মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ১০


-আজকে ফাটাইয়া খেলতে হবে মামা। ডিজে শাওন-কে উদ্দেশ্য করে বলল মীর।

-গরম গরম চলিবু দে রি। মাল-পানি রেডি রাখিছ।

মীরের প্রত্যুত্তরে ডিজে শাওন কিসের মাল-পানির কথা বলল কিছুই বুঝলাম না। আজ আমাদের ভার্সিটির ক্রিকেট টুর্নামেন্ট এর লীগ পর্যায়ের শেষ ম্যাচ। এই টুর্নামেন্ট এ নির্দিষ্ট করে কোন সেমিফাইনাল নাই, লীগ পর্যায়ে ম্যাচ শেষ হলে পরে হার-জিত ও পয়েন্টের হিসেবে শীর্ষে থাকা দুই দল সরাসরি ফাইনাল খেলবে। সকাল সকাল এক পশলা বৃষ্টির পর রৌদ্রজ্জল পরিবেশ। পিচ মোটামুটি শুকনো আছে, তবে আউটফিল্ড খানিকটা ভেজা। চট্রগ্রাম মেডিকেলের পেছন দিকটায় ছোটখাটো কিছু টিলার কোল ঘেঁষেই এই মাঠ, সবাই মেডিকেল ফিল্ড নামেই ডাকে।  

আজ আমাদের প্রতিপক্ষ এই টুর্নামেন্ট এর সবচেয়ে শক্তিশালী দলটি, আমাদেরই তড়িৎপ্রকৌশল অনুষদের শেষবর্ষের টিম। নাম “Warriors of EEE” ইতোমধ্যে আমাদের ক্যাপ্টেন নোবেল অনিক গিয়ে টস করে এসেছে। পশ্চাতদেশ দুলাতে দুলাতে প্যাভেলিয়ন এ এসেই বলছে-

-ব্যাটিং পাইছি আমরা, টসে হেরে গেছিলাম।

-হারামজাদা, তোরে টসে যাইতে কে বলছে? তুই একটা পোড়াকপাইল্লা।

-সমস্যা নাই, আমাদের ডিজে মামা আছে। আর আমিতো আছি…কুল।

-তোর কুলের গুল্লি মারি, ভেজা মাঠে বল চোখে দেখস নাকি দেখ।

নোবেল আর মীরের বাকবিতণ্ডায় আমি অনুপ্রবেশ করলাম, পরিস্থিতি শান্ত করার উদ্দেশ্যে বললাম-

-যা হবার হয়ে গেছে, ঠিকঠাক ব্যাটিং করতে হবে। উইকেট দেয়া যাবেনা, মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হবে। ওপেনিং নামবে ডিজে শাওন আর জিগর। গত ম্যাচগুলোতে জিগর ভালোই খেলেছে, এক ম্যাচে ত ফিফটিই করে বসেছে। উইকেট ধরে খেলতে পারে ছেলেটা, আর সঙ্গী শাওন হচ্ছে আমাদের গেইল। বলে বলে চার-ছক্কার ফুলঝুড়ি যার ব্যাট থেকে। বলতে না বলতেই ম্যাচ শুরু হয়ে গেল, স্কোরবোর্ডের দায়িত্বে আছেন টুর্নামেন্ট কমিটির সিনিয়র কিছু ভাই আর দু-দল থেকে দুজন। স্কোরবোর্ডে বড় বড় করে লিখা হয়েছে “Circuit Breakers” Vs “Warriors of EEE

বেশ লম্বা রান-আপ নিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে আসছে বিপক্ষ দলে ফাস্ট বোলার, বল মাটিতে পড়তে না পড়তেই “ছক্কা”। ওপেনিং এ ডিজে শাওন তার খেল শুরু করেছে, পরের বলেই আরেকটি “ছক্কা”, এর পরের বলেই “চার”। আমাদের সার্কিট ব্রেকারস প্যাভেলিয়ন এ বেশ হই-হুল্লোর শুরু হয়ে গেছে, প্রতিপক্ষের বোলারের মাথায় হাত… বল ফেলারই জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না বেচারা। বোলারকে মনোবল দিতে বিপক্ষ দলের অধিনায়ক তার কাছে গিয়ে কিছু একতা বলছিল, আর এরই ফাঁকে আমাদের ওপেনার ব্যাটসম্যান শাওন ব্যাট উঁচিয়ে আমাদের দিকে বিজয়ীর ভাব নিচ্ছিল।

এবারে তৃতীয় বলটিতে প্রান্ত বদল করে ছোট ছোট রান-আপ নিয়ে এগিয়ে আসছিল বোলার। বল ক্রিজে পড়তেই নিচু হয়ে ব্যাটসম্যনের উইকেট উপড়ে নিল। সাথে সাথে আমাদের শিবিরে নেমে এলো শুনশান নীরবতা, আমাদের গেইল বোল্ড। মাত্র দশ রানেই আমাদের প্রথম উইকেটের পতন। শাওন ক্রিজ ছেড়ে প্যাভেলিয়ন এর দিকে আসতে না আসতেই আবারো নোবেল জোর করে ব্যাটিং এ নেমে যাচ্ছিল, আমরা ক’জন তাকে অনেক কষ্টে থামাই আর ওয়ারিফ কে নামার নির্দেশ দেই।

-দেখ, বল এখন নিচু হয়ে আসছে। ওয়ারিফ ছোটখাটী গড়নের খেলোয়াড়, ও ভালো খেলতে পারবে। নোবেলকে উদ্দেশ্য করে বললাম আমি।

-হ্যাঁ, ঠিক ঠিক । বাকি সবাই আমার কথায় সায় দিল।

এভাবে প্রায় পাঁচটি ওভার চলে গেল, ওয়ারিফ আর জিগর মোটামুটি ক্রিজে সেট হয়ে গেছে। ওয়ারিফ এদিক-ওদিক লাগিয়ে সিঙ্গেলস, ডাবলস, বাই রান বের করছিল আর জিগর মাঝেসাঝে চার-ছক্কা হাঁকাচ্ছিল। পাঁচ ওভারে আমাদের সংগ্রহ ৫৮/১।

ষষ্ঠ ওভারে আবারো বল করতে আসল সেই ওপেনার ফাস্ট বোলার, এবার ওর বাউন্সে ক্যাচ তুলে দিয়ে প্যাভেলিয়ন এর দিকে ফিরে আসে ওয়ারিফ। পরিস্থিতি সামলে উইকেট আঁকড়ে খেলে আসা ওর ১০-১৫ রানের ইনিংসটিকে আমরা বেশ বাহবা দিচ্ছিলাম। এবার নোবেল আর ধৈর্য রাখতে পারল না, ব্যাট নিয়ে নেমে পড়ল। আমরাও আর কেউ বারণ করলাম না। কিন্তু আবারো সেই দুরাবস্থা, তিন বল খেলে একটি চার আর একটি ছক্কা মেরে বোল্ড। ছয় ওভারে আমাদের সংগ্রহ ৬৮/৩ ।

যথারীতি মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান সাইদুল কে নামালাম, এবারে মোটামুটি আবারো একটা ভাল জুটি গড়ে উঠল জিগর আর সাইদুলের মাঝে। জিগর ইতোমধ্যেই ফিফটি তুলে নিয়েছে, দশ ওভারে আমাদের সংগ্রহ ৯৮/৩। একাদশ ওভারের দ্বিতীয় বলটিতে উড়িয়ে মারতে গিয়ে সীমানায় খুব দুর্দান্ত একটি ক্যাচের বলি হয়ে আউট হয়ে গেল জিগর, স্কোর ৯৮/৪। 

এবার সবার চাপাচাপিতে আমিই নেমে গেলাম ব্যাট নিয়ে, যা হয় হবে… ২০০ এর কাছাকাছি রান করতে হবে এই মাঠে- নয়ত পরাজয় নিশ্চিত। ক্রিজে নেমে প্রথম বলটি ছেড়ে দিয়ে বড় বাঁচা বেঁচে যাই। একে তো ১২৫-৩০ গতির বল, তার উপর বাউন্স, এই বল ব্যাটে লাগালেই স্লিপ কিংবা গালি-তে নির্ঘাত ক্যাচ। এর পরের বলেই সেই ভুল করে বসি আমি, ব্যাটে লেগে বল স্লিপের ক্যাচ… কিন্তু এই যাত্রায় আবারও আল্লাহ সহায় হলেন। ক্যাচ ফিল্ডারের হাত ফসকে মাটিতে, আর আমি মনে মনে ভাবছিলাম “হারানোর কিছু নাই এখন আমার, এই মাঠে কিছু একটা করা এখন আমার দায়িত্ব”।

পর পর দু-বলে দুটো চার মেরে কিছুটা মনোবল ফিরে এলো আমার। অপর পাশ থেকে সাইদুল ভালোই সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছিল, আর আমি বেশি বেশি সিংগেল নিতে লাগলাম। পনের ওভারের খেলা, আর দু-ওভার আছে হাতে। তাই সাইদুল কে তাগাদা দিলে মেরে খেলতে। পর পর দুটো চার মেরেই সাইদুল ক্যাচ তুলে দেয় মিড পয়েন্টে, দলীয় সংগ্রহ ১৫০/৫। আমার নামের পাশে  ৩৫ রান, ওপ্রান্তে ব্যাট হাতে সঙ্গ দিচ্ছে মীর। হাতে আর দুটি ওভার চাইলেই ফিফটি করা সম্ভব। এই দুটি ওভার পুরোপুরি ঘোরের মধ্যে গেল আমার, এতো ভাল টাইমিং আগে কখনো হয়নি আমার। শেষ ওভারের প্রথম বলেই ছক্কা মেরে দলীয় স্কোর ১৬৬, আর আমার ব্যাক্তিগত ৪৮, পরের বলেই রিস্ক না নিয়ে গড়িয়ে মারলাম লেগে…আর দৌঁড়ে সেই কাঙ্ক্ষিত দুটি রান। লাইফের প্রথম কোন বড় টুর্নামেন্ট এ ব্যাক্তিগত ফিফটি, আজীবন মনে রাখার মত একটি স্মৃতি। পরের কয়টি বল খেলে দলীয় স্কোর ১৭৭/৫ আর ব্যাক্তিগত সর্বোচ্চ ৫৮ রান জ্বলজ্বল করছিল স্কোরবোর্ডে।

ম্যাচ বিরতিতে পুরো টিম চাঙ্গা, যেভাবেই হোক আটকে দিতে হবে সিনিয়র ভাইদের। ফিল্ডিং এ নেমে বল তুলে দিলাম মীরের হাতে, কাগজে কলমে সহ-অধিনায়ক হলেও মাঠে একরকম অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। প্রথম ওভারে মীর বেশ ভালোই বল করল, কিন্তু কোন উইকেট নিতে পারল না। পরের ওভারে সাইদুল বেশ মার খেল, চার ছক্কার বন্যা বয়ে গেল মাঠে, আমরা সবাই আধার দেখছিলাম। ঠিক অই সময়ই নোবেল আসল, ওর হাতেই তুলে দিলাম বল। নোবেল টোক্কা বোলার হলেও যে সে ধরতে পারে না। প্রথম বলেই উইকেট, উইকেট রক্ষক দীপ্তর তালুবন্ধি বল। পরের বলেই আম্প্যায়ার নো ডাকলেন, প্রতিপক্ষের অভিযোগে নোবেলের হাত ভেঙ্গে টোক্কা বোলিং আম্প্যায়ার এর নজরে এসেছে। শেষমেষ বেচারা বাধ্য হয়ে স্পীন করে ওভারটা শেষ করল। মাত্র একটি উইকেট হারিয়ে তিন বিপক্ষ দলের সংগ্রহ ৩৫ রান, বেশ স্বাস্থ্যবান স্কোর বলা চলে। আবারো নিয়ম করে মীর, সাইদুল, ইফতেখার(ব্রাভো) কে বোলিং এ আনলাম। কিন্তু কোন উইকেট পড়ছিল না। এবারে বিরক্ত হয়ে তুলে নিলাম বল হাতে। আমি মিডিয়াম গতির পেস বল করি, কোন রকমে চালিয়ে নেয়ার মতো আরকি। প্রথম ওভারে মোটামুটি রানের চাকা আটকে রাখলাম কিন্তু কোন উইকেট পেলাম না। সাত ওভারে ওয়ারয়র্স দের সংগ্রহ ৭৫/১।

এরপর সাইদুলের বল আগের চেয়ে ভালো হলো, একটি উইকেট পড়ল ওই ওভারে। সাজ্জাদ ভাই অনেক দূর থেকে দৌঁড়ে এসে দুর্দান্ত ক্যাচ ধরে বিপক্ষ দলের মারকুটে ব্যাটসম্যান-কে বিদায় করলেন। নবম ওভারে বল করতে এসে দেখলাম, ব্যাটসম্যান স্লো বলে টাইমিং মেলাতে পারছে না… ব্যাটে না লাগলে পায়ে লাগিয়ে দিচ্ছে বারে বারে। বেশ কয়েকবার “লেগ বিফোর উইকেট” এর আবেদন করেও পেলাম না আমরা, জোর যার মুল্লুক তার মতো অবস্থা। এবার ভাগ্য আমার সহায় হলো-

কথায় আছে “You miss, I hit”,। ওই ওভারের শেষ বলে স্লীপে একটি ক্যাচ উঠল…বেচারা জিগর ক্যাচখানা ছেড়ে না দিলে দুটো উইকেট হতে যাচ্ছিল আমার।

পরের ওভারগুলোতে আমরা যেমন উইকেট নিয়েছি প্রতিপক্ষ সেভাবে ব্যাট চালিয়ে গেছে। আমার শেষ ওভারে দুটো উইকেট পাই আমি, ব্যাট হাতে ৫৮ রান… বল হাতে ৩ উইকেট। ক্যারিয়ারের সেরা পারফর্মেন্স, কিন্তু দিনশেষে আমরা পরাজিত দলে।

বিপক্ষ দলের স্কোর ১৭৮/৯ । ম্যাচশেষে আমার দলের খেলোয়াড়দের থেকে “ডেরেন সামি” খেতাব পেলাম। রানরেট এ এগিয়ে থাকায় আমরা ফাইনাল খেলার সুযোগ পাবো, আর আমাদের প্রতিপক্ষের আরো একটি ম্যাচ বাকি ছিল সর্বোচ্চ পয়েন্টধারী দলটির সাথে। এই সুখবরেও খুশি হতে পারলাম নাম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মাঠ ছাড়ছিলাম…আমার ডান পা খুব ভালভাবে কেটে গেছে, হয়তোবা স্বপ্নের ফাইনাল খেলতে পারব না।

এই ম্যাচটিই যে আমার খেলা শেষ ক্রিকেট ম্যাচ হবে কে জানত, এরপর থেকে মন খারাপ করেই একরকম ক্রিকেট থেকে সরে এসেছি। আর তাই এই ম্যাচটা, এই দিনটা চাইলেও ভুলতে পারবো না কখনো।  


<<<আগের পর্ব      পরের পর্ব>>>> 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...