গ্রামোফোন রেকর্ড যা কিনা কলের গান নামেই পরিচিত, মাঝেমধ্যে এমন কিছু মানুষের সাথে সাক্ষাত হয়ে যায় যাদেরকে সেই গ্রামোফোনের সাথে তুলনা করলে মোটেই ভুল হবেনা। অবশ্য সব গ্রামোফোনই কিন্তু বিরক্তিকর নয়, কিছু কিছু গ্রামোফোন আপনাকে শিল্পীদের গান শোনাবে আর কিছু গ্রামোফোন তার নিজের ফিচার-এপ্লিকেশন বর্ণনা করবে, সেই ফিচার-এপ্লিকেশনগুলো শুনে শুনে আপনি অবাক হবেন আর মনে মনে বলবেন- “Wow, how genus Edison was who invented this machine”
বাগদাদ ইলেকট্রনিক্স মার্কেটের বাইরে রাস্তার পাশের সিঁড়িতে বসে কেউ একজন খুব মনযোগ দিয়ে মোবাইল টিপছে। ছাই রঙা টিশার্ট, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, লিকলিকে শরীর, রোদে পুড়ে পুড়ে চেহারাটা কালচে-বাদামী হয়ে গেছে। পরিচিত মনে হওয়াতে কাছে যেতেই চিনতে পারলাম, আরেও এ-তো ওই ছেলেটা কি নাম যেন- রাজা না রাজু ? এই আমার এক সমস্যা, মানুষের চেহারা মনে থাকে কিন্তু নাম মনে থাকেনা। পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফেসবুকে হালকা খোঁজাখোজি করেই পেয়ে গেলাম, এইতো “রাজিত”। ক্যাম্পাসে এই রাজিত শব্দটা প্রায় সবার মুখে মুখে, কারণ ড্রোন নিয়ে ওর সবচেয়ে বেশি মাতামাতি। এইতো কদিন আগেই ওদের একটি গ্রুপ “টিম অন্তহীন” এর F-22 Raptor প্লেন ডিজাইন করে উড়ানোর ভিডিও দেখলাম। কাছে যেতেই দেখি মোবাইলে গেমস খেলছে। কি গেম ওটা পরে অবশ্য জানতে পেরেছিলাম Clash of Clans, যেটা কিনা COC নামেই বেশি পরিচিত ছিল। বেচারাকে আর ডিস্টার্ব না করে আমি মার্কেটের ভেতরেই চলে গেলাম, কিন্তু ভেতরে গিয়ে বেশ খানিক্ষণ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স পণ্য খুঁজতে খুঁজতেই ওর সামনাসামনি পড়ে গেলাম।
-রাজিত ভাই, কি অবস্থা?
-এইতো ভালো, তোমাকে চিনলাম না।
-আমি সানি, সেকেন্ড সেমিস্টার ভাই।
-আচ্ছা, তুমি IUT তে গেছ যে ওই টিমের নাকি?
-জ্বি ভাই, আপনাদের F-22 Raptor এর ভিডিও দেখলাম, জোস হইছে ভাই।
-হ্যাঁ, আর বইলো না। যা প্যারা খাইছি, ঠিকঠাক উঠছিল না কোনমতেই।
-হ্যাঁ, দেখলাম। ইন্সট্রুমেন্ট তো অনেক খরচ না ভাই?
-আরে Passion থাকলে টাকা-পয়সা কোন ব্যাপার না। যেখান থেকেই হোক জোগাড় হয়ে যাবে, অবশ্য আমাদের কিছুটা স্পন্সর করছিল মুন্না স্যার।
-ভাই আমাদের কিছু শেখান না।
-আরেহ, এগুলা তো সব ইন্টারনেট এ পাওয়া যায়, বাসায় কি ওয়াইফাই নাই?
এরপর থেকে গ্রামোফোনের সেই রেকর্ড শুরু, এই রেকর্ড আমি বারে বারে শুনে গেছি যতবারই উনার সাথে দেখা হইছে। প্রথম প্রথম একটু বিরক্ত লাগতো, কিন্তু পরে গিয়ে আবিষ্কার করলাম উনার কথাবার্তার টোন-ফ্রিকোয়েন্সি একই থাকলেও কথাগুলো তথ্যবহুল হয়। নতুন কিছু না কিছু টেকনোলজি বা ট্রিক্স শেখা যায়। সে যাই হোক, উনার সাথে কথা বলে কিছুটা হতাশ আবার মোটিভেটেডও হলাম বটে। হতাশ হওয়ার কারণ ছিল আমার বাসায় ওয়াইফাই নাই, আর মোটিভেটেড হওয়াটা হচ্ছে উনার এক্সপ্রেশন দেখে। আজকের দিনটাই যে শুরু হয়েছিল মুন্না স্যারের ঝাড়ি দিয়ে, সে দিক দিয়ে অবশ্য দিনশেষে এই মিশ্র অনুভূতিটাই যথেষ্ঠ।
সকালেই মুন্না স্যার অফিসে আমাকে আর রাশেদকে ডেকেছিলেন রোবোটিক্স ক্লাবের ওয়ার্কশপে রেজিস্ট্রেশন করা ছাত্রছাত্রীদের আইডি কার্ড প্রিন্ট করে আনার জন্যে। স্যার নিজেই ডিজাইন করে রেখেছিলেন আইডি কার্ড, সফটওয়্যার টা দেখলাম…নাম “ইলাস্ট্রেটর”…মনে মনে সংকল্প করলাম, এই সফটওয়্যার এর কাজ শিখতে হবে। একটা পেনড্রাইভ এ করে স্যার সফট কপি দিলেন আমাকে আর বললেন-“জিইসি মোড় যাবা, ফুজি স্টুডিও। B4 সাইজ বলবা, ওরা ঠিকঠাক প্রিন্ট করে লেমিনেটিং করে দেবে।”
স্যারের কাছ থেকে পেনড্রাইভ নিয়ে আর আমি আর রাশেদ জিইসি মোড় এর দিকে রওনা দিলাম। জিইসি যেতে যেতেই মুন্না স্যার কি বলেছিল সব ভুলে গেলাম, সাথে থাকা রাশেদকে জিজ্ঞাস করলাম…
-“বন্ধু, স্যার কোত্থেকে প্রিন্ট করতে বলছিল যেন?”
-“সেন্ট্রাল প্লাজার নিচে দেখ, কম্পিউটারের দোকান আছে। ওখান থেকে মানাই নিয়ে গেলেই হবে”
-“আচ্ছা, ঠিক আছে চল।”
গেলাম সেন্ট্রাল প্লাজার নিচের কিছু স্টেশনারির দোকানে। একটা কম্পিউটারের দোকান দেখে ঢুকে পড়লাম দুজন, অপারেটরকে পেনড্রাইভ দিতেই সফট কপি চেক করে ৪০ পিছ আইডি কার্ডের জন্যে ৫০০ টাকা চাইলো, দরদাম করে আমরা ৩০০ তে নামালাম। চার-পাঁচ পিছ প্রিন্ট হতে না হতেই মুন্না স্যারের ফোন…
-“কি অবস্থা তোমাদের? প্রিন্ট করছ?”
-“স্যার, একটা কম্পিউটার এর দোকানে আসছি। চল্লিশ পিছ তিনশত টাকা।”
-“এ, তোদেরকে ওখানে কে যাইতে বলছে? প্রিন্ট কিসে দিছস, ফটো পেপারে?”
-“জি স্যার, একটা ফটো পেপারে তিনটা করে হচ্ছে।”
-“গাধা, কত করে পড়তেছে প্রতি পিছ ?”
-সাড়ে সাত টাকার মতো স্যার।
-আরে বোকা, ফুজি স্টুডিও তে গেলে সাত টাকা দিয়ে প্রতি পিছ পাইতি। বন্ধ করতে বল প্রিন্ট, যেদ্দুর হইছে অইগুলার টাকা দিয়ে এখন বাইর হ।
ফোনের ওপাশ থেকে স্যারের বকাবকি শুনে ৬ খানা আইডি কার্ডের টাকা দিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এলাম। এরপর একটু হেঁটে সামনে যেতেই দেখলাম সবুজ সাইনবোর্ডে বড় বড় করে লেখা “Fuji Color Lab”, কিন্তু স্যারের সেই ফুজি স্টুডিও কোথায়? স্যারের ঝাড়ি খাবার পর এখন দুচোখে কেবল সরষে ফুল দেখছি। দোকানটা দু-তিনবার ঘুরে ফিরে দেখলাম, এরপর ভেতরে ঢুকে দোকানীকে জিজ্ঞেস করলাম-“ভাই, এটাই কি ফুজি স্টুডিও?”। দোকানীর হ্যাঁ শুনে কলজেতে পানি আসল, তাড়াতাড়ি পেনড্রাইভ বের করে বললাম B4 সাইজের কার্ড প্রিন্ট করবেন, লেমিনেটিং সহ দরদাম করলাম পনের টাকা করে প্রতি পিছ। এরপর দিয়ে চলে এলাম ক্যাম্পাসে, দু-ঘন্টা পর গিয়ে নিয়ে আসতে হবে।
ক্যাম্পাসে এসেই মুন্না স্যার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছিলাম, আইডি কার্ডগুলা হাতে হাতে পৌঁছে না দিলে পরে আরো কতো কথা শুনতে হয় আবার। এদিকে আবার ইকোনোমিক্স মিড এক্সাম থাকায় আমি আর রাশেদ ছুটলাম পাঁচ তলায়। গিয়ে দেখি সবাই পেছন দিক থেকে সুন্দরভাবে বসে গেছে, সামনে সারিটাই কেবল খালি। আমরা দুজন পাশের রুম থেকে এক্সট্রা চেয়ার নিয়ে এসে পিছনে গিয়ে দুরত্ব রেখে বসে পড়লাম। ম্যাম আসতে না আসতেই চোখ পড়ল আমাদের উপর-“পেছনে যারা আছো সামনে চলে এসো”। মনে অনেক দুঃখ নিয়ে আস্তে আস্তে সামনে এগুলাম, গিয়ে বসতেই পেছন থেকে সাদ ভাইকে ডেকে আমার এক চেয়ার পাশে বসিয়ে দিলেন। ডানপাশে রাশেদ, বাঁপাশে সাদ ভাই আর মাঝখানে আমি। কোনাকুনি পেছনে তাকালে অবশ্য গাজী ভাইয়ের খাতা দেখা যাচ্ছিল, নাই মামার থেকেও কানা মামা ভালো-মনে মনে নিজেকে এই ভরসা দিলাম।
এক্সাম শুরু হতে না হতেই সাদ ভাইয়ের ডাকাডাকি বেড়ে গেল-“অই, দেখা দেখা…কি লিখসস দেখা।” দুটো প্রশ্নের মধ্যে একটা প্রশ্নই কমন ছিল, চাহিদা রেখা … যোগান রেখা এইসব নিয়ে। অন্য প্রশ্নের কিছুটাও যদি এদিক ওদিক থেকে লিখে নিতে পারি তো হবে… এই চিন্তায় পেছনে তাকিয়ে গাজী ভাইয়ের খাতা দেখার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু উনার লেখার সাইজ যে ন্যানোস্কেলের তা জানা ছিল না। মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখলেও এই লেখা বোঝা যাবে না বোধ হয়, কি আজব পাবলিক ! এদিকে রাশেদও আমাকে সমানে ডাকছে-“বন্ধু দেখা দেখা।” পেছনে দেখতে গিয়ে ম্যামের বকাও খেলাম। শেষমেশ নিজে যা পারি তাই পুরোদমেই লিখা শুরু করলাম, প্লান ছিল যা পারব লিখে জাস্ট খাতা জমা দিয়ে বেরিয়ে যাব। তাড়াতাড়ি ১০ মার্কের আন্সার করে খাতা জমা দিয়ে বেরিয়ে এলাম… বিশের মধ্যে দশ পেলেও হবে, ফাইনালটা ভাল করে দেব ক্ষণ।
আমার এমন একগুঁয়েমি দেখে বন্ধু রাশেদ রাগে গিজগিজ করছিল, ম্যাম না থাকলে বোধ হয় মেরেই দিতো আমাকে…চলে আসার সময় তো বলেই বসল-“আধা পরাইন্নের ডুইল্লে কা গরর? এক্কানা দেখাইলে কি ক্ষতি হই যাইবু নে?”
-“মাথা ঠিক নাই বন্ধু, আইডি কার্ড গুলা স্যারের হাতে জমা দেয়ার আগ পর্যন্ত…”
এক্সাম শেষ করেই জিইসি গিয়ে আইডি কার্ডগুলো নিয়ে এলাম, আমি আর রাশেদ ভয়ে ভয়ে ঢুকলাম টিচার্স কমন রুমে…
-স্যার এইযে আইডি কার্ড গুলা।
-বাহ, সুন্দর হইছে তো। দেখছ…স্টুডিওর কাজ আর তোমার কম্পিউটার এর দোকানের কাজের তফাত?
-জি স্যার, মাথা নিচু করে রইলাম আমরা দুজন।
-টোটন স্যার, দেখেনতো কেমন হইছে…ভাল না?
-স্যার এই কার্ডগুলা কি করব…কম্পিউটার এর দোকানে যেগুলা অতিরিক্ত প্রিন্ট করে ফেলছি।
-গলায় ঝুলাই পুরা ক্যাম্পাস ঘোর।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন