মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ২৫

 

প্যাকেজ শব্দটার সাথে প্রথম পরিচিতি সেই ছোটবেলায়, বিয়ে কিংবা গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে একটা টিম আসত…এরা বিভিন্ন রকম হাস্যরসাত্মক কর্মকান্ড করতো, এদেরকেই বলা হতো প্যাকেজ। আর আমাদের আশে পাশের কারো নিত্যনৈর্মিত্তিক কার্যকলাপ যদি এমন হাস্যরসের জন্ম দিতো তবে তার কর্মকান্ড কে-ও প্যাকেজ নাম দেয়া হতো। ইংরেজিতে আবার প্যাকেজ বলতে বোঝায় একসাথে পুরো একটা সিস্টেম বা ব্যাবস্থা।

নভেম্বর মাস আর ডিসেম্বরের বেশ কটা দিন চলে গেছে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষায়। পরীক্ষা কথা অবশ্য না বললেই চলছে, এই ফাইনাল পরীক্ষার সময় একটু জমিয়ে লেখাপড়া করেছিলাম কিনা তাই বইয়ের পাতা, লেকচার শীট আর নোট ছাড়া চোখের সামনে কিছুই ভেসে উঠছে না। শেষ পরীক্ষায় দিনেই আমরা কয়েকজন আড্ডা দিচ্ছিলাম এই ছুটিতে একটা ট্যুরের সাম্ভাব্যতা নিয়ে আর এই আলোচনাতেই “প্যাকেজ” শব্দটার সূত্রপাত যার রেশ ছিল পুরো ট্যুর জুড়ে।

-কক্সবাজার চল, ওখানে আমার বড় ভাইয়ের বন্ধুর কটেজ আছে।

-না না, সিলেট যাই চল। ওখানে আমার বন্ধুর মেসে উঠা যাবে।

-সিলেট গেলে বাজেট বেশি পড়বে, কক্সবাজারে দু-তিনদিন থেকে চলে আসব। এই ধর দু-এক হাজার, সবকিছু একটা প্যাকেজের ভিতর হয়ে যাবে।

-আচ্ছা, ঠিকাছে। বাকিরা কি বলে দেখ।

ওয়ারিফের সাথে আলোচনা হচ্ছিল কোথায় ট্যুর দেয়া যায় এই নিয়ে। এরই মধ্যে ওয়ারিফ বাকিদের সাথে কথা বলে ঠিক করল কক্সবাজারই ট্রিপ হবে। বাকিদের মধ্যে ছিল রবিন, তানভীর আর দীপ্ত। ছোটখাটো গ্রুপ করে গেলেই ঝামেলা কম হবে এই ছিল আমাদের পরিকল্পনা। এর আগেও অবশ্য রাশেদ ক্লাসের সবাই মিলে আশেপাশে কোথাও ট্যুর দেয়ার জন্যে বারবার বলে আসছিল। কিন্তু ওই, মানুষ বেশি তো...এক এক জনের এক এক রকম সমস্যা। আর এসবে বিরক্ত হয়েই আমাদের পাঁচ জনের ছোট্ট এই “প্যাকেজ টিম”।    

পরিকল্পনামতো ডিসেম্বরের হালকা কুয়াশাচ্ছন্ন কোন এক সকালে আমরা চারজন একত্রিত হলাম অলঙ্কার বাস স্টেশনে, আরেকজন টিম মেম্বার দীপ্ত উঠবে নতুন ব্রীজ থেকে। স্টেশনের পাশের একটা টঙ থেকেই পরটা-ডিম ভাজি আর চা দিয়ে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। একটু পরই কক্সবাজারের বাস ছেড়ে দেবে, তাড়াহুড়া করে তাই উঠে পড়লাম বাসে। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত আমাদের এই কক্সবাজার, এর আগে কখনো যাওয়া হয়নি…সেবারই বন্ধুদের সাথে প্রথমবার।

ভোর সাড়ে ছটায় বাস ছেড়ে দিল, চেনা শহরের রাস্তা ধরে সাঁই সাঁই করে বাস ছুটে চলছে আমার পরিচিত গণ্ডির সীমানা ছাড়াতে। এর আগেও অবশ্য চট্রগ্রাম ছেড়েছি বেশ কবার, কিন্তু প্রত্যেক বারই কোন না কোন কাজের উদ্দেশ্যে। এবার পুরোপুরি চিন্তামুক্ত আর স্বাধীন প্রাণ, একটাই উদ্দেশ্য বন্ধুদের নিয়ে ক’টা দিন সাগর সৈকতের সান্যিধ্যে কাটানো আর নিজেদের মতো করে ঘুরে বেড়ানো। এসব কিছু ভাবতে ভাবতেই বাস নতুন ব্রীজ চলে এলো, উঠে পড়ল আমাদের আরেক সহযাত্রী দীপ্ত। দীপ্ত এসে আসন গ্রহণ করতে না করতেই আমাদের “প্যাকেজ” টিম এক অন্য মাত্রায় রূপ নিল। আমাদের হইহুল্লোরে আগ্রহী হয়ে পুরো বাসভর্তি লোকজন আমাদের দিকে উঁকি দিয়ে দেখছিল। আমাদের আসনগুলোও পড়েছিল বাসের একেবারে মাঝামাঝি, বন্ধুরা সব একত্রিত হয়ে যেন ক্যাম্পাসের আড্ডা জমে উঠলো চলন্ত এই বাসেই। এরই মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার জন্যে সকলের মনযোগ আকর্ষণ করলো আমাদের ম্যানেজার ওয়ারিফ।

-আচ্ছা, এখন কথা হচ্ছে আমাদের এই ট্যুরটা হচ্ছে একটা প্যাকেজ। মানে নিজেরা নিজেদের টাকা একসাথে করে ওখান থেকে সব খরচ করব। সবাই আপাতত দুই হাজার টাকা করে দিয়ে দে আমাকে। এইখান থেকে সব খরচ হবে, ট্যুর শেষে বাঁচলে ফেরত, আর এক্সট্রা লাগলে আবার নেয়া যাবে।

-হ্যাঁ, সিস্টেম টা ঠিক… কিন্তু রবিন আর দীপ্ত তোরা তো পোন্দে-মুখে বিড়ি টানে। ওদের বিড়ির টাকা এই প্যাকেজ থেকে খরচ করতে পারবি না।

-আচ্ছা ঠিকাছে যা, নিজের পকেটের টিয়া দি খাইয়ুম। তুই টেনশন ন গরিছ। - দীপ্ত আর রবিন আমাকে আশ্বস্ত করল।

বোয়ালখালি, পটিয়া, চন্দনাইশ , সাতকানিয়া … প্রায় এক ঘন্টার কিছু বেশি সময় ধরে বাস চলছিল। চলা না বলে একে টানা বললেই বোধ হয় মানায় বেশ, Hino AK1j ইঞ্জিনের সাঁই সাঁই গর্জন আর একের পর এক ওটি(ওভারটেক) এর ফিল নিতে নিতে লোহাগড়ার দিয়ে ছুটে চলছিলাম আমরা। ইতোমধ্যেই দীপ্ত আর রবিন বিড়ি ফুঁকার জন্যে প্যানপ্যান করা শুরু করছে, কবে যাত্রা বিরতি দিবে…আর নেমে বিড়ি ফুকবে। ওয়ারিফ আমাদের আশ্বস্ত করলো লোহাগড়া গিয়েই বাস যাত্রা বিরতি দেবে। আরো মিনিট বিশেক চলার পর একটা রেস্টুরেন্ট এর সামনে এসে বাস যাত্রা বিরতি দিলো, যথারীতি পাগলা দুইটা নেমে পড়ল ধোঁয়া আর জল উৎগীরণের তাগিদে।

যাত্রা বিরতি শেষে আবারো বাস ছুটে চলল কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। ওয়ারিফের বাড়ি লোহাগাড়া, এই লোহাগাড়া কেন…কিভাবেই বা নাম হলো এই লোহা গাড়াগাড়ির, এই নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ তর্ক চলল আমাদের মাঝে। এরপর ক্ষাণিক বাদেই ওয়ারিফ চেঁচিয়ে বলল

-আমার লোহাগাড়া শেষ, এইবার শাওনের চকরিয়া।

-কোন শাওন? ক্লাসে দুজন শাওন ছিল বিধায় ওয়ারিফকে প্রশ্ন করলাম।

-আরে CR শাওন।

-ও আচ্ছা।

এভাবে মজা করতে করতে আমরা প্রায় তিনঘন্টা বাসজার্নি শেষে কক্সবাজার সদর এসে পৌছালাম। কোথায় নামব, কোথায় উঠব কিছুই জানিনা…সব আমাদের প্যাকেজ ম্যানেজার ওয়ারিফের হাতে।  বাসের সুপারভাইজার হাঁকডাক করছিল “কলাতলী পয়েন্ট যারা যারা নামবেন সামনে চলে আসেন”। দেখলাম ওয়ারিফের কোন ভ্রুক্ষেপ নাই, তাই আমিও চুপ করে রইলাম। আবার কিছুক্ষণ পর সুপারভাইজার বলল “সুগন্ধা পয়েন্ট” এবার আমি আর চুপচাপ থাকতে পারলাম না।

-কিরে ওয়ারিফ, এখানে এগুলা কিসের পয়েন্ট। এরকম কয়টা পয়েন্ট আছে সামনে? আমাদের পয়েন্ট কত?

-দাঁড়া দাঁড়া। সামনেই নামি যাব। ব্যাগ ট্যাগ গুছাই নে।

লাবনী পয়েন্ট আসতেই আমরা সবাই ওয়ারিফের পিছু পিছু নেমে পড়লাম, এরপর কেবলই হাঁটা আর হাঁটা। ওয়ারিফ পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে কাকে যেন ফোন দিচ্ছিল, খানিকটা চিন্তিত দেখাচ্ছিল ওকে।

-কিরে কি হইছে তোর? তানভীর ওয়ারিফকে প্রশ্ন করল।

-আরে বড় ভাই ওর বন্ধুর কটেজের নাম্বার দিছিল, কল দিতেছি ধরতেছে না।

-তাহলে এখন কি হবে?

-দেখি না আরো কিছুক্ষণ চেষ্টা করে, আর নাহয় অন্য একটা কটেজে উঠব আরকি।

-আচ্ছা, চল।

অনেক্ষণ এদিক-ওদিক হাটাহাটির পর অবশেষে কটেজের পরিচালক আমাদের নিতে আসলেন। উনার পিছু পিছু গিয়ে আমরা চেক ইন করলাম আর আমাদের রুম বুঝে নিলাম। দুই বেড এর রুম…মোটামুটি বড়ই আছে, পাঁচ জনের জন্যে খারাপ না। সামনের বারান্দাটা বেশ সুন্দর। একজন একজন করে গোসল সেরে নিচ্ছিলাম, এরপর একটু বিশ্রাম নিয়ে দুপুরের খাবার খেতে বেরোব। একেবারে বিকেলের দিকেই বীচে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিলো সবাই। কিন্তু আমার ইচ্ছে করছিল বীচে গিয়েই গোসলটা সেরে আসি, সকলের সাথে মানিয়ে চলতে গিয়ে নিজের ইচ্ছেটাকে দমিয়ে রাখতে হল।

ওয়াশরুম থেকে বেরোতেই দেখি পুরো রুম ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। প্রথমে ভেবেছিলাম আগুন লেগেছে, পরে দেখি দুই খাটাশ রুমের দরজা জানালা বন্ধ রেখে বিছানায় শুয়ে শুয়ে বিড়ি টানছে। মনে মনে যে ভয়টা পাচ্ছিলাম, এদের জ্বালায় রাতে ঘুমোতেই হয়ত পারব না। রাগে ছাইপাশ বকতে বকতে তাড়াতাড়ি দরজা-জানালা খুলে দিয়ে বাইরে গেলাম ওয়ারিফ আর তানভীরকে খুঁজতে, এরা দুজন পরিচালকের সাথে আশপাশটা ঘুরে দেখছে আর সব নিয়ম-কানুন বুঝে নিচ্ছে। ওদের সাথে আশেপাশে ঘুরে এসে সবাই মিলে চললাম দুপুরের খাবার খেতে। প্যাকেজ ম্যানেজার যে রকম আয়োজন করছিল তাতেই সবার সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছিল, অবশ্য সবার মতামত নিয়েই সবকিছু হচ্ছিল। ভালমন্দ দুপুরের খাবার খেয়ে চায়ের দোকান খোঁজা শুরু করলাম, টিমের সব কয়টার চায়ের নেশা প্রচুর। আর তাই কালক্ষেপণ না করে খুঁজে খুঁজে টঙের দোকানের চা খেয়ে কটেজে ফিরলাম।

দুপুরের হালকা ঘুমের পর ভ্রমণ ক্লান্তি একেবারেই কেটে গেল, সবাই মিলে এবার বিচে যাবার পালা। বিকেলটা আমাদের মন্দ কাটল না, যেখানেই যাচ্ছি সেখানেই প্যাকেজ আর প্যাকেজ। লাবনী বীচের আশপাশটা ঘুরে আর সাগরের উন্মত্ত জলরাশির সান্যিধ্য নিতে নিতেই সন্ধ্যে নেমে এলো সৈকতে। কটেজে গিয়ে গোসল করে নিলাম, প্যান্টের পকেটে পকেটে বালি ঢুকে গেছে। সন্ধ্যেয় আবারো সবাই মিলে বেরিয়ে বীচের রাতের পরিবেশ উপভোগ করছিলাম। ঝিনুক মার্কেট, কাকড়া-গলদা চিংড়ি ভাজা, আলোর রোশনাই, গানের আসর কিংবা সাগর সৈকতের শোঁ শোঁ বাতাস… যা দেখছি আর উপভোগ করছি তাতেই প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছিল। রাতে খেয়েদেয়ে কটেজে ফিরে আমরা সবাই মিলে একটা মজার পরিকল্পনা করলাম। অপারেশন “প্যাকেজ ফান”। মানে অপরিচিত নাম্বার থেকে বন্ধুদের কল দিয়ে দিয়ে সবাই মিলে মজা নেয়া।

<<<<আগের পর্ব    পরের পর্ব>>>> 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...