মিচ মার্কেটে। সৈকত, ঘুরাঘুরি আর কটেজ…এভাবেই একটা পুরো দিন কেটে গেল আমাদের। এবার রাতের খাবারের পালা, রাতের খাবারের জন্যে আমরা পাঁচজন মিলে এই হোটেল থেকে ওই হোটেলে ঘুরছিলাম। এক-একটা হোটেলে যাই, লোকজন কি খাচ্ছে দেখি…আর গলাকাটা দাম নেবে ভেবে বেরিয়ে আসি। শেষমেশ ওয়ারিফ আর তানভীর একটা রেস্টুরেন্ট পছন্দ করল, কিন্তু বাইরে থেকে ফিটফাট আর ভেতরে যে সদরঘাট হবে তা যদি আগে জানতাম ওই বেলা বন-কলা আর চা খেয়েই কাটিয়ে দিতাম।

পাঁচ জনের জন্যে সাদা ভাত, ডাল, ডিম আর মুরগির মাংস… এই ছোট্ট অর্ডারে প্রায় মিনিট বিশেকের বেশি কাটিয়ে দিচ্ছিল ওয়েটার, অথচ দোকানে আমরা ছাড়া আর কোন গ্রাহক ছিল না। শেষমেশ বিরক্ত হয়ে চেঁচামেচি শুরু করতেই আধ ঘন্টার মাথায় খাবার আসে। খাবার আসতেই আমি সাথে সাথে নিয়ে বিসমিল্লাহ বলে শুরু করে দিলাম। আমার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। এমনিতেই মাত্রাতিরিক্ত ঝাল খাবার খেতে পারিনা, তার উপর মাংসে আলাদা গোলমরিচ দিয়ে কি যে বানাইছে ওরাই জানে। আমি পানি-চিনি করে চেঁচামেচি শুরু করলাম, এদিকে বাকি সবারই দেখি একই অবস্থা। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা আবিষ্কার করলাম, এই মাংস হয়ত বাসি…যে কারনে অতিরিক্ত গোল মরচ দিয়ে ঝাল করা হইছে যাতে বোঝা না যায়। ক্ষুদায় সবার পেট চো চো করছিল, তাই ইতোমধ্যেই খাবার কমবেশি খেয়ে নিয়েছি…চাইলেই এখন আর অর্ডার ক্যান্সেল করা যাবেনা। নিতান্তই বাধ্য হয়ে ডাল আর ডিম দিমে বাকি ভাতগুলো গেলা হলো। কটেজে ফিরে রবিন আর দীপ্তর পেট খারাপ হয়েছিল পরে, কি বিশ্রিভাবে ফেঁসে গিয়েছিলাম ওইদিন রাতের খাবারে…ভাবতেই গা শিউরে উঠে এখনো।

পরদিন সকাল সকাল আমরা নাস্তা করে বেরিয়ে পড়লাম টেকনাফের উদ্দেশ্যে। রাতের খাবারে নাস্তানাবুদ হয়ে রবিন আর দীপ্ত তো সকালেই চট্রগ্রাম ফিরে যেতে চেয়েছিল, শেষমেশ আমরা বুঝিয়ে সুজিয়ে তাদেরও নিয়ে চললাম টেকনাফ। কক্সবাজার বাস স্ট্যান্ড থেকে শেয়ারিং মাইক্রো তে উঠলাম আমরা পাঁচজন। গাড়ি চালু হতে না হতেই ড্রাইভার গান প্লে করলেন…

“ম্যাডাম তোয়ার গায়ের ফিগার এতো যে সুন্দর, যিক্কা চাই ইক্কা তোয়ারে লাগে রে আদর…”

গানের তালে তালে আমাদের অসুস্থ বন্ধু দীপ্ত আর রবিন যেন প্রাণ ফিরে পেল। এই গাদাগাদির মধ্যেও তারা মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে গানের সাথে তাল মিলাচ্ছিল। কি আজব আজব সব গান এই অঞ্চলে বাজায় লোকজন, এসব গান সচরাচর শহর এলাকায় শোনা যায় না… তার উপর আজেবাজে ভাষা ব্যাবহার করে গানের দফারফা করা হয়েছে। এ যেন পুরুলিয়ার পানু গানের টেকনাফ ভার্শন, আমার মাথাব্যাথা শুরু হয়ে গেল। বেশ কিছুদুর যাবার পর প্রথম চেকপোস্ট পড়ল, বিজিবি গাড়ি দাঁড় করিয়ে সবকিছু চেক করে ছেড়ে দিল। এভাবে আবার কিছুদূর পর চেকপোস্ট, বারবার এভাবে উঠানামা করতে করতে এক সময় বিরক্ত হয়ে গেলাম। তার উপর এক ফার্মেসি দোকানী গাড়িতে উঠেছে দু-চার কাটন ওষুধ নিয়ে, এইসব ওষুদের কাগজপত্র দেখাতে দেখাতে বেশি দেরি হয়ে যায় প্রতিটা চেকপোস্টে। হ্নীলা স্টেশনে এসে ওই দোকানী নেমে গেল, ওর জাগায় এক বস্তা বাজার নিয়ে উঠল এক বয়স্ক ব্যাক্তি। খাইছে, এই বস্তাওয়ালার চেয়ে ওই ওষুদের দোকানীই ভালো ছিল… মনে মনে এই বস্তাওয়ালাকে গালমন্দ করছিলাম।  

প্রায় দু ঘন্টা মাইক্রোবাস জার্নির পর আমরা টেকনাফ পৌঁছলাম। গাড়ি থেকে নেমেই হাত-মুখ ধুয়ে আগে নাস্তা করে নিলাম পরটা, ডাল-ভাজি আর চা দিয়ে। খেয়ে-দেয়ে কিছুটা চাঙ্গা হয়ে এবার সবাই মিটিং এ বসলাম কোথায় যাওয়া যায়। টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন যাওয়ার ট্রলার ছাড়ে, কিন্তু খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেল সেন্টমার্টিন এর জাহাজ-ট্রলার আরো সকালে ছেড়ে যায়। আর এখন প্রস্তুতি ছাড়া সেন্টমার্টিন যাবার চেয়ে ভাল হয় সারাটা দিন টেকনাফ শহর ঘুরে দেখা। যেই ভাবা সেই কাজ, সবাই মিলে হাঁটা শুরু করলাম। হাঁটতে হাঁটতে একটা গোলচত্বরে এসে দেখলাম একটা ইজিবাইক স্ট্যান্ড। ইজিবাই ওয়ালাদের ওয়ারিফ জিজ্ঞাস করল আশেপাশে কই যাওয়া যায়। উত্তর এলো টেকনাফ বিচ, শুটকির বাজার, নাফ নদী ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর একটা অটো ভাড়া করে সবাই টেকনাফ বীচের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। টেকনাফ বীচে যাবার পথে ধুলা-বালিতে পুরো মাখামাখি হয়ে যাচ্ছিলাম সবাই, মনে মনে নিজেকে নিজে গালমন্দ করছিলাম- বাসার পাশেই পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, হেসে-খেলে বড়ই হইলাম সৈকতে…আর আমি কিনা এতদূর চলে আসছি শুধু বীচ দেখার জন্যে। 

বেশ ক্ষাণিক্ষণ পর আমরা টেকনাফ সমুদ্র সৈকতে এসে পৌঁছলাম, এই বীচটা সত্যিই অন্যরকম। দূরের নীল জলরাশি, আশেপাশে নেই কোন জনমানুষের কোলাহল, সাগরের ঢেউয়ের  সাথে শোঁ শোঁ বাতাস আর সৈকতে রাখা রঞ-বেরঙের জেলেনৌকা…সত্যিই মনঃমুগ্ধকর। কক্সবাজার সৈকত এর চেয়ে আমার এই টেকনাফ সৈকত বেশি ভাল লেগে গেল শুধুমাত্র এর শান্ত পরিবেশের নিমিত্তে। দীপ্তর মুখে তো মাইক্রোতে শোনা সেই গানগুলি লেগে আছে, কিছুক্ষণ পর পর একটা একটা গান ধরে আর আমরা সবাই অট্টহাসি তে ফেটে পড়ি। হাসি-আড্ডার পাশাপাশি এদিক ওদিক ঘুরেফিরে আমরা অসংখ্য ছবি-সেলফি তুললাম। ফেরার সময় হলে পরে আরেকখানা অটো নিয়ে শুটকি বাজারে গেলাম, বার্মিচ আচার নিলাম এর আগের বাজার থেকে। শুটকির বাজার থেকে যে যার মতো করে শুটকি কিনে নিল, এই শুটকির স্বাধ সত্যিই অনন্য ছিল। আসার পথে নাফ নদীর পাড়ে নির্মিতব্য একখানা ব্রিজ থেকে ঘুরে এলাম, ওপারে মিয়ানমারের আরাকান আর এপারে বাংলাদেশের টেকনাফ। নাফ নদী বয়ে চলেছে দুটি দেশের সীমারেখা হয়ে।

বিকেলের দিকে কক্সবাজারের বাসে উঠে পড়লাম আমরা আর সন্ধ্যার কিছু আগেই পৌঁছলাম। এখন আর কটেজে ফেরার তাড়া নেই, গন্তব্য চট্রগ্রাম। কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে বাসে উঠে পড়লাম সবাই। দুটো দিন কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া বেশ ভালোই কাটল আমাদের মতো করে। আবার নিত্যদিনের ব্যাস্ততায় ফিরে যাওয়া, আবার শহুরে জীবনের ব্যস্ত কোলাহলে ডুব দেয়া।

<<<<আগের পর্ব     পরের পর্ব>>>>


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...