রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ২১


-শাওন, আজকে পোলাপান কেমন হবে বলে মনে হচ্ছে?

-মাত্র তো সাড়ে ১০ টা বাজে, বেলা বাড়লে ওয়াসার মোড় পোলাপাইনে ভরে যাবে।

-মানুষও দিন দিন আমাদের অবরোধে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনকার যানজটেই আমরা হাঁপিয়ে যাই, এখন যারা অবরোধের কারণে আটকা পড়ে আছে তাদের অবস্থাটা চিন্তা কর।

-কিছু পেতে হলে একটু স্যাক্রিফাইস তো করতেই হবে। এরকম টানা অবরোধের কারণেই তো প্রশাসনযন্ত্রের উপর চাপ পড়ছে বিভিন্ন দিক থেকে।

-হ্যাঁ, তা অবশ্য ঠিক। ওদিকে দেখ তো, স্কুটি নিয়ে দাঁড়ানো ওই লোকটা কি যেন বলতে চাইছে।

-“বাবারা, তোমাদের দেখে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের কথা মনে পড়ে গেল। তখন আমি চিটাং ভার্সিটির ছাত্র ছিলাম, আমিও এরকম রাস্তায় নেমে মিছিল করছিলাম। আজকে আমি বের হইতাম না, একটু মেডিকেলে চেক-আপ ছিল তাই বের হওয়া”

-আপনি আমাদের সাথে আসেন আঙ্কেল, এই উনাকে জায়গা ছেড়ে দাও।

মুরব্বীকে আমরা কয়েকজন মিলে অবরোধ এলাকা থেকে বাইরে এগিয়ে দিলাম। যাবার পথে ভদ্রলোক আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন…

-“তোমরা তোমাদের দাবিতে অটল থাক, সফল তোমরা হবেই হবে”।

ক্লাস বর্জন আর সড়ক অবরোধ, এ যেন নিত্যদিনকার নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকালে ক্যাম্পাসে এসেই সবাই একত্রিত হয়ে মিছিল করতে করতে সড়ক অবরোধ করে আর দুপুর গড়িয়ে বিকেল পর্যন্ত চলে এই অবরোধ। মাঝে অবশ্য দু-একদিন ক্যাম্পাসে না এসেই সরাসরি অবরোধে যোগ দিয়েছি। সেই ১০ তারিখ শনিবার থেকে শুরু করে আজ ১৪ তারিখ বুধবার।

প্রতিদিন অবরোধ করতে করতে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকেও সুস্পষ্ট কোন ঘোষণা আসছিল না যাতে আমরা ঘরে ফিরে যেতে ভরসা পাই। ইতোমধ্যেই ঢাকায় কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দদের সাথে সরকারের একটি কমিটির বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে কিন্তু এখনো পর্যন্ত সুস্পষ্ট কোন ঘোষণা হয়নি। আজ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের থেকে ঘোষণা আসার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু আগের প্রেস ব্রিফিংগুলোতে যেভাবে ছাত্রছাত্রীদের হেয় করে কথা বলা হয়েছিল, তাই আমরা চুপ করে বসে না থেকে এখনো রাজপথে আন্দোলনে।

-জাহিদ, কি মনে হচ্ছে? আজকের আন্দোলন কতক্ষণ চলতে পারে?

-কিছুই তো বুঝতেছি না রে, জানিস গতকাল আমারে টিভিতে দেখাইছে।

-ওয়াও, তাই নাকি? কোন চ্যানেলে?

-সময় টিভিতে। গতকাল সাংবাদিক আসলো না, আমি কথা বলছিলাম ক্যামেরার সামনে।

-তা কি কি বললি?

-বলার কি শেষ আছে রে ভাই, কত কষ্ট কইরা ভার্সিটির টিউশন ফি জোগাড় করি…এরপর সংসার চালাই- এসব কিছু বলছি আরকি।

-যাক, ভালই করছিস।

সূর্য তখন মধ্যগগণে, দুপুর বারোটা কি একটা হবে। কাছেই থাকা একজন সংবাদকর্মী আমাদের উদ্দেশ্য করে বলছিলেন

-“আপনাদের দাবী তো সরকার মেনে নিয়েছে, আপনারা এখন কি অবরোধ তুলে নেবেন?”

-অবরোধ চলছে, চলবে। এ, কি বললেন ? দাবী মেনে নিছে ?

-হ্যাঁ, একটু আগেই মন্ত্রীসভার একটা বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন। আপনাদের নেতৃবৃন্দ থেকে কিছু বললে ভাল হয়, আমরা একটা ছোট ইন্টারভিউ নেব।

-চলেন ওদিকে, মুক্তা দিদি-শিমুল ভাই এর কাছে যাই।  

ঠিক তখনো বিশ্বাস হচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল এ বুঝি কোন চক্রান্ত হবে। আর তাই আমাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আমরা রাজপথেই অনড় ছিলাম। তাৎক্ষণিকভাবে তাই আমাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে বেশ কিছুক্ষণ সময় নেয়া হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই শিমুল ভাইয়ের কণ্ঠ ভেসে এলো মাইকে…

“ছাত্রসমাজ হারতে শেখেনি, আবারো রাজপথে ছাত্রজনতার বিজয় অর্জিত হয়েছে। আমাদের অবরোধ আমরা তুলে নিলাম আর এই ওয়াসা মোড় থেকে এখন আমরা বিজয় মিছিল করতে করতে দুই নাম্বার গেট পর্যন্ত যাবো। ধন্যবাদ সকল রাজপথের সহযোদ্ধাদের, ধন্যবাদ সকল পুলিশ ভাইদের, ধন্যবাদ সকল মিডিয়ার ভাই-বোনদের, ধন্যবাদ সকল সাধারণ জনগণদের।”

ঘোষণা শেষে ওয়াসার মোড় ছাত্রছাত্রীদের বিজয় ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল। রাজপথে থেকে এরকম একটা দেশব্যপী আন্দোলনের অংশ হতে পারব এবং শেষমেশ এভাবে আমাদেরই দাবী সরকার মেনে নেবে সত্যিই- খুশির আজ বাঁধ ভেঙ্গেছে। বন্ধুদের মধ্যে সামনে যে যাকেই পাচ্ছিল জড়িয়ে ধরছিল-এ এক অনন্য প্রাপ্তি।

আগের সব স্লোগান ভুলে গিয়ে মুখে মুখে এখন নতুন স্লোগান…

 “জিতেছে রে জিতেছে, ছাত্রসমাজ জিতেছে”

একসাথে সবাই বিজয় মিছিল করতে করতে আমরা দুই-নাম্বার গেটের দিকে যাচ্ছিলাম। চাইলেই এখান থেকে বাড়ির পথ ধরতে পারতাম, কিন্তু কেন জানিনা আরো শেষ দেখতে ইচ্ছে করছিল। ইচ্ছে করছিল এই যে ছাত্রজনতার এক অটুট বন্ধনের অংশ হতে পেরেছি, তা চির অম্লান থাকুক। বারে বারে অন্যায়ের প্রতিবাদে রুখে দাঁড়াক এই ছাত্রসমাজ।

মিছিলের ভেতর আমার একখানা জুতোর ফিতে ছিঁড়ে যায়, সেই জুতো হাতে নিয়ে বিজয় মিছিল করে গেলাম। এদিকে ওদিকে যে যেভাবে পারছিল সেলফি তুলছিল, এই মুহূর্ত যে ফ্রেমে বন্দী করে রাখার মতো। যদ্দুর মনে পড়ে কোন এক ফ্রেমে হয়তো আমিও ছিলাম শাওন,নোবেল,ওয়ারিফ আর রিয়াদের সাথে, কিন্তু কার মোবাইলে তোলা হয়েছিল আর মনে নাই।     

দুই নাম্বার গেট পৌঁছে মাঝের ট্রাফিক পুলিশ পয়েন্ট থেকে শিমুল ভাই সবার উদ্দেশ্যে কিছু বললেন। এই আন্দোলন আজকেই শেষ নয়, দেশের ক্রান্তিলগ্নে আর অন্যায়ের প্রতিবাদে বারে বারে এই আন্দোলন সংগঠিত হবে। ঘোষণা শেষ হবার পর-পরই আমরা শিমুল ভাই, মুক্তা দিদি ও অর্পন ভাই থেকে বিদায় নিয়ে প্রবর্তক আমাদের ক্যাম্পাসের দিকে গেলাম। শিক্ষকদের জন্যে মিষ্টি নিয়ে গেল আমাদের পক্ষ থেকে কয়েকজন, আমরা আমাদের মতো করে নাস্তা-পানি করে বিজয় উৎযাপন করলাম। বাড়ি ফেরার পথে ফেসবুক ঘাটতে ঘাটতেই চোখে পড়ল কোন এক বিদ্রোহী সহযোদ্ধার দু-চারটে লাইন…

বারে বারে মিছিলে যায় বিদ্রোহী প্রাণ,

বারে বারে চিৎকার করার আহ্বান।

শেষ হয়েও শুরু হয় আবার,

নেমে আসুক বিদ্রোহী নজরুল প্রতিবার। 

<<<<<আগের পর্ব      পরের পর্ব>>>>>

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...