-“স্যার, আরেকটু আরেকটু”।
-“সবাই খাতা দিয়ে চলে গেছে, তোমার জন্যে
বসে থাকব নাকি”?
-“স্যার দেরিতে আসছি তো, এজন্যে”।
-“তুমি দেরিতে আসছ আমার কি ? সময় শেষ…
ঘন্টা পড়ে গেছে”।
অবশেষে জমে মানুষে খাতা টানাটানিতে আমার
মতো নীরিহ মানুষটি হার মানলো, দুটো মিনিটও অতিরিক্ত লিখতে পারলাম না। আজ শেষ পরীক্ষা
ছিল, সকাল বেলায় একটু বেশি বৃষ্টি হওয়ায় পরীক্ষার হলে ঢুকতে প্রায় চল্লিশ মিনিটের মতো
দেরি হয়ে যায়…আর তাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রাণপণে লিখে শেষ করার বৃথা চেষ্টা। এই শেষ
পরীক্ষাটাও সেই দেবাশীষ স্যারের ক্যামিস্ট্রি, যদ্দুর পারছি লিখে আসছি। বাপ রে বাপ
এইসব রাদারফোর্ড, বোর একজন আরেকজন এর ভুল বের করা মডেল আবার সর্বাধুনিক কোয়ান্টাম মডেল
পড়ে লিখতে লিখতে জান শেষ। ভাগ্যিস, ইলোকট্রোকেমিস্ট্রি চ্যাপ্টার থেকে পুরো দুটো প্রশ্ন
আসছে নাহয় সিনিয়রদের মতো আমার রিটেক/রিকোর্স নেয়ার টেনশন থেকে যেত। পরীক্ষা শেষে বেরিয়ে
দেখি মিশ্র অনুভুতি, মানে কমবেশি অনেকেই ভাল লিখলেও জাঁদরেল স্যারের খাতা কাটার পদ্ধতি
সবারই জানা, তাই সবাই একটু বেশিই চিন্তিত।
জিইসি মোড় এসে দশ নাম্বার বাসে উঠলাম
ধাক্কাধাক্কি করে আর পাশেই দেখি এক পরিচিত মুখ…
-আরে সৈকত না ! কেমন আছিস দোস্ত?
-এইতো আছি ভাল। তুই কই আসছিলি?
-আমার পরীক্ষা ছিল, সেমিস্টার ফাইনাল
আজকে শেষ হইল।
-ও আচ্ছা, কোন সেমিস্টারে এখন?
-কিছু সমস্যা ছিল রে বন্ধু, তাই ড্রপ
পড়ে গেছে।
-আচ্ছা থাক তাহলে বাদ দে, তোরা কি কাটগড়
এলাকায় এখনো আছিস?
-হ, আর কই যাবো?
-আমরা চরপাড়া বীচের কাছে বাড়ি করছি, আসিছ একদিন বাসায়।
সৈকত আমার স্কুলের বন্ধু, সেও পড়ছে তড়িৎপ্রকৌশল
নিয়ে…অন্য আরেকটি ভার্সিটি তে তৃতীয় বর্ষে আছে। বহুদিন পর দেখা পেলেও কথা-বার্তায় ঠিক
তাল মেলাতে পারছিলাম না তার সাথে। তথ্য-প্রযুক্তি ও তড়িৎপ্রকৌশল এর খুঁটিনাটি নিয়ে
হারামিটার জ্ঞান আমার চেয়ে তিনগুণ বেশি, আমিও তার সাথে কথায় কথায় সায় দিয়ে যাচ্ছিলাম
আর মনে মনে পণ করলাম- শুধু ক্লাস করে কিছু শেখা যাবেনা, এর ওর থেকেও শিখতে হবে। অন্তত
সৈকতের মতো কারিগরী বিদ্যাটা ভালভাবে আয়ত্ত্ব করতে পারলেই হয়। পরক্ষণেই সৈকত আমাকে
উদ্দেশ্য করে বলল-
-পিসিবি বানাইতে পারস? আমরা গত সেমিস্টারে
শিখছিলাম জাস্ট থিওরি, এরপর জিনিসপাতি কিনে এনে ৪-৫ টা বানাইছি বাসায়।
-আমি তো পারিনা, শেখাবি আমাকে?
-এই শুক্রবার আয় বাসায় তাহলে।
-আচ্ছা ঠিকাছে দোস্ত।
সল্টগোলা ক্রসিং আসতেই আমি বাস থেকে নেমে গেলাম, “Unity Dream” কোচিং এ আজকে ক্লাস নিতে হবে। দশম শ্রেণীর পদার্থবিজ্ঞান ক্লাসে গিয়েই আমি কিছুক্ষণ আগে লাভ করা জ্ঞানের কিয়দাংশ ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বিতরণ করলাম। এ আমার একরকম অভ্যেস বলা চলে, নতুন কিছু শিখলে বা জানলে অন্যদেরও জানাতে মনটা আঁকুপাঁকু করে। মনে পড়ে গেল কবি সুনির্মল বসুর সেই বিখ্যাত কবিতা-
“বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র
নানান ভাবে নতুন জিনিস শিখছি দিবারাত্র।”
একটা ক্লাস শেষ করতে না করতেই কোচিং
এর পরিচালক সাহেব এলেন আর কুশলাদি বিনিময় করলেন। হঠাৎ করে তিনি পুরো ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের
প্রশ্ন করে বসলেন-
-সানি স্যার তোমাদের কেমন পড়ান ?
পুরো ক্লাসে পিনপতন নীরবতা, কেউ টুঁ
শব্দটি পর্যন্ত করছে না। “খাইছে, আমার এই সপ্তাহের টাকাটা বোধ হয় আর পাবো না, কেউ অন্তত
কিছু বল তোরা” – মনে মনে ভাবতে লাগলাম।
কাঁচুমাচু মুখ করে যখন দাঁড়িয়ে থেকে
কোচিং থেকে বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম ঠিক তখনই সব ছেলেপিলে একসাথে চেঁচিয়ে বলে উঠল-
-“অনেক… ভাল পড়ান”।
-“আপনি নাকি পাঠ্যবই এর বাইরে থেকেও
ওদের জীবনমুখী অনেক কিছু শেখান?” পরিচালক মুচকি হেসে আমাকে প্রশ্ন করলেন।
-“জ্বি, না মানে…টুকটাক সাহিত্যচর্চা
করি। ওখান থেকে ওদের কিছু শুনাই। আজকালকার ছেলেপিলেরা তো মোবাইল-ফেসবুক-গেমস নিয়েই
ব্যাস্ত, বই পড়ার সময় কই ওদের” ?
-“খুবই ভাল। আসলে আপনি আসার আগেই আমি
ওদের সাথে কথা বলেছিলাম…আর আমরা সবাই মিলে আপনাকে একটু বাজিয়ে দেখলাম”। - এই বলে পরিচালক
সোল্লাসে হেসে উঠলেন।
-“ধন্যবাদ তোমাদের, এ আমার অনেক বড় পাওয়া।”-ছাত্রছাত্রীদের
উদ্দেশ্য করে বললাম আমি।
-“লাঞ্চ করেছেন?”
-“নাহ, আসলে পরীক্ষা দিয়েই এদিকে চলে
এসেছি।”
-“এভাবে না খেয়ে থাকলে পড়ানোর শক্তি পাবেন কই? চলেন, আজ আপনাকে লাঞ্চ করাব।”
>>>>>>>>>>
শুক্রবার,
সকাল বেলা “স্টাডি জোন” কোচিং এ ক্লাস
নিতে গিয়ে অই এলাকায় স্বনামধন্য পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষক সাখাওয়াত ভাই এর সাথে পরিচয়।
পরিচয়পর্ব শেষে জানলাম ভাইও তড়িৎপ্রকৌশল এর ছাত্র, কিন্তু এই ব্যাচ পড়ানোর নেশায় পেয়ে
বসায় পড়াশুনাটা ঠিক নিয়মিত করা হয়ে উঠছে না। আলোচনায় চলে আসল পিসিবি বানানোর কথা, আর
আজ বিকালেই সৈকত পিসিবি বানানো শেখাবে…এমন সুযোগ তিনিও হাতছাড়া করতে চাইলেন না। আর
তাই উনি সব জিনিসপত্র নিয়ে তার কোচিং এ আসার আমন্ত্রণ রাখলেন। দুপুরে জুমার নামাজ শেষ
করে এসে তাড়াতাড়ি ভাত দুটো খেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটলাম কাটগড় সাখাওয়াত ভাই এর কোচিং সেন্টারে।
ইতোমধ্যেই
সৈকত জিনিসপত্র নিয়ে চলে এসেছে কাটগড় মোড়ে, আমি কি কি জিনিস আছে তা জানার জন্যে
বারবার প্রশ্ন করছিলাম। “বল বীর, চির উন্নত মম শির”- বন্ধু সৈকতের চেহারা সুরত আর
ভাবভঙ্গি দেখে আমার ওকে এমনই মনে হচ্ছিল। যাই হোক, নাই মামার চেয়ে কানা মামাই
ভালো। কিছু তো অন্তত শিখা যাবে ওর থেকে। দেখলাম ফটোকপির দোকান থেকে এক পেজে প্রিন্ট করা সার্কিট সে ফটো পেপারে ফটোকপি করে নিল।
-কি
ফটোকপি করলি এটা?
-“লেজার
প্রিন্টারে প্রিন্ট দিতে হয় এই ডায়াগ্রাম, আর প্রিন্ট করতে হয় গ্লসি পেপারে যাতে
করে পিসিবি বোর্ডের উপর প্রেশার আর হিট দিলে লেগে যায়”। - সৈকত ব্যাখ্যা করল।
-“ও
আচ্ছা, তো ফটোকপি করতেছস কেন”?
-“লেজার
প্রিন্টার নাই, তাই ফটোকপি ট্রিক্স। দুইটাই কার্বন কালি”।
-“আরি শালা, এ তো দেখি চাইনিজ মানুষ...বাংলা বুদ্ধি”।– মনে মনে বললাম।
সাখাওয়াত ভাই এর কোচিং এ ঢুকেই দেখি ইয়া বড় এলইডি ডিসপ্লে। কোচিং সেন্টারটাকে একটা ছোটখাটো ফিজিক্স ল্যাব বলা চলে। সরল দোলক থেকে শুরু করে বীকার, সরল মাইক্রোস্কোপ, প্রিজম, লেন্স, স্লাইড ক্যালিপার্স, স্ক্রু গজ, প্যারিস্কোপ, দূরবীক্ষণ যন্ত্র... মানে নেই যে কিছু বাকি নাই। এত ছোট রুমে এত এত যন্ত্রপাতি দেখে মনে মনে ভাবছিলাম, ঈশ ... আমারো যদি এমন একটা ল্যাব থাকতো !
-বুঝলেন
সৈকত ভাই, এগুলা আমার অনেক দিনের সঞ্চয়। একটা একটা করে নিয়ে সব জমিয়ে রাখছি।
-বাহ,
খুব সুন্দর আপনার চিন্তাভাবনা।
-আচ্ছা
শুরু করেন কি জাদু দেখাবেন আজকে?
-একটা
প্লাস্টিকের গামলা বা এ জাতীয় কিছু হবে, পানি নেয়ার জন্যে?
-হ্যাঁ,
হ্যাঁ... অবশ্যই। একেবারে ল্যাবরেটরির ছোট প্লাস্টিকের ট্রে গুলাই আছে।
-সৈকত,
প্লাস্টিকের ট্রে কেন রে? – আমি না বুঝেই বন্ধুকে প্রশ্ন করে বসলাম।
-মাম্মা,
ফেরিক ক্লোরাইড সিলভারে বা অন্য মেটালের পাত্রের সাথে কেমিক্যাল রিএকশন করে বসে।
-ও
আচ্ছা। - প্রতিনিয়ত সৈকতের কাজেকর্মে অবাক হচ্ছিলাম, যেন কোন জাদুকর জাদু দেখাতে
এসেছে।
ফটোকপি করা ফটোপেপার কেটে নিয়ে একটা কপার বোর্ডের উপর বসাল সৈকত, এরপর ব্যাগ থেকে ভারী একটা স্ত্রী বের করে যা ডলাডলি শুরু করল...না পারছিল স্ত্রীর উপর উঠেই যায়। বেশ কিছুক্ষণ ডলাডলি করে বেচারা ঘেমে-নেয়ে একাকার। এরপর পানিতে ভিজিয়ে আস্তে আস্তে কপার বোর্ড থেকে কাগজ তুলে নিল, দেখলাম খুব সুন্দরভাবে সার্কিট ডায়াগ্রামটি কপার বোর্ডের উপর বসে গেছে। আমি পানি বদলে ট্রেতে নতুন পানি এনে দিলাম। সৈকত তার ব্যাগ থেকে একটা বয়াম বের করে দু-চামচ ফেরিক ক্লোরাইড ট্রেতে ঢেলে দিল, সবুজাভ বাদামি ফেরিক ক্লোরাইড পানিতে পড়ার সাথে সাথেই হালকা ঝাঁঝাঁ শব্দে বিক্রিয়া শুরু করল। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, কপার ফেরিক ক্লোরাইড এর সাথে বিক্রিয়া ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে। বিক্রিয়া তাড়াতাড়ি শেষ করার জন্যে বন্ধু সৈকত আরো দু-চামচ ফেরিক ক্লোরাইড দিয়ে হাত দিয়ে ঘষতে থাকে... আর কিছুক্ষণের মধ্যেই খুব সুন্দরভাবে পিসিবি তৈরী হয়ে যায়। পরে অবশ্য বই-পুস্তক পড়ে জেনেছি এই প্রক্রিয়াটার নাম “Etching”।
সবশেষে সৈকত ছোট ড্রিল দিয়ে ফুটো করে ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্ট গুলো বসিয়ে সোল্ডারিং করে পিসিবি রেডি করে আমার হাতে তুলে দিল। উপস্থিত আমি আর সাখাওয়াত ভাই হাতে কলমে প্রথম পিসিবি বানানো শিখলাম। সার্কিট টি ছিল LDR লাইট সার্কিট, আলো-অন্ধকার এর উপর ভিত্তি করে রিলে সুইচিং সার্কিট এর পিসিবি। এরপর থেকে আমার পরীক্ষা শেষের ছুটিটা বেশ ভালোই কেটে গেছে…… কোচিং-টিউশন শেষে মাঝে মধ্যে এরকম বসে টুকটাক কাজ শিখি-করি, বলতে গেলে একরকম এভাবেই আমার প্রফেশনাল ইলেকট্রনিক্সে হাতেখড়ি, গুঁতোগুঁতি তো সেই স্কুল লাইফ থেকে করে আসছি।
>>>>>>>
আজ সকাল থেকে
মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে… না পারতে ভার্সিটি তে আসা। আজ নাকি রেজাল্ট দিবে। দুপুরের দিকে
বৃষ্টি কিছুটা থেমেছিল, আর তাই আমরা ক’জন ক্যাম্পসে। বেলা তিনটের দিকে নোটিশ বোর্ডে
নাকি রেজাল্ট টাঙানো হবে। ভার্সিটির প্রথম পরীক্ষা, সবার তাই কমবেশি টেনশন হচ্ছিল।
নোটিশ বোর্ডে রেজাল্ট শিট লাগানোর সাথে সাথেই একগাদা ছেলেপিলের হুড়োহুড়ি, হন্যে হয়ে
সবাই যে যার নাম আর আইডি খুঁজে চলেছে নোটিশ বোর্ডের এই প্যান্ট থেকে ওই প্রান্তে। এর
আগে যতবারই আমি এই নোটিশ বোর্ডের সামনে গিয়েছি খুব কনফিডেন্ট ছিলাম… মাধ্যামিক-উচ্চ
মাধ্যমিক সব ফলাফল স্কুল-কলেজের নোটিশ বোর্ডে গিয়েই দেখেছি। কিন্তু এবার আমি ভাল করেই
জানি, আমার রেজাল্ট ভাল হবেনা। আইডি আর নাম খুঁজে বের করতে না করতেই ওয়ারিফ বলে উঠল
“দুইটা রিটেক, দুইটা”। আমি সিস্টেম এর আগা মাথা কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। একে একে
দেখি A, A-, B, A+, A, A-, B…. আর দুটো বিষয়ে R1 লিখা। বাকি সবার সাথে আলোচনা করে বুঝতে
পারলাম, ফার্স্ট ফিফটি তে পাশ করে ফাইনালে পাশ করতে না পারলে তাঁকে রিটেক বলে, R1 দিয়ে
প্রথমবারের মতো বুঝাচ্ছে। আর ফার্স্ট ফিফটি কিংবা ফাইনাল ফিফটির কোনটিতেই পাশ করতে
না পারলে F লিখা আসে। তার, গণিত-১ আর সার্কিট-১ এই দুটো বিষয় এর ফাইনাল পরে আবার দিয়ে
পাশ করতে হবে……শান্তি নাই।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন