ভ্যাট বিরোধী আন্দোলনে বিজয়ের রেশ বেশ ক’টা দিন ছিল সবার মুখে মুখে। সময় গড়াতে না গড়াতেই আবারো নিত্যদিনকার ব্যাস্ততায় সকলেই ব্যস্ত হয়ে পড়ি। এদিকে কদিন ধরে মাথা ব্যাথাটা খুব বেড়েছে, মাথার একপাশটা এমন ব্যাথা করে ইচ্ছে করে ঐ পাশটা কেটে ফেলি। মাইগ্রেনের ব্যাথা হবে হয়তো, কপালের একপাশে শিরা-উপশিরাগুলো চেপে ধরলে হালকা প্রশান্তি মেলে, ছেড়ে দিলে আবার সেই আগের মতো। বরাবরের মতোই কাপের পর কাপ চা খেতে খেতে যাচ্ছেতাই অবস্থা, আম্মু চা বানাতে বানাতে বিরক্ত হয়ে বললেন…
-“কাল গিয়ে ডাক্তার দেখা, সকাল বিকাল দুই কাপ ছাড়া আর চা বানাইতে পারব না। নিজে বানাই নিজে খা”
-“ও আচ্ছা, চা বানাইতেই তোমার যতো বিরক্তি, থাক আর চা বানাইতে হবে না। আমি বানাইলে আরো কড়া করে বানাইতে পারি।”
সকাল সকাল গেলুম চট্রগ্রাম মেডিকেলের মেডিসিন বহির্বিভাগ। দশ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে সিরিয়াল নিয়ে অপেক্ষা করছি, কখন ডাক পড়বে। কয়েকজন যেতে না যেতেই আমার ডাক পড়ল, ডান হাতটা মাথার একপাশে চেপে ধরে ডাক্তারের রুমে ঢুকলাম।
-বসেন, কি সমস্যা?
-মাথাব্যাথা, এতোটাই ব্যাথা যে কিছুতেই কমছে না। মাথার একপাশটা পুরো কেটে ফেলতে ইচ্ছে করছে।
-ক’দিন ধরে মাথাব্যাথা?
-এইতো, দু-তিনদিন।
-কোন ওষুধ খাইছিলেন?
-প্রথম দুদিন কোন ওষুধ খাই নি। গতকাল একটা সেরিডন খেলাম, তাও যাচ্ছে না।
-ওষুধ লিখে দিচ্ছি, দিনে দুটো করে তিনদিন খাবেন, চলে যাবে ইনশা-আল্লাহ।
আমি অবশ্য একটা ওষুধেই সন্তুষ্ঠ হচ্ছিলাম না। না পারতে প্রেসকিপশন হাতে নিয়ে বেরোতে বেরোতে মনে মনে ডাক্তারকে গালমন্দ করছিলাম। বাইরে মেডিকেল শপ থেকে ওষুধ নিয়ে ক্যাম্পাসে চলে এলাম। আজকের প্রথম ক্লাসটাই ইকোনোমিক্স, রাশেদের প্ররোচনায় পড়ে দু-একখানা কোর্স অতিরিক্ত নেয়ার ফল যেমনটা হয় আরকি। ইমিডিয়েট সিনিয়রদের সাথে ক্লাস করাটা তেমন সুখকর নয়। যদিও আমরা দুজন এমন ভাব নিয়ে ক্লাসে ঢুকতাম আর রিকোর্স নেয়া ভাইদের সাথে গিয়ে বসতাম, যেন আমরাও ওদের সিনিয়র। আন্দোলনে পড়ে বেশ কিছু ক্লাস পিছিয়ে পড়েছি আমরা, তার উপর ১০-১৫ জনের ছোট্ট একটা ক্লাস। বলতে না বলতেই ম্যাডামের প্রবেশ…
-“Good Morning, কেমন আছেন আপনারা সবাই? আলাউদ্দিন সাহেব, কি খবর আপনার”
-“জ্বি ম্যাম, ভাল। আপনি কেমন আছেন?”
-“আমিতো আছি ভালই। তা মিছিল কেমন করলেন আপনারা?”
-“সেরা ম্যাম, সেরা।”
-“এবার একটু লেখাপড়ায় মন দেন, আগামী সপ্তাহ থেকেই তো মিডটার্ম।”
অর্থনীতির এই ম্যামটা খুব মজার মানুষ, ভার্সিটির ইকোনোমিক্স ডিপার্টমেন্টের ফ্যাকাল্টি। সপ্তাহে দুটো ক্লাস নিতে আসেন আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টি তে। যাদের সাথে ক্লাস করছি তারা থার্ড সেমিস্টার, ফল সেশনের ক্লাস বলে হাতে গোনা মাত্র জনা বিশেক ছাত্রছাত্রী। এদের শ্রেণী প্রতিনিধি হচ্ছে আলাউদ্দিন, কেউ কেউ আবার রোমেল নামেও ডাকে। খুব হাসিখুশি আর প্রাণবন্ত এই আলাউদ্দিন ছেলেটা, প্রায় সময়ই পাঞ্জাবী পড়ে ক্লাসে আসে। প্রথম কয়েকদিন এদের সাথে একটু দুরত্ব থাকলেও পরবর্তীতে অবশ্য সেটা অনেকটা কেটে যায়। বিশেষ করে আলমগীর ভাই আর গাজী ভাইকে তো ভুলতেই পারিনা, শেষ বর্ষের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুরে এদেরই যে রুমমেট ছিলাম। সে যাই হোক, পেছনের দিকে বসে ক্লাস করতে করতেই আরেক সিনিয়র ভাইয়ের পেছন থেকে ডাকাডাকি…
-এই তোমার থেকে কলম আছে?
-এই নেন ভাই।
-আচ্ছা, আগের ক্লাসে কি পড়াইছে দেখি তো খাতাটা।
-আমি তো তেমন একটা ক্লাস করি নাই ভাই, আলাউদ্দিন কে জিজ্ঞাস করে দেখেন।
পেছনের ভাইটি আর কেউ নয়, ক্যাম্পাসের পরিচিত মুখ “সাদ ভাই”। অনেক সিনিয়রদেরও সিনিয়র, পাশ করে বের হবার জন্যে রীতিমতো সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। কথায় আছে অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকিয়ে যায়, এমনিতেই সকাল থেকে মাথা ব্যাথা করছে তার মধ্যে এই সাদ ভাইয়ের পাল্লায় পড়ে ম্যামের চোখে পড়ে গেলাম।
-এই you, Stand Up.
মাথা নিচু করে উঠে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আমি, এরই মধ্যেই …
-আপনি না, আপনার পিছের জন। মাথা নিচু করে আছেন কেন আপনি?
-ও, ম্যাম আমি? না মানে…আমি এমনে লিখতেছিলাম যে।
-কই দেখান তো আপনার খাতা।
-না মানে খাতা নাই, পৃষ্টায় লিখতেছিলাম…পৃষ্ঠাটা নিচে পড়ে গেছে, ম্যাম।
-দেখি বলেন তো কি পড়াচ্ছিলাম?
একগাল হাসি দিয়ে সাদ ভাই বলার চেষ্টা করছিলেন আর আশে পাশে সামনে যাকে পাচ্ছিলেন খোঁচাচ্ছিলেন যাতে আমরা তাকে টপিক্সটা বলে দেই। আমি ফিসফিস করে বললাম “Monopoly Market” আর সাদ ভাই কি না কি শুনলেন , ফট করে উত্তর দিয়ে বসলেন।
-“মনপুরা মার্কেট পড়াচ্ছিলেন ম্যাডাম।“
সাদ ভাইয়ের উত্তর শুনে পুরো ক্লাস অট্টহাসি-তে ভরে গেল। ম্যামসহ ক্লাসের প্রায় সবাই মিলে আমরা বেশ কিছুক্ষণ হাসলাম, মজার ব্যাপার হচ্ছে সাদ ভাই নিজেও হাসছিলেন। সাদ ভাইয়ের সরলপনা দেখে ম্যাম আর বকতে পারলেন না, মুখে হাসি নিয়েই বোর্ডে মিডের সিলেবাস লিখতে থাকলেন।
সেদিনের মতো ক্লাস শেষ করে সাত তলা থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে নামলাম দোতলায়। রাশেদ আর আমি মিলে মুন্না স্যারের সাথে পরামর্শ করে ঠিক করেছি রোবোটিক্স ক্লাব থেকে এখন একটা ওয়ার্কশপ আয়োজন করলে ভালো হয়। এই বিষয়টা ক্লাসে জানিয়ে বেশ ভালো সাড়া পেয়েছিও বটে, প্রায় জনা ত্রিশেক এর মতো ছাত্রছাত্রী কর্মশালায় রেজিস্ট্রেশন করেছে। রেজিস্ট্রেশন ফি থাকায় প্রথম দিকে আমাদের চিন্তা হচ্ছিল আদৌ ছেলেপিলে রেজিস্ট্রেশন করবে কিনা। মোটামুটি হাজার তিনেকের মতো টাকা জমা পড়েছে যার পুরোটাই গচ্ছিত রাখলাম মিশনের কাছে।
>>>>>>>>>>>>>>>
আজ বৃহস্পতিবার, ক্লাস নাই। ডাক্তারের ওষুধ তিনদিন খেয়েই মাথাব্যাথা পুরোপুরি সেরে গেছে, আলহামদুলিল্লাহ। আর তাই আম্মু সকাল থেকেই সমানে ববকি করছেন। বিদ্যুতের বিল নাকি গত কয়েক মাস ধরে অনেক বেশি বেশি দিচ্ছে, আর আমি ইলেকট্রিক্যাল এর স্টুডেন্ট হয়েও বাসায় পড়ে পড়ে ঘুমুচ্ছি। এই ছিল বকাবকির কারণ। পরটা আর চা কোনরকমে গিলে উঠেই আগের পাচ-ছয় মাসের বিদ্যুতের বিলের কাগজ সব খুঁজে বের করলাম। এরপর একটা হিসেব করে দেখলাম, আগে যেখানে প্রতি মাসে দেড়-দুশ ইউনিট করে বিল আসত গত দু-মাস ধরে সেখানে আসছে তিনশ ইউনিট করে। উঠে বিদ্যুতের মিটারের রিডিং চেক করলাম, মিটারের বর্তমান রিডিং এর চেয়ে বিলের কাগজের রিডিং অনেক এগিয়ে। আজব তো ! এ কি করে সম্ভব? তৎক্ষণাৎ মিটারের রিডিং সমেত একটা ছবি তুলে নিলাম আর মিটারের সব কাগজ গুছিয়ে নিলাম, আজ এর একটা বিহীত করতেই হবে।
বন্দরটিলা ওয়ার্ড অফিসের বিপরীতের রাস্তা ধরে একদম শেষে নেভীর ঘাঁটির সাথেই স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ। আম্মুর কাছে শুনেছি এই অফিস নাকি আগে প্রধান সড়কের পাশে টিসিবি ভবনের সাথেই ছিল। লাইনের কোন জটিলতায় টানা দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ না এলে পরে লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে এই বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করত। এখন এরা নেভীর সুরক্ষায় এসে গেছে, তাই চাইলেও কেউ কিচ্ছুটি বলতে পারে না আর ভেতরে বসে বসে ঘোর অনিয়ম ঘটিয়ে যাচ্ছে। খবর নিয়ে জানতে পেরেছি আমাদের পতেঙ্গা-টু ডিস্ট্রিবিউশন লাইনের দায়িত্বে আছেন সাব-এসিসট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার বিদ্যুৎ বড়ুয়া।
-ভাই, আপনি কি বিদ্যুৎ ?
-হ্যাঁ, আমি বিদ্যুৎ। হাসতেছেন কেন, মানুষের নাম কি বিদ্যুৎ হইতে পারে না?
-না হইতে তো পারে। আমি চিন্তা করতেছি আপনি সিংগেল ফেজ না ত্রি ফেজ ?
-মানে? কি বলতে চান আপনি?
-পতেঙ্গা-টু ডিস্ট্রিবিউশন লাইনের আমরা, গত দুমাস ধরে বিল অনেক বেশি বেশি আসছে।
-আচ্ছা, বসেন। আপনার বাসায় কি কি চালান? নতুন টিভি, ফ্রিজ, মোটর আনছেন মনে হয়?
-আরেহ ভাই সব লোড আগের মতোই। টিভি ১৫০, ফ্যান ৩ টা ৮০ ওয়াট করে, ফ্রিজ ২০০ ওয়াট আর এনার্জি বাল্ব চারটা মিলে সর্বোচ্চ ১২০ ওয়াট ।
-মোটর মোটর? মোটর কত বিদ্যুৎ খায় জানেন? পানির মোটর কয় ঘোড়া?
-ঘোড়া কই পাইলেন আবার ?
-আরেহ ঘোড়া বুঝলেন না, ঘোড়া মানে মোটর ক্ষেমতা আরকি?
-ও আচ্ছা, হর্স পাউয়ার এ-না বলবেন। মোটর 1HP, মানে ৭৪৬ ওয়াট।
-তো এবার হিসাব করেন, কতো আসে?
-আরে ভাই আমি ইলেকট্রিক্যাল এর স্টুডেন্ট, এইখানে হিসাব করতে আসি নাই।
-তো আমরা কি পড়ালেখা না করেই আসছি নাকি এখানে?
-সেকথা কবে বললাম? একটু মাথা ঠান্ডা করে ছবিটা দেখেন, ছবিতে মিটারের রিডিং আজকে তোলা ১১ হাজার সাতানব্বই, আর এই মাসের বিলের কাগজ দেখেন ১১ হাজার ছয়শ সাতানব্বই। আমার মিটার রিডিং না দেখেই বিল দিচ্ছেন আপনারা।
-ও আচ্ছা আচ্ছা, এটা না বলবেন।
-আপনি আমাকে বলতে দিলেন কই ? এখন কি করব ওইটা বলেন।
-নিচে গিয়ে বিলের ফটোকপি জমা দিয়ে আসেন, ঠিক হয়ে যাবে পরের মাস থেকে। চা খাবেন?
-আরেহ না না, আরেকবার আসলে খাব।
পাশে বসা আরেকজন বয়স্ক ভদ্রলোক আমাদের লক্ষ্য করে বললেন…
-বিদ্যুৎ, এখনো সিংগেল ফেজেই রয়ে গেলা, একটা ক্যাপাসিটর লাগাইয়া নাও…ডাবল ফেজটুকু যদিও হতে অন্তত পারো।
<<<<আগের পর্ব পরের পর্ব>>>>

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন