রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২০

স্নাতকের দিনগুলির ষোলআনা - পর্ব ৯



রাতে বাসায় এসেই কাজে লেগে পড়লুম, রাশেদ সার্কিট এঁকে দিয়েছে… তার উপর হালকা পড়াশুনা করে বুঝলাম এই সার্কিট সাধারণ টর্চ লাইট ব্যাটারি চার্জিং সার্কিট এর মতো। আপাতত দুটো রেকটিফায়ার এর দুই মাথা এক করে প্যারালালে একটা ক্যাপাসিটর লাগিয়ে দিলেই হচ্ছে। আমার সেই স্কুলে থাকতে কেনা মাল্টিমিটার এর প্রব ক্যাপাসিটরের দুই মাথায় দিয়ে চেক করে দেখলাম, হ্যাঁ ২০-২৪ ভোল্ট পাওয়া যাচ্ছে।
হঠাৎ বুমমমমম…
-আবার শুরু গইজ্জুস নে গুঁতাগুঁতি? তড়াতড়ি ঠিক গর, নাটক চাইয়ুম। - পাশের রুম থেকে আম্মুর ঝাঁঝালো বকাবকি।
-হ্যাঁ, পাঁচ মিনিট … পাঁচ মিনিট।
-পাঁচ মিনিট ন সরে ঠিক গর, নত আজিয়ে ভাত পাতি নু। 

ক্যাপাসিটরের দুই প্রান্ত শর্ট হয়ে ডিসচার্জ এর শব্দ ছিল, আর সে শব্দে ভয় পেয়ে আমার হাত পড়ে যায় ট্রান্সফরমারে, আর বাসার সার্কিট ব্রেকার যায় পড়ে। আমার জন্যে নতুন কিছু শেখাটা আম্মুর কাছে নিত্যনৈমিত্তিক গুঁতাগুঁতি। একবার তো টিনের চালে কাঁকের দাপাদাপি সহ্য করতে না পেরে বাসায় টিনের চাল বিদ্যুতায়িত করে বসি, পাঁজি-হতচ্ছাড়া কাঁকের যন্ত্রণা তাও যদি কিছুটা কমে। এসব গুঁতোগুঁতি করতে গিয়ে শ-খানেক বারেরও বেশি শক খেয়েছি, এমনকি এখনো খেয়ে চলছি। বাসার ব্রেকায় তুলতে তুলতে আমার মনে পড়ে গেল সেই দিনটির কথা, যেদিন প্রথম ইলেকট্রিক শক খেয়েছিলাম। তখন সবেমাত্র ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি, বিভিন্ন খেলনা গাড়ি থেকে মোটর সংগ্রহ করা ছিল আমার নেশা। একবার ব্যাটারি ছাড়া আর কিভাবে মোটর চালানো যায় সেই চিন্তা থেকে মোটর থেকে দুই তার বের করে সরাসরি সকেটে ঢুকিয়ে দেই… সেই থেকে শুরু, আজও চলছে।
>>>>>>> 
-হ্যালো, সানি ভাই বলছেন?
-জ্বি, বলছি।
-ও পজেটিভ রক্ত লাগবে আপুর জন্যে,প্রচুর ব্লিডিং হয়েছে। দুজন ঠিক করে রাখা ডোনারের একজন আসেনি।
-হ্যাঁ, ডেলিভারি পেশেন্ট? আমি ফেসবুকে আমাদের ব্লাড ব্যাংক গ্রুপে দেখেছি, কোথায় আসব বলুন?
-জ্বি, চট্রগ্রাম মেডিকেল।
-আচ্ছা, আমার ক্যাম্পাস মেডিকেল এর কাছেই। আমি আপনাকে ফোন দেব।
আগে কখনো রক্তদান করা হয়ে উঠেনি, এর আগে আরেকবার একজনের জায়গায় আমরা তিনজন এসে পড়েছিলাম তাই আর আমার রক্ত দেয়া হয়ে উঠেনি। ক্যাম্পাসের সিনিয়র ভাই সূর্য দাদার বেশ কার্যকরী একটি সংগঠন আছে, নাম “CTG Blood Bank” । স্বেচ্ছায় রক্তদানে মানুষকে উৎসাহিত করা থেকে শুরু করে যে কোন জরুরি প্রয়োজনে রক্ত জোগাড়ের চেষ্টায় এই ডিজিটাল প্লাটফর্ম। একদিন তো দাদাকে প্রশ্ন করেই বসি -“এত দ্রুত ম্যানেজ করেন কিভাবে?” উনি হেসে উত্তর দেন-“সবই নেটওয়ার্ক, আর দীর্ঘদিনের কাজের ফসল”

মেডিকেলে গিয়ে রোগীর ভাইকে সাথে নিয়ে মেডিকেলের ব্লাড ব্যাংক এর বুথে লাইনে দাঁড়ালাম। চেহারায় এমন ভাব ফুটিয়ে তুলেছি যেন আমি আগেও রক্তদান করেছি, পাছে আগের বারের মতো যদি না দিতে পারি। বুথে রোগীর আত্মীয় টাকা আর রোগীর স্যাম্পল জমা দিয়ে একটা খালি ব্যাগ নিলেন। এরপর গেলাম ভেতরে, এরকম একটা সেনসিটিভ জায়গার পরিবেশ যেমনটি হওয়া উচিত ছিল ঠিক তেমনটি নেই। খুব বাজে অবস্থা, পানের পিক, চিপস, সিগারেট থেকে শুরু করে ময়লা আবর্জনায় ভর্তি। এসব আমাদেরই কৃতকর্মের ফল, আমি কিংবা আমাদের কেউ না কেউই ত এভাবে হাসপাতাল নোংরা করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।
-দেখি, হাতটা সোজা করেন। আগে ব্লাড দিছেন যে ৩ মাস হইছে?
-“হু”
সাদা এপ্রোন পরা তরুণীকে ভয়ে ভয়ে বললাম, ডাক্তার কিংবা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট হবে হয়তো। আজকেই প্রথম এটা জানলে যদি এখান থেকে ভাগিয়ে দেয় তাই সব প্রশ্নেই হু-হু করে যাওয়া। বলতে না বলতেই তরুণী হাতে সুঁই ফুটিয়ে দিল আর একটা মেডিকেল টেপ মেরে ব্যাগটা পাশেই রাখল। যাহ, কই ব্যাথা ট্যাথা তো কিছুই পেলুম না… তাহলে লোকে ভয় কেন যে পায় আল্লাহই জানেন। কিছুক্ষণ পর তরুণী এসে একটা স্পঞ্জের বল হাতে ধরিয়ে দিলেন আর বললেন
-“জোরে জোরে প্রেস করেন”
-“আস্তাগফিরুল্লাহ, কি বলে এসব। এই ছোট্ট একটা বল, তাও জোরে জোরে প্রেস করব কিভাবে? কিন্তু কেন এই চাপাচাপি?”
-“প্রেস করতে বলছি না, হাঁ করে তাকিয়ে আছেন কেন?” – রাগী কণ্ঠে আদেশ করল তরুণী টেকনোলজিস্ট।
-“সরি সরি, চাপতেছি”
কিছুক্ষণ চাপাচাপি করেই বুঝলাম এই চাপাচাপির ফায়দাটা কী !!! সিম্পল ফিজিক্স… ফ্লুইড লোয়ার পটেনশিয়াল থেকে হাইয়ার পটেনশিয়াল এর দিকে যেতে এবং এয়ার গ্যাপগুলো পূর্ণ করতে বলের (Force) প্রয়োজন, প্রেস করলে পরে ব্লাড ভেসেল একটা ইমিডিয়েট ফ্লো এনার্জি পায় আর ব্যাগের খালি অংশ ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে উঠে। অবশ্য প্রথম দিকে পটেনশিয়াল কম থাকায় চাপাচাপির প্রয়োজন পড়েনি। ব্যাগ ভর্তি হতেই আরেকজন ছেলে এসে একটান দিয়ে ব্যাগসহ সুঁই খুলে নিল, একটা ব্যান্ডেজ মেরে দিয়ে বলল…
-“চুপচাপ শুয়ে থাকেন বিশ মিনিট”।
-“বিশ মিনিট !!! ওই তরুণী বললে নাহয় শুয়ে থাকতাম…বিশ মিনিট না, প্রয়োজনে বিশ ঘন্টা। তুমি কোথাকার কে বাপু?”
নতুন টেকনোলজিস্ট ছেলেটাকে মনে মনে বললাম আমি। এরপর দু-মিনিট যেতে না যেতেই উঠে বেরিয়ে গেলাম। বাইরে রোগীর ভাই আমার জন্যে ডাব নিয়ে অপেক্ষা করছে। ডাব খেতে খেতে হালকা কথাবার্তা বলে ক্লাসের তাড়া আছে বলে বেরিয়ে এলাম। একটা সময় ছিল যখন টাকা দিয়ে রক্ত যোগাড় করতে হতো, ডোনার পাওয়া গেলেও টাকা ছাড়া কেউ আসত না। কিন্তু যুগ পাল্টেছে এই যুবসমাজের হাত ধরে, আজ মানুষ স্বেচ্ছায় রক্তদানের জন্যে প্রতিযোগিতা করে। নিজের রক্তদানের দিনক্ষণ টুকে রাখে, যাতে পরবর্তী রক্তদানের সময় এলেই নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারে অকাতরে।

ক্লাসে এসেই দেখি মিড-টার্ম পরীক্ষার রুটিন দিয়েছে, সবাই কমবেশি হা-হুতাশ করছে বিশেষ করে গণিত আর সার্কিট বিষয় দুটি নিয়ে। এরই মধ্যে দেখি একজন খুব রিলাক্স করছে, সবাই তার কাছে ধরনা দিচ্ছে… বিশেষ করে গনিত নিয়ে। কালো করে একটু স্বাস্থ্যবান এই ছেলেটিকে আগেও বেশ ক’বার দেখেছি…ক্লাসে খুব চুপচাপ আর মনযোগী। নাম তার মিশন বিশ্বাস।
-বন্ধু, কি অবস্থা… এতো রিলাক্স কেন ?
-আমার তো সব শেষ, তাই ।
-বলিস কি? আমরা শুরুই করলাম না … আর তোর শেষ?
-আরে এইটা কোন মিডের সিলেবাস হলো? বাইচ্চা পোলাপান এর সিলেবাস দিছে সিটির।
-আচ্ছা, তো এখন কি করতেছস?
-এই যে সবাইকে বুঝাই দিচ্ছি। চিন্তা করিস না, আমি গ্রুপে আমার নোট খাতার পিডিএফ আপলোড করে দেব।
-আচ্ছা, ঠিকাছে দোস্ত।
সেই থেকে একের পর এক সেমিস্টার এসেছে আর গেছে, এই মিশন বিশ্বাসের পিডিএফ এর উপর আমাদের সবার অগাধ আস্থা রয়ে গেছে। আমি মজা করে নাম রেখেছি “মিশন বিশ্বাসের ম্যথ সমাধান”, হ্যাঁ … অধিকাংশ অংকের সমাধান তার কাছেই পাওয়া যেত বলে কথা। যাই হোক, ক্লাস শেষ করে আমরা ক’জন গেলাম “পেটুক” নামের একটা রেস্তোরাঁয়। এইখানে অল্প দামে ভালই ডিম-খিচুড়ি পাওয়া যায়, প্লেট প্রতি ৪০ টাকা। সেলফি…সেলফি…আর সেলফি, মানে কি যে যুগ আসল সবাই হাঁটতে, চলতে, ফিরতে, খাইতে কথায় কথায় শুধু ছবি তলে… পেটুকে খেতে এসেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।

দুপুরের খাওয়া শেষ করে ছুটলাম আরেকটা নতুন কোচিং এর উদ্দেশ্যে, বন্ধুদের বিকালের ল্যাব ক্লাস আছে। ক্লাস প্রতি দু’শ টাকা দেবে, কোচিং এর নাম “Unity Dream” অর্থাৎ একতাই যাদের স্বপ্ন। মজার ব্যাপার হচ্ছে এদের নামের সাথে কাজের মিল আছে, ওদের অধিকাংশ শিক্ষকই ভাড়ায় খাটে। কথায় আছে “একতাই বল”, স্থায়ী শিক্ষক রাখার চেয়ে এই পদ্ধতিটাই বোধ হয় এদের কাছে বেশি লাভজনক। সে যাই হোক, নবম-দশম শ্রেণির দুটো করে পদার্থ আর রসায়ন ক্লাস নিয়ে হাজিরা খাতায় সাইন করতে করতে…
-ভাই, দিনের টাকা দিনে দিবেন না?
-এটা কি বললেন ? আপনারা কি লেবার নাকি যে দিনের টাকা দিনে নেবেন? আপনারা হচ্ছেন শিক্ষক, জাতির মেরুদন্ড।
-কিন্তু গত সপ্তাহেই তো ফ্রি চারটে ক্লাস দিলাম, আর আপনি বলেছিলেন এ সপ্তাহ থেকে ক্লাস বেসিসে পে করে দেবেন।
-না, আসলে হয়েছে কি… স্টুডেন্ট রাও চাচ্ছিল বিষয়ভিত্তিক একজন করে শিক্ষক স্থায়ী থাকুক, কিন্তু মিলছিল না ব্যাটে বলে।
-ব্যাট বল কেন আসল আবার ভাই?
-আরে বুঝেন নাই? আচ্ছা, আপনাকে দৈনিক না দিয়ে সাপ্তাহিক পে করে দেব, এর মধ্যে আপনি যতটা ক্লাস নেন। কিন্তু একটা ব্যাপার, স্টুডেন্ট দের বলবেন আপনি এখানে স্থায়ী আছেন।
-আচ্ছা, ঠিকাছে।
কি আজব ব্যাপার, মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাওয়া যাকে বলে আরকি। এতদিন এই প্রবাদবাক্যটি কেবল শুনে এসেছি, আজ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছি। যাই হোক, দৈনিক আর সাপ্তাহিক… আমার একটা হলেই হলো। এছাড়া “স্টাডি জোন” কোচিং এ তো স্থায়ী আছিই…কোন রকমে চলে যাবে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

স্নাতকের দিনগুলোর ষোলআনা - পর্ব ৪২

  মাইক্রোকন্ট্রোলার নিয়ে নুব লেভেলে কাজ করতে গেলে আর্ডিনোর বিকল্প হয়না , আর চারিদিকেও এই আর্ডিনোর জয়জয়কার চলছে। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ফেম...