বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ২৪

 

সেদিন অবশ্য গলায় আইডি কার্ড ঝুলিয়ে ক্যাম্পাস ঘুরতে হয়নি, ইলেকট্রনিক্স মার্কেট থেকে সরাসরি চলে গেলাম সিমেন্স হোস্টেলের “Unity Dreams” কোচিং এ। দোতলায় উঠে পরিচালকের রুমের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে দেখি বেশ সুদর্শন ফ্রেঞ্চ কাট শ্মশ্রুসুলভ এক যুবক খুব সাবলীলভাবে ক্লাস নিয়ে যাচ্ছে। কোচিং পরিচালকের কক্ষে ঢুকেই জিজ্ঞাস করলাম  ফ্রেঞ্চ কাট টিচার টা কে ? পরিচালক অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন, যেন তিনি কিস্তিমাত করে ফেলেছেন।
-কি বুঝলি? সেই হ্যান্ডসাম না? (পরিচালক আমার সমবয়সী হওয়ায় আমরা একরকম বন্ধুই ছিলাম)
-হ্যাঁ, ছেলেমেয়েরা তো দেখি হা করে লেকচার শুনছে।
-হুম, একাউন্টিং এর নতুন টিচার।
-ও আচ্ছা, আমি তাহলে আমার ক্লাস নিতে গেলাম।
টানা দুটো ক্লাস শেষ করে শিক্ষক রুমে গিয়ে দেখি সেই ফ্রেঞ্চ কাট দাঁড়ির যুবক, মুখে তার হাসি যেন লেগেই আছে। পরিচালক আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন।
-হ্যালো, আমি নিশাত।
-আমি সানি। কোথায় আছেন?
-চবি… IERT
-IERT মানে?
-এডুকেশন রিসার্স এন্ড ট্রেইনিং, আপনি?
-ও আচ্ছা। আমি ইইই তে পড়ছি একটা প্রাইভেট ভার্সিটি তে আছি।
-ইইই মানে তো ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক্স ?
-হ্যাঁ। 

নিশাতের সাথে সেদিনের পরিচয়ের পর ভেবেছিলাম হয়তোবা খুবই অহংকারী আর রাগী মানুষ হবে। কিন্তু ক্রমে ক্রমেই আবিষ্কার করলাম খুব সাদাসিদে, প্রাণখোলা, পরোপকারী আর প্রকৃতিপ্রেমী এই ছেলেটি। ক্লাস নেয়ার ফাঁকে ফাঁকে খুব কমই গল্প-আড্ডা হতো নিশাতের সাথে, তবে ক্লাস শেষে কখনো কখনো গল্প-আড্ডা চলতো জমিয়ে। বিশেষ করে ওই দিনটির কথা তো সর্বদাই মনে পড়ে, যেদিন রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম থাকায় আমি আর নিশাত গল্প করতে করতে হেঁটে হেঁটে স্টীল মিল পর্যন্ত চলে এসেছিলাম। কথার মধ্যে ছিল আমাদের ফেলে আসা অতীত, ভবিষ্যত নিয়ে ভাবনা ইত্যাদি ইত্যাদি। মজার বিষয় হচ্ছে সেই নিশাত এখনো একটুকুও বদলায়নি। আমার ভ্রমণপিপাসু এই বন্ধুটি করোনা মহামারীর মধ্যেই সেন্টমার্টিন দ্বীপে কাটিয়ে দিলো পুরো পাঁচটি মাস। এভাবেই চলার পথে কিছু কিছু মানুষের সাথে আপনার দেখা হয়ে যাবে আর জীবনের কোন এক সন্ধিক্ষণে সেই মানুষগুলোর ছোট ছোট স্মৃতিগুলো নিংড়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়বেন- আহা, এইতো জীবন।

জন্মদিন নিয়ে আমার তেমন কোন বাড়াবাড়ি ছিল না কখনোই। এই ফেসবুক আসার পর থেকে যদি না টাইমলাইন বন্ধুদের শুভেচ্ছাবার্তায় ভরে না যেত, হয়তোবা ভুলেই যেতাম এই বিশেষ দিনটি। মজার ব্যাপার হচ্ছে এবারের জন্মদিনে এই দিনটিতেই সাপ্তাহিক ছুটির দিন পড়েছে , তাই ক্যাম্পাসে গিয়ে বন্ধুদের ট্রিট নামক ঝামেলা থেকে রেহায় পেয়ে গেছি বলে মনে মনে শোকর করছিলাম। কিন্তু ক্যাম্পাসে না থাকলে কি-হবে, টিউশনে তো যেতেই হবে। বিকেল বেলা গেলুম সিমেন্স হোস্টেলের একটা টিউশনে, এই টিউশনটা পেয়েছি বেশিদিন হয়নি। যেই কোচিং এ ক্লাস নিতাম সেখানকারই একজন ছাত্রী, নাম নিতু। কোচিং এর নিচতলায় ওর বাবার একখানা রেস্টুরেন্ট ছিল, যেথায় প্রায়শই চা-নাস্তা করতাম। একদিন নিতুর বাবা ডেকে পরিচয় দিয়ে ওনার মেয়েকে পড়াতে বললেন, ব্যাস…সে থেকেই এই সিমেন্স হোস্টেল কলোনীর শেষ বিল্ডিংটায় সপ্তাহে চারদিন পড়াতে আসা।
-কি ব্যাপার নিতু? আজকে একটা ম্যাথও সলভ করতে পারছ না।
-কই, না তো ভাইয়া !
-তোমার আজকে কি হইছে বল তো ? নার্ভাস দেখাচ্ছে তোমাকে আজ ।
-কে বলছে ? আচ্ছা, থাক ভাইয়া…ম্যাথ বাদ দিয়ে ফিজিক্স নিই।
-আচ্ছা নাও, কিন্তু তোমার কিছু তো হইছেই … লেট মি গেস !
-স্কুলের কোন পরীক্ষায় খারাপ করছ?
-না ভাইয়া !
-কেউ কি বকা দিছে?
-না ভাইয়া!
-শরীর খারাপ নাকি তাহলে ?
-আরে ধুরু…না না। আসলে বলতেছিলাম কি আপনার জন্যে একটা গিফট আছে।
-আমার জন্যে গিফট ! হা হা হা, অনেক মজা হইছে এইবার পড়ায় মনযোগ দাও।
-আরে শোনেন না, আজকে আপনার জন্মদিন না ?
-তুমি কেমনে জানলা ?
-জানি জানি, আমার আব্বুর ফেসবুক আইডি আমিও চালাই। আপনি ওই আইডি তে কানেক্ট আছেন তো।
-ও আচ্ছা, এই তাহলে কাহিনী।
-এই যে আপনার জন্যে গিফট।
দেখলাম নিতু তার ব্যাগ থেকে একটা সুন্দর বক্স বের করল আর বলল-“আমি আব্বুকে বলছিলাম, আব্বু এই গিফট টা এনে দিছে। আপনি এটা বাসায় গিয়ে খুলবেন কিন্তু”
-আচ্ছা, ঠিক আছে। কিন্তু আমি তো বার্থডে ট্রিট দেই নাই।
-লাগবে না ট্রিট আমার।

বাসায় যাবার আগেই অবশ্য বক্সটা খুলে ফেলেছিলাম, দেখি একটা হাতঘড়ি। ঘড়িটা হাতে পরে নিয়েই বক্সটা রাস্তার একপাশে ফেলে দিলাম। পরে আবার কি মনে করে বক্সটা কুড়িয়ে নিলাম। একটু দূরেই দেখি নিতুর ছোট ভাই, ওকে ডেকে নিয়ে দোকান থেকে এক বক্স আইসক্রিম নিয়ে দিলাম যাতে বাসায় গিয়ে সবাই মিলে খায়। সন্ধ্যার ব্যাস্ত সড়কের পাশ ঘেষে সোডিয়াম বাতির আলোতে একা একা হাঁটছিলাম, অবশ্য বেশ কিছু বাতি এলইডি বাতিতে পরিবর্তন করা হয়েছে। হলুদ আর ফকফকা সাদা আলোর মিশেলে কেমন বিদঘুটে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। কিছুদূর যেতে না যেতেই স্কুলের বন্ধু অনিকের ফোন।
-হ্যাঁ সানি, কই আছিস তুই?
-আমি ইপিজেড এর কাছাকাছি।
-আমি আর সিফাত হসপিটাল গেট আছি, চলে আয়।
-ওকে দোস্ত।
অনিক সিলেট থেকে এসেছে গত পরশু, এমনিতেই দেখা করার প্লান ছিল। তার উপর আজ আবার আমার জন্মদিন, একেবারে ছোটখাটো খানাপিনার আয়োজন হয়ে গেলে মন্দ হয়না। এই ভেবে আমি অনিক আর স্কুলের আরেক বন্ধু সিফাত একত্রিত হলাম হাসপাতাল গেট এলাকায়। সেই চিরচেনা শহর,স্কুল-কলেজ জীবনের ফেলে আসা স্মৃতি রোমন্থন, বন্ধু-আড্ডা-গল্প আর খানাপিনায় কেটে গেলো সময়।
>>>>>>>>>>>>>>>

পরীক্ষার আগের দিন যত বড় সিলেবাসই হোক না কেন, প্রকৌশলীদের জন্যে তা পান্তা ভাত। এই ভেবেই পুরো সেমিস্টার জুড়ে সব পড়া জমিয়ে রাখে এরা পরীক্ষার আগের দিনটাতে পড়বে বলে। অবশ্য এছাড়াও আরো দু-শ্রেণীর প্রকৌশলী দেখতে পাওয়া যায়। একদল সেমিস্টারের শুরু থেকেই খুব সিরিয়াস, বাইরে থেকে এমন ভাব নেয় যেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। আরেকদল ভেতরে ভেতরে পড়বে কিন্তু কাউকেই বুঝতে দেবে না, খুব সুন্দরভাবে বিদ্যাসাগর শ্রেণি এবং সাধারণ শ্রেণীর মধ্যে ভাব বজায় রাখবে। নিজেকে অবশ্য আমি কখনো কোন শ্রেণীতে আবদ্ধ রাখিনি, যখন যেটা ভাল লেগেছে উচিত মনে হলে সেটাই করেছি। এই সেমিস্টারে অবশ্য পড়ালেখায় হালকা মন দিয়েছি যদিও আমার মন দেয়া না দেয়া সব ওই পরীক্ষার আগের কদিনের উপরই নির্ভরশীল।

সেই মাহেন্দ্রক্ষণ অতি সন্নিকটে বলা চলে, একে একে ল্যাব ফাইনালগুলো শেষ হতে চলেছে। ইংরেজির শুকলা ম্যামের ক্লাস করেছি আমরা বিগত দু-সেমিস্টার ধরে, এরপর আর কোন ক্লাস নেই উনার। তাই ক্লাসে আমরা জানিয়েছিলাম শেষ ক্লাসে আমরা ক্লাস পার্টি করব সবাই মিলে। যেই ভাবা সেই কাজ, সকলের সম্মিলিত আয়োজনে ২০৩ নম্বর কক্ষটিকে আমরা খুব সুন্দরভাবে সাজালাম। রঙ বেরঙের বেলুন, কনফেত্তি আর সাজ সাজ আয়োজন বিরাজ করছিল এই ২০৩ নম্বর কক্ষে। আগে থেকেই আমরা চাঁদা তুলে বিশাল কেক আর নাস্তার অর্ডার করে রেখেছিলাম, ম্যাম ক্লাসে ঢুকেই খুব সুন্দর করে গুছিয়ে আমাদের উদ্দেশ্যে কথা বললেন। একে একে আমাদের দিয়ে পারফর্ম করালেন কবিতা, গান, কৌতুক, অভিনয়, নাচ… ইত্যাদি। সেদিন স্কুলের ফেলে আসা দিনগুলির কথা মনে পড়ে গিয়েছিল খুব করে। সবশেষে আমরা সবাই মিলে কেক কাটলাম, নাস্তা আর ফটোসেশনের মধ্য দিয়ে প্রথম বর্ষের ক্লাস পার্টি শেষ করলাম।

<<<<আগের পর্ব    পরের পর্ব>>>>

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...